14/11/2025
এনিই আমার দেখা প্রথম হকার। হয়তো আরও অনেক ফেরিওয়ালা দেখেছি। তাদের স্মৃতি মনে নেই। কিন্তু ছবির মানুষটির কথা মনে থাকার বিশেষ কিছু কারণ ছিল।
এলাকায় ঢুকলে আমার আব্দুল আজিজ নানার সঙ্গে দেখা করতেন। নানান গল্পে দুজনে মেতে উঠতেন। যদিও নানার সঙ্গে তার বয়সের ব্যবধান ছিল অনেক। তবু তাদের বন্ধুত্ব ছিল স্মরণযোগ্য। নানাকে তিনি মিতা বলে ডাকতেন। একই নাম হলে মিতা সমন্ধন করা হয়। তাতেই ধরে নিয়েছি তার নামও আজিজ।
আঙিনায় গিয়ে হাঁক ছাড়তেন, মিতা আছেন? তাকে দেখেই আমরা এগিয়ে যেতাম। আমাদের সঙ্গে এমন দুষ্টু মিষ্ট সম্পর্ক তাকে যদি কখনও শাহজাদপুর উপজেলার শহরের মধ্যে দেখতাম, আমারা নিজেদের মধ্যে বলা কওয়া করতাম, এ এ ওই যে ওই যে দ্যাক। দ্যাকরে আমাদের গা'র ফেরিওয়ালা এহনেও আইছে।
কিন্তু আমাদের কৈশোর মন তখনও জানতো না, একজন হকার শুধু এক গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না। তাদের কর্মের বিস্তার অনেকখানি এলাকাজুড়ে।
আব্দুল আজিজ নামের শিশুবান্ধব হকারটিকে আমরা ঘিরে থাকতাম। তিনি তার ব্যাগের মধ্যে থেকে এতটুকুন আলতা বের করে বিনামূল্যে ছোট বাচ্চাদের হাতের তালুতে ঢেলে দিতেন। সেটি মুহূর্তে বাচ্চারা কেউ গালে কেউ বা পায়ে লাগাতো।
সে আলতা থেকে কী যে অপূর্ব একটা ঘ্রাণ বের হতো।
এই লোকটাকে একটা শার্ট পরা অবস্থাতেই বহুদিন দেখেছি। ছাই রঙা একটা মোটা কাপড়ের হাফ হাতার শার্ট। মাথার শাদা পাকা চুলগুলোও আলতা দিয়ে রাঙানো।
মজা করে কথা বলতেন। আমরা ধরে নিয়েছিলাম তার নেই কোনো ঘরবসতি। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে আমাদের অঞ্চলে তিনি ফেরি করতেন। কোথায় থেকে তিনি এসেছেন, আমরা কেউ জানতাম না। আমি ছোটবেলা থেকে খুব কৌতূহলী ছিলাম। নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খেতো৷ আচ্ছা তার বাড়ি কোথায়? তার বউ ছাওয়াল নেই দেখেই বুঝি লোকটা আমাদের বিনামূল্যে তার ব্যাগ থেকে আলতা, সুরমা, আতর
মেখে দিতেন। তার নামও অনেকে জানেন না। একজন হকারের বাড়ি কোথায় এই তথ্যটুকুও জানার প্রয়োজনবোধ করে নি। লোকটির মুখের বিশেষ ভাষার কারণেই আমরা তাকে নানান ধরনের প্রশ্ন করতাম। তিনিও হাসিমুখে উত্তর দিতেন। সেসব শুনে আমরা গড়িয়ে যেতাম।
আমাদের এক ভাবী বলতেন, 'এ ওই ক্যারিবেরি করে কথা কওয়া ছাওয়ালডো আর আসে না। দাদার হাতে (সাথে) লোকটোর মিল আছিল। ছাওয়ালডো মনে অয় মারা গ্যাছে।'
আজ থেকে প্রায় দুই যুগ আগে আমাদের দুলাল মামা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের চাকরি নিয়ে যান নোয়াখালী। সেসব গল্পও আমরা জানি না।।একদিন আজিজ নামের এই হকারটি এসে আজিজ নানাকে জানালেন, আপনার ভাতিজা তো আমাদের ওখানে চাকরি করে। দুলাল মামার থাকার যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিছেন। সেসবের ফিরিস্তি জানিয়ে দিলেন।
এর পর দুলাল মামা ছুটি নিয়ে বাড়িতে এলে জানা গেল আরেক চমকপ্রদ কাহিনী।
আলতা সুরমা, আতর বিক্রি করা মানুষটির অর্থবিত্তের কাহিনী। বউ আছে। দুই তলা বিল্ডিংওয়ালা বাড়ি।
ছেলেরা বিদেশে থাকেন। উচ্চ শিক্ষিত তারা। অর্থাৎ চিনাধুকুড়িয়া গ্রামের সবচেয়ে ধনীকে দশবার করে কিনে নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে।
~~হাসনাত মোবারক~~