17/07/2026
#গল্প: #ওমিরাং_একটি_বন্যফুল
#পর্বঃ ১০
#লেখনীতে :
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে রাস্তার দিকে হাঁটছিল দিনা।
হাতে তখনও হাসপাতালের ক্যানোলা লাগানো।
শরীর দুর্বল হওয়ায় হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছিল।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একটি রিকশায় উঠতেই সামনের দিক থেকে আসা আরেকটি রিকশার সঙ্গে হালকা ধাক্কা লাগে।
ভারসাম্য হারিয়ে দিনা নিচে পড়ে যায়।
ঠিক সেই মুহূর্তেই সামনে এসে তীব্র ব্রেক কষে থামে একটি কালো গাড়ি।
গাড়ির দরজা খুলে নিচে নামল ওরাং।
মাটিতে পড়ে থাকা দিনাকে দেখে বিরক্ত গলায় বলল—
ওরাং : বাহ! যেখানে যাই, সেখানেই আপনাকে পাই।
ব্যথা চেপে ধীরে ধীরে উঠে বসতে বসতে দিনা বলল—
দিনা : আমিও একই কথা বলতে পারি।
ওরাং একবার উল্টে যাওয়া রিকশার দিকে, একবার দিনার দিকে তাকাল।
ওরাং : রাস্তার মাঝখানে নাটক করার নতুন জায়গা পেয়েছেন নাকি?
দিনা ধুলো ঝেড়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ঠান্ডা স্বরে বলল—
দিনা : আপনার সঙ্গে দেখা হলেই মনে হয় ভদ্রতা শব্দটা আপনার অভিধানে নেই।
ওরাং ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলল—
ওরাং : বাংলাটা ভালোই শিখেছেন দেখছি। তবে ভদ্রতা সবাই পাওয়ার যোগ্য হয় না।
দিনা : ঠিক বলেছেন। সেটা অর্জন করতে হয়।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন চাপা হেসে উঠল।
ওরাংয়ের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল।
দিনা হাঁটতে গিয়েও হালকা টলে উঠল।
নিজেকে সামলে নেওয়ার সময়ই ওরাংয়ের চোখ গিয়ে থামল তার ডান হাতে।
হাতে হাসপাতালের ক্যানোলা।
সাদা টেপের নিচে এখনও রক্তের হালকা দাগ শুকিয়ে আছে।
ওরাংয়ের ভ্রু অজান্তেই কুঁচকে গেল।
ওরাং : হাসপাতালে ছিলেন?
দিনা একবার নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে নির্বিকার গলায় বলল—
দিনা : আপনার জানার প্রয়োজন আছে?
ওরাং : প্রশ্ন করেছি।
দিনা : আর উত্তর দেওয়া আমার দায়িত্ব না।
কয়েক মুহূর্ত দুজনেই নীরব।
ওরাং প্রথমবারের মতো খেয়াল করল—
মেয়েটার মুখ অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে।
চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।
মনে হচ্ছে, দাঁড়িয়ে থাকাটাও যেন তার জন্য কষ্টকর।
তবুও দিনা নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করল না।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সিএনজির দিকে এগিয়ে গেল।
দরজা খুলে ওঠার আগে একবার শুধু ফিরে তাকিয়ে বলল—
দিনা: আজ আর আপনার সঙ্গে তর্ক করার শক্তি নেই, মিস্টার ওরাংওটাং। অন্যদিন হিসাব হবে।
সিএনজিটা ধীরে ধীরে চোখের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
ওরাং কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
অজান্তেই তার দৃষ্টি হাসপাতালের দিকে চলে গেল
তার চোখে বারবার ভেসে উঠছে দিনার হাতের ক্যানোলা আর ফ্যাকাশে মুখ।
ঠিক তখনই হাসপাতালের ভেতর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এল দিবা, দিন, পাখি উমাইর ও দাবির উমাইর।
চারদিকে তাকিয়েও দিনাকে কোথাও দেখতে পেল না।
পাখি উমাইর উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে ডাকলেন—
— দিনা...! দিনা...!
দিবা দ্রুত চারপাশে চোখ বুলিয়ে রাস্তার দিকে দৌড়ে গেল।
কিন্তু ততক্ষণে দিনা অনেক দূরে চলে গেছে।
প্রায় আধাঘণ্টা পর...
দাবির উমাইরের ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল— Home।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে আতেরা বানুর কণ্ঠ ভেসে এল—
— বাবা, তোমরা আর খুঁজো না।
দাবির উমাইর উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন—
— কেন? দিনা কি বাসায়?
— হ্যাঁ, এইমাত্র এসেছে।
দাবির উমাইর দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
— ঠিক আছে। আমরা আসছি।
ফোন কেটে তিনি সবার দিকে তাকিয়ে বললেন—
— দিনা বাসায় পৌঁছে গেছে।
কথাটা শুনে পাখি উমাইর দু'হাত তুলে বললেন—
— আলহামদুলিল্লাহ।
তবুও মেয়েকে নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত তার অস্থিরতা কাটল না।
এদিকে...
