27/12/2025
“ভারত বাংলাদেশে কেমন সরকার চায়”?
---------------------------------------------------------
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতিবেশীদের আগ্রহ অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতায় ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত দুই দেশের ক্ষেত্রে তা আরও স্বাভাবিক। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশে কী ধরনের সরকার ক্ষমতায় থাকবে—এটি ভারতের কৌশলগত হিসাবের অংশ, এমনটা মনে করা অযৌক্তিক নয়।
ভারত মূলত বাংলাদেশে এমন একটি সরকার প্রত্যাশা করে, যেটি হবে স্থিতিশীল, পূর্বানুমেয় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতার প্রশ্নে সহনশীল। সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থিতিশীলতা, ট্রানজিট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগ—এসব বিষয় ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সে কারণেই বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা বা ভারতবিরোধী রাষ্ট্রীয় অবস্থান তারা স্বাভাবিকভাবেই এড়িয়ে চলতে চায়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার—ভারতের এই প্রত্যাশা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্ন নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় স্বার্থকেন্দ্রিক একটি কৌশলগত অবস্থান। প্রায় সব বড় রাষ্ট্রই তাদের প্রতিবেশী অঞ্চলে এমন সরকার দেখতে চায়, যারা সংঘাত নয়, বরং সহযোগিতার পথে হাঁটে।
তবে এই বাস্তবতার পাশাপাশি আরেকটি সত্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ—বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। এ দেশের সরকার কেমন হবে, কে ক্ষমতায় আসবে কিংবা কোন নীতিতে দেশ পরিচালিত হবে—সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একমাত্র বাংলাদেশের জনগণের। কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কৌশলগত আগ্রহ গণতান্ত্রিক রায়ের বিকল্প হতে পারে না।
বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ এখানেই—একদিকে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখা। কূটনীতি মানে কারো সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা নয়; আবার অন্ধ অনুসরণও নয়। কূটনীতি মানে সমতা, সম্মান ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনা করা।
বাংলাদেশ কারো নিরাপত্তা ঝুঁকি হতে চায় না, আবার কারো ভূরাজনৈতিক দাবার ঘুঁটিও হতে পারে না। দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের পথ হওয়া উচিত—গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা আত্মমর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
পরিশেষে বলা যায়, ভারত কী চায়—তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশ কী চায় এবং জনগণ কী সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে বাইরের প্রত্যাশা নয়, জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছাই।