19/08/2026
আমি যখন থেকে প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত শুরু করলাম, শুরুতে আমার মনে একটা নির্দিষ্ট আশা ছিল। মনে হতো—এই আমলটা করলে হয়তো আমার ইচ্ছাগুলো দ্রুত পূরণ হবে। হয়তো জীবনের যে সমস্যাগুলো নিয়ে আমি এতদিন দুশ্চিন্তা করছি, সেগুলো একে একে মিটে যাবে। আমি ভাবতাম—হয়তো খুব দ্রুত কোনো বড় পরিবর্তন ঘটবে।
কিন্তু কিছুদিন পর বুঝলাম, আল্লাহ আমার জীবনে যে পরিবর্তন আনলেন—তা আমার কল্পনার থেকেও ভিন্ন, অথচ অনেক গভীর।
আমি হঠাৎ করে সব ইচ্ছা পূরণ হতে দেখিনি। জীবনের সব সমস্যাও একদিনে শেষ হয়ে যায়নি।
বরং এর চেয়েও মূল্যবান কিছু ঘটতে শুরু করল।
ফজরের পর যখন আমি শান্ত সকালে বসে Surah Ya-Sin তিলাওয়াত করতাম, তখন মনে হতো দিনের শুরুটাই অন্যরকম হয়ে গেছে। যেন পুরো দিনটা আল্লাহর স্মরণ দিয়ে শুরু হচ্ছে।
ধীরে ধীরে একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম— আগের মতো আর অস্থির লাগছে না। যে বিষয়গুলো নিয়ে আগে খুব দুশ্চিন্তা করতাম, সেগুলো এখন ততটা ভারী মনে হয় না। মনে হয়—আল্লাহ আছেন, তিনি দেখছেন, তিনিই সহজ করে দেবেন। প্রতিটি সকাল এখন একটু বেশি শান্ত লাগে।
ফজরের নরম আলো, চারপাশের নিস্তব্ধতা, আর সেই সময় কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা—এগুলো যেন আমার হৃদয়ের ভেতর একটা অদৃশ্য প্রশান্তি তৈরি করতে শুরু করল।
একদিন হঠাৎ বুঝলাম—
আমি আর আগের মতো অস্থিরভাবে ইচ্ছা পূরণের অপেক্ষা করছি না। বরং আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শিখছি। তখনই আমি বুঝলাম—ইচ্ছা পূরণ সবসময় তাৎক্ষণিকভাবে ঘটে না। অনেক সময় আল্লাহ প্রথমে মানুষের হৃদয়কে বদলে দেন। তিনি মানুষের ভিতরে ধৈর্য দেন, ভরসা দেন, এবং এমন এক প্রশান্তি দেন—যা কোনো দুনিয়ার অর্জন দিয়েও পাওয়া যায় না।
আমাদের প্রিয় নবী
হযরত মুহাম্মদ (সা.) কুরআনের তিলাওয়াতকে মানুষের হৃদয়ের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশান্তির উৎস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আজ আমি বুঝি— বারাকাহ শুধু সম্পদে নয়, শুধু সাফল্যে নয়। অনেক সময় বারাকাহ আসে হৃদয়ের ভেতর—শান্তি হিসেবে, সন্তুষ্টি হিসেবে, আল্লাহর ওপর দৃঢ় নির্ভরতা হিসেবে।
তাই আজও প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর যখন আমি সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করি, তখন আর শুধু ইচ্ছা পূরণের জন্য পড়ি না। আমি পড়ি আমার হৃদয়ের প্রশান্তির জন্য।আমি পড়ি সেই বিশ্বাসের জন্য, যা আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়— যে পথেই যাই না কেন, আল্লাহ আমার সাথে আছেন।
কারণ ধীরে ধীরে আমি বুঝেছি— মানুষের সব ইচ্ছা পূরণ হয়ে গেলেও তার মন শান্ত হয় না। আর অনেক সময় মানুষের সব সমস্যার মাঝেও তার হৃদয় শান্ত থাকে—যদি সে আল্লাহর কাছে থাকে।
আমরা দুনিয়ার পেছনে এত দৌড়াই, যেন এখানেই আমাদের চিরকাল থাকতে হবে। কিন্তু কুরআনের প্রতিটি আয়াত যেন নীরবে মনে করিয়ে দেয়— এই জীবন আসলে খুবই ক্ষণস্থায়ী। একদিন সব ব্যস্ততা থেমে যাবে। সব স্বপ্ন, সব দৌড়, সব হিসাব শেষ হয়ে যাবে। সেদিন আমাদের সাথে থাকবে না সম্পদ, না সাফল্য, না মানুষের প্রশংসা।
সেদিন আমাদের সাথে থাকবে শুধু সেই কাজগুলো—যেগুলো আমরা আল্লাহর জন্য করেছি।
তাই যদি তুমি আগামীকাল ফজরের পর সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করো— শুধু কোনো ইচ্ছা পূরণের আশায় নয়।
পড়ো তোমার হৃদয়ের জন্য। পড়ো সেই প্রশান্তির জন্য, যেটা আমরা সবাই খুঁজে বেড়াই। আর তারপর ধীরে ধীরে দেখো— কীভাবে নিঃশব্দে আল্লাহ তোমার অস্থিরতাকে বদলে দেন এক গভীর শান্তিতে।