02/06/2026
ফাহফায, ফা-কুল্লু হাফিযিন ইমাম
কলমে- আব্দুল হাকীম মাদানী
হিফযের গুরুত্ব, উপায় ও আদব
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه ومن والاه.
ইসলামী জ্ঞানচর্চায় হিফয বা মুখস্থ করার গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। কুরআন, হাদীস, ফিকহ, আকীদা, আরবি ভাষা সব ক্ষেত্রেই হিফয তলিবুল ইলমের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি। শুধু বই সংগ্রহ করা, নোট লেখা বা বেশি পড়াই যথেষ্ট নয়; বরং জ্ঞান তখনই জীবন্ত হয়ে ওঠে, যখন তা হৃদয়ে সংরক্ষিত থাকে, প্রয়োজনের সময় স্মরণে আসে, আমলে প্রকাশ পায় এবং মানুষের উপকারে ব্যবহৃত হয়।
আল্লাহ তাআলা কুরআন সংরক্ষণের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন,
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমিই তার সংরক্ষক। সূরা আল-হিজর: ৯।
এই সংরক্ষণের একটি মহান মাধ্যম হলো উম্মতের হাফেয, আলেম ও মুহাদ্দিসগণ। তাঁদের বক্ষ ছিল জ্ঞানের ভাণ্ডার। তাঁরা কুরআন ও সুন্নাহ মুখস্থ করেছেন, বুঝেছেন, আমল করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এজন্য হিফয শুধু একটি বিদ্যাগত দক্ষতা নয়; এটি দ্বীনের খেদমত, ইলমের আমানত এবং আত্মগঠনের এক মহান পথ।
হিফযের মর্যাদা-
হিফয মহান আল্লাহর একটি বড় নিয়ামত। মানুষ যদি স্মরণশক্তি থেকে বঞ্চিত হতো, তবে তার জীবন অত্যন্ত কঠিন হয়ে যেত। আল্লাহ মানুষের অন্তরে স্মরণ ও সংরক্ষণের শক্তি দিয়েছেন, যাতে সে জ্ঞান ধারণ করতে পারে। কুরআন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
بَلْ هُوَ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ فِي صُدُورِ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ
বরং এটি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ, যা জ্ঞানপ্রাপ্তদের বক্ষে সংরক্ষিত। সূরা আল-আনকাবূত: ৪৯। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, কুরআন কেবল পৃষ্ঠায় লেখা নয়; বরং আলেম ও হাফেযদের বক্ষেও তা সংরক্ষিত থাকে। তাই হিফযের মর্যাদা অত্যন্ত উঁচু।
রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের শুধু জ্ঞান শুনতে বলেননি; বরং তা সংরক্ষণ করে অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে বলেছেন। আব্দুল কাইস গোত্রের প্রতিনিধি দলকে তিনি দ্বীনের কিছু বিষয় শিক্ষা দিয়ে বলেছিলেন,
احْفَظُوهُنَّ وَأَخْبِرُوا بِهِنَّ مَنْ وَرَاءَكُمْ
তোমরা এগুলো মুখস্থ রাখো এবং তোমাদের পেছনে যারা আছে, তাদের জানিয়ে দাও।
অতএব হিফযের উদ্দেশ্য শুধু নিজের জ্ঞান বাড়ানো নয়; বরং ইলমকে সংরক্ষণ করা, আমল করা এবং মানুষের মাঝে পৌঁছে দেওয়া।
হিফয কী?-
হিফয মানে শুধু শব্দ মুখস্থ করা নয়। প্রকৃত হিফয হলো ইতকান, অর্থাৎ যথাযথভাবে, নির্ভুলভাবে, মজবুতভাবে সংরক্ষণ করা। ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হিফয কী? তিনি বলেন,
