Al-Ilm Magazine

Al-Ilm Magazine 'আল-ইলম ম্যাগাজিন' শিক্ষার্থী ও শিশু-কিশোরদের জন্য আল-ইলম একাডেমী ও ইন্সটিটিউট এর ইসলামী মুখপত্র।

তালখীস তথা সারসংক্ষেপ করার গুরুত্ব ও পদ্ধতি-জ্ঞান অর্জনের পথে পড়া, শোনা ও বোঝার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো ...
12/06/2026

তালখীস তথা সারসংক্ষেপ করার গুরুত্ব ও পদ্ধতি-

জ্ঞান অর্জনের পথে পড়া, শোনা ও বোঝার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো সারসংক্ষেপ করা। অনেক সময় মানুষ কোনো বই পড়ে, কোনো লেকচার শোনে বা কোনো আলোচনা দেখে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে পারে; কিন্তু সেই বোঝাপড়াকে সংক্ষেপে, সুন্দরভাবে ও সুস্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। ফলে তার অর্জিত জ্ঞান নিজের ভেতরে স্থায়ীভাবে গুছিয়ে বসে না এবং অন্যের কাছেও সহজে পৌঁছায় না। তাই সারসংক্ষেপ শুধু লেখার একটি কৌশল নয়; বরং এটি চিন্তাকে পরিষ্কার করা, বোঝাপড়াকে দৃঢ় করা এবং জ্ঞানকে নিজের ভাষায় ধারণ করার একটি কার্যকর উপায়।

আমার কয়েকজন সহপাঠী ও বন্ধু ছিল, যাদের সঙ্গে আমি মাঝেমধ্যে কোনো বই পড়ার সিদ্ধান্ত নিতাম অথবা কোনো লেকচার ও শিক্ষামূলক আলোচনা দেখার পরিকল্পনা করতাম। আমরা বিষয়টি পড়তাম বা শুনতাম, তারপর তা নিয়ে আলোচনা করতাম। অনেক সময় আমি তাদের সামনে সেই বই বা আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরতাম। তখন তারা প্রায়ই জানতে চাইত, কীভাবে এত সুন্দরভাবে সারসংক্ষেপ করা যায়। বাস্তবতা হলো, তাদের অনেকেই বুঝতে ও গভীরভাবে চিন্তা করতে আমার চেয়েও সক্ষম ছিল। কিন্তু তারা যা বুঝত, তা গুছিয়ে প্রকাশ করতে কষ্ট পেত। এটি শুধু তাদের সমস্যা নয়; বরং অনেক শিক্ষার্থী ও পাঠকের মধ্যেই এই দুর্বলতা দেখা যায়।

সারসংক্ষেপ করার জন্য খুব জটিল কোনো নিয়ম জানা আবশ্যক নয়। এর শুরুটা হতে পারে খুব সহজভাবে। প্রথমে বিষয়টি মনোযোগ দিয়ে পড়তে বা শুনতে হয়। প্রয়োজন হলে একাধিকবার পড়া বা শোনা উচিত। এরপর মূল বক্তব্য, গুরুত্বপূর্ণ শব্দ, কেন্দ্রীয় ধারণা এবং লেখক বা বক্তার উদ্দেশ্যের দিকে নজর দিতে হয়। একটি বড় লেখা বা দীর্ঘ আলোচনায় অনেক সময় মূল ধারণা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। কোথাও ভূমিকা অংশে ইঙ্গিত থাকে, কোথাও মাঝখানে ব্যাখ্যা থাকে, আবার শেষে গিয়ে তা পূর্ণতা পায়। সারসংক্ষেপকারীকে সেই বিচ্ছিন্ন অংশগুলো একত্র করে গুছিয়ে উপস্থাপন করতে হয়।

সারসংক্ষেপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়া। কোনো লেখক বা বক্তা অনেক সময় বিস্তারিত ব্যাখ্যা, উদাহরণ বা পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কথা বলেন। কিন্তু সারসংক্ষেপে সবকিছু রাখা প্রয়োজন হয় না। সেখানে মূল বক্তব্যটি ধরে রাখতে হয় এবং অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘতা কমিয়ে আনতে হয়। তবে সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে যেন অর্থ বিকৃত না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হয়। ভালো সারসংক্ষেপ হলো এমন, যেখানে মূল বক্তব্য অক্ষুণ্ণ থাকে, কিন্তু ভাষা হয় সহজ, সংক্ষিপ্ত ও সুসংগঠিত।

অনেকে মনে করেন, সারসংক্ষেপ করা খুব কঠিন কাজ। আসলে এটি এমন একটি দক্ষতা, যা অনুশীলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে অর্জিত হয়। তাই আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত নয় 'আমি কীভাবে সারসংক্ষেপ করব?' বরং আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত 'আমি কবে থেকে সারসংক্ষেপ শুরু করব?' কারণ শুরু না করলে কোনো পদ্ধতিই নিজের হয় না। মানুষ যখন নিয়মিতভাবে ছোট ছোট লেখা, লেকচার বা আলোচনার সারসংক্ষেপ করতে শুরু করে, তখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের ভাষা, চিন্তার ধরন ও উপস্থাপনার ভঙ্গি তৈরি হয়ে যায়।

শুধু পড়া বা শোনার সঙ্গে সারসংক্ষেপসহ পড়া বা শোনার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। যখন কেউ সারসংক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে কোনো বিষয় পড়ে, তখন তার মনোযোগ বেড়ে যায়। সে চিন্তা করে কোনটি মূল কথা, কোনটি সহায়ক কথা, কোনটি উদাহরণ, কোনটি বাদ দেওয়া যায় এবং কোনটি অবশ্যই রাখা দরকার। এতে তার বোঝাপড়া গভীর হয়। তথ্যগুলো আলাদা আলাদা না থেকে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে। ফলে জ্ঞান শুধু মস্তিষ্কে জমা থাকে না; বরং তা সাজানো চিন্তায় পরিণত হয়।

সারসংক্ষেপ মানুষকে ধৈর্যও শেখায়। বর্তমান সময়ে মানুষ খুব দ্রুত ফল চায়। সবাই দ্রুত পড়তে, দ্রুত বুঝতে এবং দ্রুত শেষ করতে চায়। কিন্তু ভালো সারসংক্ষেপের জন্য ধীরে পড়তে হয়, পুনরায় শুনতে হয়, ফিরে তাকাতে হয় এবং নিজের বোঝাপড়াকে যাচাই করতে হয়। শুরুতে এটি কিছুটা কষ্টকর মনে হতে পারে, কিন্তু কিছুদিন পর মানুষ পুনরায় পড়া ও শোনার মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পায়। নিজের হাতে তৈরি একটি সুন্দর সারসংক্ষেপ দেখলে পরিশ্রমের ফল অনুভব করা যায়।

নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো সারসংক্ষেপকারীদের কাজ পড়া অত্যন্ত উপকারী। যারা বিভিন্ন ইলমি, চিন্তামূলক বা শিক্ষামূলক সিরিজের সারসংক্ষেপ তৈরি করেন, তাদের লেখা থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। এতে বোঝা যায়, কোন বাক্য লিখে রাখা দরকার, কোন অংশ হুবহু রাখা উচিত, কোন অংশ নিজের ভাষায় বলা ভালো, আর কোথায় শুধু মূল সিদ্ধান্ত তুলে ধরলেই যথেষ্ট। এভাবে অন্যের ভালো কাজ দেখে নিজের দক্ষতাও ধীরে ধীরে উন্নত করা যায়।

