14/09/2026
১৯৪৭ সালে যে মানুষটাকে "জাতির পিতা" বানানো হইল, তিনি আমাদের ভাষাটা পর্যন্ত জানতেন না। কোনোদিন শিখতেও চান নাই। তাহলে এই অঞ্চলের ৪৭ এর নায়ক তিনি হন কেমনে?
৪৭ কে ধারণ করা আর জিন্নাহকে সেলিব্রেট করা এক জিনিস না।
মুসলিম লীগের জন্ম কোথায় হইছিল? ঢাকায়। আহসান মঞ্জিলে।
আর নেতৃত্ব কয়েক বছরের মধ্যে চলে গেল কাদের হাতে? ইউপি, বিহার, পাঞ্জাবের এলিটদের হাতে। বাংলা থাকল ভোটব্যাংক হয়ে। শুধুমাত্র সংখ্যা হিসেবে। সিদ্ধান্ত নিত ঐপাশের এলিটরা।
লাহোর প্রস্তাব কে উত্থাপন করছিলেন? শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। বাংলার প্রধানমন্ত্রী। মূল প্রস্তাবে লেখা ছিল "independent states"। বহুবচনে। মানে পূর্বে এক রাষ্ট্র, পশ্চিমে আরেক।
১৯৪৬ সালে দিল্লিতে সেই বহুবচন চুপচাপ একবচন হয়ে গেল। states হয়ে গেল state। করলো কে? জিন্নাহ।
এরপর ভাষার প্রশ্ন। এইখানে ব্যাখ্যার দরকারই নাই, তার নিজের মুখের কথাই যথেষ্ট।
২১ মার্চ ১৯৪৮। রমনা রেসকোর্স। জিন্নাহ ঘোষণা করলেন, উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।
তিন দিন পর কার্জন হলে একই কথা। ছাত্ররা সেদিন মুখের ওপর দাঁড়িয়ে "নো" বলছিল।
রাষ্ট্র জন্মানোর সাত মাসও হয় নাই।
পাকিস্তানের অর্ধেকের বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলে। উর্দুভাষী ১০ শতাংশেরও কম।
সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাদ। সংখ্যালঘুর ভাষা চাপিয়ে দেওয়া।
যে লোক আপনার মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রের অযোগ্য বলে ঘোষণা করেন, তাকে আপনি কোন যুক্তিতে উদযাপন করবেন?
তাহলে এই অঞ্চলের ৪৭ এর নেতা কারা?
শেরে বাংলা। বরিশালের চাখারের ছেলে। বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী।
তার রাজনীতি ধর্মের রাজনীতি আছিল না। ছিল কৃষকের রাজনীতি। মহাজনের ঋণের ফাঁদ থেকে কৃষককে বাঁচানোর আইন তার। ঋণ সালিশি বোর্ড তার। আর জমিদারি প্রথা তুলে দেওয়ার যে সুপারিশ পরে আইনে রূপ নিল, সেই কমিশনও তার গড়া।
বাংলার কৃষকের জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এই লোক এনেছেন। জিন্নাহ না।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী। ভাগ হওয়ার মুহূর্তে চেয়ারে বসা মানুষ।
তার সবচেয়ে বড় কাজ কোনটা জানেন? অখণ্ড স্বাধীন বাংলার পরিকল্পনা।
১৯৪৭ এর মে মাসে শরৎ বসু, কিরণশঙ্কর রায়, আবুল হাশিম আর তিনি মিলে একটা চুক্তিতে সই করলেন। প্রস্তাব ছিল সোজা। বাংলা ভারতেও যাবে না, পাকিস্তানেও না। বাংলা হবে আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্র।
কে ঠেকাইল? কংগ্রেস হাইকমান্ড, হিন্দু মহাসভা, আর জিন্নাহ। দিল্লি আর করাচি, দুই জায়গাই বাংলার নিজের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার মানতে রাজি হয় নাই।
২০ জুন ১৯৪৭। বেঙ্গল অ্যাসেম্বলিতে ভোট হইল। যৌথ অধিবেশনে বাংলা ভাগের বিপক্ষে পড়ল ১২৬ ভোট, পক্ষে ৯০।
মানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ভাগ চান নাই।
তারপরও ভাগ হইল। কারণ নিয়মটাই এমন বানানো ছিল যে এক পক্ষ চাইলেই ভাগ হয়ে যাবে।
বাংলা ভাগ হইছে বাংলার মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে।
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল।
বরিশালের নমশূদ্র ঘরের ছেলে। আম্বেদকরের সহযোগী। বাংলার দলিত আন্দোলনের সবচেয়ে বড় নেতা।
আম্বেদকর যখন বোম্বে থেকে গণপরিষদে ঢুকতে পারতেছিলেন না, তখন যোগেন মণ্ডলই তাকে যশোর-খুলনা থেকে নির্বাচিত করান।
পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতির আসনে বসছিলেন তিনি। জিন্নাহর নামটাও প্রস্তাব করছিলেন তিনিই। পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী।
তার যুক্তি কী আছিল? তিনি ভাবছিলেন, উচ্চবর্ণ জমিদারের শাসনের চেয়ে মুসলমান কৃষকসমাজের সাথে দলিতের স্বার্থ বেশি মেলে। দুই পক্ষই নিপীড়িত। এই হিসাবেই তিনি থেকে গেলেন। লাখ লাখ নমশূদ্রকে থেকে যেতে বললেন।
তিন বছর পর, ১৯৫০ সালে, তিনি পদত্যাগ করলেন। পদত্যাগপত্রে লিখলেন সংখ্যালঘুদের ওপর কী ঘটতেছে, প্রশাসন আর পুলিশ কী করতেছে।
যোগেন মণ্ডল আমাদের কী শেখায়?
শেখায় যে ৪৭ শুধু মুসলমানের ঘটনা না। বাংলার দলিত, নমশূদ্র, কৃষক, সবাই এর অংশীদার।
আর শেখায়, জিন্নাহর পাকিস্তান তার নিজের প্রতিশ্রুতিটাও রাখে নাই।
যে মুসলিম লীগ পাকিস্তান বানাইল, সেই মুসলিম লীগকে বাংলার মানুষ কবর দিল সাত বছরের মাথায়।
১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট। হক, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী একসাথে। ৩০৯ আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ পাইছিল হাতেগোনা কয়েকটা।
এইটা কী প্রমাণ করে?
প্রমাণ করে বাংলার মানুষ পাকিস্তান চাইছিল ঠিকই। কিন্তু জিন্নাহর পাকিস্তান চায় নাই।
৪৭ কে অস্বীকার করার কিছু নাই। ৪৭ আমাদের ইতিহাস। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি, জমিদারি উচ্ছেদের পথ খোলা, বাংলার কৃষক-প্রজার উত্থান, সবই এর সাথে বাঁধা। ৪৭ মুছে ফেললে ৫২ আর ৭১ এর ভিত্তিটাই অস্পষ্ট হয়ে যায়।
কিন্তু ৪৭ ধারণ করা মানে জিন্নাহ ধারণ করা না।
জিন্নাহর ৪৭ ছিল দিল্লি-করাচির দর কষাকষি। ভাইসরয়ের সাথে চা-চক্র। এলিটদের নিরাপত্তার হিসাব।
আমাদের ৪৭ ছিল মহাজনের হাত থেকে জমি বাঁচানোর লড়াই। জমিদারি উচ্ছেদের স্বপ্ন। নমশূদ্র কৃষকের মর্যাদার দাবি। আর অখণ্ড স্বাধীন বাংলার এক ব্যর্থ কিন্তু সাহসী চেষ্টা।
এই দুইটা এক জিনিস না। কোনোদিনই ছিল না।
যিনি আমাদের ভাষাকে অস্বীকার করছেন, যিনি ফজলুল হককে ছেঁটে ফেলছেন, যিনি লাহোর প্রস্তাবের বহুবচন একবচন বানাইছেন, যিনি বাংলার নিজের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার মানেন নাই, তাকে আমাদের নেতা বানানোর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই।
এটাই সত্য যে, জিন্নাহর ৪৭ এ বাঙালীর কোনো অবস্থান নাই।
আমাদের নেতা শেরে বাংলা। আমাদের নেতা সোহরাওয়ার্দী, আমাদের নেতা যোগেন মণ্ডল।
©️ আবু তৌহিদ মোঃ সিয়াম