13/09/2025
চলে গেছেন লালন কন্যা ফরিদা পারভীন।
ফরিদা পারভিন (৩১ ডিসেম্বর ১৯৫৪ – ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫) ছিলেন একজন বাংলাদেশী লোকসঙ্গীত শিল্পী। তিনি লালন সঙ্গীতের জন্য সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তাকে "লালনকন্যা" হিসাবে অভিহিত করা হয়। সঙ্গীতে তার অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৭ সালে একুশে পদক ও ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
ফরিদা পারভীন ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর নাটোর জেলার সিংড়া থানার কলম ইউনিয়নের শাঔঁল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ফরিদা পারভীনের বাবা দেলোয়ার হোসেন পেশায় ছিলেন সাধারণ চিকিৎসক। মা রৌফা বেগম।
শিক্ষাজীবন
তার প্রাতিষ্ঠানিক স্কুল জীবন কেটেছে বিভিন্ন শহরে। স্কুল জীবনের সূচনা হয়েছিল মাগুরায়। তিনি কুষ্টিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার মীর মশাররফ হোসেন বালিকা বিদ্যালয় (বর্তমান সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়) এবং মেহেরপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। কুষ্টিয়ার মীর মশাররফ হোসেন বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৪ সালে কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন এবং কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৭৬-৭৯ সালে অনার্স পাঠ করেন।
তার গানের শিক্ষাজীবনেরও হাতখড়ি মাগুরা জেলায়। মাগুরায় তার গানে হাতেখড়ি দিয়েছিলেন ওস্তাদ কমল চক্রবর্তী। পরবর্তীতে তিনি কুষ্টিয়ার তখনকার গানের ওস্তাদ রবীন্দ্রনাথ রায়, মোতালেব বিশ্বাস এবং ওসমান গণি'র কাছে ক্ল্যাসিক্যাল শেখেন। প্রায় ছয়-সাত বছর তানপুরার সঙ্গে ক্ল্যাসিক্যাল চর্চা করবার পর তিনি নজরুল সঙ্গীত শিখতে শুরু করেন। তার নজরুল সঙ্গীতের প্রথম গুরু হচ্ছেন কুষ্টিয়ার ওস্তাদ আবদুল কাদের। এরপর তিনি মেহেরপুরে মীর মোজাফফর আলী'র কাছেও নজরুল সঙ্গীত শেখেন। স্বরলিপি দিয়ে নজরুলের গান হারমোনিয়ামে ও কন্ঠে তোলার কাজটি তিনি ওস্তাদ মীর মোজাফফর আলী'র কাছেই প্রথম শেখেন। ১৯৬৮ সালে তিনি রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত নজরুল সঙ্গীত শিল্পী নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে লালন সাঁইজির গানের সঙ্গে ফরিদার যোগাযোগ। তখন তিনি কুষ্টিয়াতে থাকতেন। সেখানে তাদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন গুরু মোকছেদ আলী সাঁই। ১৯৭৩ সালে ফরিদা তার কাছেই 'সত্য বল সুপথে চল' গান শিক্ষার মাধ্যমে লালন সাঁইজির গানের তালিম নেন। পরে মোকছেদ আলী সাঁইয়ের মৃত্যুর পর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছে লালন সঙ্গীতের শিক্ষা গ্রহণ করেন।
সংগীত জীবন
ফরিদা পারভীনের কর্মজীবন সঙ্গীতময়। শুধু লালনের গান নয়, তিনি একাধারে গেয়েছেন আধুনিক এবং দেশাত্মবোধক গান। ফরিদা পারভীনের গাওয়া আধুনিক, দেশাত্মবোধক কিংবা লালন সাঁইয়ের গান সমান ভাবেই জনপ্রিয়। তার জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে 'এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা-সুরমা নদীর তটে' 'তোমরা ভুলেই গেছো মল্লিকাদির নাম', 'নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে প্রেমের কী সাধ আছে বলো', 'খাঁচার ভিতর', 'বাড়ির কাছে আরশি নগর' ইত্যাদি। তার অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে-
• ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে অচিন পাখি' নামে একটি লংপ্লে রেকর্ড বের হয়। স্পন্সার করে 'শ্রোতার আসর' বর্তমানে এসিআই কোম্পানি
• ডন কোম্পানি থেকে 'লালনগীতি'
• সারগাম থেকে 'লালনের গান'
• দোয়েল প্রডাক্টস থেকে 'দেশাত্মবোধক/আধুনিক/লালন' মিলে একটা ক্যাসেট
• আরশিনগর-এর ব্যানারে লালনের গান 'আমারে কি রাখবেন গুরু চরণে'
• বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে 'সময় গেলে সাধন হবে না'
• আবুল উলাইয়ার পরিবেশনায় 'আশা পূর্ণ হলো না'
• 'লাইভ কনসার্ট ইন জাপান' নামে একটা এ্যালবাম বের করছে আবুল উলাইয়া
• তোমার মতো দয়াল বন্ধু আর পাবো না
• সমুদ্রের কূলেতে বসে
• হিট সঙস অব ফরিদা পারভীন : মিলেনিয়াম /বহুদিন হলো ভেংগেছি ঘর।
পুরস্কার ও অর্জন
সঙ্গীতে অবদানের জন্য ফরিদা পারভীন ১৯৮৭ সালে একুশে পদক লাভ করেন। অন্ধ প্রেম চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেওয়ার জন্য ১৯৯৩ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ নারী সঙ্গীত শিল্পী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।[৪] ২০০৮ সালে তিনি ফুকুওয়াকা এশীয় সাংস্কৃতিক পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস ও অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কার পেয়েছেন।
পারিবারিক জীবন
ফরিদা পারভীন প্রখ্যাত গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী আবু জাফরকে বিয়ে করেন। তিনি চার সন্তানের জননী। তার মেয়ের নাম জিহান ফারিয়া আর তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলের নাম ইমাম নিমেরি উপল, মেজ ছেলের নাম ইমাম নাহিল সুমন এবং ছোট ছেলের নাম ইমাম নোমানি রাব্বি।
আবু জাফরের সাথে তার বিচ্ছেদের পরে তিনি বাংলাদেশের বিখ্যাত বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিমের সাথে দ্বিতীয় বারের মতো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
মৃত্যু
শিল্পী ফরিদা পারভীন আজ শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, রাত ১০:১৫ মিনিটে ঢাকায় ইন্তেকাল করেছেন।
(তথ্য: উইকিপিডিয়া থেকে)