16/05/2026
||এক টুকরো ফল আর অটল বিশ্বাস! কীভাবে আপনার জীবন বদলে দিতে পারে ফলহারিণী অমাবস্যা? জানুন এর অলৌকিক কাহিনি||
আজ ১৬ই মে, শনিবার। বাইরে জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ, আর ঠিক এই সময়েই প্রকৃতি তার ডালি সাজিয়ে দেয় নানা রসালো ফলের সম্ভারে— আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল। কিন্তু আপনি কি জানেন, জ্যৈষ্ঠ মাসের এই অমাবস্যা তিথিটি সাধারণ কোনও রাত নয়? সনাতন ধর্ম ও বাঙালি জীবনে এই রাতটি এক পরম পবিত্র এবং রহস্যময় তিথি— ফলহারিণী অমাবস্যা।
ভাবুন তো, এমন একটি দিন যেখানে আপনার মনের দীর্ঘদিনের কোনও সুপ্ত বাসনা কেবল একটিমাত্র ফল উৎসর্গ করার মাধ্যমে পূরণ হতে পারে! শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, যুগ যুগ ধরে অগণিত ভক্ত এই বিশেষ দিনটির দিকে চাতকের মতো চেয়ে থাকেন। আসুন, আজ গল্পের ছলে জেনে নিই এই তিথির মাহাত্ম্য এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের এক অভূতপূর্ব প্রেমের ও ভক্তির কাহিনি।
# # # 'ফলহারিণী' শব্দের অর্থ কী?
খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে, 'ফল' এবং 'হারিণী' (যিনি হরণ করেন)। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, মা কালী এই তিথিতে তাঁর ভক্তদের জীবনের সমস্ত অশুভ কর্মফল হরণ করে নেন। আমরা জীবনে জেনে বা না জেনে যেসব পাপ বা ভুল কাজ করে ফেলি, তার ফলে যে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হয়, মা আজ সেই সব বিষাদ হরণ করে আমাদের এক নতুন, শুদ্ধ জীবন দান করেন। রোগ, ব্যাধি, দেনা বা সাংসারিক অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে আজ তাই মায়ের কাছে আকুল প্রার্থনা জানান ভক্তরা।
# # # আপনার ভাগ্য ফেরাতে পারে যে ছোট্ট নিয়মটি!
জ্যোতিষ এবং শাস্ত্র মতে, ফলহারিণী পুজোয় একটি অত্যন্ত অদ্ভুত ও সুন্দর নিয়ম রয়েছে, যা নিষ্ঠাভরে পালন করলে অভাবনীয় ফল মেলে। নিয়মটি ভারী চমৎকার:
* আজকের দিনে মাকে আপনার সবচেয়ে প্রিয় একটি মরশুমি ফল (যেমন ধরুন আম, লিচু বা কলা) দিয়ে পুজো দিন।
* মায়ের কাছে নিজের মনের সবচেয়ে গভীর ইচ্ছাটি জানান।
* পুজোর পর সেই নির্দিষ্ট ফলটি প্রসাদ হিসেবে বাড়িতে নিয়ে আসুন এবং সযত্নে রেখে দিন।
* আসল নিয়মটি হলো: আগামী এক বছর আপনি আর ওই নির্দিষ্ট ফলটি খেতে পারবেন না!
* যদি এক বছরের মধ্যে আপনার মনস্কামনা পূরণ হয়ে যায়, তবে সেই প্রসাদী ফলটি গঙ্গায় বা কোনও পবিত্র জলাশয়ে ভাসিয়ে দিন। এরপর থেকে আপনি আবারও স্বাভাবিকভাবে সেই ফল খেতে পারবেন।
ত্যাগেই যে আসল প্রাপ্তি লুকিয়ে থাকে, এই নিয়মটি যেন তারই এক সুন্দর প্রতীক!
# # # শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদা: এক আধ্যাত্মিক রূপকথার রাত
ফলহারিণী অমাবস্যার কথা উঠবে আর দক্ষিণেশ্বরের কথা আসবে না, তা কি হয়! ইতিহাস বলছে, ১২৮০ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ মাসের এই অমাবস্যা রাতেই দক্ষিণেশ্বরে ঘটেছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা, যা আজও হিন্দু ধর্মে নারীশক্তির সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে বিবেচিত হয়।
সেদিন রাতে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর নিজের স্ত্রী, মা সারদাকে দশমহাবিদ্যার তৃতীয় রূপ— ষোড়শী বা ত্রিপুরাসুন্দরী রূপে পুজো করেছিলেন। একটি আলপনা আঁকা পিঁড়িতে মা সারদাকে বসিয়ে, তাঁকে সাক্ষাৎ দেবীজ্ঞানে পুজো করেন ঠাকুর। মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে তিনি বলেছিলেন—
> "হে সর্বশক্তির অধীশ্বরী মাতঃ ত্রিপুরাসুন্দরি, সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর, ইহার (শ্রীশ্রী মা) শরীর মনকে পবিত্র করিয়া ইহাতে আবির্ভূতা হইয়া সর্বকল্যাণ সাধন কর!"
পুজো শেষে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর সারাজীবনের সাধনার ফল, জপের মালা— সবকিছু নিজের স্ত্রীরূপী দেবীর পাদপদ্মে চিরকালের জন্য সমর্পণ করেছিলেন। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের এমন ঐশ্বরিক ও সম্মানজনক রূপ পৃথিবীর ইতিহাসে সত্যিই বিরল। নারী যে কেবল ভোগের বস্তু নয়, নারী যে সাক্ষাৎ ঈশ্বরী, সেদিন তা নিজের কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন ঠাকুর।
# # # বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে...
আমাদের বাংলায় যা ফলহারিণী কালীপুজো, উত্তর ভারতে সেই একই দিনটি পরিচিত 'বট সাবিত্রী ব্রত' বা 'বট অমাবস্যা' নামে। প্রাচীন ভারতের বৃক্ষ উপাসনার ঐতিহ্য মেনে এই দিনটিতে বট গাছের পুজো করা হয়। মা কালী আদিতে ছিলেন 'বলাকা মাতৃকা', আর আজও নবদ্বীপের 'পোড়ামা বৃক্ষমাতৃকা' বা বাংলার অসংখ্য বটতলায় দেবী উপাসনা সেই প্রাচীন লোকায়ত ধর্মেরই প্রমাণ দেয়।
# # # শেষ কথা
সংসারের হাজারো টানাপোড়েন, অফিসের চাপ বা ব্যক্তিগত জীবনের হতাশার মাঝে এই ফলহারিণী অমাবস্যা যেন এক পশলা শান্তির বৃষ্টির মতো। আপনি আস্তিক হোন বা না হোন, নিজের অহংকার আর মন্দ স্বভাবগুলোকে আজ অন্তত মানসিক ভাবেও যদি 'বিসর্জন' দিতে পারেন, তবে কালকের সকালটা আপনার জন্য নিশ্চয়ই এক নতুন আলোর বার্তা নিয়ে আসবে।
আপনার সমস্ত অশুভ কর্মফল দূর হোক, জীবনে আসুক অনাবিল সুখ ও সমৃদ্ধি— ফলহারিণী অমাবস্যার এই পুণ্য লগ্নে এটাই হোক আমাদের সকলের প্রার্থনা।