Terra Soord Moa

Terra Soord Moa সৃজনশীল কল্পনা গল্পের সৌন্দর্য সৃষ্টি, The world is in the beautiful imagination.

 #গল্প: #ওমিরাং_একটি_বন্যফুল #পর্বঃ  ১০ #লেখনীতে :  হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে রাস্তার দিকে হাঁটছিল দিনা।হাতে তখনও হ...
17/07/2026

#গল্প: #ওমিরাং_একটি_বন্যফুল
#পর্বঃ ১০
#লেখনীতে :

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে রাস্তার দিকে হাঁটছিল দিনা।

হাতে তখনও হাসপাতালের ক্যানোলা লাগানো।

শরীর দুর্বল হওয়ায় হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছিল।

রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একটি রিকশায় উঠতেই সামনের দিক থেকে আসা আরেকটি রিকশার সঙ্গে হালকা ধাক্কা লাগে।

ভারসাম্য হারিয়ে দিনা নিচে পড়ে যায়।

ঠিক সেই মুহূর্তেই সামনে এসে তীব্র ব্রেক কষে থামে একটি কালো গাড়ি।

গাড়ির দরজা খুলে নিচে নামল ওরাং।

মাটিতে পড়ে থাকা দিনাকে দেখে বিরক্ত গলায় বলল—

ওরাং : বাহ! যেখানে যাই, সেখানেই আপনাকে পাই।

ব্যথা চেপে ধীরে ধীরে উঠে বসতে বসতে দিনা বলল—

দিনা : আমিও একই কথা বলতে পারি।

ওরাং একবার উল্টে যাওয়া রিকশার দিকে, একবার দিনার দিকে তাকাল।

ওরাং : রাস্তার মাঝখানে নাটক করার নতুন জায়গা পেয়েছেন নাকি?

দিনা ধুলো ঝেড়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ঠান্ডা স্বরে বলল—

দিনা : আপনার সঙ্গে দেখা হলেই মনে হয় ভদ্রতা শব্দটা আপনার অভিধানে নেই।

ওরাং ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলল—

ওরাং : বাংলাটা ভালোই শিখেছেন দেখছি। তবে ভদ্রতা সবাই পাওয়ার যোগ্য হয় না।

দিনা : ঠিক বলেছেন। সেটা অর্জন করতে হয়।

চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন চাপা হেসে উঠল।
ওরাংয়ের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল।
দিনা হাঁটতে গিয়েও হালকা টলে উঠল।
নিজেকে সামলে নেওয়ার সময়ই ওরাংয়ের চোখ গিয়ে থামল তার ডান হাতে।
হাতে হাসপাতালের ক্যানোলা।
সাদা টেপের নিচে এখনও রক্তের হালকা দাগ শুকিয়ে আছে।

ওরাংয়ের ভ্রু অজান্তেই কুঁচকে গেল।

ওরাং : হাসপাতালে ছিলেন?

দিনা একবার নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে নির্বিকার গলায় বলল—
দিনা : আপনার জানার প্রয়োজন আছে?

ওরাং : প্রশ্ন করেছি।

দিনা : আর উত্তর দেওয়া আমার দায়িত্ব না।

কয়েক মুহূর্ত দুজনেই নীরব।
ওরাং প্রথমবারের মতো খেয়াল করল—

মেয়েটার মুখ অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে।
চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।

মনে হচ্ছে, দাঁড়িয়ে থাকাটাও যেন তার জন্য কষ্টকর।
তবুও দিনা নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করল না।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সিএনজির দিকে এগিয়ে গেল।

দরজা খুলে ওঠার আগে একবার শুধু ফিরে তাকিয়ে বলল—

দিনা: আজ আর আপনার সঙ্গে তর্ক করার শক্তি নেই, মিস্টার ওরাংওটাং। অন্যদিন হিসাব হবে।

সিএনজিটা ধীরে ধীরে চোখের আড়ালে মিলিয়ে গেল।

ওরাং কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
অজান্তেই তার দৃষ্টি হাসপাতালের দিকে চলে গেল

তার চোখে বারবার ভেসে উঠছে দিনার হাতের ক্যানোলা আর ফ্যাকাশে মুখ।

ঠিক তখনই হাসপাতালের ভেতর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এল দিবা, দিন, পাখি উমাইর ও দাবির উমাইর।

চারদিকে তাকিয়েও দিনাকে কোথাও দেখতে পেল না।

পাখি উমাইর উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে ডাকলেন—

— দিনা...! দিনা...!

দিবা দ্রুত চারপাশে চোখ বুলিয়ে রাস্তার দিকে দৌড়ে গেল।

কিন্তু ততক্ষণে দিনা অনেক দূরে চলে গেছে।

প্রায় আধাঘণ্টা পর...

দাবির উমাইরের ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল— Home।

ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে আতেরা বানুর কণ্ঠ ভেসে এল—

— বাবা, তোমরা আর খুঁজো না।

দাবির উমাইর উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন—

— কেন? দিনা কি বাসায়?

— হ্যাঁ, এইমাত্র এসেছে।

দাবির উমাইর দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

— ঠিক আছে। আমরা আসছি।

ফোন কেটে তিনি সবার দিকে তাকিয়ে বললেন—

— দিনা বাসায় পৌঁছে গেছে।

কথাটা শুনে পাখি উমাইর দু'হাত তুলে বললেন—

— আলহামদুলিল্লাহ।

তবুও মেয়েকে নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত তার অস্থিরতা কাটল না।

এদিকে...

দিনা বাসায় ফিরে কারও সঙ্গে একটি কথাও বলল না।

সোজা নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

আতেরা বানু কয়েকবার দরজায় নক করে ডাকলেন।

— দিনা দাদু মনি... দরজা খোল।

কিন্তু ভেতর থেকে কোনো উত্তর এল না।

---

কিছুক্ষণ পর দাবির উমাইরের গাড়ি উমাইর কুঞ্জে ঢুকতেই চড়ুই পাখির কিচিরমিচির আবাসের সবাইও সেখানে চলে এল।

চড়ুই বেগম উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—

— দিনা কোথায়?

পাখি উমাইর অসহায় চোখে দিবার দিকে তাকালেন।

দিবা ধীরে বলল—

— আপু আমাদের আগেই বাসায় চলে এসেছে।

আয়না বিস্মিত হয়ে বলল—

— কী! কিন্তু দিন ভাইয়ের সঙ্গে তো ওনাকে দেখলামই না!

দাবির উমাইর গম্ভীর গলায় বললেন—

— কাউকে কিছু না বলেই হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে একাই চলে এসেছে।

হাম্মাদ চৌধুরী অবিশ্বাসের সুরে বললেন—

— তোমরা কেউ ছিলে না? আর ওর শরীরের ওই অবস্থায় একা চলে এল?

দিবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—

— আপুকে যদি কোনো সিদ্ধান্ত থেকে ফেরাতে হয়, সেটা খুব সহজ না। শরীর খারাপ ছিল, কিন্তু জেদটা তার শরীরের চেয়েও শক্ত ছিল।

---

এদিকে পাখি উমাইর দ্রুত দিনার রুমের সামনে এসে দরজায় নক করলেন।

— মা... দরজা খোল।

কোনো উত্তর নেই।

আবার ডাকলেন।

তবুও নীরবতা।

পাখি উমাইরের বুক ধড়ফড় করে উঠল।

তিনি প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বললেন—

— দিনা... মা, একটা কথা বল।

চিৎকার শুনে সবাই দোতলায় উঠে এল।

ইমাদ উদ্বিগ্ন হয়ে বলল—

— আপু মনে হয় আবার অজ্ঞান হয়ে গেছে। দরজা ভেঙে ফেলি?

