16/03/2026
#রক্তাত্ত_অতীত
#পর্বঃ ৪
#লেখনীতে :
কপি🚫
ছোট কুটির বাসায় হাসি-খুশি যেন শেষ হয়নি। আজ অদ্বিকা ভীষণ খুশি। বাচ্চাটা কেন জানি কম হাসে, তবে মাঝে মাঝে তার মুখে খুব করে খুশির ঝিলিক দেখা যায়। আর সেই খুশিতে সে অভ্রকে সামিল করে। কাতুকুতু দিয়ে অভ্রকে খুব হাসায়।
আজ তার খুশির কারণ হলো তার মাম বলেছে সবাইকে নিয়ে বাইরে যাবে। সারাবিকেল বাইরে ঘুরে সন্ধ্যায় অদিতিকে ডাক্তার দেখিয়ে বাইরে খেয়ে তারপর বাসায় আসবে। আর কী লাগে অদ্বিকার খুশির জন্য!
গত তিন মাস ধরে অদিতিকে নতুন ডাক্তার দেখাচ্ছে অদ্রিতা। ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি এবং আংশিক প্যারালাইসিসের জন্য অদিতি আড়াই বছর ধরে এই অবস্থায় আছে।
নতুন চাকরি পাওয়ার পর অদ্রিতা আবার স্বপ্ন দেখে অদিতির সুস্থ হওয়ার। ডক্টর আভিরাজ মির্জা দেশের একজন খ্যাতনামা নিউরোলজিস্ট। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর জটিল রোগ নিয়ে কাজ করার জন্য তার আলাদা সুনাম আছে। অনেক বছর পরও যেসব রোগীর উন্নতির আশা থাকে না, তাদের মধ্যেও তিনি আশার আলো জ্বালাতে পারেন।
তাই অদ্রিতা মনে করে তার অদিতি আবার হাঁটবে। আর না হাঁটুক, অন্তত স্বাভাবিকভাবে কথা বলুক। আর সেই দিন কী হয়েছিল তা বলুক।
সন্ধ্যা তখন সাতটা। ১৪ নম্বর সিরিয়ালটা অদিতির ছিল। চেম্বারে ঢুকতেই আভিরাজের চোখ অদ্রিতার দিকে যায়। মেয়েটাকে আভিরাজের মনে আছে। দেখতে তার মেয়ে আভিরার মতো লাগে—বিশেষ করে চোখ আর কপাল।
তার এটা মনে হওয়ার কারণ কী? দুইজনই চোখ-মুখ কুঁচকে কথা বলে, মনে হয় সেই জন্য।
কিন্তু তার মেয়েটা ছোট, আর এই মেয়ের দুইটা বাচ্চা আছে। সেটাও তার কাছে অবাক লাগে। মেয়েটাকে দেখতে মনে হয় বিশ-বাইশ বছর, কিন্তু মেয়ের বয়সও আট-নয় বছর হবে।
তার এই মেয়েটাকে মনে রাখার কারণ কী?
প্রথম যেদিন মেয়েটা এসেছিল, সেদিন তার যাওয়ার সময় তার দিকে তাকানো দেখে তার এসিস্ট্যান্ট সামি বলেছিল—
সামি :
মেয়েটা দেখতে ভালো হলেও আসলে একটা বেয়াদব।
আভিরাজ :
কেন, কী করেছে?
সামি :
স্যার, এই মেয়ের মেয়ে আমার ছেলের সাথে এক স্কুলে পড়ে। গতকাল দুইজন কেন জানি ঝামেলা করেছে। আমার ছেলে তার মেয়েকে মেরেছে। এসব কারণে গার্ডিয়ান ডাক পড়েছে।
সব তো ঠিকই ছিল, কিন্তু মেয়েটা তার মেয়েকে সবার সামনে একটা থাপ্পড় মেরেছে।
আভিরাজ :
অন্যায় করেছে, তাই হয়তো মেরেছে।
সামি :
না স্যার, তার জন্য না!
আভিরাজ :
তাহলে কেন মেরেছে?
সামি :
মারার সময় বলেছে—
“তোকে মারছে, তুইও মারতে পারতি। যা হওয়ার আমি দেখতাম। মার খেয়ে আমার কাছে কেন আসলি?”
মানে মার খেয়েছে, মার দেয়নি কেন—সেই জন্য মেরেছে!
আভিরাজ :
কি বলো! এমনটা হয়েছে?
সামি :
হ্যাঁ স্যার। আমি তো ভাবছি মেয়েকে এমন শিক্ষা দিচ্ছে, তো ছেলেকে কী শিক্ষা দেবে!