الإِتْقَانُ هُوَ الحِفْظُ
ইতকান বা দৃঢ়ভাবে আয়ত্ত করাই হলো হিফয।
ইমাম আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
الحِفْظُ الإِتْقَانُ
হিফয হলো ইতকান, অর্থাৎ নির্ভুলভাবে আয়ত্ত করা।
তাই একজন তলিবুল ইলমের জন্য মুখস্থ মানে শুধু দ্রুত পড়ে নেওয়া নয়; বরং এমনভাবে শেখা, যাতে ভুল কম হয়, অর্থ বোঝা যায় এবং প্রয়োজনের সময় তা স্মরণে আসে।
তালিবুল ইলমের জন্য হিফযের প্রয়োজনীয়তা-
একজন ছাত্র যদি অনেক বই পড়ে কিন্তু কিছুই হৃদয়ে ধারণ না করে, তবে প্রয়োজনের সময় সে অসহায় হয়ে পড়ে। বই, নোট ও লাইব্রেরি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু বক্ষের ইলম সবচেয়ে বেশি উপকারী। খলীল ইবনু আহমদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
الاحْتِفَاظُ بِمَا فِي صَدْرِكَ أَوْلَى مِنْ حِفْظِ مَا فِي كِتَابِكَ، وَاجْعَلْ كِتَابَكَ رَأْسَ مَالِكَ، وَمَا فِي صَدْرِكَ لِلنَّفَقَةِ
তোমার বক্ষে যা আছে তা সংরক্ষণ করা, তোমার বইয়ে যা আছে তা সংরক্ষণের চেয়ে উত্তম। তোমার বইকে মূলধন বানাও, আর বক্ষে থাকা ইলমকে খরচের জন্য রাখো।
অর্থাৎ বই হলো জ্ঞানের ভাণ্ডার; কিন্তু মুখস্থ জ্ঞান হলো ব্যবহারযোগ্য সম্পদ। শিক্ষকতা, দাওয়াহ, নসীহত, আলোচনা, ফতোয়া, খুতবা সব জায়গায় হৃদয়ে সংরক্ষিত ইলমের প্রয়োজন হয়।
আব্দুর রাযযাক রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
كُلُّ عِلْمٍ لَا يَدْخُلُ مَعَ صَاحِبِهِ الحَمَّامَ فَلَا تَعُدَّهُ عِلْمًا
যে ইলম তার মালিকের সঙ্গে গোসলখানায়ও প্রবেশ করে না, তাকে প্রকৃত ইলম মনে করো না। অর্থাৎ বই সঙ্গে না থাকলেও যে জ্ঞান মানুষের অন্তরে থাকে, সেটিই প্রকৃত উপকারী জ্ঞান।
হিবাতুল্লাহ আল-বাগদাদী রাহিমাহুল্লাহ সুন্দর করে বলেছেন,
عِلْمِي مَعِي أَيْنَمَا يَمَّمْتُ يَتْبَعُنِي
بَطْنِي وِعَاءٌ لَهُ لَا بَطْنُ صُنْدُوقِ
আমার ইলম আমার সঙ্গেই থাকে, আমি যেদিকে যাই তা আমার অনুসরণ করে। আমার বুকই তার পাত্র, কোনো সিন্দুকের পেট নয়।
আরেকজন বলেন,
إِنْ كُنْتُ فِي البَيْتِ كَانَ العِلْمُ فِيهِ مَعِي
أَوْ كُنْتُ فِي السُّوقِ كَانَ العِلْمُ فِي السُّوقِ
আমি ঘরে থাকলে ইলম আমার সঙ্গে ঘরেই থাকে।
আর বাজারে থাকলে ইলম আমার সঙ্গে বাজারেই থাকে।
উবাইদুল্লাহ আস-সাইরাফী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
لَيْسَ بِعِلْمٍ مَا حَوَى القِمَطْرُ
مَا العِلْمُ إِلَّا مَا حَوَاهُ الصَّدْرُ
সিন্দুকে যা জমা থাকে তা ইলম নয়।
ইলম তো সেটাই, যা বক্ষ ধারণ করে।
ইবনু শদীদ আল-আযদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
أَأَشْهَدُ بِالجَهْلِ فِي مَجْلِسٍ
وَعِلْمِي فِي البَيْتِ مُسْتَوْدَعُ
إِذَا لَمْ تَكُنْ حَافِظًا وَاعِيًا
فَجَمْعُكَ لِلْكُتُبِ لَا يَنْفَعُ
আমি কি কোনো মজলিসে অজ্ঞতার সাক্ষ্য দেব, অথচ আমার ইলম ঘরে জমা থাকবে?