কথাটা শুনে বিছানায় শুয়ে থাকা দিনার কপালে ভাঁজ পড়ল।

বাসায় ফিরে ক্লান্ত শরীরটা একটু বিশ্রাম দিতেই কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।

সে ধীরে ধীরে উঠে দরজার কাছে গিয়ে বলল—

— MOMMA, I'M OK! JUST TEN MINUTES. WAIT. I'M COMING.

দিনার কণ্ঠ শুনেই সবার বুকের ওপর থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল।

দাবির উমাইর বললেন—

— ঠিক আছে, মামণি। আমরা নিচে আছি। সময় নিয়ে এসো।

ধীরে ধীরে সবাই নিচে নেমে গেল।

---

এদিকে দরজায় হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল দিনা।

তারপর পুরো রুম তন্নতন্ন করে খুঁজতে শুরু করল।

ড্রয়ার...

আলমারি...

লকার...

টেবিল...

কোথাও নেই।

তার লন্ডনে ফেরার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পাসপোর্ট—কিছুই খুঁজে পেল না।

সবশেষে বিছানায় বসে পড়ল।

কয়েক মুহূর্ত স্থির থাকার পর হঠাৎ তার মনে হলো—

এগুলো কেউ সরিয়েছে।

আর সেই মানুষটা হয়—

মাম্মা... পাপা... কিংবা দাদুন।

দিনা দু'হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরল।

রাগে তার বুকটা জ্বলে উঠল।

কিন্তু সে জানে—

এখন রাগ দেখানোর সময় না।

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার লক খুলল।

তারপর নিচে ড্রইংরুমের দিকে হাঁটতে লাগল।

নোট/বিঃদ্রঃ

গল্পটি মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। কোথাও বানান, ভাষা বা ঘটনার ধারাবাহিকতায় কোনো ভুল বা অসংগতি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে মন্তব্যে জানাবেন। আপনাদের প্রতিটি গঠনমূলক মতামত ও পরামর্শ আমাকে আরও ভালোভাবে লিখতে এবং গল্পটিকে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করবে।

ভালো লাগলে গল্পটি শেয়ার করে অন্যদেরও পড়ার সুযোগ করে দিতে পারেন। আপনাদের ভালোবাসা, সমর্থন ও দোয়াই "ওমিরাং একটি বন্য ফুল"-এর এগিয়ে চলার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

ধন্যবাদ। 🤍🌼

তুমি এসেছিলে আমার জীবনের রঙিন চশমা হয়ে। তখন ছিল গভীর রাত। হঠাৎ ঘুম ভেঙে বুঝলাম—সবটাই ছিল এক দুঃস্বপ্ন। কিন্তু সেই দুঃস্ব...
16/07/2026

তুমি এসেছিলে আমার জীবনের রঙিন চশমা হয়ে। তখন ছিল গভীর রাত। হঠাৎ ঘুম ভেঙে বুঝলাম—সবটাই ছিল এক দুঃস্বপ্ন। কিন্তু সেই দুঃস্বপ্নের ভেতরেই আমি নিজেকে কলঙ্কিত করেছি।
আজ সৃষ্টিকর্তার কাছে শুধু একটাই প্রার্থনা—আমাকে এমন ধৈর্য দাও, যেন আর কোনো ভুল ঠিকানাকে রঙিন ভেবে হৃদয়ে জায়গা না দিই।

— আইলিন জানান

#রক্ত_কথা_বলে

একটা মেয়ের জীবনে তার বাবা অনেক দামি। কারণ তার বাবার পাতিলে ভাত না থাকলেও, বা বাবা নিজে না খেয়ে থাকলেও, মেয়েটাকে খোঁটা খে...
12/07/2026

একটা মেয়ের জীবনে তার বাবা অনেক দামি। কারণ তার বাবার পাতিলে ভাত না থাকলেও, বা বাবা নিজে না খেয়ে থাকলেও, মেয়েটাকে খোঁটা খেয়ে থাকতে হয় না। খোঁটা শুনতে হয় না। তখন মেয়ের এটা বলার অধিকার থাকে, "তোমার ঘরে জন্মেছি, তোমার দায়িত্ব।"

কিন্তু সেই কথাটা সে নিজের মায়ের পেটের ভাইকেও বলতে পারে না।

বাবার ছোঁয়া জীবনের শ্রেষ্ঠ, সে বাবা যেমনই হোক।

ভাই-বোনের সম্পর্ক মধুর হয়, কিন্তু সেটা কেমন? যেমন ফুটবলের মতো—একজন খেলোয়াড় সব সময় বলটাকে গোল করার জন্য লাথি মেরে সামনে নিয়ে যায়, আর বলটাও সেভাবেই ছুটে যায়।

আচ্ছা, মা-মেয়ের সম্পর্ক কেমন? মা ছেলের জন্য বেস্ট মা হলেও, মেয়ের শুধু মা হলেই হয় না; মাতৃত্বের যোগ্যতাও লাগে।

কিন্তু মায়ের পেটের আপন একজন সুসম্পর্কের বোন থাকা ভালো। সম্পর্ক খারাপ হলেও তারা একে অপরকে বুঝতে পারে।

আর স্বামীর ঘরে সুখী হওয়ার জন্য মেয়েদের ভাগ্য থাকা লাগে।

সন্তানের ঘরে সুখী হতে হলে মেয়েদের সঠিক আর্দশ শিক্ষক হওয়া লাগে।

একটা মেয়ে যখন তিন বেলা নিয়ম করে খাওয়ার খোঁটা শোনে, থাকার খোঁটা শোনে, বিছানায় থাকতে গেলে কাঁথাটা টেনে নেয়, বিছানা থেকে নামিয়ে দেয়, আবার সে সেই জায়গায় এমনভাবে পড়ে থাকে, যেন তার আর কোনো লজ্জা-সম্মানই নেই—একেবারে চোঁচার মতো। না চোরের মতো পড়ে থাকে—তখন তার কাছে পৃথিবীর সব কষ্ট সমান লাগে। সে ধর্ষিত নয়, কিন্তু সে সমাজের ময়লা। তার কাছে পৃথিবীটা এমন মনে হয়, পৃথিবীর সব বিষ যেন তার শরীরেই আছে।

তার ধৈর্য ধরার ক্ষমতার শেষ নেই। সে সেই জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু নতুন কোনো জাহান্নামে যেতে চায় না। কারণ পুরোনো জাহান্নাম তার অভ্যাস হয়ে গেছে। নতুন জাহান্নামকে যদি সে মানতে না পারে, আর আখিরাতের জান্নাতও হারিয়ে ফেলে? তাই তার ধৈর্য এমন হয়। পৃথিবীতে তার কোনো কিছুর প্রতি মায়া থাকে না। আর থাকলেও সেটা সে প্রকাশ করে না। কারণ সে নিজেই জাহান্নামে থাকে।

সবচেয়ে সুন্দর কথা এই যে, মেয়েদের বাবা থাকলে তাদের অভিযোগ শোনার একজন থাকে। মেয়েটা যদি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নষ্টও হয়, তবুও সে বলতে পারে, "আমি এই কারণে নষ্ট।" আর যদি বাবা না থাকে, তাহলে কষ্ট পেলে তার দীর্ঘশ্বাস আর বাম চোখের পানি ছাড়া, মনে মনে বাবার না থাকার অভিযোগ করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না।

আল্লাহকে কী বলা যায়? সবাই তো বলে, মেয়ে হওয়ার সুফল? নাকি সৌভাগ্য!