আভিরাজ :
ছেলেও আছে? দেখে তো মনে হয় বাচ্চা একটা মেয়ে!
সামি :
না স্যার। মেয়ের বয়স আট বছর। ছেলের বয়স এক বছর হবে মনে হয়। মা হিসেবে বাচ্চাদের ভালো শিক্ষা দিচ্ছে না!
আর সেই থেকে আভিরাজের এই মেয়েকে নিয়ে অদ্ভুত এক ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে।
আভিরাজের ভাবনার ছেদ হয় অদ্রিতা অদিতিকে ভিতরে এনে তার পাশে বসানোর সময়।
আভিরাজ :
রিপোর্ট এগুলো তো আগের। আর উনার নেক্সট ভিজিট তো আরো দুই সপ্তাহ পরে?
অদ্রিতা :
আই নো বাট… আসলে ডক্টর, আমি ঠিক জানি না আগে এমন হয়েছে কি না। কিন্তু কালকে ও হাত নাড়িয়েছে এবং চোখগুলোও একধরনের নাড়িয়েছে।
আভিরাজ :
রোগীর শরীর রেসপন্স করছে?
অদ্রিতা :
ইয়েস।
আভিরাজ :
ওকে। আমি কিছু টেস্ট দিচ্ছি। এগুলো করিয়ে আগামীকাল আবার দেখা করবেন।
অদ্রিতা :
ওকে, ডক্টর।
অদ্রিতা বাসায় আসে। অরিশা সহ দুইজনে মিলে অদিতিকে শুইয়ে দেয়। তারপর হঠাৎ অদ্রিতা বলে—
অদ্রিতা :
অরি, আমি ডক্টরকে একটা কথা বলিনি।
অরিশা :
কী কথা?
অদ্রিতা :
দেখ!
বলেই অদ্রিতা টিভি অন করে। একটা ভিডিও চালায়। টিভির পর্দায় তখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল সেই মানুষটার মুখ—যার নাম বহু বছর ধরে এই ঘরে কেউ উচ্চারণ করে না। তা দেখে অদিতি কেমন অস্থির হয়ে ওঠে—তার চোখ কাঁপছে, হাত নাড়াচাড়া করছে।
অরিশা :
এটা ডক্টরকে কেন বলিসনি? তুই এটা জানিস না—ডক্টরের কাছ থেকে কোনো কিছু লুকানো ঠিক না!
জাস্ট একজনকে তুই অপছন্দ করিস, তাই তার মাধ্যমে মায়ের সুস্থতা নিশ্চিত—এটা তোর সমস্যা?
অদ্রিতা :
কি বললি? অপছন্দ না… অপছন্দ না—ঘৃণা করি!
আর কী বলবো ডক্টরকে? এই যে ডক্টর… আমি বা আমরা যার জারজ সন্তানের অপবাদ নিয়ে সমাজে চলি—তাকে দেখে আমার মা রেসপন্স করছে!
আসলে কথাটা কী জানিস? তোদের সবার কাছে আমাকে পুতুল মনে হয়। তাই তো আমার দাম তোদের কাছে নেই!
বলে অদ্রিতা সেখান থেকে চলে যায়। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল, কিন্তু টিভির আলোয় অদিতির কাঁপতে থাকা চোখ যেন অন্য এক সত্য বলতে চাইছিল।
অরিশা তার দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে।
অরিশা কী করে বোঝাবে—সে নিজেও একজন ইন্টার্ন ডাক্তার হিসেবে সত্যি কথাই বলছে। ডাক্তার নয়, সাধারণ মানুষও জানে ডাক্তার থেকে কথা লুকানো ঠিক না।
কয়েকজন মাতাল নেশাখোর ছেলে ঘিরে আছে একটা মেয়েকে। মেয়েটা খুব অসহায় হয়ে চোখে পানি ফেলছে। আর কান্না করে তাকে ছেড়ে দেওয়ার আকুতি জানাচ্ছে। কিন্তু মাতালরা কি শুনে সেই পবিত্র ফুলের আবেদন? এক এক করে কেড়ে নেয় সেই ফুলের আবরণী।
রাত তখন গভীর। সেই দুঃস্বপ্ন দেখে আবারও রাতের ঘুম চলে যায় অদ্রিতার। সে অস্থির হয়ে উঠে বসে। উঠে ডাইনিং টেবিল থেকে পানি নিয়ে প্রাণ ভরে পান করে। তারপর ধীর পায়ে বাসা থেকে বাইরে হয়ে একতলা ছাদে যায়।
অসংখ্য গাছগাছালির মাঝে শুয়ে পড়ে নিকষ কালো আকাশে তাকিয়ে থাকে। আর নিজেকে প্রশ্ন করে।
অদ্রিতা :
সে কি আজও আছে বেঁচে তোমার মাঝে?