যদি তুমি সচেতন হাফেয না হও, তবে তোমার বই সংগ্রহ তোমার উপকারে আসবে না।
এসব উক্তি আমাদের শেখায়, বই সংগ্রহ প্রশংসনীয়; কিন্তু মুখস্থ ও আয়ত্ত না থাকলে জ্ঞান পূর্ণ উপকারী হয় না।
হিফযের পথে প্রথম কষ্ট ও ধৈর্য-
হিফয সহজ কাজ নয়। শুরুতে এটি কঠিন মনে হয়। মন ক্লান্ত হয়, বারবার পড়তে বিরক্ত লাগে। কিন্তু ধৈর্য, অনুশীলন ও নিয়মিত চেষ্টায় হিফয সহজ হয়ে যায়।
ইমাম ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
مَا رَأَيْتُ أَصْعَبَ عَلَى النَّفْسِ مِنَ الحِفْظِ لِلْعِلْمِ وَالتَّكْرَارِ لَهُ
ইলম মুখস্থ করা এবং তা বারবার পুনরাবৃত্তি করার চেয়ে নফসের ওপর কঠিন কিছু আমি দেখিনি।
তবে কষ্টের পরই সহজতা আসে। ইমাম যুহরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
إِنَّ الرَّجُلَ لَيَطْلُبُ وَقَلْبُهُ شِعْبٌ مِنَ الشِّعَابِ، ثُمَّ لَا يَلْبَثُ أَنْ يَصِيرَ وَادِيًا لَا يُوضَعُ فِيهِ شَيْءٌ إِلَّا الْتَهَمَهُ
মানুষ যখন ইলম অন্বেষণ শুরু করে, তখন তার হৃদয় ছোট একটি উপত্যকার মতো থাকে। এরপর অল্পদিনেই তা এমন প্রশস্ত উপত্যকায় পরিণত হয়, যেখানে যা রাখা হয়, তা ধারণ করে নেয়। অর্থাৎ, শুরুতে স্মরণশক্তি দুর্বল মনে হলেও নিয়মিত অনুশীলনে তা শক্তিশালী হয়। হৃদয় যত বেশি ইলম গ্রহণ করে, ততই তার ধারণক্ষমতা বাড়ে।
হিফযের প্রধান উপায়: পুনরাবৃত্তি-
হিফযের সবচেয়ে বড় উপায় হলো তাকরার বা পুনরাবৃত্তি। অন্য সব উপায় সহায়ক; কিন্তু আসল ভিত্তি হলো বারবার পড়া, শোনা, বলা ও যাচাই করা।
আবু ইসহাক আশ-শীরাযী রাহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে বলা হয়, তিনি একটি পাঠ মুখস্থ করার জন্য একশ বার পুনরাবৃত্তি করতেন।
كَانَ أَبُو إِسْحَاقَ الشِّيرَازِيُّ يُعِيدُ الدَّرْسَ مِائَةَ مَرَّةٍ
আবু ইসহাক আশ-শীরাযী রাহিমাহুল্লাহ পাঠ একশ বার পুনরাবৃত্তি করতেন।
হাসান ইবনু আবী বকর আন-নাইসাবূরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
لَا يَحْصُلُ الحِفْظُ لِي حَتَّى يُعَادَ خَمْسِينَ مَرَّةً
আমার হিফয অর্জিত হয় না, যতক্ষণ না তা পঞ্চাশ বার পুনরাবৃত্তি করা হয়।
ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহকে তাঁর হিফযের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,
لَا أَعْلَمُ شَيْئًا أَنْفَعَ لِلْحِفْظِ مِنْ مُدَاوَمَةِ النَّظَرِ
হিফযের জন্য নিয়মিত পুনঃপাঠের চেয়ে উপকারী কিছু আমি জানি না।
সুতরাং যে ব্যক্তি হিফয করতে চায়, তাকে পুনরাবৃত্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হবে। একবার পড়ে মুখস্থ হয়েছে মনে করলেই যথেষ্ট নয়। আজ মুখস্থ হলে কাল, পরশু, এক সপ্তাহ পরে, এক মাস পরে আবার পড়তে হবে। কারণ হিফয একটি গাছের মতো; মুরাজাআহ হলো তার পানি। পানি বন্ধ হলে গাছ শুকিয়ে যায়।
অল্প অল্প করে নিয়মিত হিফয-
হিফযের ক্ষেত্রে অল্প কিন্তু নিয়মিত আমল বেশি ফলপ্রসূ। একদিনে অনেক কিছু মুখস্থ করে পরে ছেড়ে দেওয়া ভালো নয়। বরং প্রতিদিন সামান্য অংশ মুখস্থ করা এবং তা দৃঢ় করা উত্তম।
ইমাম যুহরী রহ. বলেন,