আমার লেখা এলোমেলো, কারণ আমার অনুভূতিগুলো কখনো সারিবদ্ধ হয়ে আসেনি।

07/07/2026

অতীত কি ফিরবে নাকি তাদের গল্প হবে নতুন সূচনা
#ওমিরাং_একটি_বন্যফুল

 #গল্প:  #ওমিরাং_একটি_বন্যফুল #পর্বঃ ৯.২ #লেখনীতে :  দিনাকে কোলে নিয়ে দ্রুত গাড়ির দিকে ছুটে গেল দিন।দিবা কোনো সময় নষ্ট ন...
06/07/2026

#গল্প: #ওমিরাং_একটি_বন্যফুল
#পর্বঃ ৯.২
#লেখনীতে :

দিনাকে কোলে নিয়ে দ্রুত গাড়ির দিকে ছুটে গেল দিন।

দিবা কোনো সময় নষ্ট না করে ড্রাইভিং সিটে বসল। পেছনের সিটে অচেতন দিনাকে কোলে আগলে বসলেন পাখি উমাইর। দিনও পাশে বসে বারবার দিনার মুখে ডাকতে লাগল—

— বোনু... চোখ খোল।

কিন্তু কোনো সাড়া নেই।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটা উমাইর কুঞ্জ ছেড়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল।

ঠিক তখনই গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় ইনাম।

এত তাড়াহুড়ো দেখে সে দারোয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল—

ইনাম : ভাই, কী হয়েছে? ওরা কাকে নিয়ে গেল?

দারোয়ান : দিনা মেম হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেছেন। ওমিরাং এইড মেডিকেলে নিয়ে গেছে।

ইনাম : ওহ... আচ্ছা।

ইনাম আর কিছু বলল না। তবে খবরটা বেশিক্ষণ চাপা রইল না।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই চড়ুই পাখির কিচিরমিচির আবাসে খবর পৌঁছে গেল।

মুহূর্তেই সকালের স্বাভাবিক পরিবেশ বিষণ্ন হয়ে উঠল।

ফাই : কাল রাতেও তো ঠিক ছিল!

এসফার চুপ করে রইল।

আর ওরাং...

সে কিছুই বলল না।

শুধু একবার সবার চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল।

তার নীরবতাই যেন সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিকর।

---

ওমিরাং এইড মেডিকেলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই দিনাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হলো।

ডাক্তাররা দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলেন।

চৌধুরী পরিবারের প্রায় সবাই খবর পেয়ে হাসপাতালে চলে এলেও কাউকেই কেবিনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলো না।

শুধু ডাক্তার হওয়ার কারণে দিবা ভেতরে থাকার অনুমতি পেল।

বাইরে করিডোরজুড়ে উৎকণ্ঠা।

পাখি উমাইর বারবার কেবিনের দরজার দিকে তাকাচ্ছেন।

প্রতি মিনিট যেন এক একটা ঘণ্টার সমান মনে হচ্ছে।

হাসপাতালে অতিরিক্ত ভিড় হয়ে যাওয়ায় দিন সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করল।

দিন : সবাই এখানে থাকলে কোনো লাভ হবে না। ডাক্তাররা কাজ করতে পারবে না। তোমরা বাসায় যাও। কিছু হলে আমি সঙ্গে সঙ্গে জানাব।

অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে শেষ পর্যন্ত দুই পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যকে বাসায় পাঠানো হলো।

তবুও পাখি উমাইর যেতে চাইছিলেন না।

মেয়েকে না দেখে যেন এক পা-ও নড়তে পারছিলেন না।

ঠিক তখনই জরুরি মিটিং ছেড়ে হাসপাতালে পৌঁছে গেলেন দাবির উমাইর।

তার মুখে স্পষ্ট উদ্বেগ।

কিছুক্ষণ পর দিবা কেবিন থেকে বেরিয়ে এল।

ক্লান্ত গলায় বলল—

দিবা : আপুর জ্ঞান ফেরার সম্ভাবনা আছে। তবে এখন সবাইকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে।

কথাটা শুনে সবার বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়টা সামান্য হলেও কমল।

---

দুপুর প্রায় বারোটা।

ধীরে ধীরে চোখ খুলল দিনা।

কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল নিজের অবস্থাটা বুঝতে।

সাদা ছাদ।

হাতে স্যালাইনের ক্যানোলা।

চারদিকে ওষুধের গন্ধ।

সে হাসপাতালে আছে।

পাশেই বসে ছিল দিবা।

দিনার চোখ খুলতেই সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

দিবা : আলহামদুলিল্লাহ। আপু, এখন কেমন লাগছে?

দিনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চারপাশে তাকাল।

দিনা : আমি এখানে কেন?

দিবা : তুমি ব্রেকফাস্ট টেবিলে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে। জ্বরও অনেক ছিল।

দিনা ধীরে ধীরে উঠে বসতে গেল।

দিবা তাড়াতাড়ি তাকে ধরে বলল—

দিবা : না আপু, এখন উঠবে না। শরীর খুব দুর্বল।

দিনা : আমি বাসায় যাব।

দিবা : এখনই?

দিনা : হ্যাঁ।

দিবা : অসম্ভব। ডাক্তার এখনো অবজারভেশনে রেখেছেন।

দিনা কোনো উত্তর দিল না।

তার দৃষ্টি জানালার বাইরে স্থির।

মনে হচ্ছে শরীরের চেয়ে মনটাই বেশি অস্থির।

কিছুক্ষণ পর ধীর কণ্ঠে বলল—

দিনা : আমার অনেক কাজ আছে।

দিবা : পৃথিবীর সব কাজ অপেক্ষা করতে পারবে। আগে তুমি সুস্থ হও।

দিনা : আমার এই কাজটা অপেক্ষা করবে না।

দিবা বুঝতে পারল—

দিনা শুধু অসুস্থ নয়।

সে ভেতরে ভেতরে অন্য কিছুর সঙ্গে যুদ্ধ করছে।

ঠিক তখনই কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন পাখি উমাইর।

মেয়ের জ্ঞান ফিরেছে দেখে তিনি ছুটে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

পাখি উমাইর : মা... কেমন আছিস?

দিনা মৃদু হাসার চেষ্টা করল।

দিনা : আমি ঠিক আছি, আম্মু।

পাখি উমাইর : ঠিক আছিস আবার! জানিস, কী ভয় পাইয়ে দিয়েছিস?

দিনা কিছু বলল না।

সে শুধু মায়ের হাতটা নিজের হাতে চেপে ধরল।

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বলল—

দিনা : আম্মু...

পাখি উমাইর : বল মা।

দিনা ঠোঁট নড়াল, কিন্তু আর কিছু বলতে পারল না।

ঠিক তখনই কেবিনে ঢুকলেন দাবির উমাইর।

তিনি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে ফিরছিলেন।

মেয়েকে জেগে থাকতে দেখে তার বুক থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল।

তিনি এগিয়ে এসে দিনার মাথায় হাত রাখলেন।

দাবির উমাইর : এখন কেমন লাগছে, মামণি?

দিনা : আমি ভালো আছি, আব্বু।

দাবির উমাইর : ভালো থাকলে মানুষ এভাবে অজ্ঞান হয়?

দিনা চুপ করে রইল।

দাবির উমাইর দিবার দিকে তাকালেন।

দাবির উমাইর : ডাক্তার কী বলেছে?