কিছুক্ষণ নীরব থাকে। তারপর বলে—
অদ্রিতা :
না, বেঁচে নাই—মরে গেছে! কিন্তু তার স্মৃতি আজও বেঁচে আছে। এটা তিক্ততা না—এটা আমার শক্তি। অদ্রিতার মাঝে শক্তি তুমি , পরাজয় না মানা রক্তবীজ।
আরো কিছু সময় অদ্রিতা ছাদে শুয়ে থাকে। তারপর উঠে চলে যায়। আর নিজের রুমে ঢোকার আগে অদিতির রুমে ঢোকে। দেখে অদিতি এখনো চোখ খুলে রেখেছে এবং তার চোখের পানি পড়ছে।
অদ্রিতা অদিতির কাছে গিয়ে তার হাতে ও কপালে চুমু দেয়। তারপর অদিতির হাত ধরে বসে থাকে।
অদ্রিতা :
জানো, আমার মাঝে মাঝে হাসি পায় আমাদের ভাগ্য দেখে। দেখোই না! কিন্তু কি করার আছে? আমার দায়িত্ব অনেক। অরিকে বিয়ে দিতে হবে। অদু, অভ্রকে ভালো মানুষ হিসেবে বড় করতে হবে। আর তোমাকে সুস্থ করতে হবে।
আরো কিছু সময় নিরবতায় কাটে ---
অদ্রিতা :
আমি জানি আমি পৃথিবীকে যা দেখাই তা নয়। বাট তুমি কিছু জানো, অরিও জানে। সব জানার মাঝে সত্যি এই যে আমি যা করছি তোমাদের ভালো রাখতে করছি। আমাকে কখনো ভুল বুঝো না, অবিশ্বাস করো না। আমার তোমরা ছাড়া কেউ নেই।
তখন অদ্রিতা নিজের কাঁধে কারো হাত অনুভব করে। পিছু তাকিয়ে দেখে অরিশা। অরিশা অদ্রিতাকে জড়িয়ে ধরে। অদ্রিতাও অরিশার কোমর জড়িয়ে বসে থাকে। অদিতির নজর তখন তাদের দুই বোনের দিকে।
জীবন রঙিন, জীবন যন্ত্রণা। জীবন হলো শিক্ষক আর এর শিক্ষা মৃত্যু পর্যন্ত। পৃথিবীতে আসা কারো নিজের ইচ্ছে হয় না। আর না পৃথিবী থেকে নিজ ইচ্ছায় যাওয়ার অনুমতি আছে।
পৃথিবীতে যদি আত্মহননের অনুমতি থাকতো, তাহলে সকল দুঃখী মানুষ নিজেকে হত্যা করে জীবনের সকল দুঃখ-কষ্ট, অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতো।
পৃথিবীর সব থেকে বড় যন্ত্রণার অধ্যায় হলো অপরাধবোধ। অপরাধবোধে ভুগতে থাকা মানুষ জানে প্রতি নিয়ত মৃত্যুর কষ্ট কী।
না নিজেকে প্রকাশ করা যায়, আর না কষ্ট মুছা যায়।
আর সেই রকম কষ্টে নিজেকে আবৃত করেছে রিদান মির্জা। নিজের দোষে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে সে নিঃস্ব। পৃথিবীতে তারও একজন ভালোবাসার মানুষ ছিল, সন্তান ছিল। নিজের রক্তাক্ত অতীত প্রতি নিয়ত তাকে ভিতর থেকে পুড়িয়ে মারে।
এই যে এখন রুমে থাকতে তার দম বন্ধ লাগছে। কী এক অসহ্য অবস্থা!
রিদান তার নিজ রুম থেকে বাইরে হয়ে আসে। নিজের ভিতরের হতাশা কাটানোর জন্য ছাদে যায়।
একটা রাত কারো কাছে সাধারণ, আর কারো কাছে তিক্ততার।
নোট/বিঃদ্রঃ
বানান ভুল বা কোনো অসংগত অংশ চোখে পড়লে মন্তব্যে জানাবেন। আপনার পরামর্শ আমার জন্য খুব মূল্যবান। গল্পের প্রতিটি পর্বে আমি শিখছি—তাই সাপোর্ট আর গাইডলাইন চাই সবার কাছে। আশা রাখছি ভুল ত্রুটি হলে সাহায্য করবেন।
এটা আমার ২য় গল্প!