সারসংক্ষেপের সবচেয়ে বড় উপকার হলো, এটি মানুষের চিন্তাকে গুছিয়ে দেয়। একজন ব্যক্তি যখন কোনো বড় বিষয়কে সংক্ষেপে লিখতে চেষ্টা করে, তখন সে নিজের অজান্তেই বিষয়টি নতুনভাবে বুঝতে শুরু করে। তার ভাষা পরিষ্কার হয়, চিন্তা শৃঙ্খলিত হয় এবং বোঝাপড়া দৃঢ় হয়। তাই সারসংক্ষেপ শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি বা নোট তৈরির জন্য নয়; বরং ইলম, চিন্তা ও আত্মগঠনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলব, সারসংক্ষেপ করা একটি প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান দক্ষতা। এটি শেখার জন্য বড় কোনো প্রস্তুতির দরকার নেই; দরকার শুধু শুরু করার সাহস ও নিয়মিত অনুশীলন। একটি ছোট লেখা, সংক্ষিপ্ত লেকচার বা ছোট অধ্যায় দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। প্রথম সারসংক্ষেপ নিখুঁত না হলেও সমস্যা নেই। ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা করতে থাকলে একসময় বোঝাপড়া পরিষ্কার হবে, ভাষা গুছিয়ে আসবে এবং চিন্তা প্রকাশের ক্ষমতা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তাই যে ব্যক্তি জ্ঞানকে নিজের ভেতরে স্থায়ী করতে চায় এবং অন্যের সামনে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে চায়, তার জন্য সারসংক্ষেপের অভ্যাস অত্যন্ত জরুরি।

আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।

03/06/2026

▪️ইসলামী শরী'আহর ইলম অর্জনের জন্য কিছু পরামর্শ-

১. প্রথমেই কুরআনের ইলম অর্জন করুন। বিশুদ্ধভাবে তাজবীদসহ কুরআন তিলাওয়াত শিখুন। সাধ্যানুযায়ী কুরআন হিফয করুন। দৈনিক একটা নির্দিষ্ট সময়ে অর্থ ও তাফসীরসহ কুরআন পড়ুন। তাফসীরে সা'দী, তাফসীর মুয়াসসার, তাফসীর ইবনু কাছীর এর মুখতাছার, এভাবে পড়তে পারেন।

২. হাদীসের ইলম অর্জন করুন। সহীহ হাদীস থেকে নিয়মিত কিছু হাদীস অর্থ ও ব্যাখাসহ পড়ুন। সুন্নাহ আপনাকে কুরআনের ইলমকে পূর্ণতা দিবে। পাশাপাশি সাহাবীদের আছার পড়ুন। রিয়াযুস সালেহীন, ঊমদাতুল আহকাম, বুলুগুল মারাম, সহীহ বুখারী ও মুসলিম অথবা আল জামিউ লিমা ফিস সহীহাইন, এভাবে আগাতে পারেন।

৩. এরপর আক্বীদার ইলম অর্জন করুন। এক্ষেত্রে প্রথমেই ঈমান ও আক্বীদার বিষয়গুলো বুঝে নিন। এজন্য সংক্ষিপ্ত কোনো কিতাব পড়ুন। যেমন-
কিতাবুত তাওহীদ, উসূলুস সালাসাহ, কাওয়াঈদুল আরবাআহ। এভাবে বড় কিতাবের দিকে আগাবেন। সাথে সাথে মানহাজ বিষয়ক কিতাবগুলো দেখে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
এই কিতাবগুলো শেষ করার পর ফিক্বহ শিখবেন। ফিক্বহের জন্যও ছোট কিতাব দিয়ে শুরু করুন। যেমন-
ফিক্বহুল মুয়াসসার, মুখতাছার ফিকহুস সুন্নাহ, মুলাখখাস ফিক্বহী, সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ, এভাবে বড় কিতাবের দিকে আগাবেন। পাশাপাশি উসূলে হাদীস ও উসূলে ফিক্বহের ইলম অর্জন করবেন।

৪. তারপর ইলমুল আলাহ তথা মূল ইলম অর্জনে সহায়ক জ্ঞানগুলো ধাপে ধাপে শিখবেন। এক্ষেত্রে আরবী ভাষা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে। সর্বনিম্ন এক বছর নির্বিঘ্নে আরবী ভাষায় টানা সময় দিন। যাতে করে ভাষা জ্ঞানটা যথাযথ হয়ে যায়। আরবী ব্যাকরণের নাহু ও সরফের নিয়মগুলো সংক্ষিপ্ত ভাবে জেনে রাখা জরুরী। এভাবে সীরাহ, ফারায়েয, ইতিহাস সহ প্রয়োজনীয় ইলম অর্জন করতে পারেন।

▪️ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম ও সতর্কতা-
একসাথে একাধিক বিষয়ে ইলম অর্জনে মনোনিবেশ না করাই উচিত। কেবল কুরআন ও হাদীসের অধ্যয়নের পাশাপাশি একটি মাত্র সহায়ক বিষয় মুযাকারার জন্য রাখা যায়। তবে মনে রাখতে হবে এটা মূল ইলম অর্জনকে বাধাগ্রস্ত না করে।

✍️সার্বিক উপদেশসমূহ-
১. প্রতিটি বিষয়ে একটি মূল কিতাব নির্ধারণ করুন। যাতে সেই বিষয়টা আপনি সেই কিতাব থেকে মূলভিত্তি হিসেবে শিখতে পারেন। এর সাথে একটি উপযুক্ত ব্যাখ্যা (শারহ) নির্বাচন করুন। পড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হাইলাইট করুন। এটা হয় বইয়ের পাশে, না হয় আলাদা খাতায়।

২. সব কিছু মুখস্থ করতে হবে না। যা আপনার মনন ও চিন্তাশক্তি বাড়ায়, সেদিকে মনোযোগ দিন।

৩. মূল কিতাবগুলোকেই অনুসরণ করুন। সার্বিক নোট বা টীকাসমূহ এগুলো যেন হয় কেবল জরুরি অবস্থায় কিতাব বুঝতে সহায়তা পাওয়ার জন্য।

৪. ইলম আসে দুইভাবে। যথা -
- উস্তাযের মুখ থেকে শোনার মাধ্যমে (মুশাফাহা)
- নিজে পড়ার মাধ্যমে (মুতালাআহ)
কাজেই উস্তায ছাড়া নিজে নিজে পড়া যেন অতিরঞ্জিত না হয়, আবার শুধুই উস্তায নির্ভর হওয়াও উচিত নয়। বরং উভয়ের মাঝে সমন্বয় করার চেষ্টা রাখতে হবে।

৫. কোন বিষয়ে কোন কিতাব পড়বেন, তা আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিজ্ঞ কারো থেকে জেনে নিন। যাতে করে সময় নষ্ট না হয়।

৬. আপনার ইলম অর্জনকে একজন উস্তাযের সাথে সীমাবদ্ধ রাখবেন না, যেন তিনি নিভে গেলেও আপনি থেমে না যান। একাধিক অপশন সবসময় প্রস্তুত করে রাখবেন।

৭. সবসময় নিজেই নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। ইলম অর্জনে অদম্য ইচ্ছা ও আগ্রহ সবসময় বেশি থাকা জরুরি।

৮. উসূল ও ভাষা (আরবী) এর মূলভিত্তি যতটা পারবেন দ্রুত শিখে ফেলবেন। কারণ মূল ইলম অর্জনে গন্তব্যে পৌঁছতে এই দুটোর বিকল্প নেই।

৯. যেন প্রতিদিন অন্তত কিছু না কিছু জ্ঞান অন্তরে স্থান পায়। গ্যাপ হয়ে গেলে ইলম অর্জনে অলসতা চলে আসবে।

১০. সদা সর্বদা মহান আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখুন। আর প্রতিনিয়ত তাঁর নিকটে একনিষ্ঠতার সাথে তাওফীক্ব চান, যেন তিনি আপনার সামনে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করেন। ইলম অর্জনের পথকে সহজ করে দেন।

১১. নির্ভরযোগ্য কিতাব একবার পড়া যথেষ্ট নয়, বরং একাধিকবার পড়তে হয়। প্রয়োজনে আরো বেশিবার পড়া জরুরি।

১২. ইলমের স্বাদ উপভোগ করুন। কারণ, এটি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মর্যাদার একটি। মহান আল্লাহ ইলমের বিষয় দিয়েই অহির সূচনা করেছেন।

১৩. দৈনিক একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন ইলম অর্জনের জন্য, যে সময়ে আপনি নিজেকে বাধ্য করবেন পড়াশোনায় বসতে। এভাবে নিয়মিত অভ্যাস গড়তে হবে ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