দিবা : আপাতত ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই। সারারাত বৃষ্টিতে ভেজা, উচ্চ জ্বর, ঠিকমতো না খাওয়া আর অতিরিক্ত মানসিক চাপ—সব মিলিয়েই এমন হয়েছে। তবে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

দাবির উমাইর : ঠিক আছে।

কিন্তু দিনা আবার বলল—

দিনা : আমি বাসায় যাব।

পাখি উমাইর : এখনই?

দিনা : হ্যাঁ।

দাবির উমাইর : এটা কোনো আবদার করার সময় না, মামণি।

দিনা : আমি ঠিক আছি।

দিবা : আপু, তুমি দাঁড়াতেই পারছ না।

দিনা : তবুও আমি বাসায় যাব।

তার কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল, যা দেখে কেউ আর কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর দিবা চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ আনতে বের হলো।

পাখি উমাইর ওয়াশরুমে গেলেন।

দাবির উমাইর চিকিৎসকের সঙ্গে রিপোর্ট নিয়ে কথা বলতে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন।

অল্প কয়েক মিনিটের জন্য কেবিনটা ফাঁকা হয়ে গেল।

দিনা ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল।

শরীর কাঁপছে।

তবুও সে থামল না।

হাতে লাগানো ক্যানোলার দিকে একবার তাকিয়ে ধীরে সেটি খুলে ফেলল।

ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল।

মনে মনে শুধু একটাই কথা বলল—

"আমাকে যেতেই হবে..."

তারপর কাউকে কিছু না জানিয়েই কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।

---

কয়েক মিনিট পর দাবির উমাইর কেবিনে ফিরে এসে থমকে দাঁড়ালেন।

বিছানাটা খালি।

ঠিক তখনই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলেন পাখি উমাইর।

দাবির উমাইর : পাখি... দিনা কোথায়?

পাখি উমাইর চারদিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে গেলেন।

পাখি উমাইর : এই তো... এখানেই ছিল!

এমন সময় দিবাও ফিরে এল।

খালি বেড দেখে তার বুক ধক করে উঠল।

দিবা : আপু কোথায়?

দাবির উমাইর গম্ভীর গলায় বললেন—

দাবির উমাইর : মনে হচ্ছে কাউকে কিছু না বলেই বেরিয়ে গেছে।

দিবা দ্রুত টেবিলের দিকে তাকাল।

ফোন নেই।

ব্যাগও নেই।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—

দিবা : আপু ইচ্ছে করেই চলে গেছে।

পাখি উমাইরের চোখ ভিজে উঠল।

পাখি উমাইর : মেয়েটা এমন করছে কেন?

দাবির উমাইর নিজেকে শান্ত রেখে বললেন—

দাবির উমাইর : সবাই আলাদা হয়ে খুঁজো। হাসপাতালের আশপাশেই থাকার কথা।

দিবা দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেল।

পাখি উমাইর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—

দিনা কী লুকাতে চাইছে?

আর সেই কথাটাই কি আজ সকালে সবাইকে বলতে চেয়েছিল?

নোট/বিঃদ্রঃ
বানান ভুল বা কোনো অসংগত অংশ চোখে পড়লে মন্তব্যে জানাবেন। আপনার পরামর্শ আমার জন্য খুব মূল্যবান। গল্পের প্রতিটি পর্বে আমি শিখছি—তাই সাপোর্ট আর গাইডলাইন চাই সবার কাছে। আশা রাখছি ভুল ত্রুটি হলে সাহায্য করবেন।

 #গল্প: #ওমিরাং_একটি_বন্যফুল #পর্বঃ  9.1 #লেখনীতে :  দিনা খেতে খেতে ভাবছিল, আজকাল তার শরীরটা খুব দুর্বল লাগে। যখন-তখন চো...
19/06/2026

#গল্প: #ওমিরাং_একটি_বন্যফুল
#পর্বঃ 9.1
#লেখনীতে :

দিনা খেতে খেতে ভাবছিল, আজকাল তার শরীরটা খুব দুর্বল লাগে। যখন-তখন চোখে ঘুম নেমে আসে। আগে এমন ছিল না।

কিন্তু শরীরের ক্লান্তির চেয়েও বেশি তাকে তাড়া করে ফিরছে গত রাতের ফোনকল।

"দিনা, তোমার লন্ডনে ফেরা দরকার।"

কথাগুলো বারবার কানে বাজছে।

হঠাৎ করেই মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে।

তবে এখনই কাউকে কিছু বলবে না।

সকাল হওয়ার অপেক্ষা।

---

প্রতিদিনের মতো সার্ভেন্ট এসে ডাকতেই ঘুম থেকে উঠল দিনা।

শরীরটা খুব একটা ভালো লাগছে না।

মাথা ভারী।

গা কেমন ঝিমঝিম করছে।

তবুও সে নিচে নেমে ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসে বসল।

টেবিলে বসেই বলল—

দিনা : আমি ভোররাতে খেয়েছি। আমাকে শুধু এক কাপ কফি দিলেই হবে।

তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল—

দিনা : আমার তোমাদের কিছু বলার আছে।

কথাটা শুনে সবাই তার দিকে তাকাল।

দিবা ভ্রু কুঁচকে বলল—

দিবা : আপু, তোমার চোখ-মুখ এমন দেখাচ্ছে কেন?

দিনও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল।

সে হাত বাড়িয়ে দিনার কপালে হাত রাখতেই চমকে উঠল।

দিন : সে কী! বোনু, তোর তো গা পুরো জ্বরে পুড়ছে!

পাখি উমাইরও সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের দিকে তাকালেন।

দিনা কিছু বলতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই কফির কাপে চুমুক দিল সে।

কিন্তু পরমুহূর্তেই মুখ বিকৃত হয়ে গেল।

দিনা : এই কফির স্বাদ এমন কেন?

কথাটা বলেই দ্রুত উঠে দাঁড়াল।

মনে হলো বমি চলে আসবে।

কিন্তু দুই পা এগোতেই চারপাশ ঝাপসা হয়ে গেল।

চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো।

পরের মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে।

— আপু!

— দিনা!

চারদিক থেকে চিৎকার ভেসে এলো।

দিন দ্রুত তাকে ধরে ফেলল।

তারপর কোলে তুলে ড্রয়িংরুমের সোফায় শুইয়ে দিল।

দিবা তৎক্ষণাৎ দিনার নাড়ি, প্রেসার আর শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করল।

কয়েক মুহূর্ত পর তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

দিবা : আপুর অবস্থা ভালো না। এখনই হাসপাতালে নিতে হবে।

পাখি উমাইর প্রায় কেঁদে ফেললেন।

পাখি উমাইর : আমার মেয়ের কী হয়েছে? দিবা, কিছু বল!

