07/06/2026
রূপনা চাকমা: একজন কোচকে ‘ইমপ্রেস’ না করলেও ইতিহাসকে করেছেন!
পিটার বাটলার বলেছেন, “সে আমাকে ইমপ্রেসড করতে পারেনি।” একজন কোচের অধিকার আছে কোনো খেলোয়াড়কে পছন্দ বা অপছন্দ করার। একজন কোচ তার দর্শন অনুযায়ী দল সাজাতেই পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জাতীয় দলের মতো জায়গায় একজন খেলোয়াড়ের মূল্যায়নের চূড়ান্ত মাপকাঠি কি একজন কোচের ব্যক্তিগত ইমপ্রেশন, নাকি মাঠের পারফরম্যান্স ও অর্জন?
এই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতেই আজ দাঁড়িয়ে আছেন রূপনা চাকমা।
বাংলাদেশ নারী ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুটি অর্জন হলো ২০২২ এবং ২০২৪ সালের সাফ উইমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা। এই দুই শিরোপা জয়ের গল্প লিখতে গেলে সাবিনা খাতুন, ঋতুপর্ণা চাকমা, আফঈদা খন্দকারদের মতোই একটি নাম বারবার সামনে আসবে... রূপনা চাকমা।
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে টানা দুইবার সেরা গোলরক্ষকের স্বীকৃতি পাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি কোনো আবেগের গল্প নয়, এটি পরিসংখ্যানের ভাষা। এটি ভোটাভুটির ফল নয়, এটি পারফরম্যান্সের পুরস্কার। ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, মালদ্বীপ কিংবা শ্রীলঙ্কার গোলরক্ষকদের পেছনে ফেলে টানা দুই আসরে সেরা হওয়া মানে আপনি অঞ্চলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক।
তবুও আজ প্রশ্ন উঠছে তার যোগ্যতা নিয়ে।
মজার বিষয় হলো, যে ফাইনালের পর কোচ রূপনাকে নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়লেন, সেই ম্যাচের সংবাদ সম্মেলনেই তিনি স্বীকার করেছেন বাংলাদেশের হজম করা তিন গোলের মধ্যে দুটি গোল গোলরক্ষক মিলি আক্তারের ভুলে হয়েছে। কিন্তু সেই ভুলকে তিনি বলেছেন “খেলার অংশ”।
অবশ্যই ভুল খেলার অংশ। বিশ্বের সেরা গোলরক্ষকও ভুল করেন। আলিসন করেন, কোর্তোয়া করেন, দোনারুম্মাও করেন। কিন্তু তখন স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে, যদি মিলির ভুল খেলার অংশ হয়, তাহলে রূপনার ক্ষেত্রে সেই উদারতা কোথায়?
যে খেলোয়াড় দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোলরক্ষক হয়েছেন দুইবার, তাকে কি একই সুযোগ দেওয়া হয়েছে?
রূপনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় তার উচ্চতা নিয়ে আলোচনা। কিন্তু ফুটবল ইতিহাস কখনো শুধু উচ্চতার খেলা ছিল না। যদি উচ্চতাই সবকিছু হতো, তাহলে হোর্হে ক্যাম্পোস কিংবদন্তি হতে পারতেন না। যদি শারীরিক গঠনই শেষ কথা হতো, তাহলে অসংখ্য প্রতিভাবান গোলরক্ষক ইতিহাসে জায়গা করে নিতে পারতেন না।
গোলরক্ষকের আসল শক্তি তার অবস্থান বোধ, রিফ্লেক্স, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, সাহস এবং ম্যাচ রিডিং। রূপনা বছরের পর বছর ধরে এই গুণগুলো মাঠে প্রমাণ করেছেন। তিনি ট্রফি জিতেছেন, ক্লিন শিট রেখেছেন, ফাইনালে দলকে বাঁচিয়েছেন এবং দেশের জার্সিতে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের অংশ হয়েছেন।
একজন কোচ হয়তো বলতেই পারেন, “সে আমাকে ইমপ্রেসড করতে পারেনি।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন খেলোয়াড়ের চূড়ান্ত দায়িত্ব কি কোচকে ইমপ্রেস করা, নাকি দেশের জন্য পারফর্ম করা?
রূপনা চাকমা হয়তো পিটার বাটলারকে ইমপ্রেস করতে পারেননি। কিন্তু তিনি দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলকে ইমপ্রেস করেছেন। তিনি দুইবারের সাফ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশকে ইমপ্রেস করেছেন। তিনি লাখো বাংলাদেশি সমর্থককে ইমপ্রেস করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ইতিহাসকে ইমপ্রেস করেছেন।
ফুটবলে মতের পার্থক্য থাকতে পারে। কোচ বদলাবে, কৌশল বদলাবে, একাদশ বদলাবে। কিন্তু অর্জন বদলায় না। ইতিহাসও বদলায় না।
আর বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে রূপনা চাকমার নাম লেখা আছে কোনো কোচের মতামতের কারণে নয়, বরং নিজের পারফরম্যান্স, সাহস এবং অর্জনের কারণেই।