25/11/2025
বৃষ্টির চোখে ভালোবাসা
✍️ লেখক: জান্নাতুন
📘 পেজ: Holdthepuzzle
#বৃষ্টিরচোখেভালোবাসা
#পর্বঃ৫
বৃষ্টি বাড়ির পথে হাঁটছিল।
রাস্তার বাতিগুলো কুয়াশার আলোয় ঝাপসা হয়ে আছে।
পায়ের নিচে ভেজা রাস্তায় তার প্রতিটা পদক্ষেপের শব্দ আজ যেন একটু অন্যরকম—
হালকা, নরম, প্রায় গান হয়ে ওঠা।
মনে মনে হাজারটা প্রশ্ন পাক খাচ্ছে,
“আজ আয়ান আমাকে সত্যিই তার ভিতরে ঢুকতে দিলো…
এটা কি সাধারণ বন্ধুত্ব?
নাকি…?”
বৃষ্টি এই প্রশ্নের উত্তর জানে না।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে যে লাজুক হাসি লেগে আছে—
সেটাই বলে দেয়, সে উত্তরটা অনুমান করতে পারছে।
---
বাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই মা বললেন,
“এত ভিজে ভিজে এলি? আবার সর্দি হবে।”
বৃষ্টি মুচকি হেসে বলল,
“না মা, আজ একটু বৃষ্টি ভালো লাগছিল।”
মা তাকালেন একবার।
মেয়ের মুখে এভাবে আলো জ্বলে থাকলে
মায়েরা খুব সহজেই বুঝে ফেলে—
কিছু একটা ঘটছে।
“মুখটা কেমন উজ্জ্বল।”
মা বললেন।
বৃষ্টি হেসে পাশ কাটিয়ে গেল,
“আরে না, কিছুই না।”
(কিন্তু তার হৃদয়ের ভেতর যেন পুরো একটা আতশবাজি জ্বলে আছে।)
ঘরে ঢুকে ব্যাগ রেখে আয়নায় তাকাতেই থমকে গেল।
তার চুল, তার চোখ, তার ঠোঁট—
সবকিছুতেই হালকা আভা।
মনে হলো—
সে যেন নিজেও বদলে যাচ্ছে।
এটা কি ভালোবাসার শুরু?
নাকি স্রেফ কোনো উষ্ণ অনুভূতি যা একটু বেশি ধারালো?
---
হঠাৎ ফোন vibrate করল।
Ayaan:
“বাড়ি পৌঁছালে জানিও।”
বৃষ্টি ফোন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েই রইল।
এত সাধারণ একটি মেসেজ—
তবু তার হৃদয়ে ঢেউ তুলল।
সে উত্তর দিল—
“পৌঁছেছি।”
মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় রিপ্লাই—
Ayaan:
“ভালো। আজকের জন্য… ধন্যবাদ।”
“আমি অনেক দিন পর এমন হালকা লাগছে।”
বৃষ্টির হৃদয়ে গরম একটা শিহরণ উঠল।
সে লিখল—
“আমারও ভালো লেগেছে।”
কিন্তু পাঠানোর আগে কিছুক্ষণ দ্বিধায় রইল।
শব্দগুলো যেন অনেক বেশি প্রকাশ করে ফেলবে।
তবুও সে পাঠিয়ে দিল।
---
কয়েক মুহূর্ত পরে আরেকটা মেসেজ এল—
Ayaan:
“তোমাকে একটা কথা বলি?”
