07/09/2026
ফুলছড়িতে মাত্র কয়েক মিনিটের নদী পথ পাড়ি দিতে ঘন্টার পর ঘন্টা বিড়ম্বনা
বিমল কুমার সরকার, ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) গাইবান্ধার ফুলছড়িতে ব্রহ্মপুত্র নদে মাত্র কয়েক মিনিটের নদী পাড়ি দিতে যদি ঘণ্টার পর ঘন্টা সময় লাগে—এর চেয়ে বিড়ম্বনা আর কী হতে পারে? আর এই নদী পথে প্রতিদিনি হাজার হাজার মানুষ অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে নৌকায় যাতায়াত করছেন গাইবান্ধার বালাসী টু বাহাদুরাবাদ নৌপথের দুই পাড়ের বাসিন্দারা।
এটি কোনো গল্প নয়, উত্তরাঞ্চল তথা গাইবান্ধাবাসীর প্রতিদিনের বাস্তব চিত্র। যখন উন্নয়নের মহাসোপানে দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন গাইবান্ধার নদীভাঙন, চরাঞ্চল ও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এই মানুষগুলো যেন উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে এখনো বিচ্ছিন্ন।
ব্রহ্মপুত্র আর যমুনা এখানে শুধু একটি নদী নয়; এটি যেন মানুষের স্বপ্ন আর সম্ভাবনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা গাইবান্ধা তথা উত্তরের উন্নয়নের এক বিশাল বাধা। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ মানুষ এই নদী পাড়ি দেওয়ার দুর্ভোগ সহ্য করে আসছে।
কখনো নৌকার জন্য অপেক্ষা, কখনো করে লঞ্চ অনেক সময় প্রতিকূল আবহাওয়া, কখনো হাজারো ডুবোচর—সব মিলিয়ে কয়েক মিনিটের দূরত্ব পরিণত হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টার বিড়ম্বনায়।
গাইবান্ধা তথা ফুলছড়ি বাসীর কাছে এই বিলম্ব মানে হাট বাজার স্কুল কলেজ মাদ্রাসা কোটকাচারী অফিস আদালত হাসপাতালে পৌঁছাতে দুর্ভোগ যেন নিত্য নতুন যন্ত্রণা । একজন শিক্ষার্থীর কাছে এর অর্থ ক্লাস বা পরীক্ষায় পৌঁছানোর অনিশ্চয়তা। একজন রোগীর কাছে প্রতিটি মিনিট হয়ে ওঠে অমূল্য। আর একজন দিনমজুরের কাছে কয়েক ঘণ্টার অতিরিক্ত যাত্রা মানে এক দিনের আয়-রোজগারের বড় অংশ হারিয়ে ফেলা।
ফুলছড়ির গজারিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ওয়াজেদ আলী মুন্সি বলেন, চরে বাস করি এখানে স্কুল কলেজ হাসপাতাল নেই যেতে হয় জেলা বা দুরের শহরে অনেক সময় ডেলিভারি রোগী হাসপাতালে পৌঁছার আগেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
বালাসীর সাত্তারকান্দির বাসিন্দা জসিজল হক বলেন,পোলাপান নৌকায় করে স্কুলে যেতে চায়না,বর্ষায় নৌকা চলে অধিকাংশ সময় হাঁটা পথে চলতে হয়।ভালো ঘরে বিয়ে সাদি হয়না আমাগোর মেয়ের।
সবচেয়ে কষ্ট তাদের, যাদের হাতে সামর্থ্য কম। নদীর ঘাটে অপেক্ষমাণ মানুষটির মুখে অভিযোগের অন্ত নেই, কিন্তু বুকের ভেতর জমে থাকে দীর্ঘশ্বাস—আর কতদিন? এভাবে বিড়ম্বনা শেষ হবে।
ফুলছড়ি উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম বলেন, এই নৌ পথে একটি সেতু বদলে দিতে পারে পুরো উত্তরাঞ্চলের চিত্র। এই দীর্ঘদিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের অন্যতম কার্যকর পথ হতে পারে এই নৌঘাট থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত একটি সেতু নির্মাণ।
এটি শুধু একটি সেতু হবে না; এটি হবে উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের যোগাযোগ, অর্থনীতি ও সম্ভাবনার সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপনের একটি ঐতিহাসিক দ্বার। বালাসি-বাহাদুরাবাদ সেতু নির্মিত হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ আরও সহজ ও দ্রুত হতে পারে। কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের চলাচল সহজ হবে, জরুরি রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে চরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা অনেকটাই দূর হতে পারে বলে সেতু বাস্তবায়নকারী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ মনে করেন। আজ যে পথ পাড়ি দিতে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, সেই পথ যদি একটি সেতুর মাধ্যমে দ্রুত ও নিরাপদ যোগাযোগের আওতায় আসে, তাহলে বদলে যেতে পারে লাখো মানুষের জীবনযাত্রা।
একটি সেতু কখনো শুধু ইট-পাথর, রড-সিমেন্টের কাঠামো নয়। একটি সেতু কখনো একটি জনপদের অর্থনীতি বদলে দেয়, মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দেয়, প্রজন্মের স্বপ্ন বদলে দেয়। উন্নয়নের সুফল পৌঁছাক প্রান্তিক মানুষের ঘরে উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার সুফল রাজধানী কিংবা বড় শহরের সীমানা পেরিয়ে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের মানুষের ঘরেও পৌঁছে যায়।
উত্তরাঞ্চলের মানুষ কর দেয়, ভোট দেয়, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে। অথচ মৌলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাদের কেন যুগের পর যুগ অপেক্ষা করতে হবে—এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে গাইবান্ধা বাসীর। বালাসি-বাহাদুরাবাদ সেতু নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা, সম্ভাবনা ও মানুষের প্রত্যাশাকে এখন বাস্তবতার মাটিতে নিয়ে আসার সময় এসেছে।
সম্ভাব্যতা, পরিবেশগত প্রভাব, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও প্রকৌশলগত বিষয়গুলো যাচাই করে একটি দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ উত্তরাঞ্চলের মানুষ আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়।
ব্রহ্মপুত্রের ঢেউ প্রতিদিন তীরে আছড়ে পড়ে আবার ফিরে যায়। কিন্তু এই জনপদের মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান আর অপেক্ষার শেষ কোথায়? তাদের চাওয়া খুব বেশি নয়—একটি নিরাপদ পথ, দ্রুত যোগাযোগ, উন্নত জীবন এবং সন্তানদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।
বালাসি ঘাট-বাহাদুরাবাদ ঘাট সেতু নির্মিত হলে সেই দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা ও যোগাযোগের দুর্ভোগ থেকে উত্তরাঞ্চলের মানুষ স্থায়ীভাবে মুক্তির একটি বড় সুযোগ পেতে পারে। চার মিনিটের পথ যেন আর চার ঘণ্টার যন্ত্রণায় পরিণত না হয়—এটাই গাইবান্ধা বাসীর স্বপ্ন।
আর সেই অধিকার বাস্তবায়নের পথে বালাসি-বাহাদুরাবাদ সেতু হতে পারে উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুক্তির সেতু বন্ধন।