إِنَّ هَذَا العِلْمَ إِنْ أَخَذْتَهُ بِالمُكَابَرَةِ عَسُرَ عَلَيْكَ، وَلَكِنْ خُذْهُ مَعَ الأَيَّامِ وَاللَّيَالِي أَخْذًا رَفِيقًا تَظْفَرْ بِهِ
এই ইলম যদি তুমি জোর করে একসাথে নিতে চাও, তবে তা তোমার জন্য কঠিন হয়ে যাবে। কিন্তু দিন-রাতের ধারাবাহিকতায় কোমলভাবে গ্রহণ করলে তুমি তা অর্জন করতে পারবে।
হাম্মাদ ইবনু আবী সুলাইমান রাহিমাহুল্লাহ তাঁর ছাত্রকে বলতেন,
تَعَلَّمْ كُلَّ يَوْمٍ ثَلَاثَ مَسَائِلَ وَلَا تَزِدْ عَلَيْهَا
প্রতিদিন তিনটি মাসআলা শিখো, এর বেশি বাড়িয়ো না।
আহমাদ ইবনুল ফুরাত রাহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে বলা হয়,
كَانَ لَا يَتْرُكُ كُلَّ يَوْمٍ إِذَا أَصْبَحَ أَنْ يَحْفَظَ شَيْئًا وَإِنْ قَلَّ
তিনি প্রতিদিন সকালে কিছু না কিছু মুখস্থ করতেন, যদিও তা অল্প হতো।
এটাই হিফযের বাস্তব নিয়ম। কম নাও, কিন্তু মজবুত করে নাও। অল্প মুখস্থ করে নিয়মিত মুরাজাআহ করা, বেশি মুখস্থ করে ভুলে যাওয়ার চেয়ে অনেক উত্তম।
নতুন মুখস্থের আগে পুরোনো মজবুত করা-
হিফযের বড় একটি ভুল হলো, পুরোনো অংশ ঠিকমতো না দেখে নতুন অংশে এগিয়ে যাওয়া। এতে প্রথমে অগ্রগতি বেশি মনে হয়, কিন্তু পরে সব দুর্বল হয়ে পড়ে।
সালাফদের নীতি ছিল, যা নিয়েছে তা দৃঢ় না করে সামনে এগোবে না। কেউ কেউ এক-দুইটি হাদীস শুনেই থেমে যেতেন, যাতে তা ঠিকমতো মুখস্থ করতে পারেন।
সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
كُنْتُ آتِي الأَعْمَشَ وَمَنْصُورًا، فَأَسْمَعُ أَرْبَعَةَ أَحَادِيثَ وَخَمْسَةً ثُمَّ أَنْصَرِفُ، كَرَاهَةَ أَنْ تَكْثُرَ وَتَتَفَلَّتَ
আমি আ'মাশ ও মানসুরের কাছে যেতাম। চার-পাঁচটি হাদীস শুনে ফিরে আসতাম, এ আশঙ্কায় যে বেশি হলে তা হাতছাড়া হয়ে যাবে।
শু‘বা রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
كُنْتُ آتِي قَتَادَةَ فَأَسْأَلُهُ عَنْ حَدِيثَيْنِ، فَيُحَدِّثُنِي، ثُمَّ يَقُولُ: أَزِيدُكَ؟ فَأَقُولُ: لَا، حَتَّى أَحْفَظَهُمَا وَأُتْقِنَهُمَا
আমি কাতাদার কাছে গিয়ে দুটি হাদীস জিজ্ঞেস করতাম। তিনি আমাকে তা বলতেন। এরপর বলতেন, আরও বলব? আমি বলতাম, না; যতক্ষণ না এই দুটিকে মুখস্থ ও মজবুত করি।
এজন্য বলা হয়েছে,
مَنْ طَلَبَ العِلْمَ جُمْلَةً فَاتَهُ جُمْلَةً
যে ব্যক্তি ইলম একসাথে নিতে চায়, তার কাছ থেকে ইলম একসাথেই ছুটে যায়।
মনোযোগ দিয়ে শোনা-
হিফযের শুরু হয় ভালোভাবে শোনা থেকে। যে ভালো শুনতে পারে না, সে ভালো মুখস্থও করতে পারে না। তাই শিক্ষার্থীর প্রথম আদব হলো নীরবতা, মনোযোগ এবং গ্রহণের মানসিকতা।
সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
أَوَّلُ العِلْمِ الصَّمْتُ، وَالثَّانِي الاسْتِمَاعُ لَهُ وَحِفْظُهُ، وَالثَّالِثُ العَمَلُ بِهِ، وَالرَّابِعُ نَشْرُهُ وَتَعْلِيمُهُ
ইলমের প্রথম ধাপ হলো নীরবতা। দ্বিতীয় ধাপ হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা ও মুখস্থ করা। তৃতীয় ধাপ হলো আমল করা। চতুর্থ ধাপ হলো তা প্রচার ও শিক্ষা দেওয়া।
আরেকটি সুন্দর উক্তি আছে,
يَا طَالِبًا لِلْعِلْمِ كَيْ تَحْظَى بِهِ
دِينًا وَدُنْيَا حَظْوَةً تُعْلِيهِ