দিবা শান্ত থাকার চেষ্টা করল।

দিবা : আগে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। দেরি করা ঠিক হবে না।

এই অল্প সময়ের মধ্যেই পাখি উমাইর ভেঙে পড়েছেন।

তিশা উমাইর তাকে সামলানোর চেষ্টা করছে।

তিশা : আপু, তুমি শান্ত হও। কিছু হবে না ইনশাআল্লাহ।

আতেরা বানু হতবাক হয়ে বসে আছেন।

মুখে কোনো কথা নেই।

অন্যদিকে দাবির উমাইর আর দিদার উমাইর কেউই বাসায় নেই।

দাবির উমাইর ভোরেই একটি জরুরি বিজনেস মিটিংয়ের জন্য বেরিয়ে গেছেন।

আর দিদার উমাইর দেশের বাইরে।

এমন অবস্থায় পুরো বাড়িজুড়ে উদ্বেগ আর অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ল।

আর কেউ খেয়াল করল না—

দিনা আজ সকালে সবাইকে কিছু বলতে চেয়েছিল।

খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু।

কিন্তু কথাটা আর বলা হলো না।

নোট/বিঃদ্রঃ
বানান ভুল বা কোনো অসংগত অংশ চোখে পড়লে মন্তব্যে জানাবেন। আপনার পরামর্শ আমার জন্য খুব মূল্যবান। গল্পের প্রতিটি পর্বে আমি শিখছি—তাই সাপোর্ট আর গাইডলাইন চাই সবার কাছে। আশা রাখছি ভুল ত্রুটি হলে সাহায্য করবেন।

 #গল্প: #ওমিরাং_একটি_বন্যফুল #পর্বঃ  ৮ #লেখনীতে :  শেষ রাতের প্রহর।আজকাল ওরাং আর ফাইয়ের বেশিরভাগ সময়ই কাটে ছাদে। মাঝে মা...
17/06/2026

#গল্প: #ওমিরাং_একটি_বন্যফুল
#পর্বঃ ৮
#লেখনীতে :

শেষ রাতের প্রহর।

আজকাল ওরাং আর ফাইয়ের বেশিরভাগ সময়ই কাটে ছাদে। মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গ দিতে আসে এসফারও।

কিন্তু আজ সবাইকে অবাক করে দিয়ে তাদের আড্ডায় যোগ দিল হামিম চৌধুরীর বড় ছেলে ইনাম।

ফাই ভ্রু কুঁচকে বলল—

— বড়দের মাঝে তোর কী কাজ?

ইনাম সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল—

— কেন? আমি কি এখনো ফিডার খাই নাকি? তোমরা দেখো না, আব্বুরা চার ভাই একসঙ্গে বসে কত আড্ডা দেয়! তখন তো কেউ বড়-ছোট খোঁজে না।

এসফার ওদের থামিয়ে দিয়ে বলল—

— তোর সকালে কলেজ নেই? যা, ঘুমা।

ইনাম নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—

— তোমরা কি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছ?

— শুনে রাখো, আমিও এখন তোমাদের মতো বড় হয়ে গেছি।

ফাই হেসে বলল—

— কিভাবে?

ইনাম বুক ফুলিয়ে বলল—

— আমিও কাউকে ভালোবাসি। আর তোমাদের তিনজনের মনের খবরও জানি।

এসফার চোখ বড় করে বলল—

— তুই প্রেম করিস?

ইনাম পাল্টা বলল—

— তোমরা করো না?

ফাই সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—

— কী বেয়াদব! মুখে মুখে কথা বলে!

এসফার হাসতে হাসতে বলল—

— আচ্ছা বাদ দে। আগে বল, কার সঙ্গে প্রেম চলে আপনার?

ইনাম মাথা নেড়ে বলল—

— প্রেম না, ক্রাশ।

— ও আচ্ছা। নাম কী?

ইনাম মুখ খুলল—

— দিনা উ...

কথা শেষ করার আগেই ফাই বলে উঠল—

— বেয়াদব! ও আমারও বড়। নাম ধরে বলবি না, আপু ডাকবি!

এসফারও প্রায় লাফিয়ে উঠল—

— তুই কী বললি, তুই জানিস?

— না জানার কী আছে?

ফাই এবার সন্দেহের চোখে তাকাল—

— কখন দেখেছিস ওকে?

ইনাম গম্ভীর মুখে বলল—

— দেখিনি।

— তাহলে?

— গান শুনেছি। ভায়োলিন বাজানো শুনেছি। দোতারা বাজানো শুনেছি।

এসফার বলল—

— আর?

ইনাম মাথা চুলকে বলল—

— আয়না বোনু বলেছে, উনি নাকি পরির মতো সুন্দর।

এসফার কপালে হাত দিয়ে বলল—

— তোর সাহস কম না! ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বোনের ওপর ক্রাশের কথা বলছিস!

ইনাম অবাক হয়ে বলল—

— দূর! আমিও তো তোমার মতো ওর ভাই!

ফাই মাথা নেড়ে বলল—

— বেয়াদব! ও তোর কত বড়, সেটা জানিস?

— হ্যাঁ তো। আয়না বোনু বলেছে বাইশ-তেইশ হবে।

একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল এসফার আর ফাই—

— কীইইই?

— বাইশ-তেইশ?

এসফার মাথায় হাত দিয়ে বলল—

— বেয়াদব! দিনাকে ঠিক বয়সে বিয়ে দিলে তোর বয়সী ছেলে-মেয়ে থাকত! ওর বয়স সাতাশ।

ইনাম নির্বিকারভাবে বলল—

— দূর! ভালোবাসা বয়স মানে না।

ফাই হেসে বলল—

— আমার জানা মতে, ঐ মেয়েরে তুই ভালোবাসি বললে ঝাঁটা, জুতা—সব তোর কপালে উঠবে।

এসফার বলল—

— দাদান জানে এসব?

ইনাম সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল—

— না। আগে দিনারে পটাই, তারপর দাদানকে বিয়ে করে সারপ্রাইজ দিব।

এতক্ষণ চুপচাপ থাকা ওরাং এবার বলল—

— আমি যাচ্ছি দাদানকে বলতে।

ইনাম প্রায় লাফিয়ে উঠল।

— কী বলবে?

— বলব, দাদান! তোমার সুপ্রিয় নাতি তোমার বুড়ি, সেকা-খাওয়া নাতনির প্রেমে পড়েছে। এখন তাকে বিয়ে করার প্ল্যান করছে।

— আরে ভাই! আই অ্যাম কিডিং!

এসফার বলল—

— না, চল দাদানকে বলি। তারপর তোর বিয়ের ব্যবস্থা করি।

ফাই হেসে বলল—

— বেশি কিছু না। দাদান তোরে এমন জায়গায় পাঠাবে, যেখানে দাঁড়িয়ে ওমিরাং কিংবা উমাইরদের বাড়িও দেখতে পাবি না।

— ওরাং ভাই! বোঝাও না। আমি মজা করেছি।

ওরাং মাথা নাড়িয়ে বলল—

— এমন ফান আর করবি না।

ইনাম এবার বিরক্ত হয়ে বলল—

— আরে, এত রেগে যাচ্ছো কেন? আমি মজা করেছি। তাছাড়া আমি নেহাকে ভালোবাসি। দিনা আপুকে তো আমি দেখিইনি।

ফাই ভ্রু তুলে বলল—

— নেহা? অরিন নেহা শাহ? তোর মামাতো বোন?

ইনাম মুখ বাঁকিয়ে বলল—

— বালের বোন! বউ লাগে!

এসফার হেসে কুটিকুটি।

— বেয়াদব ছেলে! আমরা এখনো বিয়ে করতে পারলাম না, আর তোর বউও ঠিক হয়ে গেছে!

ফাই মাথা নেড়ে বলল—

— পুরো বাল-পাকনা ছেলে।

ওরাং দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—

— ছিঃ! ব্যবহারের কী শ্রী!

চারজনের হাসির শব্দ রাতের নীরবতা ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল।

---

সেদিন রাতেই...

বৃষ্টির শব্দের মাঝে তন্দ্রা নেমে এসেছিল দিনার চোখে।

আর স্বপ্নের ভেতর সে আবার ফিরে গেল সেই মানুষটার কাছে—

জাসব বলছে—

— ভালোবাসি বলেই মূল্য নেই। একদিন আমার এই ভালোবাসা খুঁজবে ঠিকই, কিন্তু পাবে না।

দিনা ভ্রু কুঁচকে বলল—

— কেন? ভালোবাসা ফুরিয়ে যাবে নাকি?