বৃষ্টি—
“হ্যাঁ বলো।”
Ayaan:
“আমি ভয় পাই…
কারণ ভালো অনুভূতিগুলো আমার জীবনে বেশিদিন থাকে না।”
বৃষ্টি ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইল।
এই একটা বাক্য—
কত গভীর কষ্ট লুকিয়ে আছে তার মধ্যে।
সে ধীরে লিখল—
“সব অনুভূতি একরকম হয় না, আয়ান।”
“কিছু অনুভূতি আসে ঠিক মানুষকে খুঁজে—মানুষকে হারাতে নয়।”
একটা ডেলিভারড টিক দেখাল।
তারপর typing…
Ayaan:
“জানি না… কিন্তু আজ তুমি ছিলে বলে ভালো লেগেছে।”
বৃষ্টি চোখ বন্ধ করল।
এ যেন চুপচাপ স্বীকারোক্তি
ঘর অন্ধকার।
বৃষ্টি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।
রাতে হালকা আবার বৃষ্টি এসেছে।
রাস্তার বাতিতে জলকণা ঝিলমিল করছে।
হঠাৎ মনে পড়ল ছাদের প্রতিটা মুহূর্ত…
আয়ানের ভয়,
তার নরম কণ্ঠ,
তার চোখের ভাষা…
সব মিলিয়ে বৃষ্টি এমনভাবে অনুভব করছে—
যেন তার ভিতরে কিছু জন্ম নিচ্ছে
নরম, লাজুক
কিন্তু খুব শক্তিশালী।
সে নিজের বুকের উপর হাত রাখল।
ধপ-ধপ—
সে অনুভব করছে নিজের হৃদয়ের অনিয়মিত স্পন্দন।
এটা কি সে আগে কখনও এমন অনুভব করেছে?
না। এই অনুভূতি একেবারেই নতুন।
সকাল হলো।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বৃষ্টি বারান্দায় দাঁড়াল।
মেঘলা আকাশ।
হাওয়ায় ঠান্ডা সুবাস।
ফোন vibrate করল।
Ayaan:
“Good morning, rain-girl।”
বৃষ্টি হেসে ফেলল।
সে লিখল—
“তুমি তো কবিতা দিয়ে সকাল শুরু করলে।”
Ayaan:
“তুমি থাকলে কবিতা ভাবনাও জাগে।”
বৃষ্টির হৃদয় আজকে যেন আরও একটু নরম হল।
---
আজ কলেজে যাওয়ার সময় বৃষ্টি চারদিকেই তাকাচ্ছিল—
যেন কেউ তাকে দেখছে।
যেন কেউ তাকে অনুসরণ করছে।
অবচেতন মনে সে আয়ানের কথা ভাবছিল।
সে কি আজ আবার কোথাও দেখা দেবে?
বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকার সময়
হঠাৎ মনে হলো,
কেউ যেন কয়েক ধাপ দূর থেকে তাকিয়ে আছে।
বৃষ্টি চোখ ঘুরিয়ে দেখল—
একটা ছেলে মোবাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু সে আয়ান নয়।
তারপরও
বৃষ্টির বুকের ভেতর হালকা দুরুদুরু অনুভূতি তৈরি হলো।
---
ক্লাসে বসেও সে মনোযোগ দিতে পারছিল না।
রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
রিয়া বলল,
“তুই আজ অদ্ভুত লাগছে দেখছি। বলবি কিছু?”
বৃষ্টি বলল,
“না… কিছু না।”
কিন্তু মুখের ভেতরের হাসিটা এত স্পষ্ট
যে রিয়া একদম ধরে ফেলল।
“বৃষ্টির মুখে এমন লাজুক হাসি?
স্পষ্ট… কেউ আছে।”
রিয়া বলল।
বৃষ্টি চুপ।
তার চোখে তাকিয়ে রিয়া বলল,
“ও মাই গড!
তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কেউ তোকে প্রেমের গল্পে ফেলে দিয়েছে!”
বৃষ্টি মাথা নিচু করে বলল,
“কিছু না। শুধু… একজনের সাথে কথা হয়।”
“আয়ন?”
রিয়া জিজ্ঞেস করল।
বৃষ্টি চমকে তাকাল।
“তুই কিভাবে জানলি?”
রিয়া মুচকি হাসল।
“চোখ দিয়ে বলছিস।”
বৃষ্টি কিছু বলতে যাচ্ছিল—
ঠিক তখনই ফোন vibrate করল।
Ayaan:
“Lunch time এ কথা হবে?”
বৃষ্টি ফোনটা বুকে চেপে ধরল।
রিয়া বলল,
“হয়ে গেছে।
বৃষ্টি officially প্রেমে পড়ছে।”
বৃষ্টি তাড়াতাড়ি বলল,
“না রে! তেমন কিছু… না!”
