18/01/2026
#ইরানে চরম ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা: ৯ কোটি ২০ লাখ নাগরিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন
ইরান ইতিহাসের অন্যতম চরম ইন্টারনেট শাটডাউনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ১০ দিন ধরে দেশটির ৯ কোটি ২০ লাখ নাগরিক সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছেন, এমনকি ফোন ও টেক্সট মেসেজিং সেবাতেও রয়েছে ব্যাপক ব্যাঘাত।
গত ৮ জানুয়ারি #ইরানি সরকার ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়, যার উদ্দেশ্য বলে মনে করা হচ্ছে বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারি দমন-পীড়নের আন্তর্জাতিক যাচাই-বাছাই রোধ করা এবং ভিন্নমত দমিয়ে রাখা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, "বাইরে থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী অভিযান" মোকাবিলায় ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে।
স্থায়ী বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা
সরকার এখনও জানায়নি কবে ইন্টারনেট সেবা ফিরবে। তবে নতুন প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পর্দার আড়ালে কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে ইন্টারনেট সীমিত করার পরিকল্পনা করছে।
গত ১৫ জানুয়ারি ইরানওয়্যার নিউজ ওয়েবসাইট জানিয়েছে, সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি সাংবাদিকদের বলেছেন যে আগামী মার্চ মাসের শেষে ইরানি নববর্ষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ওয়েব অ্যাক্সেস পাওয়া যাবে না।
ইন্টারনেট স্বাধীনতা পর্যবেক্ষক সংস্থা ফিল্টারওয়াচ বিশ্বাস করে যে সরকার তাড়াহুড়ো করে নতুন ব্যবস্থা ও নিয়ম বাস্তবায়ন করছে যাতে ইরানকে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়।
ফিল্টারওয়াচ সরকারি সূত্র উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, "আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট অ্যাক্সেস পুনরায় চালু হওয়ার কোনো প্রত্যাশা থাকা উচিত নয়, এবং পরবর্তীতেও ব্যবহারকারীদের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট অ্যাক্সেস আর কখনো আগের মতো ফিরবে না।"
মানবিক সংকট ও অর্থনৈতিক প্রভাব
হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) অনুমান করছে যে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন হাজার তিনশ'রও বেশি বিক্ষোভকারীর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে, আরও চার হাজার তিনশ আশিটি মামলা পর্যালোচনাধীন রয়েছে। এছাড়া ১৮৭টি শহরে গ্রেফতারের সংখ্যা ২৪ হাজার ২৬৬ জনে পৌঁছেছে।
প্রকৃত নিহত ও আটকের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে, কিন্তু ইন্টারনেট অ্যাক্সেসের অভাবে তথ্যগুলো স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইতিমধ্যেই ইরানে জীবিকার ওপর শাটডাউনের গুরুতর প্রভাব পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, বিশেষ করে ই-কমার্স খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চীন-রাশিয়ার মডেল অনুসরণের আশঙ্কা
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান চীন ও রাশিয়ার মতো ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে চাইছে। চীনের "গ্রেট ফায়ারওয়াল" নাগরিকদের বৈশ্বিক ইন্টারনেটের বেশিরভাগ অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখে এবং ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের মতো সব পশ্চিমা অ্যাপ ভিপিএন ছাড়া প্রবেশযোগ্য নয়।
রাশিয়া ২০১৯ সালে "রু-নেট" নামে একটি অনুরূপ ব্যবস্থার পরীক্ষা শুরু করে, যার মধ্যে রয়েছে একটি "কিল সুইচ" যা সংকটকালে ব্যবহার করা হবে।
মিয়ান গ্রুপের সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল অধিকার বিভাগের পরিচালক আমির রশিদি বিবিসিকে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন কর্তৃপক্ষ একটি স্তরবিন্যাস ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে যেখানে বৈশ্বিক ইন্টারনেট অ্যাক্সেস আর স্বয়ংক্রিয় হবে না, বরং অনুমোদনের বিষয় হবে।
যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যালান উডওয়ার্ড বলেছেন, "ইরানে মনে হচ্ছে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত না হলে সবাইকে যেকোনো ইলেকট্রনিক অ্যাক্সেস থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি পদক্ষেপ চলছে।"
স্টারলিঙ্ক ও প্রতিরোধের নতুন উপায়
এলন মাস্কের স্বত্বাধীন স্টারলিঙ্কসহ স্যাটেলাইট ভিত্তিক ইন্টারনেট সেবাও বিক্ষোভকারীদের জন্য সংযোগের একটি বিকল্প উপায় হয়ে উঠেছে। সরকার কিছু স্টারলিঙ্ক ব্যবহারকারীকে জ্যাম করতে সক্ষম হলেও, বিবিসি নিশ্চিত করেছে যে কোম্পানিটি তার ফার্মওয়্যার আপডেট করার পর অন্যান্য টার্মিনাল এখনও সচল রয়েছে।
স্টারলিঙ্ক ইরানি ব্যবহারকারীদের জন্য সাবস্ক্রিপশন ফিও মওকুফ করে দিয়েছে।
অধ্যাপক উডওয়ার্ড ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। তিনি বলেন, "ইন্টারনেট অ্যাক্সেস শেষ পর্যন্ত সত্যিকার অর্থে সর্বজনীন হবে এটা প্রায় অনিবার্য, তবে নিপীড়ক শাসনব্যবস্থার জন্য এটি সবসময় বিড়াল-ইঁদুর খেলার মতো থাকবে।"
মানবাধিকার সংস্থা অ্যাক্সেস নাউ একটি প্রকাশ্য বিবৃতিতে বলেছে, ইন্টারনেট অ্যাক্সেসের সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার অপরিহার্য। "এই প্রয়োজনীয় সেবাগুলোতে প্রবেশাধিকার সীমিত করা শুধু জীবনকে বিপন্ন করে না বরং কর্তৃপক্ষকে মানবাধিকার লঙ্ঘন লুকিয়ে রাখতে এবং জবাবদিহিতা এড়াতে সাহসী করে তোলে।"
প্রচারেঃ ইমামি মিডিয়া