১৪. মাঝে মাঝে বেশি পরিশ্রমী হয়ে পড়ুন। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি পড়ুন। তবে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে নিজের সীমা অতিক্রম করবেন না। তাহলে পথ হারিয়ে ফেলবেন আবার।

১৫. নিজের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করুন এবং ধৈর্য্য ধরে সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন।

১৬. বুদ্ধিমান ও একনিষ্ঠ ছাত্রদের সাথে বসুন। তাদের সাথে যোগাযোগ দৃঢ় করুন। ইলম ও তাকওয়ার কাজে তাদের থেকে সহযোগিতা নিন এবং তাদেরকেও সহযোগিতা করুন।

১৭. যারা আপনাকে ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে হতাশ করে তাদের কথায় কান দিবেন না।

১৮. একটা সুন্দর সাজানো গোছানো পরিকল্পনা করুন-
সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ছোটো ছোটো লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেটাকে পূর্ণতা দিন ছোটো ছোটো সময়ে। পাশাপাশি নিজের সামর্থ্য বিশ্লেষণ করুন।

১৯. বারবার নিজেকে স্বরণ করিয়ে দিন-
দ্রুত ফল আশা করবেন না। দ্রুত ফল আশা করবেন না। দ্রুত ফল আশা করবেন না। যার সূচনাটা সুন্দর হয় না তার সমাপ্তিও দৃষ্টিনন্দন হয় না।

২০. ইলম অর্জনের জন্য পাঁচটি বিষয় দরকার-
আত্মত্যাগ, বিনয়, নিরবতা, ক্ষুধা সহ্য, অহংকার বর্জন।

২১. ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে পাখা হলো-
ইখলাস (নিয়্যত), সময়ের যথাযথ ব্যবহার (নিজেকে সবকিছু থেকে আলাদা করুন), মুখস্থ করা, বুঝা, একনিষ্ঠ উপদেশ, প্রতিযোগী বন্ধু, অপরকে শেখানো ও ব্যাখ্যার অভ্যাস করা।

২২. যদি একটি কিতাব পড়া শুরু করেন, শেষ না হওয়া পর্যন্ত থামবেন না অথবা শেষ না করে অন্য কিতাবে যাবেন না।

২৩ . প্রতিটি কিতাবের জন্য একটি খাতা রাখবেন-
বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও বিরল বিষয়গুলো লিখে রাখুন। অনুরুপ যে বিষয়গুলো নিজের মতো করে বুঝেছেন সেগুলো এবং যে বিষয়গুলো জটিল মনে হয়েছে সেগুলো লিখে রাখুন।

২৪. সদা সর্বদা আল্লাহর সাহায্য চান। ইলম অর্জনে কখনোই কখনো হতাশ হবেন না।

২৫. ইলমকে কখনো অবজ্ঞা করবেন না। এটি অনেকটা নদীর মতো, আপনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলে একদিন ঠিকই সীমানায় পৌঁছে যাবেন।

رب زدني علما، اللهم إني أسألك علما نافعا ورزقا طيبا وعملا متقبلا.

🖋️ আব্দুল হাকীম মাদানী

02/06/2026

ফাহফায, ফা-কুল্লু হাফিযিন ইমাম
কলমে- আব্দুল হাকীম মাদানী

হিফযের গুরুত্ব, উপায় ও আদব
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه ومن والاه.

ইসলামী জ্ঞানচর্চায় হিফয বা মুখস্থ করার গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। কুরআন, হাদীস, ফিকহ, আকীদা, আরবি ভাষা সব ক্ষেত্রেই হিফয তলিবুল ইলমের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি। শুধু বই সংগ্রহ করা, নোট লেখা বা বেশি পড়াই যথেষ্ট নয়; বরং জ্ঞান তখনই জীবন্ত হয়ে ওঠে, যখন তা হৃদয়ে সংরক্ষিত থাকে, প্রয়োজনের সময় স্মরণে আসে, আমলে প্রকাশ পায় এবং মানুষের উপকারে ব্যবহৃত হয়।

আল্লাহ তাআলা কুরআন সংরক্ষণের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন,
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমিই তার সংরক্ষক। সূরা আল-হিজর: ৯।

এই সংরক্ষণের একটি মহান মাধ্যম হলো উম্মতের হাফেয, আলেম ও মুহাদ্দিসগণ। তাঁদের বক্ষ ছিল জ্ঞানের ভাণ্ডার। তাঁরা কুরআন ও সুন্নাহ মুখস্থ করেছেন, বুঝেছেন, আমল করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এজন্য হিফয শুধু একটি বিদ্যাগত দক্ষতা নয়; এটি দ্বীনের খেদমত, ইলমের আমানত এবং আত্মগঠনের এক মহান পথ।

হিফযের মর্যাদা-
হিফয মহান আল্লাহর একটি বড় নিয়ামত। মানুষ যদি স্মরণশক্তি থেকে বঞ্চিত হতো, তবে তার জীবন অত্যন্ত কঠিন হয়ে যেত। আল্লাহ মানুষের অন্তরে স্মরণ ও সংরক্ষণের শক্তি দিয়েছেন, যাতে সে জ্ঞান ধারণ করতে পারে। কুরআন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
بَلْ هُوَ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ فِي صُدُورِ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ
বরং এটি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ, যা জ্ঞানপ্রাপ্তদের বক্ষে সংরক্ষিত। সূরা আল-আনকাবূত: ৪৯। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, কুরআন কেবল পৃষ্ঠায় লেখা নয়; বরং আলেম ও হাফেযদের বক্ষেও তা সংরক্ষিত থাকে। তাই হিফযের মর্যাদা অত্যন্ত উঁচু।

রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের শুধু জ্ঞান শুনতে বলেননি; বরং তা সংরক্ষণ করে অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে বলেছেন। আব্দুল কাইস গোত্রের প্রতিনিধি দলকে তিনি দ্বীনের কিছু বিষয় শিক্ষা দিয়ে বলেছিলেন,
احْفَظُوهُنَّ وَأَخْبِرُوا بِهِنَّ مَنْ وَرَاءَكُمْ
তোমরা এগুলো মুখস্থ রাখো এবং তোমাদের পেছনে যারা আছে, তাদের জানিয়ে দাও।
অতএব হিফযের উদ্দেশ্য শুধু নিজের জ্ঞান বাড়ানো নয়; বরং ইলমকে সংরক্ষণ করা, আমল করা এবং মানুষের মাঝে পৌঁছে দেওয়া।

হিফয কী?-
হিফয মানে শুধু শব্দ মুখস্থ করা নয়। প্রকৃত হিফয হলো ইতকান, অর্থাৎ যথাযথভাবে, নির্ভুলভাবে, মজবুতভাবে সংরক্ষণ করা। ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হিফয কী? তিনি বলেন,
الإِتْقَانُ هُوَ الحِفْظُ
ইতকান বা দৃঢ়ভাবে আয়ত্ত করাই হলো হিফয।

ইমাম আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
الحِفْظُ الإِتْقَانُ
হিফয হলো ইতকান, অর্থাৎ নির্ভুলভাবে আয়ত্ত করা।
তাই একজন তলিবুল ইলমের জন্য মুখস্থ মানে শুধু দ্রুত পড়ে নেওয়া নয়; বরং এমনভাবে শেখা, যাতে ভুল কম হয়, অর্থ বোঝা যায় এবং প্রয়োজনের সময় তা স্মরণে আসে।

তালিবুল ইলমের জন্য হিফযের প্রয়োজনীয়তা-
একজন ছাত্র যদি অনেক বই পড়ে কিন্তু কিছুই হৃদয়ে ধারণ না করে, তবে প্রয়োজনের সময় সে অসহায় হয়ে পড়ে। বই, নোট ও লাইব্রেরি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু বক্ষের ইলম সবচেয়ে বেশি উপকারী। খলীল ইবনু আহমদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
الاحْتِفَاظُ بِمَا فِي صَدْرِكَ أَوْلَى مِنْ حِفْظِ مَا فِي كِتَابِكَ، وَاجْعَلْ كِتَابَكَ رَأْسَ مَالِكَ، وَمَا فِي صَدْرِكَ لِلنَّفَقَةِ
তোমার বক্ষে যা আছে তা সংরক্ষণ করা, তোমার বইয়ে যা আছে তা সংরক্ষণের চেয়ে উত্তম। তোমার বইকে মূলধন বানাও, আর বক্ষে থাকা ইলমকে খরচের জন্য রাখো।