اسْمَعْهُ ثُمَّ احْفَظْهُ ثُمَّ اعْمَلْ بِهِ
لِلَّهِ ثُمَّ انْشُرْهُ فِي أَهْلِيهِ
হে ইলমের অনুসন্ধানী! তুমি যদি দীন ও দুনিয়ার মর্যাদা পেতে চাও, তবে প্রথমে তা শোনো, তারপর মুখস্থ করো, তারপর আল্লাহর জন্য আমল করো, এরপর তার উপযুক্তদের মাঝে তা ছড়িয়ে দাও।
উচ্চস্বরে পড়া-
হিফযের আরেকটি কার্যকর উপায় হলো উচ্চস্বরে পড়া। এতে চোখের সঙ্গে কানও অংশগ্রহণ করে। ফলে স্মরণ শক্তিশালী হয়।
যুবাইর ইবনু বাক্কার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তাঁর পিতা তাঁকে বলেছিলেন,
إِنَّمَا لَكَ مِنْ رِوَايَتِكَ هَذِهِ مَا أَدَّى بَصَرُكَ إِلَى قَلْبِكَ، فَإِذَا أَرَدْتَ الرِّوَايَةَ فَانْظُرْ إِلَيْهَا وَاجْهَرْ بِهَا، فَإِنَّهُ يَكُونُ لَكَ مَا أَدَّى بَصَرُكَ إِلَى قَلْبِكَ وَمَا أَدَّى سَمْعُكَ إِلَى قَلْبِكَ
তুমি চুপচাপ পড়ে যা অর্জন করছ, তা শুধু চোখ থেকে হৃদয়ে পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু যখন বর্ণনা বা মুখস্থ করতে চাও, তখন দেখে উচ্চস্বরে পড়ো। এতে চোখ যা হৃদয়ে পৌঁছাবে, তার সঙ্গে কান যা হৃদয়ে পৌঁছাবে তাও যুক্ত হবে।
আবু হামিদ রাহিমাহুল্লাহ তাঁর সঙ্গীদের বলতেন,
إِذَا دَرَسْتُمْ فَارْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ، فَإِنَّهُ أَثْبَتُ لِلْحِفْظِ وَأَذْهَبُ لِلنَّوْمِ
তোমরা যখন পাঠ করবে, তখন কণ্ঠ উঁচু করো। কারণ এটি হিফযকে বেশি স্থির করে এবং ঘুম দূর করে।
তিনি আরও বলতেন,
القِرَاءَةُ الخَفِيَّةُ لِلْفَهْمِ، وَالرَّفِيعَةُ لِلْحِفْظِ
নীরব পাঠ বোঝার জন্য, আর উচ্চস্বরে পাঠ মুখস্থের জন্য।
তবে মানুষের স্বভাব ভিন্ন। কারও জন্য উচ্চস্বরে পড়া বেশি উপকারী, কারও জন্য নীরবে দেখে পড়া বেশি কার্যকর। তাই নিজের উপযোগী পদ্ধতি বুঝে নিতে হবে।
ইখলাস: হিফযের প্রাণ-
হিফযের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নিয়ত বিশুদ্ধ করা। ইলম যদি লোক দেখানো, বিতর্কে জেতা, মানুষের প্রশংসা পাওয়া বা মর্যাদা অর্জনের জন্য হয়, তবে তা বিপজ্জনক। আর যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, তবে তাতে বরকত আসে।
ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,
إِنَّمَا يَحْفَظُ الرَّجُلُ عَلَى قَدْرِ نِيَّتِهِ
মানুষ তার নিয়তের পরিমাণ অনুযায়ী হিফয করতে পারে। অর্থাৎ, নিয়ত যত বিশুদ্ধ হবে, হিফয তত বরকতময় হবে। ইলম আল্লাহর দান। তাই আল্লাহর জন্য না হলে সেই ইলমে নূর ও বরকত থাকে না।
গুনাহ ত্যাগ ও তাকওয়া-
গুনাহ স্মরণশক্তির ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। হিফযের জন্য তাকওয়া, পবিত্রতা ও নেক আমল অত্যন্ত জরুরি। ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হিফযের জন্য কোনো উপায় আছে কি? তিনি বলেন,
إِنْ كَانَ يَصْلُحُ لَهُ شَيْءٌ فَتَرْكُ المَعَاصِي
যদি হিফযের জন্য কোনো জিনিস উপকারী হয়, তবে তা হলো গুনাহ ত্যাগ করা।
সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কীভাবে হিফয পেয়েছেন? তিনি বলেন,
بِتَرْكِ المَعَاصِي
গুনাহ ত্যাগ করার মাধ্যমে।
ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ এর দিকে সম্বন্ধিত বিখ্যাত উক্তি,
شَكَوْتُ إِلَى وَكِيعٍ سُوءَ حِفْظِي
فَأَرْشَدَنِي إِلَى تَرْكِ المَعَاصِي
وَقَالَ اعْلَمْ بِأَنَّ العِلْمَ فَضْلٌ
وَفَضْلُ اللَّهِ لَا يُؤْتَاهُ عَاصِي
আমি ওয়াকী‘-এর কাছে আমার দুর্বল স্মৃতির অভিযোগ করলাম। তিনি আমাকে গুনাহ ত্যাগের নির্দেশ দিলেন।
এরপর তিনি বললেন, জেনে রাখো, ইলম আল্লাহর অনুগ্রহ। আর আল্লাহর অনুগ্রহ কোনো অবাধ্য ব্যক্তিকে দেওয়া হয় না।
এ কথার অর্থ হলো, ইলম নূর। আর গুনাহ সেই নূরকে দুর্বল করে দেয়। তাই একজন হাফেয বা তলিবুল ইলমের উচিত চোখ, কান, জিহ্বা, অন্তর ও আচরণকে পবিত্র রাখা।
নেক আমল ও কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক-
নেক আমল হিফযকে শক্তিশালী করে। বিশেষ করে কুরআন তিলাওয়াত, কিয়ামুল লাইল, যিকর, দুআ এবং আল্লাহর আনুগত্য স্মরণশক্তিতে বরকত আনে।
আল্লাহ বলেন,
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ
আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি; আছে কি কোনো উপদেশ গ্রহণকারী? সূরা আল-কামার: ১৭। যে ব্যক্তি কুরআন মুখস্থ করে, তার জন্য অন্য ইলম মুখস্থ করা সহজ হয়ে যায়। কারণ কুরআন জিহ্বা, হৃদয় ও স্মৃতিকে শুদ্ধ করে।
দুআ ও যিকর-
হিফযের জন্য দুআ একটি বড় মাধ্যম। মানুষ চেষ্টা করবে, পুনরাবৃত্তি করবে, সময় দেবে; কিন্তু তাওফীক আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। আল্লাহ বলেন,
وَاذْكُرْ رَبَّكَ إِذَا نَسِيتَ
তুমি ভুলে গেলে তোমার রবকে স্মরণ করো। সূরা আল-কাহফ: ২৪।
যিকর ভুলে যাওয়া দূর করে, অন্তরকে সজাগ রাখে এবং জ্ঞানকে স্থির করে। অনেক আলেম জমজমের পানি পান করে আল্লাহর কাছে শক্তিশালী হিফযের দুআ করেছেন। তাই তলিবুল ইলমের উচিত হিফযের আগে ও পরে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।
ইলম শেখানো ও আলোচনা করা-
হিফয ধরে রাখার একটি বড় উপায় হলো অন্যকে শেখানো। যখন একজন ব্যক্তি শেখানো শুরু করে, তখন তার নিজের হিফযও মজবুত হয়। কারণ শিক্ষা দেওয়া নিজেই এক ধরনের পুনরাবৃত্তি।
ইমাম যুহরী রাহিমাহুল্লাহ কোনো হাদীস শুনলে ঘরে গিয়ে তাঁর দাসীকে জাগিয়ে বলতেন,
اسْمَعِي، حَدَّثَنِي فُلَانٌ كَذَا وَفُلَانٌ كَذَا
শোনো, অমুক আমাকে এমন হাদীস বলেছেন, অমুক এমন বলেছেন।
একজন দাসী বলত, এ হাদীস দিয়ে আমার কী দরকার? তিনি বলতেন,
قَدْ عَلِمْتُ أَنَّكِ لَا تَنْتَفِعِينَ بِهِ، وَلَكِنْ سَمِعْتُهُ الآنَ فَأَرَدْتُ أَنْ أَسْتَذْكِرَهُ
আমি জানি তুমি এতে উপকৃত হবে না, কিন্তু আমি এখনই এটি শুনেছি, তাই তা স্মরণে দৃঢ় করতে চেয়েছি। এ থেকে বোঝা যায়, শুনে সঙ্গে সঙ্গে কাউকে বলা বা নিজে নিজে আওড়ানো হিফয মজবুত করার বড় উপায়।
সহপাঠীর সঙ্গে মুযাকারা-
একজন তলিবুল ইলমের জন্য সহপাঠীর সঙ্গে মুযাকারা বা পারস্পরিক আলোচনা অত্যন্ত উপকারী। এতে ভুল ধরা পড়ে, স্মরণশক্তি সক্রিয় থাকে এবং জ্ঞান স্থায়ী হয়। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা সাঈদকে বলতেন,
يَا سَعِيدُ، اخْرُجْ بِنَا إِلَى النَّخْلِ، وَقَالَ: يَا سَعِيدُ، حَدِّثْ