(কিন্তু তার গলার কম্পন সব বলে দিল।)
---
লাঞ্চব্রেকে বৃষ্টি কলেজের গেটে এসে দাঁড়াল।
হাওয়া বইছে।
আকাশে হালকা রোদের সাথে মেঘের ছায়া।
ফোন বেজে উঠল।
Ayaan Calling…
বৃষ্টি ধীরে কল ধরল।
“হ্যালো…”
আয়ানের কণ্ঠ নরম।
“খাচ্ছো?”
“না… কথা ভেবেই খিদে লাগেনি।”
আয়ন হেসে ফেলল,
“আমার কথায় খিদে চলে যায় নাকি?”
“কেউ কেউ এমনই প্রভাব ফেলে,”
বৃষ্টি বলল মৃদু স্বরে।
এক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর—
“বৃষ্টি, আজ তোমাকে দেখার খুব ইচ্ছে করছে।”
বৃষ্টির হৃদয় থেমে গেল।
“এখন?”
“হ্যাঁ।
এখনই।”
“কিন্তু কলেজ—”
“গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকো।”
আয়ন হালকা গলায় বলল।
“আমি এসেছি।”
বৃষ্টি স্তব্ধ হয়ে গেল।
তার শ্বাস আটকে গেল।
সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল—
তার চোখ দুটো বড় হয়ে গেল যখন দেখল—
আয়ন ঠিক গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
হালকা হাসি,
নীল শার্ট,
হাওয়ায় উড়তে থাকা চুল…
এমন মনে হচ্ছিল—
যেন পুরো পৃথিবী থেমে আছে,
শুধু তাদের দেখা হওয়ার জন্য।
সকালটা অন্য দিনের মতো হলেও বৃষ্টির মনে আজ অদ্ভুত একটা কম্পন।
জানালার কাচে পানি জমে আছে, আকাশের রঙ হালকা ধূসর, বাতাসে শীতের ছোঁয়া।
কিন্তু বৃষ্টির ভেতরে আজ আরেক ধরনের হাওয়া বইছে—
অপেক্ষার, উৎকণ্ঠার, একটু উত্তেজনার… এবং একটু ভয়ও।
কারণ গতকাল আয়ান তাকে যে কথাটা বলেছিল—
“কাল তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।
ওই জায়গাটা আমার জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত জায়গা।”
বৃষ্টি ভাবতেই পারে না, আয়ানের মতো একজন মানুষের এত গভীর রহস্য থাকতে পারে।
তার মাথায় প্রশ্নই প্রশ্ন—
আয়ান কী দেখাতে চায়?
তার অতীত?
কোনো ব্যথা?
কোনো অসমাপ্ত গল্প?
নাকি… কারো স্মৃতি?
চুল বানাতে বানাতে বৃষ্টি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে চোখ রাখে।
এই চোখ দুটোতেই আজ অদ্ভুত উত্তেজনা।
তার ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি মেশানো হাসি।
— “আজ যদি সত্যিই কোনো গোপন দরজা খুলে যায়?”
এটা ভাবতে ভাবতেই তার বুক ধড়ফড় করতে থাকে।
---
ঘড়ির কাঁটা যখন আটটা বাজালো, তখন দরজায় হালকা শব্দ।
টুপ… টুপ…
বৃষ্টির বুক থেমে গেল।
সে দরজা খুলল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আয়ান।
হালকা কালো শার্ট, ডেনিম, চোখে অল্প ক্লান্তি…
কিন্তু সেই ছোট্ট, শান্ত, নিষ্পাপ হাসিটা—যেটা বৃষ্টি দিনের পর দিন মনে গেঁথে রেখেছে।
আয়ান বলল—
— “রেডি?”
বৃষ্টি নিশ্বাস আটকিয়ে বলল—
— “হুম… কিন্তু কোথায় যাচ্ছি?”