অর্থাৎ বই হলো জ্ঞানের ভাণ্ডার; কিন্তু মুখস্থ জ্ঞান হলো ব্যবহারযোগ্য সম্পদ। শিক্ষকতা, দাওয়াহ, নসীহত, আলোচনা, ফতোয়া, খুতবা সব জায়গায় হৃদয়ে সংরক্ষিত ইলমের প্রয়োজন হয়।

আব্দুর রাযযাক রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
كُلُّ عِلْمٍ لَا يَدْخُلُ مَعَ صَاحِبِهِ الحَمَّامَ فَلَا تَعُدَّهُ عِلْمًا
যে ইলম তার মালিকের সঙ্গে গোসলখানায়ও প্রবেশ করে না, তাকে প্রকৃত ইলম মনে করো না। অর্থাৎ বই সঙ্গে না থাকলেও যে জ্ঞান মানুষের অন্তরে থাকে, সেটিই প্রকৃত উপকারী জ্ঞান।

হিবাতুল্লাহ আল-বাগদাদী রাহিমাহুল্লাহ সুন্দর করে বলেছেন,
عِلْمِي مَعِي أَيْنَمَا يَمَّمْتُ يَتْبَعُنِي
بَطْنِي وِعَاءٌ لَهُ لَا بَطْنُ صُنْدُوقِ
আমার ইলম আমার সঙ্গেই থাকে, আমি যেদিকে যাই তা আমার অনুসরণ করে। আমার বুকই তার পাত্র, কোনো সিন্দুকের পেট নয়।

আরেকজন বলেন,
إِنْ كُنْتُ فِي البَيْتِ كَانَ العِلْمُ فِيهِ مَعِي
أَوْ كُنْتُ فِي السُّوقِ كَانَ العِلْمُ فِي السُّوقِ
আমি ঘরে থাকলে ইলম আমার সঙ্গে ঘরেই থাকে।
আর বাজারে থাকলে ইলম আমার সঙ্গে বাজারেই থাকে।

উবাইদুল্লাহ আস-সাইরাফী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
لَيْسَ بِعِلْمٍ مَا حَوَى القِمَطْرُ
مَا العِلْمُ إِلَّا مَا حَوَاهُ الصَّدْرُ
সিন্দুকে যা জমা থাকে তা ইলম নয়।
ইলম তো সেটাই, যা বক্ষ ধারণ করে।

ইবনু শদীদ আল-আযদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
أَأَشْهَدُ بِالجَهْلِ فِي مَجْلِسٍ
وَعِلْمِي فِي البَيْتِ مُسْتَوْدَعُ
إِذَا لَمْ تَكُنْ حَافِظًا وَاعِيًا
فَجَمْعُكَ لِلْكُتُبِ لَا يَنْفَعُ
আমি কি কোনো মজলিসে অজ্ঞতার সাক্ষ্য দেব, অথচ আমার ইলম ঘরে জমা থাকবে?
যদি তুমি সচেতন হাফেয না হও, তবে তোমার বই সংগ্রহ তোমার উপকারে আসবে না।

এসব উক্তি আমাদের শেখায়, বই সংগ্রহ প্রশংসনীয়; কিন্তু মুখস্থ ও আয়ত্ত না থাকলে জ্ঞান পূর্ণ উপকারী হয় না।

হিফযের পথে প্রথম কষ্ট ও ধৈর্য-
হিফয সহজ কাজ নয়। শুরুতে এটি কঠিন মনে হয়। মন ক্লান্ত হয়, বারবার পড়তে বিরক্ত লাগে। কিন্তু ধৈর্য, অনুশীলন ও নিয়মিত চেষ্টায় হিফয সহজ হয়ে যায়।

ইমাম ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
مَا رَأَيْتُ أَصْعَبَ عَلَى النَّفْسِ مِنَ الحِفْظِ لِلْعِلْمِ وَالتَّكْرَارِ لَهُ
ইলম মুখস্থ করা এবং তা বারবার পুনরাবৃত্তি করার চেয়ে নফসের ওপর কঠিন কিছু আমি দেখিনি।

তবে কষ্টের পরই সহজতা আসে। ইমাম যুহরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
إِنَّ الرَّجُلَ لَيَطْلُبُ وَقَلْبُهُ شِعْبٌ مِنَ الشِّعَابِ، ثُمَّ لَا يَلْبَثُ أَنْ يَصِيرَ وَادِيًا لَا يُوضَعُ فِيهِ شَيْءٌ إِلَّا الْتَهَمَهُ
মানুষ যখন ইলম অন্বেষণ শুরু করে, তখন তার হৃদয় ছোট একটি উপত্যকার মতো থাকে। এরপর অল্পদিনেই তা এমন প্রশস্ত উপত্যকায় পরিণত হয়, যেখানে যা রাখা হয়, তা ধারণ করে নেয়। অর্থাৎ, শুরুতে স্মরণশক্তি দুর্বল মনে হলেও নিয়মিত অনুশীলনে তা শক্তিশালী হয়। হৃদয় যত বেশি ইলম গ্রহণ করে, ততই তার ধারণক্ষমতা বাড়ে।

হিফযের প্রধান উপায়: পুনরাবৃত্তি-
হিফযের সবচেয়ে বড় উপায় হলো তাকরার বা পুনরাবৃত্তি। অন্য সব উপায় সহায়ক; কিন্তু আসল ভিত্তি হলো বারবার পড়া, শোনা, বলা ও যাচাই করা।

আবু ইসহাক আশ-শীরাযী রাহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে বলা হয়, তিনি একটি পাঠ মুখস্থ করার জন্য একশ বার পুনরাবৃত্তি করতেন।
كَانَ أَبُو إِسْحَاقَ الشِّيرَازِيُّ يُعِيدُ الدَّرْسَ مِائَةَ مَرَّةٍ
আবু ইসহাক আশ-শীরাযী রাহিমাহুল্লাহ পাঠ একশ বার পুনরাবৃত্তি করতেন।

হাসান ইবনু আবী বকর আন-নাইসাবূরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
لَا يَحْصُلُ الحِفْظُ لِي حَتَّى يُعَادَ خَمْسِينَ مَرَّةً
আমার হিফয অর্জিত হয় না, যতক্ষণ না তা পঞ্চাশ বার পুনরাবৃত্তি করা হয়।

ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহকে তাঁর হিফযের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,
لَا أَعْلَمُ شَيْئًا أَنْفَعَ لِلْحِفْظِ مِنْ مُدَاوَمَةِ النَّظَرِ
হিফযের জন্য নিয়মিত পুনঃপাঠের চেয়ে উপকারী কিছু আমি জানি না।

সুতরাং যে ব্যক্তি হিফয করতে চায়, তাকে পুনরাবৃত্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হবে। একবার পড়ে মুখস্থ হয়েছে মনে করলেই যথেষ্ট নয়। আজ মুখস্থ হলে কাল, পরশু, এক সপ্তাহ পরে, এক মাস পরে আবার পড়তে হবে। কারণ হিফয একটি গাছের মতো; মুরাজাআহ হলো তার পানি। পানি বন্ধ হলে গাছ শুকিয়ে যায়।

অল্প অল্প করে নিয়মিত হিফয-
হিফযের ক্ষেত্রে অল্প কিন্তু নিয়মিত আমল বেশি ফলপ্রসূ। একদিনে অনেক কিছু মুখস্থ করে পরে ছেড়ে দেওয়া ভালো নয়। বরং প্রতিদিন সামান্য অংশ মুখস্থ করা এবং তা দৃঢ় করা উত্তম।

ইমাম যুহরী রহ. বলেন,
إِنَّ هَذَا العِلْمَ إِنْ أَخَذْتَهُ بِالمُكَابَرَةِ عَسُرَ عَلَيْكَ، وَلَكِنْ خُذْهُ مَعَ الأَيَّامِ وَاللَّيَالِي أَخْذًا رَفِيقًا تَظْفَرْ بِهِ
এই ইলম যদি তুমি জোর করে একসাথে নিতে চাও, তবে তা তোমার জন্য কঠিন হয়ে যাবে। কিন্তু দিন-রাতের ধারাবাহিকতায় কোমলভাবে গ্রহণ করলে তুমি তা অর্জন করতে পারবে।

হাম্মাদ ইবনু আবী সুলাইমান রাহিমাহুল্লাহ তাঁর ছাত্রকে বলতেন,
تَعَلَّمْ كُلَّ يَوْمٍ ثَلَاثَ مَسَائِلَ وَلَا تَزِدْ عَلَيْهَا
প্রতিদিন তিনটি মাসআলা শিখো, এর বেশি বাড়িয়ো না।

আহমাদ ইবনুল ফুরাত রাহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে বলা হয়,
كَانَ لَا يَتْرُكُ كُلَّ يَوْمٍ إِذَا أَصْبَحَ أَنْ يَحْفَظَ شَيْئًا وَإِنْ قَلَّ
তিনি প্রতিদিন সকালে কিছু না কিছু মুখস্থ করতেন, যদিও তা অল্প হতো।

এটাই হিফযের বাস্তব নিয়ম। কম নাও, কিন্তু মজবুত করে নাও। অল্প মুখস্থ করে নিয়মিত মুরাজাআহ করা, বেশি মুখস্থ করে ভুলে যাওয়ার চেয়ে অনেক উত্তম।

নতুন মুখস্থের আগে পুরোনো মজবুত করা-
হিফযের বড় একটি ভুল হলো, পুরোনো অংশ ঠিকমতো না দেখে নতুন অংশে এগিয়ে যাওয়া। এতে প্রথমে অগ্রগতি বেশি মনে হয়, কিন্তু পরে সব দুর্বল হয়ে পড়ে।

সালাফদের নীতি ছিল, যা নিয়েছে তা দৃঢ় না করে সামনে এগোবে না। কেউ কেউ এক-দুইটি হাদীস শুনেই থেমে যেতেন, যাতে তা ঠিকমতো মুখস্থ করতে পারেন।

সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
كُنْتُ آتِي الأَعْمَشَ وَمَنْصُورًا، فَأَسْمَعُ أَرْبَعَةَ أَحَادِيثَ وَخَمْسَةً ثُمَّ أَنْصَرِفُ، كَرَاهَةَ أَنْ تَكْثُرَ وَتَتَفَلَّتَ
আমি আ'মাশ ও মানসুরের কাছে যেতাম। চার-পাঁচটি হাদীস শুনে ফিরে আসতাম, এ আশঙ্কায় যে বেশি হলে তা হাতছাড়া হয়ে যাবে।

শু‘বা রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
كُنْتُ آتِي قَتَادَةَ فَأَسْأَلُهُ عَنْ حَدِيثَيْنِ، فَيُحَدِّثُنِي، ثُمَّ يَقُولُ: أَزِيدُكَ؟ فَأَقُولُ: لَا، حَتَّى أَحْفَظَهُمَا وَأُتْقِنَهُمَا
আমি কাতাদার কাছে গিয়ে দুটি হাদীস জিজ্ঞেস করতাম। তিনি আমাকে তা বলতেন। এরপর বলতেন, আরও বলব? আমি বলতাম, না; যতক্ষণ না এই দুটিকে মুখস্থ ও মজবুত করি।

এজন্য বলা হয়েছে,
مَنْ طَلَبَ العِلْمَ جُمْلَةً فَاتَهُ جُمْلَةً
যে ব্যক্তি ইলম একসাথে নিতে চায়, তার কাছ থেকে ইলম একসাথেই ছুটে যায়।

মনোযোগ দিয়ে শোনা-
হিফযের শুরু হয় ভালোভাবে শোনা থেকে। যে ভালো শুনতে পারে না, সে ভালো মুখস্থও করতে পারে না। তাই শিক্ষার্থীর প্রথম আদব হলো নীরবতা, মনোযোগ এবং গ্রহণের মানসিকতা।

সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
أَوَّلُ العِلْمِ الصَّمْتُ، وَالثَّانِي الاسْتِمَاعُ لَهُ وَحِفْظُهُ، وَالثَّالِثُ العَمَلُ بِهِ، وَالرَّابِعُ نَشْرُهُ وَتَعْلِيمُهُ
ইলমের প্রথম ধাপ হলো নীরবতা। দ্বিতীয় ধাপ হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা ও মুখস্থ করা। তৃতীয় ধাপ হলো আমল করা। চতুর্থ ধাপ হলো তা প্রচার ও শিক্ষা দেওয়া।

আরেকটি সুন্দর উক্তি আছে,
يَا طَالِبًا لِلْعِلْمِ كَيْ تَحْظَى بِهِ
دِينًا وَدُنْيَا حَظْوَةً تُعْلِيهِ
اسْمَعْهُ ثُمَّ احْفَظْهُ ثُمَّ اعْمَلْ بِهِ
لِلَّهِ ثُمَّ انْشُرْهُ فِي أَهْلِيهِ

হে ইলমের অনুসন্ধানী! তুমি যদি দীন ও দুনিয়ার মর্যাদা পেতে চাও, তবে প্রথমে তা শোনো, তারপর মুখস্থ করো, তারপর আল্লাহর জন্য আমল করো, এরপর তার উপযুক্তদের মাঝে তা ছড়িয়ে দাও।

উচ্চস্বরে পড়া-
হিফযের আরেকটি কার্যকর উপায় হলো উচ্চস্বরে পড়া। এতে চোখের সঙ্গে কানও অংশগ্রহণ করে। ফলে স্মরণ শক্তিশালী হয়।

যুবাইর ইবনু বাক্কার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তাঁর পিতা তাঁকে বলেছিলেন,
إِنَّمَا لَكَ مِنْ رِوَايَتِكَ هَذِهِ مَا أَدَّى بَصَرُكَ إِلَى قَلْبِكَ، فَإِذَا أَرَدْتَ الرِّوَايَةَ فَانْظُرْ إِلَيْهَا وَاجْهَرْ بِهَا، فَإِنَّهُ يَكُونُ لَكَ مَا أَدَّى بَصَرُكَ إِلَى قَلْبِكَ وَمَا أَدَّى سَمْعُكَ إِلَى قَلْبِكَ
তুমি চুপচাপ পড়ে যা অর্জন করছ, তা শুধু চোখ থেকে হৃদয়ে পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু যখন বর্ণনা বা মুখস্থ করতে চাও, তখন দেখে উচ্চস্বরে পড়ো। এতে চোখ যা হৃদয়ে পৌঁছাবে, তার সঙ্গে কান যা হৃদয়ে পৌঁছাবে তাও যুক্ত হবে।

আবু হামিদ রাহিমাহুল্লাহ তাঁর সঙ্গীদের বলতেন,
إِذَا دَرَسْتُمْ فَارْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ، فَإِنَّهُ أَثْبَتُ لِلْحِفْظِ وَأَذْهَبُ لِلنَّوْمِ
তোমরা যখন পাঠ করবে, তখন কণ্ঠ উঁচু করো। কারণ এটি হিফযকে বেশি স্থির করে এবং ঘুম দূর করে।

তিনি আরও বলতেন,
القِرَاءَةُ الخَفِيَّةُ لِلْفَهْمِ، وَالرَّفِيعَةُ لِلْحِفْظِ
নীরব পাঠ বোঝার জন্য, আর উচ্চস্বরে পাঠ মুখস্থের জন্য।

তবে মানুষের স্বভাব ভিন্ন। কারও জন্য উচ্চস্বরে পড়া বেশি উপকারী, কারও জন্য নীরবে দেখে পড়া বেশি কার্যকর। তাই নিজের উপযোগী পদ্ধতি বুঝে নিতে হবে।

ইখলাস: হিফযের প্রাণ-
হিফযের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নিয়ত বিশুদ্ধ করা। ইলম যদি লোক দেখানো, বিতর্কে জেতা, মানুষের প্রশংসা পাওয়া বা মর্যাদা অর্জনের জন্য হয়, তবে তা বিপজ্জনক। আর যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, তবে তাতে বরকত আসে।

ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,
إِنَّمَا يَحْفَظُ الرَّجُلُ عَلَى قَدْرِ نِيَّتِهِ
মানুষ তার নিয়তের পরিমাণ অনুযায়ী হিফয করতে পারে। অর্থাৎ, নিয়ত যত বিশুদ্ধ হবে, হিফয তত বরকতময় হবে। ইলম আল্লাহর দান। তাই আল্লাহর জন্য না হলে সেই ইলমে নূর ও বরকত থাকে না।

গুনাহ ত্যাগ ও তাকওয়া-
গুনাহ স্মরণশক্তির ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। হিফযের জন্য তাকওয়া, পবিত্রতা ও নেক আমল অত্যন্ত জরুরি। ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হিফযের জন্য কোনো উপায় আছে কি? তিনি বলেন,
إِنْ كَانَ يَصْلُحُ لَهُ شَيْءٌ فَتَرْكُ المَعَاصِي
যদি হিফযের জন্য কোনো জিনিস উপকারী হয়, তবে তা হলো গুনাহ ত্যাগ করা।

সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কীভাবে হিফয পেয়েছেন? তিনি বলেন,
بِتَرْكِ المَعَاصِي
গুনাহ ত্যাগ করার মাধ্যমে।

ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ এর দিকে সম্বন্ধিত বিখ্যাত উক্তি,
شَكَوْتُ إِلَى وَكِيعٍ سُوءَ حِفْظِي
فَأَرْشَدَنِي إِلَى تَرْكِ المَعَاصِي
وَقَالَ اعْلَمْ بِأَنَّ العِلْمَ فَضْلٌ
وَفَضْلُ اللَّهِ لَا يُؤْتَاهُ عَاصِي

আমি ওয়াকী‘-এর কাছে আমার দুর্বল স্মৃতির অভিযোগ করলাম। তিনি আমাকে গুনাহ ত্যাগের নির্দেশ দিলেন।
এরপর তিনি বললেন, জেনে রাখো, ইলম আল্লাহর অনুগ্রহ। আর আল্লাহর অনুগ্রহ কোনো অবাধ্য ব্যক্তিকে দেওয়া হয় না।

এ কথার অর্থ হলো, ইলম নূর। আর গুনাহ সেই নূরকে দুর্বল করে দেয়। তাই একজন হাফেয বা তলিবুল ইলমের উচিত চোখ, কান, জিহ্বা, অন্তর ও আচরণকে পবিত্র রাখা।

নেক আমল ও কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক-
নেক আমল হিফযকে শক্তিশালী করে। বিশেষ করে কুরআন তিলাওয়াত, কিয়ামুল লাইল, যিকর, দুআ এবং আল্লাহর আনুগত্য স্মরণশক্তিতে বরকত আনে।

আল্লাহ বলেন,
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ
আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি; আছে কি কোনো উপদেশ গ্রহণকারী? সূরা আল-কামার: ১৭। যে ব্যক্তি কুরআন মুখস্থ করে, তার জন্য অন্য ইলম মুখস্থ করা সহজ হয়ে যায়। কারণ কুরআন জিহ্বা, হৃদয় ও স্মৃতিকে শুদ্ধ করে।

দুআ ও যিকর-
হিফযের জন্য দুআ একটি বড় মাধ্যম। মানুষ চেষ্টা করবে, পুনরাবৃত্তি করবে, সময় দেবে; কিন্তু তাওফীক আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। আল্লাহ বলেন,
وَاذْكُرْ رَبَّكَ إِذَا نَسِيتَ
তুমি ভুলে গেলে তোমার রবকে স্মরণ করো। সূরা আল-কাহফ: ২৪।

যিকর ভুলে যাওয়া দূর করে, অন্তরকে সজাগ রাখে এবং জ্ঞানকে স্থির করে। অনেক আলেম জমজমের পানি পান করে আল্লাহর কাছে শক্তিশালী হিফযের দুআ করেছেন। তাই তলিবুল ইলমের উচিত হিফযের আগে ও পরে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।

ইলম শেখানো ও আলোচনা করা-
হিফয ধরে রাখার একটি বড় উপায় হলো অন্যকে শেখানো। যখন একজন ব্যক্তি শেখানো শুরু করে, তখন তার নিজের হিফযও মজবুত হয়। কারণ শিক্ষা দেওয়া নিজেই এক ধরনের পুনরাবৃত্তি।

ইমাম যুহরী রাহিমাহুল্লাহ কোনো হাদীস শুনলে ঘরে গিয়ে তাঁর দাসীকে জাগিয়ে বলতেন,
اسْمَعِي، حَدَّثَنِي فُلَانٌ كَذَا وَفُلَانٌ كَذَا
শোনো, অমুক আমাকে এমন হাদীস বলেছেন, অমুক এমন বলেছেন।

একজন দাসী বলত, এ হাদীস দিয়ে আমার কী দরকার? তিনি বলতেন,

قَدْ عَلِمْتُ أَنَّكِ لَا تَنْتَفِعِينَ بِهِ، وَلَكِنْ سَمِعْتُهُ الآنَ فَأَرَدْتُ أَنْ أَسْتَذْكِرَهُ
আমি জানি তুমি এতে উপকৃত হবে না, কিন্তু আমি এখনই এটি শুনেছি, তাই তা স্মরণে দৃঢ় করতে চেয়েছি। এ থেকে বোঝা যায়, শুনে সঙ্গে সঙ্গে কাউকে বলা বা নিজে নিজে আওড়ানো হিফয মজবুত করার বড় উপায়।

সহপাঠীর সঙ্গে মুযাকারা-
একজন তলিবুল ইলমের জন্য সহপাঠীর সঙ্গে মুযাকারা বা পারস্পরিক আলোচনা অত্যন্ত উপকারী। এতে ভুল ধরা পড়ে, স্মরণশক্তি সক্রিয় থাকে এবং জ্ঞান স্থায়ী হয়। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা সাঈদকে বলতেন,
يَا سَعِيدُ، اخْرُجْ بِنَا إِلَى النَّخْلِ، وَقَالَ: يَا سَعِيدُ، حَدِّثْ
হে সাঈদ! আমাদের নিয়ে খেজুর বাগানে চলো। এরপর বলতেন, হে সাঈদ! তুমি হাদীস বলো।
সাঈদ বলতেন, আপনি উপস্থিত থাকতে আমি বলব? তিনি বলতেন,
إِنْ أَخْطَأْتَ فَتَحْتُ عَلَيْكَ
তুমি ভুল করলে আমি তোমাকে ধরিয়ে দেব।

ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
إِنَّهُ لَيَطُولُ عَلَيَّ اللَّيْلُ حَتَّى أَلْقَى أَصْحَابِي فَأُذَاكِرَهُمْ
রাত আমার কাছে দীর্ঘ মনে হয়, যতক্ষণ না আমি আমার সঙ্গীদের সঙ্গে দেখা করে তাদের সঙ্গে মুযাকারা করি। আর এ ধরনের মুযাকারা ইলমকে জীবন্ত রাখে।

আমল হিফযকে মজবুত করে-
হিফযের উদ্দেশ্য শুধু স্মরণ নয়; বরং আমল। যে ইলম অনুযায়ী আমল করা হয়, তা হৃদয়ে বেশি স্থায়ী হয়।

ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
كُنَّا نَسْتَعِينُ عَلَى حِفْظِ الحَدِيثِ بِالعَمَلِ بِهِ
আমরা হাদীস মুখস্থ রাখতে তার ওপর আমল করার মাধ্যমে সাহায্য নিতাম।

ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে বলা হয়, তিনি তাঁর মুসনাদে কোনো হাদীস রাখলে তার ওপর আমল করার চেষ্টা করতেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ ﷺ হিজামা করিয়ে হাজ্জামকে পারিশ্রমিক দিয়েছেন বলে তিনিও হিজামা করিয়ে পারিশ্রমিক দিয়েছেন। এ থেকে বোঝা যায়, আমল ইলমের ফলও বটে, আবার হিফযের সহায়কও বটে।

