07/08/2026
“জুম্ম সমাজে সামাজিক পরিবর্তন ও বর্তমান প্রজন্ম”
সৃষ্টির আদিকাল থেকে আমাদের চারপাশের সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ধারা স্বভাবসুলভ প্রকৃতির নিয়মে হচ্ছে। কিন্তু দিন যত এগিয়েছে, মানুষের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা যত বেড়েছে, মানুষ প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বের করেছে। এই পরিবর্তন সামাজিক ও প্রাকৃতিক উভয় জায়গায় হয়েছে। আর এই উভয় পরিবর্তনের প্রভাবক হচ্ছে মানুষ। মানুষ যেমন সমাজকে পরিবর্তন করেছে, ঠিক তেমনি সমাজও মানুষের পরিবর্তন সাধন করেছে। যদিও এটি নিয়ে আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক সমাজে বেশ তর্ক বিতর্ক রয়েছে। এই নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা সমাজকে বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। ক্ল্যাসিক্যাল সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন সমাজ পরিবর্তনের এই ধারায় সামাজিক প্রতিষ্ঠান (পরিবার, সংগঠন, ক্লাব ইত্যাদি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীতে এই ধারণার প্রত্যুত্তরে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলেছেন মানুষের আধিপত্য ক্ষমতার প্রভাবে সমাজের অন্যান্য জায়গাগুলোতেও পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু উত্তর আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তি পর্যায়ের ক্ষমতার ব্যবহার একে অপরের পরিপূরক। তাই উভয়ে সমাজ পরিবর্তনে সমানভাবে অবদান রাখে । যাইহোক এ এক জটিল বিষয় বটে। তবে এই লেখার উদ্দেশ্য বৃহত্তর পরিসরে সমাজ কিভাবে পরিবর্তন হলো তা নয়। এই আলোচনা অনেক বিস্তৃত। কারণ এর পেছনে রয়েছে রেনেসাঁ, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা, শিল্পায়ন, বিশ্বায়নের ধারনা, প্রযুক্তির আগ্রাসন ইত্যাদি। এই লেখার উদ্দেশ্য বাংলাদেশে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক পরিবর্তনের কিছু চিত্র ও বর্তমান প্রজন্মের অবস্থা। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে এই পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। এই পরিবর্তন কতটা খারাপ বা ভালো তা বিচার করার আগে এই পরিবর্তন শুরুর আগমুহূর্ত ও প্রেক্ষাপট জানা খুবই জরুরি। সমাজ বিজ্ঞানী কার্ল মার্ক্স সমাজকে জানার জন্য ম্যাটেরিয়ালিস্টিক মেথডোলোজি ব্যবহার করেছেন। ঠিক অনেকটা ধনুক দিয়ে তীর ছুড়তে গেলে যেভাবে তীরকে পেছনের দিকে টানতে হয়, তেমনিভাবে সমাজের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিবর্তনকে বুঝতে গেলে সমাজের পেছনের ইতিহাস জানা দরকার। আরেক সমাজ বিজ্ঞানী মিশেল ফুকো সমাজকে জানার জন্য আর্কাইভাল মেথোডোলোজি ব্যবহার করেছেন। যেকারণে মানুষের অতীত ইতিহাসকে জেনে বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতি ও সমাজের অবস্থা ব্যাখ্যা করেছেন। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে সামাজিক ব্যবস্থা এমনভাবে পরিবর্তন হচ্ছে যার কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নেই এবং সুনির্দিষ্ট কোন ভবিষ্যৎ নেই। সকলে জানে পার্বত্য চট্টগ্রাম অনেক সমস্যায় জর্জরিত । এই সমস্যার মধ্যেও এই সামাজিক পরিবর্তনগুলোর ফলে পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী আদিবাসীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কতটা সম্ভব হবে তা ভাবনার বিষয়। এই পরিবর্তনগুলো নিচের কয়েকটি প্যারামিটার দিয়ে দেখা যাকঃ
