23/01/2026
পবিত্র কুরআনুল কারিমে যে জাতিটার কথা সবচেয়ে বেশি এসেছে সেটা হলো—বনি ঈসরাইল।
বনি ঈসরাইল জাতির মাঝেই এসেছিল সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নবি রাসুল। আল্লাহর অবারিত নিয়ামত আর অফুরান ক্ষমা লাভের নজিরও ঘটেছিল এই জাতির ভাগ্যে। আকাশ থেকে তাদের জন্য নাযিল হতো মান্না সালওয়ার মতো জান্নাতের খাবার।
বনি ঈসরাইল জাতির মাঝে আসা দুজন প্রসিদ্ধ রাসুল হলেন মুসা আলাইহিস সালাম এবং ঈসা আলাইহিস সালাম। কুরআনে এই দুজন রাসুলকেন্দ্রিক অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
মুসা আলাইহিস সালাম এবং ঈসা আলাইহিস সালাম দুজনেই এসেছিলেন বনি ঈসরাইল জাতির মাঝে। দুজনেই ছিলেন তাদের নবি৷ কিন্তু লক্ষণীয় ব্যাপার হলো—আপনি যদি কুরআন খুলে এই দুজনের ঘটনাকে পাশাপাশি পড়েন, একটা ছোট্ট পার্থক্য আপনার চোখে পড়বে।
কী সেই পার্থক্য, তাই তো?
সেই পার্থক্যটা হলো—আপনি যদি মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনাগুলো পড়েন, সেখানে দেখবেন তিনি বনি ঈসরাইলিদের সম্বোধন করার সময় বলতেন—‘ইয়া ক্বওমি’ বা ‘হে আমার জাতি’ বলে।
অন্যদিকে, যদি আপনি ঈসা আলাইহিস সালামের ঘটনাগুলো পড়েন, সেখানে দেখবেন তিনি বনি ঈসরাইলিদের সম্বোধন করার সময় ‘ইয়া ক্বওমি’ বলতেন না। তিনি বলতেন—‘ইয়া বনি ঈসরাইল’ তথা ‘হে বনি ঈসরাঈল’ বলে।
দুজনেই কিন্তু বনি ঈসরাইল জাতির নবি। দুজনকেই পাঠানো হয়েছিল একই জাতির কাছে৷ তাহলে, দুজনের সম্বোধনে এই ছোট্ট পার্থক্যটা কেন, তাই তো?
তাফসির বিশারদেরা বলেছেন, মুসা আলাইহিস সালাম এবং ঈসা আলাইহিস সালাম দুজনেই বনি ঈসরাইল জাতির নবি হলেও, দুজনের মাঝে একটা ছোট্ট পার্থক্য ছিল। সেই পার্থক্যটা হলো—মুসা আলাইহিস সালাম জন্মেছিলেন একটা স্বতঃসিদ্ধ প্রাকৃতিক নিয়মের মধ্যে—বাবা-মায়ের ঔরশে। কিন্তু ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মটা সেরকম প্রাকৃতিক নিয়মের মাঝে থেকে হয়নি। তাঁর জন্মটা ছিল আল্লাহর একটা মোজেযা। তিনি জন্মেছিলেন মাতা মারইয়াম আলাইহাস সালামের গর্ভে, কিন্তু ঈসা আলাইহিস সালামের কোনো পিতা ছিল না।
যেহেতু মুসা আলাইহিস সালামের একটা সরাসরি পৈতৃক ‘ব্লাড-লাইন’ ছিল বনি ঈসরাইল জাতির ভেতর, তাই বনি ঈসরাইলকে সম্বোধন করার সময় তিনি ‘ইয়া বনি ঈসরাইল’ না বলে ‘ইয়া ক্বওমি’ বা ‘হে আমার জাতি’ বলে ডাক দিতেন।
অন্যদিকে, ঈসা আলাইহিস সালামের যেহেতু সরাসরি কোনো পৈতৃক ‘ব্লাড-লাইন’ ছিল না বনি ঈসরাইলিদের মাঝে, ফলে তিনি বনি ঈসরাইলিদের ‘ইয়া ক্বওমি’ বা ‘হে আমার জাতি’ না বলে ‘ইয়া বনি ঈসরাইল’ বলে ডাক দিতেন।
পুরো কুরআন জুড়ে, এই দুটো প্যাটার্নে আপনি কিন্তু কোনোরকম হেরফের পাবেন না৷ মানে—কুরআনের অনেক জায়গাতেই তো তারা বনি ঈসরাইলিদের সম্বোধন করে কথাবার্তা বলেছেন, আদেশ দিয়েছেন, সতর্ক করেছেন। কিন্তু একটা জায়গাও পাবেন না যেখানে মুসা আলাইহিস সালাম ‘ইয়া ক্বওমি’ না বলে ‘ইয়া বনি ঈসরাইল’ বলে সম্বোধন করছেন, এবং ঈসা আলাইহিস সালাম ‘ইয়া বনি ঈসরাইল’ না বলে ‘ইয়া ক্বওমি’ বলছেন।
নট অ্যা সিঙ্গেল টাইম!
ভাষা আর শব্দের ব্যবহারের ভেতরেই যে একটা ঐতিহাসিক উপাদান লুকিয়ে রাখা যায়—এই ঘটনা তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ।
এই উদাহরণ আরও একটা ঐতিহাসিক সত্যকে সত্যায়িত করে। সেটা হলো—মাতা মারইয়াম আলাইহিস সালামের নিষ্পাপত্ব। ঈসা আলাইহিস সালাম যে পুরুষের কোনোরকম সংস্পর্শ ব্যতীতই দুনিয়ায় এসেছিলেন, সেটার একটা প্রমাণ তিনি তার এই বাছাইকৃত ‘ইয়া বনি ঈসরাইল’ শব্দদ্বয়ের মাঝেও রেখে গেছেন। এই শব্দের ব্যবহারই প্রমাণ করে, বনি ঈসরাইল জাতির মাঝে ঈসা আলাইহিস সালামের কোনো পৈতৃক ‘ব্লাড-লাইন’ নেই।
#কুরআনের_অলিতে_গলিতে_০৩