জাসব মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

— ভালোবাসা ফুরিয়ে গেছে বলে আমাকে হারাবে না। হারাবে তোমার অবহেলার কারণে। তখন আমাকে ফিরে পেতে চাইবে, কিন্তু পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

— তোমার অবহেলা প্রতিদিন আমাকে তিলে তিলে মেরে ফেলছে।

দিনা বিস্মিত হয়ে বলল—

— আমি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছি?

— হ্যাঁ।

— কীভাবে?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল—

— আচ্ছা বাদ দাও। কী করলে তোমার কষ্ট কমবে?

জাসব তার দিকে তাকিয়ে বলল—

— আমি যা চাই, তা দেবে?

— হুম।

— পারবে না।

— কেন?

— কারণ তুমি তোমার ক্যারিয়ারকে অনেক বেশি ভালোবাসো। তোমার বিশ্বাস, আমাদের বিয়ে করার জন্য অনেক সময় পড়ে আছে।

একটু থেমে আবার বলল—

— কিন্তু তুমি এটা ভাবো না, মানুষের জীবন তার নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী না, ভাগ্য অনুযায়ী চলে।

দিনা বলল—

— বিয়েটা ভাগ্যে থাকলে হবে।

জাসব মৃদু হাসল।

— হ্যাঁ, এখন আমাদের বিয়েটাও ভাগ্যনির্ভর। আমাদের জীবনও।

তারপর হঠাৎ বলল—

— আচ্ছা, আমি যদি মরে যাই?

দিনা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

— আমার আর তোমার পথচলা এখনো বাকি। আমি জানি, আমার বিধাতা এতটা নিষ্ঠুর হবে না।

জাসব গভীর চোখে তাকিয়ে বলল—

— দেখো, সময় আছে বলতে বলতে যেন সময় পুড়ে না যায়। পরে কাঁদতে হবে।

দিনা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—

— তুমি সব সময় ফালতু কথা বল। বিয়ে কি সব?

জাসব ধীরে বলল—

— বিয়ে সব না। তোমার মনে হতে পারে আমি শুধু তোমাকে পাওয়ার জন্য বিয়ের কথা বলি। কিন্তু ব্যাপারটা তা না।

— আমি তোমাকে বুঝি।

— না, বুঝো না।

তার কণ্ঠ হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

— আমি চাই আমাদের এমন একটা স্মৃতি হোক, যা নিয়ে একজন মরে যাওয়ার পরও অন্যজন বেঁচে থাকতে পারে...

---

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল দিনার।

বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি।

সে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

তারপর দরজা খুলে ছাদের দিকে হাঁটতে লাগল...

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল দিনার।

বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি।

এসি চললেও তার শরীর ঘামে ভিজে গেছে। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ভারী লাগছে।

কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইল সে।

স্বপ্নের কথাগুলো এখনও কানে বাজছে।

"আমি চাই আমাদের এমন একটা স্মৃতি হোক, যা নিয়ে একজন মরে যাওয়ার পরও অন্যজন বেঁচে থাকতে পারে..."

দিনা চোখ বন্ধ করল।

না।

আর ভাবতে চায় না।

তবুও কিছু স্মৃতি আছে, যেগুলো মানুষ না চাইলেও ফিরে আসে।

ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে।

জানালার কাছে গিয়ে দেখল বাইরে অঝোরে বৃষ্টি নামছে। বৃষ্টির ফোঁটায় কাঁচ ঝাপসা হয়ে আছে।

হঠাৎ কী মনে হতে রুম থেকে বেরিয়ে ছাদের দিকে হাঁটল দিনা।

উমাইর কুঞ্জের ছাদে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই বৃষ্টির পানিতে ভিজে গেল তার চুল, পোশাক, শরীর।

কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।

সে শুধু বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে রইল।

মিনিট কয়েকের মধ্যেই পুরোপুরি ভিজে একাকার হয়ে গেল।

অন্যদিকে—

চড়ুই পাখির কিচিরমিচির আবাসের ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল ওরাং।

বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই সে ছাদে এসেছিল।

তারপর থেকে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।

বৃষ্টি, বাতাস, ঠান্ডা—কিছুই যেন তাকে স্পর্শ করছে না।

হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে থামল উমাইর কুঞ্জের ছাদের দিকে।

রাতের অন্ধকার আর বৃষ্টির পর্দার কারণে স্পষ্ট কিছু দেখা যাচ্ছে না।

তবুও সে বুঝতে পারল—

ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা দিনা।

এই এক বছরে সে দিনার প্রতিটি অভ্যাস মুখস্থ করে ফেলেছে।

দিনা ধীরে ধীরে ছাদের মাঝখানে এগিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর মেঝেতে বসে পড়ল।

আরও কিছুক্ষণ পরে শুয়ে পড়ল ছাদের ভেজা মেঝেতে।

দুই হাত মাথার নিচে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।

আকাশ দেখা যাচ্ছে না।

শুধু ঝরে পড়া বৃষ্টি।

হঠাৎ তার কণ্ঠ ভেসে এলো—

"তোমায় রেখেছি প্রিয় প্রহরে হৃদয়ের দক্ষিণ জানালায়...

মন গহীনের কালো কুয়াশায়...

অদৃশ্য অদূরে মায়ার পাহাড়ে...

তুমি আমার ভালোবাসার এক কালো রং...

রংহীন ঘুড়ির ছেঁড়া সুতা..."

বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে গেল তার কণ্ঠ।

ওরাং স্থির হয়ে শুনতে লাগল।

আজও।

প্রতিদিনের মতো।

তার মনে হলো, এই মেয়েটা হয়তো কখনো জানবেও না—

তার গাওয়া প্রতিটি গান আরেকজন মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়।

ভালোবাসা সত্যিই অদ্ভুত।

যাকে ভালোবাসা হয়, সে জানেও না।

আর যে ভালোবাসে, সে বলতেও পারে না।

বৃষ্টির শব্দ ধীরে ধীরে আরও ঘন হয়ে উঠল।

গান থেমে গেল।

দিনাও আর কিছু বলল না।

বৃষ্টির শীতলতা আর দীর্ঘ ক্লান্তির কাছে হার মেনে কখন যে তন্দ্রা নেমে এলো, সে নিজেও বুঝতে পারল না।

ওপাশ থেকে ওরাং শুধু তাকিয়ে রইল।

কোনো শব্দ নেই।

কোনো দাবি নেই।

কোনো অভিযোগও নেই।

শুধু নীরব অপেক্ষা।

যেন এই নীরবতাই তার নিয়তি।
..