✅ ভাষাঃ আমরা ব্যাকরণে পড়েছি যে ভাষা মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম। ভাষা শুধু মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করা নয়, একজন মানুষের চিন্তাশক্তি নবরূপে গঠন ও পরিবর্তনে সহায়তা করে। ভাষা মানুষের মধ্যে একাত্মতার প্রতিফলন ঘটায়, নিজ জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাসকে পুনরুজ্জীবিত করে। আদি ও বর্তমান প্রজন্মের মাঝে সেতুবন্ধন দৃঢ় হয় ভাষার নিজস্ব মৌলিক শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে । এবার দেখা যাক আমাদের বর্তমান জুম্ম প্রজন্মের মধ্যে কি বিরাজমান রয়েছে। দেখা যাবে যে, যেসব জুম্ম তরুণরা পড়াশোনা করছে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পন করেছে তাদের মধ্যে নিজ মাতৃভাষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। যেমনঃ চাকমা ভাষায় 'দুপ' কে সাদা, 'বে' কে নানু, 'য়েল' কে সবুজ, 'এহ্-রা' কে মাংস এরকম অহরহ শব্দ ব্যবহার করছে। ঠিক তেমনি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরাও একই কাজ করছে। যার ফলে ছেলেমেয়েদের চিন্তাধারার মধ্যে আমূল পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি ভাষার মধ্যে এমন কিছু মৌলিক শব্দ থাকে যেগুলো অন্য ভাষায় সমার্থক খুঁজে পাওয়া যায় না। এসব শব্দের ভাবার্থ যখন অন্যভাষায় প্রকাশের চেষ্টা করা হয়, তখন ঠিক সেভাবে ওই অর্থ তার জ্ঞানমন্ডলে গঠিত হতে থাকে এবং সেভাবেই দৈনন্দিন জীবনে তা প্রয়োগ ও আচরণ করে। যার কারণে ওই প্রকাশিত ভাবার্থ নিজ ভাষার মৌলিক ভাবের থেকে দূরে সরে যায়। আবার এমন অনেক শব্দ আছে যেগুলো আমাদের ইতিহাসকে জানতে সাহায্য করে। তাই নিজ ভাষার প্রতি অনীহা আমাদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের দিনদিন তাদের শেকড় থেকে দূরে সরে নিয়ে যাচ্ছে। তারা তাদেরকে আর তাদের ইতিহাসের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারছে না কিংবা শেকড়ের প্রতি টান অনুভব করছে না। বর্তমানে এমনও দেখা যায় যে, যেসব ছেলেমেয়েরা প্রান্তিক এলাকা থেকে উঠে আসে এবং কথা বলার সময় নিজ মাতৃভাষার শব্দগুলো ব্যবহার করে, তাদেরকে ‘ক্ষ্যাত’ বলে সম্বোধন করে কিংবা এড়িয়ে চলে আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত জুম্ম শিক্ষার্থীরাই।
✅ শিক্ষা: বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা সমস্যায় পরিপূর্ণ। যেখানে দেশের প্রধান শিক্ষাব্যবস্থার এই বেহাল দশা, সেখানে বাংলাদেশের সূচনালগ্ন থেকে অবহেলিত হয়ে আসা আদিবাসীদের কাছে কী বা প্রত্যাশা করা যায়। পাহাড়ে যে শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে তা দুর্বোধ্য এবং ছেলেখেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই জগাখিচুড়ির মাঝে এক শ্রেণির মানুষ একধরনের মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছে যে, ‘পড়ালেখা মানেই চাকরি ছাড়া কোনকিছু করা বেমানান’। পাহাড়ে রয়েছে শত সমস্যা, এই সমস্যাগুলো সমাধান না করার চেয়ে, ভালো বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ আশা না করার চেয়ে চাকরি প্রত্যাশা করা অলীক স্বপ্ন মাত্র। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বর্তমানে পাহাড়ের যে বেহাল দশা তার অধিকাংশ দায়ী এই নামমাত্র শিক্ষিত জনগোষ্ঠী । এই যাত্রায় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বেশি ঝুঁকে পড়ছে । শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করা মানে মাঠে কাজ করা যাবে না, বেমানান এই কুসংস্কারটি বেশ শক্তপোক্তভাবে জনমনে গেঁথে গেছে। এখন প্রান্তিক পরিবেশ থেকে শহরের এলাকায় পড়াশোনা করতে আসা ছেলেমেয়েরা বাড়িতে যাওয়ার পর বাবা মাকে জমি কিংবা জুম কাজে সাহায্য করতে চায় না। এই বাঁধাধরা ধারনাটি তাদের অলস ও কর্মহীন করে তুলছে, কিন্তু তাদের পূর্বপুরুষরা এসব কাজ আদিকাল থেকে করে আসছে। এসব ছেলেমেয়েরা অন্যদিকে বাবা মায়ের টাকায় উদ্দাম জীবন যাপন করে, মাস শেষে টাকা চেয়ে নেয় ইচ্ছামত । টাকা জোগার করে দিতে না পারলে বাবা মাকে ব্ল্যাকমেইল করে । এই ক্যাটাগরির ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা শেষে না থাকে কোন যোগ্যতা, না থাকে কোন কারিগরি শিক্ষার জ্ঞান। আরেকটা গৎবাঁধা ধারণা দেখা যায় যে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানে খারাপ, পড়ালেখা করতে হয় না, অটোপাশ ইত্যাদি। অথচ কারিগরি শিক্ষার বহির্বিশ্বে রয়েছে অনেক চাহিদা । কিন্তু রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানে এসকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করে হাস্যরসে পরিণত করেছে। এই যে একটা ভ্রান্ত ধারনার মাধ্যমে জুম্ম শিক্ষার্থীরা বড় হচ্ছে, এর ফলে তারা জানে না কোন সঠিক ইতিহাস, এবং তারা জানে না তারা বর্তমানে যে কাজ করছে এর ভবিষ্যৎ ফলাফল কি হতে পারে। ইতিহাস জানা না জানা নিয়ে সবচেয়ে হতাশাজনক উদাহরণ পাওয়া যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের থেকে। যাদের থেকে সবচেয়ে বেশি প্রগতিশীল চিন্তাধারাগুলো আসা দরকার, তারা একাডেমিক বইয়ের বাইরে পড়াশোনা করে না, বোঝে না নিজের জাতিস্বত্তার সমাজব্যবস্থা ও আধুনিক বিশ্বের সমাজব্যবস্থা। তারা কথা বলে সেকেন্ডারী সোর্সের(গৌণ উৎস) উপর ভিত্তি করে। কিন্তু এসব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলার জন্য মুখ্য বিষয়ের গুরুত্বই তারা অনুধাবন করতে পারে না। নিজে আগ্রহ নিয়ে পড়ে উপযুক্ত যুক্তি সহকারে প্রাথমিক ডেটা নিয়ে কথা বলবে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখা যায় না। তারা কথা বলে অমুক থেকে শুনেছি, অমুক থেকে জেনেছি ইত্যাদি। তাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে; সেটি হলো নিজেকে তরুণ প্রজন্মের লিডার মনে করা। নেতৃত্ব প্রদান করার যোগ্যতা অর্জন করা কখনো খারাপ না। তবে কিছু NGO প্রতিবছর ২/৩ দিনের youth leadership নামে যে প্রোগ্রামগুলো আয়োজন করে, সেখানে ছাত্রছাত্রীরা অংশ নিয়ে যে fake self-confidence boosting পাচ্ছে তা একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাধারাকে ডাইভার্ট করা ছাড়া আর কিছুই নয়। নেতৃত্ব শিখতে হবে প্রান্তিক পর্যায়ে থেকে, নেতা হতে হবে প্রান্তিক মানুষকে আপন মনে করে তাদের সাথে কাজ করে। এসকল আয়োজিত প্রোগ্রাম নিজের স্বার্থকে সর্বোত্তম পর্যায়ে আদায় করা ছাড়া সামগ্রিক মুক্তির কোন উপায় খুঁজে দেয় না। ফলস্বরূপ, আজকাল তরুণরা এক ধরণের সেল্ফ-সেন্টার্ড (আত্মকেন্দ্রিক) হয়ে যাচ্ছে।
➡️ঘুষ দিয়ে চাকরি নেয়া একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। চাকরি পেতে হলে ঘুষ দিতে হয় এই ধারণাটি একদিকে শিক্ষার্থীদের উচ্চতর পড়াশোনার প্রতি অনীহা তৈরি করে, অন্যদিকে পরিবারকে অনেক হয়রানির সম্মূখীন হতে হয়। নিম্ন গ্রেডের একটা চাকরি পাওয়ার আশায় অনেক পরিবার ঘুষের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে নিজেদের আবাদযোগ্য জমি বিক্রি করে দেয়। অথচ চাকরির জন্য যে পরিমাণ ঘুষের টাকা দেয়া হয়, সে পরিমাণ টাকা ব্যবসা অথবা উদ্যোক্তা খাতে বিনিয়োগ করলে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ভালো টাকা আয় করা সম্ভব। সুবিধাবাদীরা এই সুযোগগুলো লুফে নেয় এবং পরিবার সর্বহারা হয়ে যায় । বাংলাদেশের চাকরির বাজারে ঘুষের লেনদেন হয় এটা যেমন সত্য, মেধা ও দক্ষ হয়েও ভালো চাকরি পাওয়া যায় সেটাও সত্য। তাই এসব বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্য পর্যন্ত স্পষ্ট ধারনা থাকা উচিত।
