01/08/2026
#একটুখানি_তাদাব্বুর
﴿اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن ضَعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِن بَعْدِ ضَعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِن بَعْدِ قُوَّةٍ ضَعْفًا وَشَيْبَةً﴾
"(তিনিই মহান) আল্লাহ যিনি দুর্বল অবস্থায় তোমাদের সৃষ্টি করেন। অতঃপর দুর্বলতার পর শক্তি দান করেন। অতঃপর শক্তির পর (আবার) দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।"
— সূরা আর-রূম: ৫৪।
দুর্বলতা থেকে শক্তি, শক্তি থেকে আবার দুর্বলতা— এটাই মানুষের বাস্তবতা মানুষের জীবন যেন একটি পূর্ণ বৃত্ত।
শুরুটা দুর্বলতা দিয়ে। এক নবজাতক শিশু যে নিজের মাথাও তুলতে পারে না, ক্ষুধার কথা বলতে পারে না, এক গ্লাস পানিও নিজে পান করতে পারে না। তারপর ধীরে ধীরে সে বড় হয়। হাঁটতে শেখে, দৌড়াতে শেখে, স্বপ্ন দেখতে শেখে। যৌবনে এসে সে মনে করতে শুরু করে— "আমি পারি, আমি জানি, আমি শক্তিশালী।"
কিন্তু কুরআন আমাদের সেই ভুল ধারণা ভেঙে দিচ্ছেন মহান সৃষ্টিকর্তা নিজেই।
আল্লাহ বলছেন, এই শক্তিও চিরস্থায়ী নয়। একদিন সেই শক্তিশালী শরীরই আবার দুর্বল হবে। যে হাত একসময় ভারী বোঝা বহন করত, সেই হাত একদিন লাঠির ভর খুঁজবে। যে চোখ একসময় দূরের ক্ষুদ্র জিনিসও দেখতে পেত, সেই চোখ একদিন একটি অক্ষর পড়তেও কষ্ট পাবে। যে পা একসময় দ্রুত ছুটে চলত, সেই পা একদিন ধীরে ধীরে কাঁপতে কাঁপতে হাঁটবে।
এই আয়াত শুধু বার্ধক্যের কথা বলে না; এটি মানুষের অহংকার ভাঙার আয়াত।
আমরা প্রায়ই নিজের সৌন্দর্য, শক্তি, জ্ঞান, অর্থ কিংবা পদমর্যাদা নিয়ে গর্ব করি। অথচ আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যা নিয়ে তুমি অহংকার করছ, তার কোনোটিই তোমার নিজের অর্জন নয়।
তুমি দুর্বল ছিলে— আল্লাহ শক্তি দিয়েছেন।
আজ তুমি শক্তিশালী— আল্লাহ চাইলে মুহূর্তেই সেই শক্তি ফিরিয়ে নিতে পারেন।
এ কারণেই কুরআন আমাদের শেখায়, শক্তি পাওয়া গর্বের কারণ নয়; বরং কৃতজ্ঞতার কারণ হওয়া উচিত।
এই আয়াত আমাদের আরও একটি দৃশ্য দেখায়। একসময় মা-বাবা আমাদের কোলে নিয়েছেন। আমরা তাদের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম।
আজ হয়তো তারা বৃদ্ধ। হাঁটতে কষ্ট হয়, কথা বলতে কষ্ট হয়, অনেক কিছু ভুলে যান। আজ তারা আমাদের ওপর নির্ভরশীল। এটাই আল্লাহর নির্ধারিত জীবনচক্র।
যে সন্তান এই আয়াত বুঝবে, সে কখনো বৃদ্ধ মা-বাবাকে বোঝা মনে করবে না। কারণ সে জানে একদিন আমিও এই অবস্থায় পৌঁছাতে পারি।
যৌবন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আমরা সাধারণত বার্ধক্যকে পরীক্ষা মনে করি। অথচ কুরআন ইঙ্গিত দেয়, যৌবনও একটি পরীক্ষা।
শক্তি পেয়েছ— কোথায় ব্যয় করলে?
জ্ঞান পেয়েছ— কাকে উপকার করলে?
অর্থ পেয়েছ— আল্লাহর পথে কতটুকু খরচ করলে?
সময় পেয়েছ— কতটুকু কুরআনের জন্য, কতটুকু সালাতের জন্য, কতটুকু মানুষের উপকারে ব্যয় করলে?
কারণ একদিন এই শক্তি থাকবে না, কিন্তু এর হিসাব অবশ্যই থাকবে। হিসাব দেওয়াই লাগবে মহান আল্লাহর কাছে।
তাই আজ, এই মুহুর্তেই নিজেকে কিছু প্রশ্ন করুন।
✅আমি কি আমার শক্তিকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহার করছি, নাকি গুনাহে?
✅আজ যদি আমার এই শক্তি চলে যায়, আমার ঈমান কি অটুট থাকবে?
✅আমি কি আমার বৃদ্ধ বাবা-মা বা পরিবারের দুর্বল সদস্যদের প্রতি সেই মমতা দেখাই, যা একদিন তারা আমার প্রতি দেখিয়েছিলেন?
✅আমি কি এমন আমল করছি, যা বার্ধক্যেও আমার জন্য আলো হয়ে থাকবে?
সূরা আর-রূমের এই আয়াত আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আজ যে শক্তি নিয়ে আমরা গর্ব করি, কাল সেটিই স্মৃতিতে পরিণত হবে। আজ যে চেহারা, যে স্বাস্থ্য, যে সামর্থ্য আমাদের অহংকারী করে তোলে, একদিন সবই সময়ের কাছে নত হবে।
তাই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা হলো শক্তির সময় বিনয়ী থাকা, সুস্থতার সময় ইবাদত করা এবং যৌবনের সময় আখিরাতের পুঁজি সংগ্রহ করা।
কারণ, যে যৌবন আল্লাহর ইবাদতে কাটে, সেই যৌবনের সৌন্দর্য বার্ধক্যেও মুছে যায় না; বরং কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় পরিণত হয়।
প্রার্থনা :
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের দুর্বলতায় ধৈর্য, শক্তিতে কৃতজ্ঞতা এবং বার্ধক্যে ঈমানের দৃঢ়তা দান করুন। আমাদের শক্তি যেন কখনো অহংকারের কারণ না হয়; বরং আপনার আনুগত্য ও মানুষের কল্যাণে আমার জীবন ব্যয় করার তাওফীক দান করুন।
আমীন।