07/02/2026
আজ কবির জন্মদিন
গান-কবিতার সাথেই বেঁচে থাকতে চান শাহআলম সানি
প্রেম-বিরহে পোড়া এক কবির জীবনের গল্প
আজ ৭ ফেব্রুয়ারি। কবি ও গীতিকার শাহআলম সানির জন্মদিন। ১৯৮৫ সালের এই দিনে টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর উপজেলার এক মনোরম গ্রাম বড়চওনায় জন্মেছিলেন তিনি। সেখানেই বেড়ে ওঠা, গড়ে ওঠা, আর এক সময় শব্দের প্রেমে মগ্ন হয়ে ওঠা। সময়ের স্রোতে তিনি হয়ে উঠেছেন একাধারে কবি, গীতিকার, উপন্যাসিক এবং রাজনৈতিক চেতনায় সক্রিয় একজন মানুষ। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তিনি নিজেকে কবি হিসেবেই পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
শব্দে ডুব দেওয়া জীবনের শুরুটা ছিল বৃষ্টিমাখা
সাহিত্যে শাহআলম সানির পথচলার শুরুটা ২০০০ সালে। তখন তার বয়স মাত্র পনেরো। সে বছর দৈনিক রূপালী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম কবিতা ‘বর্ষা’। নামেই যেমন নেমেছিল বৃষ্টির ধারা, তেমনি শব্দেও তার লেখা যেন ছুঁয়ে দিয়েছিল পাঠকের মনের কোনো এক নরম কোণ। সেখান থেকেই শুরু; এরপর আর থেমে থাকেননি।
তার লেখালেখির মূল উপজীব্য—ভালোবাসা, বিরহ, প্রত্যাখ্যান, অবহেলা এবং বাস্তব জীবনের টানাপোড়েন। তার কবিতা ও গানে মেলে মানবিক বোধের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। সানি যেন ভালোবাসার একান্ত নিজস্ব কবি, যিনি প্রেমে পোড়েন, আবার সেই আগুনের আঁচে ভাষা সেঁকে নেন নিজের মতো করে।
ভালোবাসার কবি, বিরহের শব্দযোদ্ধা
প্রেমে পড়েই মানুষ যেমন বদলে যায়, তেমনি কোনো এক নারীভালোবাসা শাহআলম সানিকেও রূপ দিয়েছিল এক প্রেমিক কবিতে। বলা যায়, প্রেম তাকে করেছে সংবেদনশীল, আবার বিচ্ছেদ করেছে গভীর। সেই গভীরতাই ধরা পড়ে তার কবিতা আর গানের কথায়। যে কেউ তার লেখা পড়লেই বুঝতে পারবেন, কবি কী গভীর অনুভব নিয়ে শব্দের প্রতিটি রেখায় রক্ত-মাংস ঢেলেছেন।
শুধু রোমান্টিকতা নয়, সমাজের বঞ্চিত মানুষের কথা, চারপাশের অসাম্য, নিঃসঙ্গতা এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংকট—সবই উঠে এসেছে তার লেখায়। একটি সময়ের পর রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার সঙ্গে কবিতার মিশ্রণ ঘটিয়ে তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠ তৈরি করেছেন, যা সমকালীন বাংলা সাহিত্যে একটি আলাদা অবস্থান সৃষ্টি করেছে।
গানের জগতে সাহসী পদচারণা
শাহআলম সানি শুধুমাত্র কবিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। গানের জগতে তার পদচারণা শুরু হয় সময়ের স্রোতে স্বাভাবিকভাবেই। কারণ, কবিতার শব্দ থেকে সুরের দিকে পা বাড়ানোটা তার কাছে যেন এক অবধারিত যাত্রা। এই যাত্রায় তিনি পেয়েছেন সম্মান, ভালোবাসা ও পরিচিতি।
তার লেখা “বিষণ্ন দুপুর” শিরোনামের গানটি কণ্ঠে তোলেন দেশের জনপ্রিয় ও সম্মানিত কণ্ঠশিল্পী বেলাল খান। গানটি শ্রোতামহলে প্রশংসিত হয় এবং সোশ্যাল মিডিয়াতেও বেশ আলোচিত হয়। সেখান থেকেই আরও অনুপ্রেরণা পান তিনি।
তিনি বলেন, “গান আমার কবিতার এক্সটেনশন। আমি গানের কথাও কবিতার মতোই দেখি। শুধু কাঠামোটা একটু বদলে যায়।”
উল্লেখ্য, শাহআলম সানি বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন, যা তার গীতিকবিতা চর্চার একটি স্বীকৃতিমূলক অধ্যায়।
উপন্যাসের জগতে যাত্রা
২০০৬ সালের বাংলা একাডেমি বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘এক বুক জ্বালা’। নাম শুনলেই বোঝা যায়, এই উপন্যাসেও প্রবল আবেগের উত্তাপ রয়েছে। প্রেম আর জ্বালার সীমানায় দাঁড়িয়ে লেখা এই উপন্যাস পাঠকদের কাছে পেয়েছিল ইতিবাচক সাড়া।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার কাব্যগ্রন্থ ‘ভালোবাসার আত্মসমর্পণ’। এই গ্রন্থটিও প্রেমিক পাঠকের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে।
জন্মদিনের দিনে কিছু কথার ছায়া
জন্মদিনে দৈনিক জনবাণীকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় শাহআলম সানি বলেন,
“জীবন থেকে আরও একটি বছর চলে গেল। যত দিন বাঁচি, গান কবিতার সাথেই বেঁচে থাকতে চাই। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।”
এই কথায় যেন মিশে আছে তার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি, কবিতার প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সৃষ্টিশীলতা ধরে রাখার অঙ্গীকার।
শেষ কথা
শাহআলম সানি বাংলা সাহিত্যে এক নিরলস স্বরের নাম। শহুরে কোলাহলে হারিয়ে যেতে থাকা মানুষের ভেতরেও যে এখনও কিছু নিঃশব্দ প্রেমিক বেঁচে আছে, তিনি তাদেরই প্রতিনিধি। জন্মদিনে তার জন্য শুভকামনা থাকুক—যেন আরও অনেক দিন তিনি প্রেমের ভাষা, বিরহের সুর আর মানবতার ছায়া নিয়ে লিখে যেতে পারেন আমাদের সময়ের কবিতাগুলো।