➡️ এখানে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল জেনারেশন গ্যাপ। এই জেনারেশনাল গ্যাপের কারণে বেশ জটিল সমস্যা দেখা যাচ্ছে। যেমনঃ বাবা লেখাপড়া পারে না, প্রযুক্তি সম্পর্কে অভিজ্ঞ নয়, শহরের পরিবেশ সম্পর্কে জানাশোনা কম, এমন পিতামাতার ছেলেমেয়েরা যখন শহরে পড়াশুনা করতে আসে এবং একটু জানাশোনা ভালো হতে থাকে তখন তাদের মধ্যে পিতামাতাকে অবজ্ঞার ছলে কথাবার্তা কিংবা আচরণ করার প্রবণতা দেখা যায়। ছেলেমেয়েরা তাদের পিতার প্রজন্মের মানুষদের থেকে নিজেকে বেশি জ্ঞানী মনে করে কিংবা তাদের মধ্যে অহংকারী মনোভাব দেখা যায়। যেমনঃ এরকম মন্তব্য করতে শোনা যায় যে, 'তোমরা লেখা পড়া জানো না , কি বুঝবে, তোমরা আদিম যুগের মানুষ' ইত্যাদি। অনেকে তাদের বাবা-মাকে শহরের বন্ধুদের কাছে পরিচয় দিতে চায় না, কারণ তাদের বাবা-মারা শহরের মানুষদের মত পোশাক পরে না কিংবা তথাকথিত স্মার্টলি কথা বলতে জানে না। শহরে পড়াশোনা করতে আসা ছেলেমেয়েরা যখন গ্রামে যায় তখনও তাদের মধ্যে এই অহংকার ও গ্রামের মুরুব্বিদের সাথে অবাধ্য আচরণ করতে দেখা যায়। তারা গ্রামের মুরুব্বিদের পর্যন্ত উপেক্ষা করতে দ্বিধাবোধ করে না। কাজেই এই পড়াশোনা জানা আর না জানা দুই প্রজন্মের মাঝে যে দূরত্ব সেটা অনুধাবন করা খুব জরুরি।
✅ রাজনীতিঃ আমরা সবাই মানি আর না মানি এইটা সত্য যে আমরা সবাই এক একজন রাজনীতিবিদ। রাজনীতির দিক দিয়ে বিবেচনা করলে আমরা সবাই রাজনীতির অধীন। এমনকি আমাদের পরিবারের মধ্যেও রাজনীতি বিদ্যমান। তবে উন্নত বিশ্বের রাজনীতির সাথে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি মানে প্রতিপক্ষকে দমিয়ে রাখতে হবে, হেয় করতে হবে, হয়রানি করতে হবে ইত্যাদি। আর আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতির অবস্থা আরো ভয়াবহ। এই অবস্থার মধ্যেই এমন কিছু বিষয় থাকে যেগুলো রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করতে হয়, রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হয়। মজার বিষয় হল যে আমাদের জুম্ম তরুণরা দুইভাগে বিভক্ত। একপক্ষ রাজনীতি না বুঝে ক্ষমতার লোভে রাজনীতিতে অংশ নেয় আর অপরপক্ষ রাজনীতি না বুঝে রাজনীতিকে ঘৃণা করে। উভয় পক্ষের মধ্যে রাজনীতির সঠিক সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা অনুপস্থিত। প্রথম পক্ষের তরুণরা দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতির অপব্যবহারের রাজনৈতিক ক্ষমতার অনুশীলন দেখে মোহাবিষ্ট হয়। এই মোহে আবিষ্ট হয়ে আসা তরুণ রাজনীতিবিদরা অধিকাংশই জানে না তার দলের লক্ষ্য কি, কি তার দলীয় ম্যানিফেস্টো, কি তার আদর্শ ইত্যাদি। তাদের মধ্যে দেখা যায় না কোন সহনশীলতা। এমনও উদাহরণ আছে যে শুধুমাত্র প্রতিপক্ষ বলেই তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে কিংবা আমার নেতার সাথে প্রতিপক্ষ কিংবা সমালোচকের খারাপ সম্পর্ক রয়েছে, যার কারণে তাকে হামলা করতে হবে। কিন্তু সে আদৌ জানে না প্রেক্ষাপট কি, কেন, কি নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ। এ ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার আপামর জনতার কাছে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। জনগণের সাথে তাদের নেই কোন মাঠ পর্যায়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা, নেই উন্নয়নমূলক কাজ কিংবা পরামর্শ। বরঞ্চ তারা প্রান্তিক অঞ্চলে গিয়ে সেখানে ক্ষমতার অনুশীলন করে, যার কারণে সাধারণ মানুষদের সাথে বর্তমান প্রজন্মের তরুণ রাজনীতিবিদদের বিশাল দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। কিছু কিছু উদাহরণ আছে যে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিরোধীতার কারণে অনেকে রাজনীতিতে প্রবেশ করে তার বিরোধী পক্ষকে শাস্তি দেয়ার জন্য। হবেই বা না কেন, এটাই তো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির বর্তমান অবস্থা। এভাবে যখন তরুণ রাজনীতিবিদরা তাদের ব্যক্তিগত কলহগুলো রাজনীতি চর্চার সাথে এক করছে, তাই সাধারণ মানুষ তাদের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।