আয়ান আবার সেই অর্ধেক হাসিটা দিল—
— “এবার জানবে।”
বৃষ্টির হৃদয় এক লাফে গলায় উঠে আসে।
---
আয়ানের বাইকে বৃষ্টি বসে।
হাওয়া মুখে লাগে।
রাস্তায় গাড়ির শব্দ, হর্ন, মানুষের হাঁটাচলা—সব মিলিয়ে একটা শহুরে সিম্ফনি।
কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেও বৃষ্টি টের পায়—
আয়ান আজ একটু নীরব।
বৃষ্টির হাত আয়ানের কাঁধের কাছে।
ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে তার হাত কাঁপে।
আয়ান বলে—
— “ঠাণ্ডা লাগছে?”
— “না… মানে… একটু।”
আয়ান ধীরে ধীরে নিজের এক হাত পিছনে এনে বৃষ্টির হাতটা চেপে ধরল, যেন বলছে—
“আমি আছি।”
বৃষ্টি চোখ বন্ধ করল।
এই এক মুহূর্তে সে পৃথিবীর সব শব্দ হারিয়ে দিল।
---
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর শহরের ব্যস্ততা কমতে থাকে।
রাস্তা ফাঁকা।
দুই পাশে লম্বা গাছ, শুকনো পাতা উড়ে যাচ্ছে।
দূরে একটা পুরোনো লাল ইটের বাড়ি দেখা যায়।
বৃষ্টি জিজ্ঞেস করল—
— “এটা কোথায়?”
আয়ান শুধু বলল—
— “আমার পুরোনো বাড়ি।”
বৃষ্টির গলায় আটকে যায় শব্দ।
পুরোনো বাড়ি?
আয়ানের জীবনের এমন কিছু কি আছে, যা সে কারো সঙ্গে ভাগ করত না?
তারা বাইক থেকে নামল।
বাড়িটার সামনে একটা বড় আমগাছ, ডালগুলো নিচে নেমে এসেছে।
মাটিতে শুকনো পাতা, বাতাসে হালকা ধুলো।
বাড়িটা যেন নিজের গল্প বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে।
বৃষ্টি বলল—
— “তুমি এখানে… বড় হয়েছ?”
আয়ানের মুখে ছায়া নেমে এল।
— “হ্যাঁ… কিন্তু এখন কেউ থাকে না।”
বৃষ্টি বুঝতে পারে, কথাটা বলার সময় আয়ানের গলায় ভারী একটা সুর আছে।
---
আয়ান কোমলভাবে বলল—
— “ভিতরে আসবে?”
বৃষ্টি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল, যদিও তার বুকের ভেতর অকারণ ভয়।
আয়ান দরজায় তালা খুলল।
চাবির টিক… টিক… শব্দে মনে হয় যেন বাড়িটা জেগে উঠল।
দরজা খুলতেই একটা পুরোনো ধুলো-মেশানো ঘ্রাণ।
ভিতরে ম্লান আলো।
দেয়ালে পুরোনো রঙ খসে পড়েছে।
ফার্নিচারগুলো কাপড়ে ঢাকা।
বৃষ্টি ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বলল—
— “এটা তো… সিনেমার দৃশ্যের মতো।”
আয়ান হাসল না। শুধু বলল—
— “এখানে আমি, আমার মা… আর…”
সে থেমে যায়।
বৃষ্টি তাকে দেখছে।
তার চোখে এমন এক ব্যথা, যেটা শব্দ দিয়ে বর্ণনা করা যায় না।
---
হঠাৎ আয়ান একটি ছোট কাঠের দরজার সামনে দাঁড়াল।
বৃষ্টি লক্ষ্য করে দরজাটার সামনে একটা ভাঙা নামের প্লেট—
“রূপা”
বৃষ্টি ফিসফিস করে বলল—
— “রূপা কে?”
আয়ানের ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
— “আমার বোন…”
বৃষ্টি জমে গেল।
— “তোমার… বোন?”