হে সাঈদ! আমাদের নিয়ে খেজুর বাগানে চলো। এরপর বলতেন, হে সাঈদ! তুমি হাদীস বলো।
সাঈদ বলতেন, আপনি উপস্থিত থাকতে আমি বলব? তিনি বলতেন,
إِنْ أَخْطَأْتَ فَتَحْتُ عَلَيْكَ
তুমি ভুল করলে আমি তোমাকে ধরিয়ে দেব।
ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
إِنَّهُ لَيَطُولُ عَلَيَّ اللَّيْلُ حَتَّى أَلْقَى أَصْحَابِي فَأُذَاكِرَهُمْ
রাত আমার কাছে দীর্ঘ মনে হয়, যতক্ষণ না আমি আমার সঙ্গীদের সঙ্গে দেখা করে তাদের সঙ্গে মুযাকারা করি। আর এ ধরনের মুযাকারা ইলমকে জীবন্ত রাখে।
আমল হিফযকে মজবুত করে-
হিফযের উদ্দেশ্য শুধু স্মরণ নয়; বরং আমল। যে ইলম অনুযায়ী আমল করা হয়, তা হৃদয়ে বেশি স্থায়ী হয়।
ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
كُنَّا نَسْتَعِينُ عَلَى حِفْظِ الحَدِيثِ بِالعَمَلِ بِهِ
আমরা হাদীস মুখস্থ রাখতে তার ওপর আমল করার মাধ্যমে সাহায্য নিতাম।
ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে বলা হয়, তিনি তাঁর মুসনাদে কোনো হাদীস রাখলে তার ওপর আমল করার চেষ্টা করতেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ ﷺ হিজামা করিয়ে হাজ্জামকে পারিশ্রমিক দিয়েছেন বলে তিনিও হিজামা করিয়ে পারিশ্রমিক দিয়েছেন। এ থেকে বোঝা যায়, আমল ইলমের ফলও বটে, আবার হিফযের সহায়কও বটে।
হিফযের উপযুক্ত সময়-
হিফযের জন্য বয়সের দিক থেকে শৈশব ও যৌবন সবচেয়ে উপযোগী। ছোট বয়সের হিফয পাথরে খোদাই করার মতো দৃঢ় হয়। তবে বয়স বেড়ে গেলে হিফয অসম্ভব হয়ে যায় এ কথা ঠিক নয়। যতদিন বিবেক ও স্মৃতি আছে, ততদিন হিফয সম্ভব; শুধু পরিশ্রম বেশি লাগে।
সালাফগণ বলতেন,
حِفْظُ الغُلَامِ الصَّغِيرِ كَالنَّقْشِ فِي الحَجَرِ، وَحِفْظُ الرَّجُلِ الكَبِيرِ كَالكِتَابَةِ عَلَى المَاءِ
ছোট শিশুর হিফয পাথরে খোদাই করার মতো, আর বৃদ্ধ বয়সের হিফয পানির ওপর লেখার মতো।
আলকামা রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
مَا حَفِظْتُ وَأَنَا شَابٌّ فَكَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَيْهِ فِي قِرْطَاسٍ
যৌবনে যা মুখস্থ করেছি, যেন এখনো তা কাগজে লেখা দেখছি।
দিনের সময়ের মধ্যে সেহরির সময়, ফজরের আগের সময়, রাতের নির্জনতা এবং ভোরের সময় হিফযের জন্য বিশেষ উপকারী। কারণ তখন মন পরিষ্কার থাকে, ব্যস্ততা কম থাকে এবং অন্তর শান্ত থাকে।
ইবনু জামাআহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
أَجْوَدُ الأَوْقَاتِ لِلْحِفْظِ الأَسْحَارُ، وَلِلْبَحْثِ الأَبْكَارُ، وَلِلْمُطَالَعَةِ وَالمُذَاكَرَةِ اللَّيْلُ، وَلِلْكِتَابَةِ وَسَطُ النَّهَارِ
হিফযের জন্য উত্তম সময় হলো সেহরির সময়। গবেষণার জন্য ভোর। পাঠ ও মুযাকারার জন্য রাত। আর লেখার জন্য দিনের মধ্যভাগ।
ইসমাঈল ইবনু আবী উওয়াইস রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
إِذَا هَمَمْتَ أَنْ تَحْفَظَ شَيْئًا فَنَمْ، وَقُمْ عِنْدَ السَّحَرِ، فَأَسْرِجْ سِرَاجَكَ، وَانْظُرْ فِيهِ، فَإِنَّكَ لَا تَنْسَاهُ بَعْدُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ
তুমি যখন কিছু মুখস্থ করতে চাও, তখন আগে ঘুমাও। এরপর সেহরির সময় উঠে প্রদীপ জ্বালিয়ে তা পড়ো। ইনশাআল্লাহ এরপর তুমি তা ভুলবে না।
হিফযের উপযুক্ত স্থান-
হিফযের জন্য নিরিবিলি, শান্ত এবং বিভ্রান্তিমুক্ত স্থান প্রয়োজন। যেখানে মানুষের চলাচল, শব্দ, দৃশ্য ও ব্যস্ততা কম, সেখানে মন একাগ্র থাকে।
উঁচু কক্ষ, নির্জন ঘর, মসজিদের শান্ত কোণ বা এমন স্থান যেখানে মনোযোগ ভাঙে না, এসব হিফযের জন্য ভালো। বিপরীতে রাস্তার পাশে, নদীর তীরে, সবুজ বাগানে বা মানুষের ভিড়ের মাঝে হিফয করা অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে। কারণ চোখ ও মন বারবার অন্যদিকে চলে যায়।
হিফযের মূলনীতি হলো,
خُلُوُّ المَكَانِ وَجَمْعُ الهَمِّ أَصْلٌ فِي الحِفْظِ
নিরিবিলি স্থান এবং মনকে একত্র করা হিফযের মূল ভিত্তি।
খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পরিমিত জীবন-
হিফযের ওপর শরীর ও খাদ্যের প্রভাব আছে। অতিরিক্ত খাবার, পেট ভরে খাওয়া, অলসতা ও ঘুমঘুম ভাব হিফযকে দুর্বল করে। সালাফগণ কম খেতেন, হালকা খেতেন এবং মন-শরীরকে প্রস্তুত রাখতেন।
তবে খাদ্য একমাত্র কারণ নয়। মধু, কিশমিশ, কালোজিরা ইত্যাদি কিছু খাবারকে সহায়ক বলা হয়েছে; কিন্তু এগুলো অলস মানুষকে হাফেয বানিয়ে দেয় না। আসল বিষয় হলো নিয়মিত পরিশ্রম, মুরাজাআহ, তাকওয়া ও আল্লাহর তাওফীক।
সময়ের সুষম ব্যবহার-
তলিবুল ইলমের কাজ অনেক। তাকে পড়তে হয়, মুখস্থ করতে হয়, লিখতে হয়, শুনতে হয়, বুঝতে হয়, শেখাতে হয় এবং বিশ্রামও নিতে হয়। তাই সময়ের সঠিক বণ্টন জরুরি।
ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হিফযের সময় আলাদা রাখা উচিত। দিনের শুরু ও রাতের শেষ ভাগ হিফযের জন্য রাখা যায়। আর বাকি সময়ে লেখা, পড়া, নকল করা, আলোচনা এবং শরীরের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা উচিত।
এখানে ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চাপ দিলে মন ক্লান্ত হয়। আবার শিথিলতা বেশি হলে হিফয দুর্বল হয়। তাই নিজের শক্তি অনুযায়ী নিয়মিত, পরিমিত ও ধারাবাহিক পথই সবচেয়ে উত্তম।
হিফযের সারকথা-
হিফয তলিবুল ইলমের মূল পুঁজি। বই দরকার, লেখা দরকার, পাঠ দরকার; কিন্তু হৃদয়ে সংরক্ষিত ইলমের বিকল্প নেই। হিফযের জন্য দরকার ইখলাস, তাকওয়া, ধৈর্য, পুনরাবৃত্তি, মুরাজাআহ, ভালো সময়, ভালো পরিবেশ, সহপাঠীর সঙ্গে মুযাকারা, আমল এবং আল্লাহর কাছে দুআ।
যে ব্যক্তি অল্প অল্প করে নিয়মিত মুখস্থ করে, পুরোনো অংশ বারবার দেখে, গুনাহ থেকে বাঁচে, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে এবং শেখা ইলম অনুযায়ী আমল করে, আল্লাহর ইচ্ছায় তার হিফযে বরকত আসে।
শেষ কথা হলো, হিফয শুধু স্মৃতির কাজ নয়; এটি হৃদয়ের কাজ। যার অন্তর আল্লাহর জন্য প্রস্তুত, যার নিয়ত বিশুদ্ধ, যার জিহ্বা পুনরাবৃত্তিতে অভ্যস্ত, যার জীবন তাকওয়ায় সজ্জিত তার জন্য হিফয আল্লাহ সহজ করে দেন। এজন্যই বলা হয়,
فَاحْفَظْ، فَكُلُّ حَافِظٍ إِمَامٌ
অতএব তুমি হিফয করো; কারণ প্রত্যেক প্রকৃত হাফেযই ইমাম।
বারাকাল্লাহু ফিকুম। জাযাকুমুল্লাহ খাইরান।
২রা জুন, মঙ্গলবার, ২০২৬
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।