অপরপক্ষে, যারা রাজনীতিকে ঘৃণা করে তারদেরও রাজনীতি নিয়ে নেই কোন সঠিক বোঝাপড়া। এই পক্ষের বেশিরভাগ একটু ভালো পরিবার থেকে আসা সুবিধাপ্রাপ্তরা। তারা মনে করে রাজনীতি মানে খারাপ, অথচ একই রাজনীতির বেড়াজালে তারা নিজেরাই আবদ্ধ তা কিন্তু তারা নিজেরাও জানে না। যদিও এই নেতিবাচক ধারনার পেছনে প্রথম পক্ষেরও বেশ অবদান আছে। রাজনীতিকে ঘৃণা করা মানুষরা আবার যথেষ্ট সুবিধাবাদী। তারা ব্যক্তিস্বাধীনতা চায়, নারীর অধিকার চায়, সম-অধিকার চায় ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন হলো যেখানে পুরো জুম্ম জনগোষ্ঠী সামগ্রিকভাবে নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত, সেখানে প্রত্যেকে কিভাবে আলাদাভাবে তাদেরকে অধিকার দিবে? দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড়ের দুর্গম এলাকার ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার জন্য কোটার আবেদন রাজনৈতিকভাবে আবেদন করা হলো। কিন্তু সেখানে দেখা যাচ্ছে রাজনীতিকে ঘৃণা করা তরুণের সংখ্যাটা বেশি। অথচ সেখানে থাকার কথা ছিল প্রান্তিক সুবিধাবঞ্চিত ছাত্র/ছাত্রীদের । পার্বত্য অঞ্চলে ধর্ষণের মতো জঘন্যতম কাজ প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে। এই প্রতিবাদে যখন কোন প্রতিবাদী সমাবেশের আয়োজন করা হয় তখন এই শ্রেণীর মানুষদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। এখানে আরও লক্ষণীয় যে; এসকল প্রোগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণ খুবই কম। যাদের জন্য এই জাতীয় প্রতিবাদী সমাবেশের আয়োজন; সেখানে তাদের সংখ্যা যদি কম থাকে তাহলে তাদের অধিকারের কথা বলবে কে?
দিনশেষে রাজনীতি নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক থাকলেও জাতীয় স্বার্থে রাজনীতি সম্পর্কে অবগত থাকা দরকার। রাজনীতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান নিয়ে রাজনীতিতে অংশ নেয়া এবং মন্তব্য করা দরকার। তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রদের উচিত প্রান্তিক মানুষদের আপন করে নিয়ে তাদের সাথে কথা বলে তাদের অধিকারগুলো শোনা। তা যদি না হয় এই দূরত্ব ভবিষ্যতে আরও বাড়তে থাকবে।
✅ অবসর যাপনঃ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এই সময়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে নিজেকে নিয়ে ভাবার সময় পাওয়া যায় । কিন্তু এ সময়টি আমাদের জুম্ম শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার করে থাকে। বিগত কয়েক বছরে এর প্রভাব ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। সামাজিক গণমাধ্যমের বদৌলতে এর বিস্তৃতি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। আজকে পাহাড়ে পর্যটনের নামে ভুমি বেদখলের যে প্রক্রিয়া চালু রয়েছে, এর জন্য এই ছেলেমেয়েরা অনেকাংশে দায়ী। সামাজিক গণমাধ্যমের অপব্যবহার করে ছুটির সময়ে পাহাড়ের বিভিন্ন নাম না জানা জায়গায় ঘুরে বেড়াবে এবং নিজের প্রোফাইল, পেইজ, ভিউ বাড়ানোর জন্য জায়গার নামসহ ছবি আপ্লোড করে। ফুরোমোন, বিলাইছড়ির ধুপপানি, সিন্দুকছড়ি এরকম অনেক উদাহরণ আছে যেগুলো আজকে পর্যটনের নামে বেদখল হতে চলেছে । বর্তমানে ভ্লগিং নামে যে আরেকটা ট্রেন্ড বের হয়েছে, এর অবস্থা আরো ভয়াবহ। ভ্লগাররা তাদের নিজেদের সংস্কৃতিকে এমনভাবে প্রেজেন্ট করে মনে হয় যেন জীবনে প্রথমবার দেখছে কিংবা বিদেশী কেউ। অথচ এসব বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাজ করার কথা ছিল কাপ্তাই বাঁধের ফলে উদ্ভাস্তু হয়ে যাওয়া জুম্মরা কোথায় আছে, কেমন আছে, যারা মানবেতর জীবন যাপন করছে তাদের কিভাবে সামাজিক অবস্থার উন্নতি করা যায়, কিভাবে প্রান্তিক দুর্গম এলাকার ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব সমস্যা বিদ্যমান সেগুলোর সাথে কিভাবে মোকাবেলা করা যায়, প্রান্তিক পর্যায়ে মানুষের সাথে কথা বলে তাদের জীবন সংগ্রামের কাহিনী শোনা ইত্যাদি। যেমনঃ কিউবায় যারা ডাক্তারী পড়ে তাদের প্রান্তিক এলাকায় গিয়ে ইন্টার্ণের মাধ্যমে চিকিৎসা প্রদান করা বাধ্যতামূলক।