দিনা বাসায় ফিরে কারও সঙ্গে একটি কথাও বলল না।
সোজা নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
আতেরা বানু কয়েকবার দরজায় নক করে ডাকলেন।
— দিনা দাদু মনি... দরজা খোল।
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো উত্তর এল না।
---
কিছুক্ষণ পর দাবির উমাইরের গাড়ি উমাইর কুঞ্জে ঢুকতেই চড়ুই পাখির কিচিরমিচির আবাসের সবাইও সেখানে চলে এল।
চড়ুই বেগম উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
— দিনা কোথায়?
পাখি উমাইর অসহায় চোখে দিবার দিকে তাকালেন।
দিবা ধীরে বলল—
— আপু আমাদের আগেই বাসায় চলে এসেছে।
আয়না বিস্মিত হয়ে বলল—
— কী! কিন্তু দিন ভাইয়ের সঙ্গে তো ওনাকে দেখলামই না!
দাবির উমাইর গম্ভীর গলায় বললেন—
— কাউকে কিছু না বলেই হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে একাই চলে এসেছে।
হাম্মাদ চৌধুরী অবিশ্বাসের সুরে বললেন—
— তোমরা কেউ ছিলে না? আর ওর শরীরের ওই অবস্থায় একা চলে এল?
দিবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
— আপুকে যদি কোনো সিদ্ধান্ত থেকে ফেরাতে হয়, সেটা খুব সহজ না। শরীর খারাপ ছিল, কিন্তু জেদটা তার শরীরের চেয়েও শক্ত ছিল।
---
এদিকে পাখি উমাইর দ্রুত দিনার রুমের সামনে এসে দরজায় নক করলেন।
— মা... দরজা খোল।
কোনো উত্তর নেই।
আবার ডাকলেন।
তবুও নীরবতা।
পাখি উমাইরের বুক ধড়ফড় করে উঠল।
তিনি প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বললেন—
— দিনা... মা, একটা কথা বল।
চিৎকার শুনে সবাই দোতলায় উঠে এল।
ইমাদ উদ্বিগ্ন হয়ে বলল—
— আপু মনে হয় আবার অজ্ঞান হয়ে গেছে। দরজা ভেঙে ফেলি?
কথাটা শুনে বিছানায় শুয়ে থাকা দিনার কপালে ভাঁজ পড়ল।
বাসায় ফিরে ক্লান্ত শরীরটা একটু বিশ্রাম দিতেই কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
সে ধীরে ধীরে উঠে দরজার কাছে গিয়ে বলল—
— MOMMA, I'M OK! JUST TEN MINUTES. WAIT. I'M COMING.
দিনার কণ্ঠ শুনেই সবার বুকের ওপর থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল।
দাবির উমাইর বললেন—
— ঠিক আছে, মামণি। আমরা নিচে আছি। সময় নিয়ে এসো।
ধীরে ধীরে সবাই নিচে নেমে গেল।
---
এদিকে দরজায় হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল দিনা।
তারপর পুরো রুম তন্নতন্ন করে খুঁজতে শুরু করল।
ড্রয়ার...
আলমারি...
লকার...
টেবিল...
কোথাও নেই।
তার লন্ডনে ফেরার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পাসপোর্ট—কিছুই খুঁজে পেল না।
সবশেষে বিছানায় বসে পড়ল।
কয়েক মুহূর্ত স্থির থাকার পর হঠাৎ তার মনে হলো—
এগুলো কেউ সরিয়েছে।
আর সেই মানুষটা হয়—
মাম্মা... পাপা... কিংবা দাদুন।
দিনা দু'হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরল।
রাগে তার বুকটা জ্বলে উঠল।
কিন্তু সে জানে—
এখন রাগ দেখানোর সময় না।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার লক খুলল।
তারপর নিচে ড্রইংরুমের দিকে হাঁটতে লাগল।
নোট/বিঃদ্রঃ
গল্পটি মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। কোথাও বানান, ভাষা বা ঘটনার ধারাবাহিকতায় কোনো ভুল বা অসংগতি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে মন্তব্যে জানাবেন। আপনাদের প্রতিটি গঠনমূলক মতামত ও পরামর্শ আমাকে আরও ভালোভাবে লিখতে এবং গল্পটিকে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করবে।
ভালো লাগলে গল্পটি শেয়ার করে অন্যদেরও পড়ার সুযোগ করে দিতে পারেন। আপনাদের ভালোবাসা, সমর্থন ও দোয়াই "ওমিরাং একটি বন্য ফুল"-এর এগিয়ে চলার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
ধন্যবাদ। 🤍🌼