— “হ্যাঁ। ছোট ছিল। আট বছর বয়সে মারা যায়। এখানে… এই ঘরেই।”
আয়ানের চোখে সেই মুহূর্তে এমন গভীর দুঃখ, যা দেখে বৃষ্টির বুক ব্যথা করে।
বৃষ্টি নিঃশব্দে আয়ানের পাশে দাঁড়াল।
আয়ান বলল—
— “চাইলে ভিতরে যেতে পারো। কিন্তু খুব ভারী… খুব।”
বৃষ্টি ধীরে দরজা ঠেলে দিল।
ঘরের ভিতর ছোট ছোট খেলনা, রঙিন পুতুল, একটা ছোট স্টাডি টেবিল, গোলাপি পর্দা—
সব যেন আট বছর আগের সময়েই আটকে আছে।
বৃষ্টি চোখে পানি ধরে রাখতে পারল না।
— “তুমি… এতদিন একা এই সব স্মৃতির সঙ্গে ছিলে?”
আয়ান তাকাল না।
শুধু মাথা নিচু করে বলল—
— “তাই তো… কাউকে কখনো ভিতরে ঢুকতে দিই না।”
বৃষ্টি ধীর কণ্ঠে বলল—
— “তাহলে আজ আমাকে দিলে কেন?”
আয়ান চোখ তুলে তাকাল।
তার দৃষ্টিতে উত্তর—
“কারণ তুমি আলাদা।”
---
তারা বাইরে এসে বসে।
বর্ষার হাওয়া বাড়ছে।
আয়ান ধীরে বলল—
— “বৃষ্টির রাতে রূপা মারা যায়। আমি তাকে বাঁচাতে কিছুই করতে পারিনি।”
বৃষ্টি শ্বাস নিল।
সে আয়ানের হাত ধরল।
— “তুমি তখন কত বছর?”
— “চৌদ্দ।”
— “চৌদ্দ বছর বয়সে কেউ কাউকে বাঁচাতে পারে না, আয়ান।”
— “কিন্তু আমি মনে করি, এটা আমার দোষ।”
আয়ানের চোখ লাল হয়ে ওঠে।
বৃষ্টি শক্ত করে তার হাত চেপে ধরে—
— “যে ব্যথা তুমি বহন করছ, সেটা তোমার বয়সের কারো নেওয়া উচিত ছিল না।
কিন্তু তুমি নিয়েছ। একা। কোনদিন কারো সঙ্গে ভাগ করোনি।”
আয়ান চোখ বন্ধ করে।
তার বুক থেকে যেন দীর্ঘদিন আটকে থাকা একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে।
---
বৃষ্টি হঠাৎ বলে—
— “চাও আমি তোমার গল্পটা বয়ে নিয়ে যাই?”
আয়ান চমকে তাকায়।
ধীরে ধীরে বলে—
— “মানে?”
— “তোমার এই ব্যথা, এই স্মৃতি, এই ভাঙা অংশ… সব।
যদি চাও, আমি এগুলো ভাগ করে নেব।”
আয়ান চোখ সরিয়ে নেয়।
— “তোমার কেন এত…”
বৃষ্টি তাকে থামিয়ে দেয়—
— “কারণ তুমি আমার কাছে এখন শুধু একজন মানুষ নও, আয়ান।
তুমি এমন একজন… যাকে আমি হারাতে চাই না।”
আয়ান দম নিয়ে বলে—
— “বৃষ্টি… তুমি জানো না, আমি কেমন মানুষ।”
— “জানি।”
— “তুমি জানো না, আমার অতীত—”
— “জানি।”
— “আমি অন্ধকারে ভরা।”
— “তোমার মধ্যে আলোও আছে।”
— “আমি ভুল করেছি।”
— “সবাই করে।”
— “আমি ভালো নই।”
বৃষ্টি তার দিকে নিবিড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—
— “তুমি মানব।”
আয়ান চুপ।
শব্দহীন।
তার চোখের ভেতরে ঢেউ উঠছে।
---
আয়ান মাথা নিচু করে বসে।
বৃষ্টি হালকা কাঁপতে থাকা তার হাত নিজের হাতে তোলে।
তারপর ধীরে ধীরে আয়ানের দিকে ঝুঁকে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।
এটা কোনো রোমান্টিক আলিঙ্গন নয়—
এটা এমন এক আলিঙ্গন, যেখানে বছরের পর বছর জমে থাকা ব্যথা, শূন্যতা, একাকীত্ব গলে যায়।
আয়ানের হাত প্রথমে নিস্তেজ।
তারপর ধীরে—খুব ধীরে—বৃষ্টির পিঠে উঠে আসে।
সে ফিসফিস করে—
— “বৃষ্টি… তুমি কেন আমার জীবনে এলে?”
