05/06/2026
#একটুখানি_তাদাব্বুর
"كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ"
“প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়বদ্ধ।”
— সূরা আত-তূর, ৫২:২১।
মানুষের পৃথিবীতে আগমন নিজেই এক অসাধারণ সম্ভাবনার সূচনা। প্রতিটি মানুষ জন্ম নেয় অফুরন্ত সামর্থ্য, স্বপ্ন এবং সুযোগ নিয়ে। কিন্তু জীবনের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তার জন্ম, বংশ বা পারিপার্শ্বিকতার মাধ্যমে নয়; বরং সে তার জীবনকে কীভাবে পরিচালনা করেছে, তার মাধ্যমেই।
আমরা অনেক সময় নিজের ব্যর্থতা, সীমাবদ্ধতা কিংবা অতীতের ভুলের কারণে হতাশ হয়ে পড়ি। মনে হয়, হয়তো আর পরিবর্তনের সুযোগ নেই। অথচ এই আয়াত আমাদের এক গভীর সত্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ মানুষকে দায়িত্বশীল সত্তা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। শেষ বিচারে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হবে তার নিজের আমল দ্বারা, অন্য কারও কাজ বা পরিস্থিতি দ্বারা নয়।
আয়াতে ব্যবহৃত "رَهِينٌ" (রাহীন) শব্দটির অর্থ হলো বন্ধক, জিম্মাদার বা নিজ কর্মফলের সঙ্গে আবদ্ধ। অর্থাৎ, একজন মানুষ তার কর্মের ফল থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তার প্রতিটি ভালো কাজ তাকে মুক্তি ও সফলতার দিকে এগিয়ে নেয়, আর প্রতিটি মন্দ কাজ তাকে তার পরিণতির মুখোমুখি দাঁড় করায়।
তবে এই আয়াতের মাঝে রয়েছে এক অনন্য আশার বার্তা। আল্লাহ বলেননি যে মানুষ তার অতীতের ভুল দ্বারা চিরতরে নির্ধারিত। বরং তিনি বলেছেন, মানুষ দায়ী তার অর্জিত কর্মের জন্য। তাই গতকালের ভুল আজকের তওবা, আত্মশুদ্ধি ও সৎকর্মের মাধ্যমে সংশোধন করা সম্ভব। যতদিন জীবন আছে, ততদিন পরিবর্তনের দরজাও খোলা।
একবার ভাবুন আপনি পৃথিবীতে এসেছেন অসংখ্য সম্ভাবনা নিয়ে। কিন্তু প্রকৃত বিজয় জন্মের মুহূর্তে নয়; প্রকৃত বিজয় হলো এমন জীবন যাপন করা, যাতে আল্লাহর কাছে সফল বান্দা হিসেবে ফিরে যাওয়া যায়। আর সেটাই আল্লাহ চান। কুরআনের ভাষায় মানুষের মর্যাদা তার সম্পদ, বংশ কিংবা বাহ্যিক পরিচয়ে নয়; বরং তার ঈমান, তাকওয়া ও আমলের মধ্যে নিহিত।
প্রখ্যাত মুফাসসির ইবনে কাসীর ব্যাখ্যা করেছেন যে, প্রত্যেক মানুষ তার নিজ কর্মের জন্য দায়বদ্ধ এবং কর্মফলের সঙ্গে আবদ্ধ। তবে মুমিনদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হলো তাদের ঈমান ও সৎকর্মের কারণে তিনি তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং জান্নাতে পরিবারকে একত্রিত হওয়ার সৌভাগ্য দান করেন।
অন্যদিকে আল তাবারী উল্লেখ করেন, “রাহীন” এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যে নিজের কর্মফলের কাছে আবদ্ধ। কেউ অন্যের পাপ বহন করবে না, আর কেউ অন্যের সৎকর্মের অধিকারীও হবে না। নিজের কর্মফল নিজের উপরই বর্তাবে।
নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে।
অতীতের ভুল ভবিষ্যৎকে নির্ধারণ করে না; সংশোধনের পথ সবসময় খোলা। মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার কর্ম ও চরিত্র দ্বারা। প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার অর্জনে নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে। প্রতিটি দিন নতুনভাবে শুরু করার একটি সুযোগ। এ সুযোগ কাজে লাগালেই আমরা সফল হব ইনশা আল্লাহ।
“জন্ম আমাকে সম্ভাবনা দিয়েছে, কিন্তু আমার আমলই নির্ধারণ করবে আমি সত্যিকার অর্থে সফল কি না।”
আল্লাহ আমাদের সবাইকে এমন আমল করার তাওফিক দান করুন, যা আমাদের তাঁর সন্তুষ্টি ও চিরস্থায়ী সফলতার পথে এগিয়ে নেয়।
আমিন।