✅ সংস্কৃতির পরিবর্তনঃ সংস্কৃতির পরিবর্তন একটি বড় বিষয় , যার ব্যাখ্যা লিখতে গেলে শেষ হবে না। এই পরিবর্তনের ধারাকে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা আরো ত্বরান্বিত করেছে। আমেরিকার রাজনীতি বিশ্লেষক জোসেফ স্যামুয়েল ন্যে, “Soft Culture” নামে একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন। সফট কালচার এমন একটি অস্পষ্ট উপাদান যেটি এর মূল্যবোধ, বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবন ধারাকে গঠন করে। এটি একটি সমাজের অ-বস্তুগত দিকগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে যা প্রায়শই পর্যবেক্ষণ করা কঠিন; তবে যৌথ মানসিকতা ও আচরণে গভীরভাবে নিমগ্ন থাকে; যার একটি উদাহরণ হলো ফেইসবুক। বর্তমানে তরুণরা ফেইসবুকে যা দেখে তা দ্বারা অনুপ্রানিত হচ্ছে। তারা তাদের স্বকীয়তা হারিয়ে তাদের ফেইসবুকের ফ্রেন্ড, ফ্যান, ফলোয়াররা কি চাচ্ছে, কি পছন্দ করছে সেভাবে পরিচালিত হচ্ছে দিনকে দিন। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ ছেলেরা অনলাইন জুয়ায় আসক্ত এবং মেয়েরা চায়না যেতে চায় (পাচার হতে চায়)। ছেলেরা অনলাইন বিজ্ঞাপন দ্বারা প্ররোচিত হয়ে প্রতিদিন অনলাইন ক্যাসিনো, জুয়া খেলে টাকা হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। অপরদিকে মেয়েরা ঝুঁকে পড়ছে চায়নায় পাড়ি দেওয়ার জন্য। তাদের মনে এই ধারনা জন্মেছে যে চায়নায় গিয়ে অনেক সুযোগ-সুবিধা পাবে এবং ভালো থাকবে। চাকমা ভাষায় একটা প্রবাদ আছে যা চায়নায় যেতে ইচ্ছুক মেয়েদের মনে রাখা দরকার তা হলোঃ “এক মুরত্তুন আরেক মুরঅ অজল দেগা যায়”(এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়কে দেখলে উঁচু মনে হয়)। বাস্তবতার দিক দিয়ে দেখলে পৃথিবীর সব জায়গাতেই মানুষের 'জীবন যুদ্ধে' যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়। এই বেঁচে থাকার অবস্থান নির্ভর করে স্থান, কাল ও পাত্র অনুযায়ী তার জীবনে কে কি কাজ সম্পাদন করছে।
➡️ বৃটিশ শাসনামল থেকে জুম্মরা অর্থনৈতিকভাবে বৃটিশদের উপর নির্ভরশীল হলেও জুম্ম আদিবাসীদের ছিল আলাদা নিজস্ব সংস্কৃতি।সংস্কৃতির পরিবর্তনের ধারা চলমান থাকবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু এই পরিবর্তনের স্রোতধারায় যাতে নিজস্ব সংস্কৃতির স্বত্ত্বা হারিয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। যেমনঃ আমেরিকার পাশের দেশ মেক্সিকো, যার অর্থনীতি শতকরা ৮০ ভাগ আমেরিকার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু তাদের সংস্কৃতিতে রয়েছে নিজস্বতা। তারা এখনো তাদের সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছে তাদের ঐতিহাসিক পরিচয়ের ধারা ধরে রাখার জন্য। গণসংস্কৃতির যুগে তারা তাদের নিজস্ব জাতিস্বত্ত্বার পরিচয়কে ভাসিয়ে দেয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংস্কৃতির যে পরিবর্তন হচ্ছে এবং এটাকে যেভাবে বৈধতা প্রদান করা হচ্ছে তার উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। লোকসংস্কৃতি আর গণসংস্কৃতি দুটি আলাদা বিষয়, এক্ষেত্রে খেয়াল রাখা দরকার যে গণসংস্কৃতির নীচে যেন লোকসংস্কৃতি হারিয়ে না যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত প্রত্যেক আদিবাসীদের নিজস্ব সামাজিক রীতিনীতি রয়েছে। ইদানীং যে পরিবর্তনগুলো দেখা যাচ্ছে তাদের মধ্যে অন্যতম হল: বিয়ের আগে গায়ে হলুদ, বিয়ে মানে কোট- টাই পরে নাচ গানের আসরের আয়োজন করতে হবে, জমকালো আয়োজন হতে হবে ইত্যাদি। তবে প্রশ্ন থেকে যায় যে জুম্মদের ইতিহাসে কি এরকম কোন নজির আছে যে বিয়ের সময় গায়ে হলুদের আয়োজন করা হয়েছিল কিংবা বিয়ে মানেই ভালো খাবার আর গান বাজনার আয়োজন করতে হবে? সামাজিক গণমাধ্যমে এমনও মন্তব্য করতে দেখা গিয়েছে যে এসব আয়োজন থাকলে বিয়ে বাড়ি বলে মনে হয় আর এসব না থাকলে বিয়ে