হঠাৎ ভোরের আজান ভেসে এলো চারদিক থেকে।

ঘুম ভাঙল দিনার।

সে ধীরে ধীরে উঠে বসল।

বৃষ্টি তখন থেমে গেছে।

ছাদের মেঝেতে জমে থাকা পানির ওপর ভোরের ম্লান আলো পড়েছে।

দিনা উঠে বসে কিছুক্ষণ নীরবে সামনে তাকিয়ে রইল।

তার পিঠ তখন চড়ুই পাখির কিচিরমিচির আবাসের দিকেই।

ওরাংও যেন তখন হুঁশে ফিরল।

সারারাত কেটে গেছে।

সে ধীরে ধীরে ছাদ থেকে নেমে গেল।

নিজের রুমে ফিরে শাওয়ার নিল।

তারপর ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

অন্যদিকে দিনাও নিজের রুমে ফিরে এলো।

গরম পানিতে শাওয়ার নেওয়ার পর হঠাৎ তার ভীষণ ক্ষুধা লাগল।

দিনা রান্নায় খুব একটা দক্ষ নয়।

তবে প্রয়োজনীয় কিছু রান্না করতে পারে।

সে সরাসরি কিচেনে চলে গেল।

প্রথমে একটি ডিম সিদ্ধ বসাল।

তারপর পেঁয়াজ, গাজর, শসা আর কাঁচামরিচ কুঁচি করে নিল।

একটি পাতিলে পানি দিয়ে তাতে পেঁয়াজ, মরিচ, সামান্য লবণ আর নুডলস দিয়ে দিল।

নুডলস রান্না হয়ে গেলে একটি বড় বাটিতে ঢেলে নিল।

তারপর তার মধ্যে কুঁচি করা সিদ্ধ ডিম, শসা, গাজর, পুদিনাপাতা, লেবুর রস আর নুডলসের মসলা মিশিয়ে নিল।

নিজের তৈরি খাবারের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসল।

অনেকদিন পর নিজের জন্য কিছু বানিয়েছে সে।

বাটিটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে নিজের রুমের দিকে হাঁটল দিনা।

কিন্তু তার মাথার ভেতর তখনও ঘুরছে গর্ত পরশু রাতের সেই ফোনকল—

"দিনা, তোমার লন্ডনে ফেরা দরকার..."

আর সেই কথাটাই যেন তার শান্ত হতে না দেওয়া নতুন অস্থিরতার শুরু।

নোট/বিঃদ্রঃ
বানান ভুল বা কোনো অসংগত অংশ চোখে পড়লে মন্তব্যে জানাবেন। আপনার পরামর্শ আমার জন্য খুব মূল্যবান। গল্পের প্রতিটি পর্বে আমি শিখছি—তাই সাপোর্ট আর গাইডলাইন চাই সবার কাছে। আশা রাখছি ভুল ত্রুটি হলে সাহায্য করবেন।

 #গল্প: #ওমিরাং_একটি_বন্যফুল #পর্বঃ  ৭ #লেখনীতে :  কপি🚫রাতটা প্রায় নির্ঘুম কেটেছে দিনার।চোখ লেগেছিল মাত্র কিছুক্ষণের জন্...
13/06/2026

#গল্প: #ওমিরাং_একটি_বন্যফুল
#পর্বঃ ৭
#লেখনীতে :

কপি🚫

রাতটা প্রায় নির্ঘুম কেটেছে দিনার।

চোখ লেগেছিল মাত্র কিছুক্ষণের জন্য। ফজরের আজানের সুর কানে আসতেই তার ঘুম ভেঙে যায়।

আগে ধর্মের প্রতি বিশ্বাস থাকলেও নিয়মিত আমল করা হতো না তার। কিন্তু গত এক বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। এখন সে প্রায়ই নামাজ পড়ে, বিশেষ করে ফজরের নামাজ কখনোই ছাড়ে না।

নামাজ শেষ করে নিজের রুমে ফিরে এল দিনা। সামনে হাসপাতালের একটি নতুন কেসের ফাইল খুলে বসলো। রিপোর্টের পাতায় চোখ রাখলেও মনটা সেখানে নেই।

বারবার মাথার ভেতর গত রাতের কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।

— "তাকে তোমার কাছ থেকে আলাদা করেছে তার বাবা নয়... অন্য কেউ।"

জাসবের মায়ের কণ্ঠ যেন এখনও কানে বাজছে।

সত্যিই কি এতদিন সে ভুল মানুষকে দোষ দিয়ে এসেছে?

আর যদি তাই হয়, তবে সেই "অন্য কেউ" কে?

সত্যটা জানার জন্যই কি তাকে লন্ডনে ফিরতে হবে?

অস্থির হয়ে উঠল দিনা।

এতসব ভাবনার মাঝে কখন সকাল সাড়ে সাতটা বেজে গেছে, সে টেরই পায়নি।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ে।

বাড়ির এক স্টাফ ভেতরে এসে বলল—

— মেম, সকালের নাস্তা প্রস্তুত।

— আচ্ছা, আসছি।

ফাইলটা বন্ধ করে ধীরে নিচে নেমে এল সে।

ডাইনিং টেবিলে সবাই প্রায় উপস্থিত।

দিনাও নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে বসল। কিন্তু আজ তার খাওয়ার দিকে কোনো মনোযোগ নেই। প্লেটে খাবার আছে ঠিকই, অথচ সে যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।

আতেরা বানু কিছুক্ষণ নাতনির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ডাকলেন—

— দিনা।

কোনো সাড়া নেই।

— দিনা।

তবুও কোনো উত্তর না পেয়ে তিনি আলতো করে নাতনির কাঁধে হাত রাখলেন।

চমকে উঠল দিনা।

— জি... জি দাদুন?

— কী হয়েছে তোমার? সকাল থেকে দেখছি কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে আছো।

— কিছু হয়নি দাদুন।

— আমি কি তোমাকে আজ চিনলাম? কিছু একটা হয়েছে।

দিনা জোর করে হালকা হাসল।

— সত্যিই কিছু হয়নি।

কথাটা বললেও তার কণ্ঠে স্বাভাবিকতা ছিল না।

ডাইনিং টেবিলে বসা সবার নজর তখন তার দিকে।

পাখি উমাইরের বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। মেয়েটাকে সে চেনে। দিনা যখন নিজের ভেতরে কোনো ঝড় লুকিয়ে রাখে, তখন এমনই হয়ে যায়।

ঠিক তখনই ডাইনিং এরিয়ার দিকে দ্রুত হেঁটে এলো চড়ুই পাখির কিচিরমিচির আবাসের এক স্টাফ।

তাকে দেখে আয়না অবাক হয়ে বলল—

— আরে মালা! এই সকাল সকাল তুমি এখানে?

— পাখি মেমকে ডাকতে এসেছি।

— আমাকে?

— জি মেম। হাম্মাদ স্যার আপনাকে এখনই যেতে বলেছেন।

কথাটা শুনে টেবিলে বসা কয়েকজন একে অপরের দিকে তাকাল।

পাখি উমাইর ভ্রু কুঁচকে বললেন—

— আচ্ছা, তুমি যাও। আমি আসছি।

মালা চলে যেতেই দাবির উমাইর বললেন—

— বাবা হঠাৎ তোমাকে কেন ডাকছে?

— জানি না তো।

কথাটা বললেও তার মনে হালকা অস্বস্তি কাজ করতে শুরু করেছে।

হাম্মাদ চৌধুরী অকারণে কাউকে ডেকে পাঠান না। আর এত সকালে ডাকার অর্থ নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পাখি উমাইর একবার দিনার দিকে তাকালেন।

মেয়েটা এখনও অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে।

তার মনে হচ্ছিল—

আজকের সকালটা হয়তো সাধারণ কোনো সকাল নয়।

---

চড়ুই পাখির কিচিরমিচির আবাসে পৌঁছাতেই পাখি উমাইরকে সবার সঙ্গে নাস্তা করতে বলা হলো।

সে টেবিলে বসল ঠিকই, কিন্তু খাবারের দিকে হাত বাড়াল না।

তার চিন্তিত মুখটা সবার চোখ এড়াল না।

চড়ুই বেগম কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন—

— পাখি মা, তোর শরীর খারাপ নাকি? মুখটা এমন শুকনো দেখাচ্ছে কেন?

— না আম্মু। শরীর ঠিক আছে। আসলে দিনাকে নিয়ে একটু চিন্তায় আছি।

কথাটা শুনে হাম্মাদ চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।

— কী হয়েছে দিনার?

পাখি উমাইর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— কাল রাত থেকে ওকে কেমন যেন লাগছে। ঠিক আগের মতো...

— আগের মতো মানে?

— প্রতি রাতের মতো ওকে দেখতে গিয়েছিলাম। সাধারণত ছাদের এক কোণে চুপচাপ বসে থাকে। কিন্তু কাল দেখলাম পুরো ছাদ জুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। খুব অস্থির লাগছিল।

একটু থেমে আবার বললেন—

— আজ সকালেও একই অবস্থা। খাওয়ার টেবিলে বসেছিল, কিন্তু মন ছিল না। আমরা কথা বলছি, অথচ মনে হলো কিছুই শুনছে না।

চড়ুই বেগমের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।

— আমার ভয় হচ্ছে... ও আবার জাসবকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেনি তো?

কণ্ঠটা অজান্তেই ভারী হয়ে এলো তার।

— অনেক কষ্টে তো মেয়েটা একটু একটু করে স্বাভাবিক হচ্ছিল। এখন আবার আগের লক্ষণগুলো কেন দেখছি বুঝতে পারছি না।

হারিস চৌধুরী শান্ত স্বরে বললেন—

— বোন, এত দুশ্চিন্তা কোরো না। হয়তো অন্য কোনো কারণে চিন্তিত। সবকিছু জাসবের সঙ্গে সম্পর্কিত নাও হতে পারে।

পাখি উমাইর নিচের দিকে তাকালেন।

— জানি... তবুও ভয় হয়। ওকে আর কষ্ট পেতে দেখতে পারি না।

কথাটা বলার সময় তার চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠল একজন মায়ের অসহায়তা।

ডাইনিং টেবিলে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো।

ঠিক তখনই হারিস চৌধুরীর ছোট মেয়ে কাশভি কৌতূহলী চোখে সবার দিকে তাকিয়ে বলল—

— জাসব কে, আপুর হাসবেন্ড?

কাশভির প্রশ্ন শুনে টেবিলে বসা সবাই থমকে গেল।

এক মুহূর্তের জন্য যেন সময়ও থেমে গেল।

ঠিক তখনই ওরাং কড়া গলায় বলে উঠল—

— কাশভি!

হঠাৎ এমন গম্ভীর স্বর শুনে কাশভি চমকে উঠল।

— বড়রা কথা বলছে। মাঝখানে কথা বলতে কে বলেছে তোমাকে?

ওরাংয়ের চোখমুখ অস্বাভাবিক রকম কঠিন হয়ে আছে।

কাশভি ভয়ে নিজের মায়ের দিকে সরে গেল।

কানিশা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে বললেন—

— আহ, ওরু! কী হচ্ছে? একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে এভাবে কথা বলছ কেন?

ওরাং কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।

হারিস চৌধুরী শান্ত স্বরে বললেন—

— ও তো শুধু একটা প্রশ্ন করেছে।

ওরাং আর কোনো উত্তর দিল না।

চোয়াল শক্ত করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।

ওর আচরণে উপস্থিত সবাই কিছুটা অবাক হলেও কেউ আর বিষয়টা বাড়াল না।

কিন্তু হাম্মাদ চৌধুরীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঠিকই ওরাংয়ের মুখের ওপর স্থির হয়ে রইল।

মনে হলো, তিনি যেন ওর প্রতিক্রিয়ার কারণ খুঁজছেন।

অন্যদিকে কাশভি আস্তে করে মায়ের কানে কানে বলল—

— আমি কি ভুল কিছু বলেছি, আম্মু?

কানিশা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বললেন—

— না মা, তুমি ভুল কিছু বলোনি।

তবুও টেবিলের পরিবেশ আর আগের মতো স্বাভাবিক রইল না।
হাম্মাদ চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীর স্বরে বললেন—

— আমি ভাবছিলাম, তোকে দিনার বিয়ে নিয়ে কিছু বলব। কিন্তু তুই যা বললি, তার পরে আর কিছু বলার থাকল না। আগে দেখা যাক কী হয়। তারপর না হয় বিষয়টা নিয়ে ভাবা যাবে।

পাখি উমাইর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— আপনার কি মনে হয়, ওকে এখন বিয়ে নিয়ে কিছু বলা যাবে?

হামিম চৌধুরী মাথা নেড়ে বললেন—

— আমার মনে হয় না। এই মুহূর্তে ওকে এসব বলা ঠিক হবে।

হারিস চৌধুরী শান্ত গলায় বললেন—

— তা বলে ওকে আমরা এভাবে একা ছেড়ে দিতে পারি না। জীবন তো থেমে থাকে না।

হামিম চৌধুরী ঠান্ডা স্বরে বললেন—

— জীবন থেমে থাকে না ঠিকই, কিন্তু যে আগুনের ভেতর দিয়ে ও গেছে, সেখান থেকে পুরোপুরি বেরও হতে পারেনি। আমার মনে হয়, ওকে ওই দেশে না নিয়ে গেলে হয়তো এত কিছু হতো না।

কথাটা শুনে টেবিলে সামান্য নীরবতা নেমে এলো।

হামিদ চৌধুরী এবার বললেন—

— দেখো, এসব কথা আমাদের এখন শুধু আফসোসই বাড়াবে। যা হওয়ার ছিল, তা হয়ে গেছে। অনেক কিছুই মানুষের হাতে থাকে না। কিছু জিনিস ভাগ্যের লিখন।

হামিম চৌধুরী আর কিছু বললেন না।

ঠিক তখনই ওরাং হঠাৎ বলে উঠল—

— আমার মনে হয় না, তোমাদের এসব কথার কোনো অর্থ আছে।
একটা মানুষকে নিয়ে বছরের পর বছর একই আলোচনা করে লাভ কী?
যা হওয়ার ছিল, হয়ে গেছে।
ওকে নিজের মতো থাকতে দিলেই হয়।

তার কণ্ঠ ছিল শান্ত, কিন্তু অস্বাভাবিক রকম কঠিন।

টেবিলে উপস্থিত বড়রা একে অপরের দিকে তাকাল।

কেউ কিছু না বললেও অনেকেই বুঝতে পারছিল, ওরাংয়ের কথার পেছনে অন্য কিছু আছে।

অন্যদিকে ছোটরা বরাবরের মতোই ওরাংয়ের আচরণে বিরক্ত হলো। তবে কেউ মুখ খুলল না।

গত এক বছরে এমন ঘটনা নতুন নয়।

দিনাকে নিয়ে কোনো আলোচনা উঠলেই ওরাং অকারণে বিরক্ত হয়ে যায়।

কেন যায়—সেই উত্তর অবশ্য এখনও কেউ জানে না।
ওরাং উঠে দাঁড়াল।
আর কোনো কথা না বলে বারান্দার দিকে চলে গেল।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।
হারিস চৌধুরী ছেলের চলে যাওয়া পিঠের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
গত এক বছরে এমন দৃশ্য নতুন নয়।
দিনার প্রসঙ্গ উঠলেই ছেলেটা কেমন বদলে যায়।

নোট/বিঃদ্রঃ
বানান ভুল বা কোনো অসংগত অংশ চোখে পড়লে মন্তব্যে জানাবেন। আপনার পরামর্শ আমার জন্য খুব মূল্যবান। গল্পের প্রতিটি পর্বে আমি শিখছি—তাই সাপোর্ট আর গাইডলাইন চাই সবার কাছে। আশা রাখছি ভুল ত্রুটি হলে সাহায্য করবেন।

Address

Sandwip

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Terra Soord Moa posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share