02/08/2026
❝রাতের নিঃসঙ্গতায় আপনি কখনোই একা নন❞
রাত গভীর। চারদিকে নীরবতা। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, অথচ আপনার চোখে ঘুম নেই। বুকের ভেতর জমে আছে কিছু না বলা কথা, কিছু দুশ্চিন্তা আর একরাশ ক্লান্তি। মনে হতে পারে—এই মুহূর্তে আমাকে বোঝার মতো কেউ নেই।
কিন্তু একজন আছেন, যিনি আপনাকে আপনার নিজের চেয়েও বেশি জানেন। যিনি আপনার নীরব কান্না, বুকের চাপা দীর্ঘশ্বাস আর মনের অপ্রকাশিত কথাগুলোও জানেন। তিনি আল্লাহ—যিনি তাঁর বান্দার খুব কাছেই আছেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন—
وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
উচ্চারণ: ওয়া নাহনু আকরাবু ইলাইহি মিন হাবলিল-ওয়ারীদ।
অর্থ: “আমি তার গলার শিরার চেয়েও তার নিকটবর্তী।”
(সূরা কাফ: ১৬)
গলার শিরা আমাদের শরীরের অত্যন্ত নিকটবর্তী একটি অংশ, যা এক মুহূর্তের জন্যও আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না। আল্লাহ এই উপমার মাধ্যমে আমাদের বুঝিয়েছেন যে, তাঁর নৈকট্য কোনো কল্পনা নয়; বরং তিনি তাঁর জ্ঞান, ক্ষমতা ও রহমতের মাধ্যমে সবসময় আমাদের সঙ্গেই আছেন।
তাহলে প্রশ্ন হলো, আমরা কেন অনেক সময় নিজেকে এত একা মনে করি?
কারণ আল্লাহ আমাদের থেকে দূরে সরে যান না, বরং আমাদের হৃদয় গাফলতের কারণে তাঁর নৈকট্য অনুভব করতে পারে না। যেমন মেঘ সূর্যকে ঢেকে দেয়, কিন্তু সূর্য কখনো আকাশ ছেড়ে চলে যায় না। তেমনি পাপ, গাফলত ও দুনিয়ার ব্যস্ততা আমাদের হৃদয়ের ওপর পর্দা ফেলে দেয়, অথচ আল্লাহ সবসময়ই কাছে থাকেন।
আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন—
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
উচ্চারণ: ওয়া ইযা সাআলাকা 'ইবাদী 'আন্নী ফাইন্নী কারীব। উজীবু দা'ওয়াতাদ-দা'ই ইযা দা'আন।
অর্থ: “আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন বলে দাও—আমি তো নিকটেই আছি। যখন কোনো আহ্বানকারী আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।”
(সূরা আল-বাকারা: ১৮৬)
লক্ষ করুন, এই আয়াতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য কোনো মধ্যস্থতার কথা বলেননি। তিনি বলেননি—অমুক হওয়ার পর ডাকো, পাপমুক্ত হওয়ার পর ডাকো কিংবা বিশেষ কোনো ভাষায় ডাকো। তিনি শুধু বলেছেন—“যখন সে আমাকে ডাকে।”
আপনার চোখের অশ্রু যদি ভাষা না পায়, তবুও তিনি তা বোঝেন। আপনার দোয়া যদি সুন্দর শব্দে সাজানো না হয়, তবুও তিনি তা শোনেন। কারণ তিনি আপনার রব।
এই সত্যটি সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছিল ইউনুস আলাইহিস সালামের জীবনে। সমুদ্রের গভীরে, মাছের পেটের অন্ধকারে—যেখানে পৃথিবীর কারো সাহায্য পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না—তিনি তাঁর রবকে ডেকেছিলেন।
لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আন্তা, সুবহানাকা, ইন্নী কুনতু মিনায-যালিমীন।
অর্থ: “আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি মহাপবিত্র। নিশ্চয়ই আমি নিজের প্রতি জুলুমকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।”
(সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৭)
তিন স্তরের অন্ধকার—রাতের অন্ধকার, সমুদ্রের অন্ধকার এবং মাছের পেটের অন্ধকার—কোনোটিই তাঁর দোয়াকে আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে বাধা দিতে পারেনি। কারণ আল্লাহ তাঁর বান্দার খুব কাছেই আছেন।
তাই জীবনের কোনো মুহূর্তে যদি নিজেকে একা মনে হয়, হতাশ হবেন না। মানুষের সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহর দরজা কখনো বন্ধ হয় না। রাতের নিস্তব্ধতায় দুই হাত তুলে শুধু বলুন—
"ইয়া কারীব! তুমি আমার খুব কাছেই আছ। আমার অন্তরকে তোমার নৈকট্য অনুভব করার তাওফিক দাও। আমার দুঃখকে সহজ করে দাও এবং আমাকে তোমার স্মরণে জীবিত রাখো।"
মনে রাখবেন, নিঃসঙ্গতা সবসময় মানুষের অনুপস্থিতির নাম নয়; অনেক সময় তা আল্লাহর আরও কাছে যাওয়ার একটি সুযোগ। যে হৃদয় আল-কারীবকে চিনে নেয়, সে কখনো প্রকৃত অর্থে একা থাকে না।
"আপনি যদি আল্লাহকে কাছে পান, তাহলে পৃথিবীর কাউকে হারিয়েও আপনি নিঃস্ব নন। আর যদি আল্লাহর নৈকট্য হারিয়ে ফেলেন, তাহলে সবকিছু পেয়েও আপনার অন্তর শূন্য থেকে যাবে।"
— আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর নৈকট্য অনুভব করার তাওফিক দান করুন। আমীন।