বাড়ি মনে হয় না কিংবা বিয়েটা মেকি মেকি মনে হয়। আমাদের একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে জুম্ম আদিবাসীরা অতীতে কখনো অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল ছিল না। এখন বিয়ে মানেই জমকালো আয়োজন এই মতবাদটিকে যদি জুম্ম সমাজে বৈধতা প্রদান করা হয় কিংবা এইটা সমাজের মাপকাঠি ধরা হয় তাহলে অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল শ্রেণির মানুষদের সামাজিক অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তারা কি সামাজিকতা রক্ষার জন্য জায়গা জমি বিক্রি করে কিংবা লোন নিয়ে সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে এসব আয়োজন করে সামাজিকতা বজায় রাখবে নাকি তাদের সামর্থ্যের মধ্যেই আটকে থাকবে? এই প্রশ্ন জুম্ম তরুন সমাজের ভাবা দরকার। এখানে হয়ত আরো তর্ক-বিতর্কের উত্থান হতে পারে যে, যার সামর্থ্য আছে সে এসব আয়োজন করবে, তাতে অন্যের মাথাব্যাথা কেন! বেশ ভালো কথা। তবে সামর্থ্য আছে বলেই যে নতুন রীতিনীতি সৃষ্টি করে অন্যকে দেখিয়ে সামাজিক বৈধতা প্রদান করা যাবে সেরকম না। জুম্ম আদিবাসীদের পরিমন্ডল খুবই ছোট, এই ছোট্ট পরিমন্ডলে এখনো দুর্গম অঞ্চলে অনেক শিশু আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারনে উচ্চ শিক্ষায় আসতে পারে না, পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে পারে না। তাই জুম্ম সমাজকে একসাথে আগামীতে পাড়ি দিতে হলে দরকার সকলের অংশগ্রহণ। তাই একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকাটা যথেষ্ট ভুমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
✅ আমাদের কি ধরনের স্বাধীনতা প্রয়োজন? পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রতিনিয়ত দেশের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সামরিক ও বেসামরিক বাহিনী দিয়ে। যেটাকে মিশেল ফুকোর ভাষায় বলে State Surveillance। এরকম সার্ভিলেন্সের মধ্যে থাকার পরেও আমাদের জুম্ম তরুণরা নিজেরা অবাধ স্বাধীন জীবন যাপন করছে বলে মনে করে। যার উদাহরণ হল এই যে- ছেলেরা চায় অর্থনৈতিক ও নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের স্বাধীনতা, নারীরা চায় নারী অধিকার, সমঅধিকার ইত্যাদি। উন্নত বিশ্বে যেরকম রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আছে আমাদের দেশে কি এরকম স্বাধীনতা আছে? মধ্যে রাতে কি একটা ছেলে কিংবা মেয়ে নিরাপদে বাড়ির বাইরে বের হতে পারে? না। আর পার্বত্য অঞ্চলে যখন-তখন বের হলে তো গুম হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি। উন্নত বিশ্বে যেরকম স্বাধীনতা অনুভব করে আমরা যদি সেরকম অনুভব করতে পারি, তাহলে আমরা বুঝব প্রকৃত স্বাধীনতা কি এবং কিভাবে তা উপভোগ করতে হয়। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেরা তাদের পিতামাতার থেকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও আধুনিক প্রযুক্তির স্বাধীনতা চায়। এক্ষেত্রে বুঝা দরকার যে জুম্মরা আদিকাল থেকে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে তাদের এই পুঁজিবাদী বাজার চক্রে আধুনিক প্রযুক্তির নাগাল পাওয়া দূরুহ। তা স্বত্বেও জুম্ম তরুণরা তাদের পিতামাতাদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা না করে সামর্থ্য বহিঃর্ভুত চাহিদার আবদার করে থাকে। যেমনঃ পারিবারিক অবস্থা যাই হোক না কেন অবশ্যই একটা বাইক থাকা লাগবে, নয়তোবা অন্যদের সাথে ক্লাস লেভেল মিলবে না। যার ফলে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানে তরুণ ছেলেদের বাইক চালানোর চিত্র দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে নারীরা চায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা থেকে বের হয়ে নারী অধিকার ও নারী স্বাধীনতা। তাদের অভিযোগ আদিবাসী নারীরা অধিকার থেকে বঞ্চিত কিংবা নির্যাতিত, যা আপাত দৃষ্টিতে খুব একটা বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। হ্যাঁ, এটা সত্য যে প্রান্তিক অঞ্চলের অনেক নারী সামাজিক ও পারিবারিকভাবে নির্যাতিত হয় এবং এটাও অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন । কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, যদি আদিবাসীদের সমাজ ব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক হয়েও থাকে, যে সমাজে পুরুষরাই স্বাধীন নয় সে সমাজে তারা নারীদের কিভাবে স্বাধীনতা দিবে। যেখানে পুরুষদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, মুক্তবাকের স্বাধীনতা নেই, পথে-ঘাটে, যেকোন মুহুর্তে গুম, মামলা কিংবা অপহৃত হওয়ার সম্ভাবনা সেখানে তারা কিভাবে অপরের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিবে? অন্যকে স্বাধীনতা, অধিকার দেয়ার আগে নিজে স্বাধীন হতে হবে, অধিকার থাকতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক, শিক্ষা, রাজনৈতিক, বাকস্বাধীনতা, সামাজিক মুক্তি। কিন্তু আমাদের নতুন প্রজন্মের পেশ করা যে যুক্তি তা হলো "অমুক দেশের মেয়েরা অধিকার পায়, আমরা পাই না কেন? অমুক দেশের অমুকের গাড়ি আছে, আইফোন আছে আমার নাই কেন?" ইত্যাদি । এক্ষেত্রে আমাদের জুম্ম তরুণদের তুলনাগত কিছু সমস্যা আছে বলে মনে হয়। আমাদের বুঝতে হবে যে, যে দেশে নারীরা অবাধে চলাফেরা করতে পারে, অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারে, অধিকার চর্চা করতে পারে সে দেশের অবস্থা আর পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি এক নয়। যার ফলে আমাদের ভাবা উচিত সবার আগে কি করা দরকার, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান সমস্যাগুলোর সাথে মোকাবেলা করে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায়। তাহলে আমরা বাকি অধিকারগুলো নিয়ে কাজ করতে পারব।
যখনই ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অধিকার চর্চার কথা এসে যায় জুম্ম আদিবাসীদের মধ্যে একটা ভন্ডামি দেখা যায়। যা বর্তমানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে। এই ভন্ডামি ছেলেমেয়ে দুই পক্ষকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে, সেটা হলো- কোন মেয়ে অ-আদিবাসী ছেলের প্রেমে জড়ালে; সমাজে গর্হিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, মেয়েটির চরিত্র, পরিবার, জাত সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়। অন্যদিকে যখন কোন ছেলে অ-আদিবাসী মেয়ের সাথে প্রেমে জড়ায় তখন তাকে বাহবা দেয়া হয়। কেন দুই পক্ষের জন্য এই আলাদা ও বিপরীত সহমত? সমঅধিকার যদি চর্চা করা হয় তাহলে উভয়ে কেন বাহবা পাবে না কিংবা দুজনকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে না? শিক্ষিত জুম্ম তরুণদের এসব বিষয় নিয়ে ভাবা দরকার। সেই সাথে এটাও যুক্তিসহকারে ব্যাখ্যা দেয়া দরকার যে মেয়েকে তিরস্কার এবং ছেলেকে বাহবা কেন দেয়া হলো, কেন অ-আদিবাসীদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করা যাবে না, কখন পারবে বা এর পরিণতি কি ইত্যাদি।
সভ্যতার পরিবর্তনের ধারায় সবচেয়ে বেশী অবদান রেখেছে তরুণ সমাজ। তরুণ-তরুণীদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনাই আগামীর বিশ্বকে এগিয়ে নিতে সক্ষম। তরুণদের হাতে নিহিত আছে আগামীর ভবিষ্যৎ কোনদিকে এগোবে। তাদের সুনেতৃত্বের ফলে সমাজ পরিবর্তন হতে বাধ্য। তাই তরুণ প্রজন্মই পারে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম সমাজের ভবিষ্যতকে নতুন করে সাজিয়ে তুলতে। এর জন্য প্রয়োজন সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনা, বিচক্ষণতা, প্রগতিশীল নেতৃত্ব, প্রান্তিক মানুষদেরকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারার ক্ষমতা ও নিজ শেকড়ের প্রতি টান।