বৃষ্টি মৃদু হাসে—
— “হয়তো তোমাকে মেরামত করতে।”
আয়ান—
— “আমি তো ভাঙা।”
বৃষ্টি—
— “ভাঙা জিনিসই সবচেয়ে সুন্দর হয়।”
ধীরে ধীরে আয়ানের শরীরের ভেতর জমে থাকা শীত, ভয়, চাপা কান্না বেরিয়ে আসে।
তার চোখের পানি বৃষ্টির কাঁধ ভিজিয়ে দেয়।
বৃষ্টি ওকে আরও জড়িয়ে ধরে।
---
আয়ান হঠাৎ বলল—
— “একটা জিনিস দেখাবে তোমাকে।”
সে ড্রয়ার খুলে একটি পুরোনো ডায়েরি বের করল।
মলাট ছেঁড়া।
পাতাগুলো হলুদ।
মেয়েদের হাতের লেখা।
বৃষ্টি জিজ্ঞেস করল—
— “কার?”
আয়ান ধীরে বলল—
— “রূপার।”
বৃষ্টি শ্বাস থামিয়ে ফেলে।
আয়ান ডায়েরি বৃষ্টির হাতে দিল।
— “আমি কোনোদিন কাউকে এটা দিইনি।”
বৃষ্টি আঙুল দিয়ে মলাট ছুঁয়ে বলল—
— “আমি রাখব… যত্ন করে।”
আয়ান বসে বসে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার চোখে অদ্ভুত শান্তি।
যে শান্তি সে অনেক বছর দেখেনি।
---
রাত নামে।
আকাশে মেঘ ঘন।
বৃষ্টিপাত শুরু হবে।
বাইক চালাতে চালাতে আয়ান বলল—
— “আজ তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে গভীর দরজা খুলে ফেললে।”
বৃষ্টি হেসে বলল—
— “আরো দরজা আছে?”
আয়ান—
— “হ্যাঁ… কিন্তু ওইগুলো অতটা অন্ধকার না।”
বৃষ্টি—
— “তাহলে সেগুলোও খুলে দেব।”
আয়ান হেসে ফেলল—
— “দেখি তোমার সামর্থ্য কত।”
বৃষ্টি মুচকি হাসল—
— “চ্যালেঞ্জ নিলাম।”
বৃষ্টির মন ভরে উঠছে।
সে অনুভব করছে…
আয়ান তাকে শুধু পছন্দই করছে না—
বিশ্বাস করছে।
ভরসা করছে।
আশ্রয় দিচ্ছে।
এটাই সম্পর্কের শুরু।
খুব সূক্ষ্ম।
কিন্তু খুব গভীর।
---
বৃষ্টিকে নামিয়ে দিয়ে আয়ান গম্ভীরভাবে বলল—
— “আজকের কথা কাউকে বলো না।”
বৃষ্টি মাথা নেড়ে—
— “আমি কারো জীবনের ব্যথা গল্প বানাই না।”
আয়ানের চোখে ক্ষীণ বিস্ময়।
সে ধীরে বলল—
— “ধন্যবাদ।”
বৃষ্টি বলল—
— “আমাকে ধন্যবাদ দেবে না।
আমাকে শুধু ভুলে যেও না।”
আয়ান থেমে যায়।
তার চোখে এক সেকেন্ডের জন্য এমন গভীর কোমলতা দেখা যায়—
যা বৃষ্টির হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়।
আয়ান বলল—
— “বৃষ্টি…
যে মানুষ একবার আমার জীবনে আসে, তাকে আমি কখনো ভুলে যাই না।”
বৃষ্টির শ্বাস আটকে যায়।
দরজা বন্ধ হওয়ার আগে আয়ান আরও কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু থেমে গেল।
দরজা বন্ধ হলো।
বৃষ্টি দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
তার ঠোঁট কাঁপছে।
— “আমি… বোধহয় ওর প্রেমে পড়ে যাচ্ছি।”
বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো।
---
---
বলবে?