হিফযের উপযুক্ত সময়-
হিফযের জন্য বয়সের দিক থেকে শৈশব ও যৌবন সবচেয়ে উপযোগী। ছোট বয়সের হিফয পাথরে খোদাই করার মতো দৃঢ় হয়। তবে বয়স বেড়ে গেলে হিফয অসম্ভব হয়ে যায় এ কথা ঠিক নয়। যতদিন বিবেক ও স্মৃতি আছে, ততদিন হিফয সম্ভব; শুধু পরিশ্রম বেশি লাগে।

সালাফগণ বলতেন,
حِفْظُ الغُلَامِ الصَّغِيرِ كَالنَّقْشِ فِي الحَجَرِ، وَحِفْظُ الرَّجُلِ الكَبِيرِ كَالكِتَابَةِ عَلَى المَاءِ
ছোট শিশুর হিফয পাথরে খোদাই করার মতো, আর বৃদ্ধ বয়সের হিফয পানির ওপর লেখার মতো।

আলকামা রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
مَا حَفِظْتُ وَأَنَا شَابٌّ فَكَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَيْهِ فِي قِرْطَاسٍ
যৌবনে যা মুখস্থ করেছি, যেন এখনো তা কাগজে লেখা দেখছি।

দিনের সময়ের মধ্যে সেহরির সময়, ফজরের আগের সময়, রাতের নির্জনতা এবং ভোরের সময় হিফযের জন্য বিশেষ উপকারী। কারণ তখন মন পরিষ্কার থাকে, ব্যস্ততা কম থাকে এবং অন্তর শান্ত থাকে।

ইবনু জামাআহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
أَجْوَدُ الأَوْقَاتِ لِلْحِفْظِ الأَسْحَارُ، وَلِلْبَحْثِ الأَبْكَارُ، وَلِلْمُطَالَعَةِ وَالمُذَاكَرَةِ اللَّيْلُ، وَلِلْكِتَابَةِ وَسَطُ النَّهَارِ
হিফযের জন্য উত্তম সময় হলো সেহরির সময়। গবেষণার জন্য ভোর। পাঠ ও মুযাকারার জন্য রাত। আর লেখার জন্য দিনের মধ্যভাগ।

ইসমাঈল ইবনু আবী উওয়াইস রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
إِذَا هَمَمْتَ أَنْ تَحْفَظَ شَيْئًا فَنَمْ، وَقُمْ عِنْدَ السَّحَرِ، فَأَسْرِجْ سِرَاجَكَ، وَانْظُرْ فِيهِ، فَإِنَّكَ لَا تَنْسَاهُ بَعْدُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ
তুমি যখন কিছু মুখস্থ করতে চাও, তখন আগে ঘুমাও। এরপর সেহরির সময় উঠে প্রদীপ জ্বালিয়ে তা পড়ো। ইনশাআল্লাহ এরপর তুমি তা ভুলবে না।

হিফযের উপযুক্ত স্থান-
হিফযের জন্য নিরিবিলি, শান্ত এবং বিভ্রান্তিমুক্ত স্থান প্রয়োজন। যেখানে মানুষের চলাচল, শব্দ, দৃশ্য ও ব্যস্ততা কম, সেখানে মন একাগ্র থাকে।

উঁচু কক্ষ, নির্জন ঘর, মসজিদের শান্ত কোণ বা এমন স্থান যেখানে মনোযোগ ভাঙে না, এসব হিফযের জন্য ভালো। বিপরীতে রাস্তার পাশে, নদীর তীরে, সবুজ বাগানে বা মানুষের ভিড়ের মাঝে হিফয করা অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে। কারণ চোখ ও মন বারবার অন্যদিকে চলে যায়।
হিফযের মূলনীতি হলো,
خُلُوُّ المَكَانِ وَجَمْعُ الهَمِّ أَصْلٌ فِي الحِفْظِ
নিরিবিলি স্থান এবং মনকে একত্র করা হিফযের মূল ভিত্তি।

খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পরিমিত জীবন-
হিফযের ওপর শরীর ও খাদ্যের প্রভাব আছে। অতিরিক্ত খাবার, পেট ভরে খাওয়া, অলসতা ও ঘুমঘুম ভাব হিফযকে দুর্বল করে। সালাফগণ কম খেতেন, হালকা খেতেন এবং মন-শরীরকে প্রস্তুত রাখতেন।

তবে খাদ্য একমাত্র কারণ নয়। মধু, কিশমিশ, কালোজিরা ইত্যাদি কিছু খাবারকে সহায়ক বলা হয়েছে; কিন্তু এগুলো অলস মানুষকে হাফেয বানিয়ে দেয় না। আসল বিষয় হলো নিয়মিত পরিশ্রম, মুরাজাআহ, তাকওয়া ও আল্লাহর তাওফীক।

সময়ের সুষম ব্যবহার-
তলিবুল ইলমের কাজ অনেক। তাকে পড়তে হয়, মুখস্থ করতে হয়, লিখতে হয়, শুনতে হয়, বুঝতে হয়, শেখাতে হয় এবং বিশ্রামও নিতে হয়। তাই সময়ের সঠিক বণ্টন জরুরি।

ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হিফযের সময় আলাদা রাখা উচিত। দিনের শুরু ও রাতের শেষ ভাগ হিফযের জন্য রাখা যায়। আর বাকি সময়ে লেখা, পড়া, নকল করা, আলোচনা এবং শরীরের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা উচিত।

এখানে ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চাপ দিলে মন ক্লান্ত হয়। আবার শিথিলতা বেশি হলে হিফয দুর্বল হয়। তাই নিজের শক্তি অনুযায়ী নিয়মিত, পরিমিত ও ধারাবাহিক পথই সবচেয়ে উত্তম।

হিফযের সারকথা-
হিফয তলিবুল ইলমের মূল পুঁজি। বই দরকার, লেখা দরকার, পাঠ দরকার; কিন্তু হৃদয়ে সংরক্ষিত ইলমের বিকল্প নেই। হিফযের জন্য দরকার ইখলাস, তাকওয়া, ধৈর্য, পুনরাবৃত্তি, মুরাজাআহ, ভালো সময়, ভালো পরিবেশ, সহপাঠীর সঙ্গে মুযাকারা, আমল এবং আল্লাহর কাছে দুআ।

যে ব্যক্তি অল্প অল্প করে নিয়মিত মুখস্থ করে, পুরোনো অংশ বারবার দেখে, গুনাহ থেকে বাঁচে, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে এবং শেখা ইলম অনুযায়ী আমল করে, আল্লাহর ইচ্ছায় তার হিফযে বরকত আসে।

শেষ কথা হলো, হিফয শুধু স্মৃতির কাজ নয়; এটি হৃদয়ের কাজ। যার অন্তর আল্লাহর জন্য প্রস্তুত, যার নিয়ত বিশুদ্ধ, যার জিহ্বা পুনরাবৃত্তিতে অভ্যস্ত, যার জীবন তাকওয়ায় সজ্জিত তার জন্য হিফয আল্লাহ সহজ করে দেন। এজন্যই বলা হয়,
فَاحْفَظْ، فَكُلُّ حَافِظٍ إِمَامٌ
অতএব তুমি হিফয করো; কারণ প্রত্যেক প্রকৃত হাফেযই ইমাম।

বারাকাল্লাহু ফিকুম। জাযাকুমুল্লাহ খাইরান।

২রা জুন, মঙ্গলবার, ২০২৬
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।

25/05/2026

আরাফা ও আমাদের করণীয়-

আমাদের জীবনে ইবাদতের মৌসুম আসে, আবার চলে যায়। রমাযান আসে, যিলহজ্ব আসে, আরাফার দিন আসে। কিন্তু সমস্যা অনেক সময় এই নয় যে, আমাদের সামনে সুযোগ আসে না; সমস্যা হলো আমরা সেই সুযোগগুলোকে যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারি না। অনেক সময় ইবাদত আমাদের কাছে শুধু কিছু নিয়মে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। অথচ এসব মহান দিন আসে আমাদের হৃদয়কে জাগিয়ে তুলতে, গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনতে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়তে।

আরাফার দিন এমনই এক মহান দিন। এটি শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক বিশাল সুযোগ। যারা হজে আছেন, তারা আরাফার ময়দানে দাঁড়ান। আর যারা হজে নেই, তারাও এই দিনের সিয়াম, দোয়া, যিকর, তাওবা ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন।

অনেকেই আরাফার দিন সামনে এলে প্রথমে প্রশ্ন করেন আরাফার সিয়াম কি ফরজ, না সুন্নত? প্রশ্নটি জানার জন্য ভালো। কিন্তু কখনো কখনো এই প্রশ্নের আড়ালে অলসতার অজুহাত লুকিয়ে থাকে। একজন গুনাহগার বান্দার জন্য যে আমলের মাধ্যমে দুই বছরের গুনাহ মাফের আশা করা যায়, সে আমলকে হালকা করে দেখা উচিত নয়। আরাফার সিয়াম ফরজ নয়, কিন্তু এর ফযীলত এত বড় যে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও এটাকে অবহেলা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

আরাফার দিনের আসল শিক্ষা শুধু ক্ষুধা ও পিপাসা সহ্য করা নয়। এই দিনের বড় শিক্ষা হলো নিজের চোখ, কান, জিহ্বা, মন ও সময়কে আল্লাহর জন্য সংরক্ষণ করা। কারণ মানুষ অনেক সময় সিয়াম রাখে, কিন্তু তার চোখ গুনাহ থেকে বাঁচে না; কান অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বাঁচে না; জিহ্বা গীবত, ঝগড়া বা অনর্থক কথায় ব্যস্ত থাকে; মন মোবাইল, ভিডিও, নোটিফিকেশন ও দুনিয়ার ব্যস্ততায় ডুবে থাকে। তখন রোজা থাকে, কিন্তু রোজার আত্মা দুর্বল হয়ে যায়।

এই যুগে আরাফার দিনের বড় পরীক্ষা হলো মোবাইল ও ডিজিটাল ব্যস্ততা। ছোট্ট একটি স্ক্রিন আমাদের সময়, মনোযোগ ও হৃদয়ের প্রশান্তি কেড়ে নেয়। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও, পোস্ট, মন্তব্য ও অপ্রয়োজনীয় আলোচনায় কাটিয়ে দিই। অথচ আরাফার দিনের মতো একটি মহান দিনে যদি আমরা ফজর থেকে মাগরিব পর্যন্ত মোবাইল ব্যবহার কমিয়ে দিতে পারি, অপ্রয়োজনীয় অনলাইন ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকতে পারি, তাহলে সেটি আমাদের নিয়তের সত্যতার বড় প্রমাণ হতে পারে।

আশ্চর্যের বিষয়, দুনিয়ার কোনো ভ্রমণ, পরীক্ষা, মিটিং বা বিশেষ কাজের জন্য আমরা অনেক সময় মোবাইল থেকে দূরে থাকতে পারি। কিন্তু আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশায়, নিজের গুনাহ মাফের আশায়, একটি দিন মোবাইল থেকে দূরে থাকা আমাদের কাছে কঠিন মনে হয়। এ থেকেই বোঝা যায়, আমাদের আসল সংগ্রাম শুধু বাইরের জগতের সঙ্গে নয়; নিজের নফসের সঙ্গেও।

আরাফার দিনে সম্ভব হলে মসজিদে কিছু সময় কাটানো, কুরআন তিলাওয়াত করা, তাকবীর, তাহলীল, তাসবীহ, দরূদ ও ইস্তিগফার করা, দীর্ঘ দোয়া করা এসব আমলে মন দেওয়া উচিত। সালাফদের কেউ কেউ সিয়াম রেখে মসজিদে বসে থাকতেন, যাতে চোখ ও কানকে ভালোভাবে হেফাজত করা যায়। কারণ পরিবেশ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। মসজিদের প্রশান্ত পরিবেশ হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফিরতে সাহায্য করে।

যারা হজে যেতে পারেননি, তারা যেন মনে না করেন যে তারা সম্পূর্ণ বঞ্চিত। শরীর আরাফার ময়দানে না থাকলেও হৃদয় আল্লাহর দরবারে দাঁড়াতে পারে। আপনি বাইতুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি, কিন্তু বাইতুল্লাহর রব তো আপনার কাছেই আছেন। আপনি মিনায় কুরবানীর পশু জবাই করতে পারেননি, কিন্তু নিজের অহংকার, প্রবৃত্তি, অলসতা, গুনাহের অভ্যাস ও নফসের চাহিদাকে আল্লাহর জন্য কুরবানী করার সুযোগ আপনার সামনে আছে।

সত্যিকারের আল্লাহভীরু মানুষরা আরাফার দিনকে খুব গভীরভাবে গ্রহণ করতেন। তারা নিজেদের আমল নিয়ে আত্মতুষ্ট হতেন না। বরং নিজেদের গুনাহ, ত্রুটি ও দুর্বলতা স্মরণ করে আল্লাহর সামনে ভেঙে পড়তেন। কিন্তু তাদের ভয় কখনো হতাশায় পরিণত হতো না। কারণ তারা জানতেন আল্লাহর রহমত অনেক বড়, তাঁর ক্ষমা অসীম, তাঁর দরজা খোলা।

আরাফার দিন তাই ভয় ও আশার দিন। একদিকে বান্দা নিজের গুনাহ দেখে লজ্জিত হবে, অন্যদিকে আল্লাহর রহমতের প্রতি গভীর আশা রাখবে। সে ভাববে আমি অনেক গুনাহ করেছি, কিন্তু আমার রব ক্ষমাশীল। আমি অনেক পিছিয়ে পড়েছি, কিন্তু তাঁর দরজা বন্ধ হয়নি। আমি অনেক ভুল করেছি, কিন্তু আজও ফিরে আসার সুযোগ আছে।

এই দিনটি আমাদের প্রত্যেককে কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আজ আমার চোখ কোথায় ব্যস্ত? আমার কান কী শুনছে? আমার জিহ্বা কী বলছে? আমার মন কিসে ডুবে আছে? আমার সময় কোথায় যাচ্ছে? আমি কি সত্যিই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি, নাকি শুধু আরেকটি দিন পার করছি?

তাই আরাফার দিনকে সাধারণ দিনের মতো কাটিয়ে দেওয়া উচিত নয়। এই দিনে অপ্রয়োজনীয় কথা কমিয়ে দিন। মোবাইল ব্যবহার কমিয়ে দিন। গীবত, ঝগড়া, অনর্থক আলোচনা ও দুনিয়াবি ব্যস্ততা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখুন। বেশি বেশি বলুন
لا إله إلا الله
الله أكبر
سبحان الله
الحمد لله
أستغفر الله

নিজের জন্য দোয়া করুন, বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করুন, পরিবার, সন্তান, উম্মাহ, মজলুম মুসলিম, অসুস্থ, ঋণগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত ও পথহারা মানুষের জন্য দোয়া করুন। কারও সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ থাকলে তা ঠিক করার নিয়ত করুন। কারও হক নষ্ট করে থাকলে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিন। কোনো গুনাহে অভ্যস্ত হলে আজই তা ছাড়ার অঙ্গীকার করুন।

মনে রাখবেন, আরাফার দিন শুধু হাজীদের দিন নয়; এটি প্রত্যেক মুমিনের জন্য ফিরে আসার দিন। কেউ আরাফায় দাঁড়ায় শরীর নিয়ে, কেউ দাঁড়ায় হৃদয় নিয়ে। আল্লাহর কাছে আসল মূল্য হলো সত্যতা, বিনয়, তাওবা, দোয়া এবং তাঁর দিকে আন্তরিক প্রত্যাবর্তন।

মহান আল্লাহ আমাদের আরাফার দিনের মর্যাদা বুঝার তাওফীক দিন। আমাদের সিয়াম, দোয়া, যিকর ও তাওবা কবুল করুন। আমাদের চোখ, কান, জিহ্বা ও হৃদয়কে গুনাহ থেকে হেফাজত করুন। এবং আমাদেরকে ক্ষমাপ্রাপ্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন!

- আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।

Address

Nawdapara (Aam Chattar), Sapura
Rajshahi
6203

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Al-Ilm Magazine posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share