16/09/2025
শিবিরসহ ৭ খুন, ছাত্রদল পেলেই মারধর।
এই শিরোনামটি আকর্ষণীয় করে দিন
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ পাহাড় আর শ্যাওলা-ধরা দেওয়ালগুলো যেন এক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মাটি ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেবল বই-খাতার ধুলোতেই নয়, মিশেছে রক্তের দাগেও। এটি কোনো সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না, ছিল এক সন্ত্রাসের রাজত্ব, যেখানে ছাত্রলীগের হাতে খুন হন সাতটি প্রাণ। ক্যাম্পাসের বাতাস তখন কেবল আন্দোলনের স্লোগানে নয়, ভারী হয়ে উঠেছিল আর্তনাদ আর আতঙ্কে।
শিবির ট্যাগ: এক নির্মম উপাধি
প্রথম আঘাতটা এসেছিল শিবিরের ওপর। ২০১০ সাল, ক্যাম্পাসের শান্ত পরিবেশ হঠাৎই হয়ে উঠল অশান্ত। শিবিরের কর্মী মহিউদ্দিন মাসুমকে রেললাইনের ধারে কুপিয়ে হত্যা করা হলো। ২৮ মার্চ, আরেক কর্মী হারুন অর রশিদ কায়সার ট্রেন থেকে নামিয়ে নিয়ে গেলেন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা, এরপর আর তার খোঁজ মেলেনি। কেবল লাশ হয়ে ফিরেছিলেন তিনি।
২০১২ সালে ভয়াবহতা যেন নতুন মাত্রা পেল। এক শীতের সকালে, জিরো পয়েন্ট এলাকা। শিবিরের সাথী মুজাহিদুল ইসলামকে গুলি করা হলো, এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নিশ্চিত করা হলো তার মৃত্যু। একই দিনে প্রাণ হারালেন শিবিরের আরেক সদস্য মাসউদ বিন হাবিব। জিরো পয়েন্টেই তাকেও গুলি ও কোপানো হয়। যখন তার নিথর দেহ মসজিদের সামনে পড়ে ছিল, তখনো হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, এ মৃত্যুগুলোর কোনো বিচার হবে না।
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে এই নির্মমতার শেষ শিকার হন শিবিরের সদস্য মামুন হোসাইন। প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়েছিল তাকে। তার দুলাভাই আজও বলেন, “প্রকাশ্যে খুন করা হয়েছিল আমার শ্যালককে, কিন্তু পুলিশ মামলা নেয়নি। উল্টো আমাদেরই চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল।” এই পাঁচটি হত্যাকাণ্ডই যেন এক অলিখিত নিয়তির পুনরাবৃত্তি—হত্যাকাণ্ড ঘটবে, অভিযোগ উঠবে, কিন্তু বিচার হবে না। ‘শিবির ট্যাগ’ দিয়ে শুধু এই পাঁচজনকে নয়, অন্তত এক হাজার ছাত্রকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। একসময় শিক্ষার আলো ছড়ানো এই ক্যাম্পাসে ছাত্র পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক পরিচয়।
নিজ দলের রক্তে ভেজা মাটি
কিন্তু এই নিষ্ঠুরতা কেবল বাইরের শত্রুর জন্য বরাদ্দ ছিল না। নিজেদের ভেতরের কোন্দলও কেড়ে নেয় দুটি প্রাণ। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের বন্দুকযুদ্ধে খুন হন সাধারণ ছাত্র তাপস সরকার। তার সহপাঠীরা মামলা করেছিলেন, কিন্তু সেই বিচারের পথ ছিল দীর্ঘ ও ধীর।
এর দুই বছর পর, ২০১৬ সালে, আরেক মর্মান্তিক ঘটনা। ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরীকে তার নিজ বাসায় ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবার বিশ্বাস করে, এটি আত্মহত্যা নয়, তাকে হত্যা করা হয়েছিল। দিয়াজের মা জাহেদা চৌধুরী আজও সন্তানের বিচার চেয়ে লড়াই করছেন, তার চোখের জল যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে জমে থাকা রক্তের দাগের মতোই ফিকে হয়নি।
ছাত্রদল: আক্রমণের আরেকটি লক্ষ্য
ছাত্রদল ক্যাম্পাসে দৃশ্যত দুর্বল হলেও, ছাত্রলীগের আক্রমণের শিকার হতে তাদেরও কোনো ছাড় ছিল না। ছাত্রদলের নেতাদের দেখলেই চলত বেধড়ক মারধর। তাদের মিছিল ভেঙে দেওয়া হয়েছে, ব্যানার-পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন সালাম মিঠু বলেন, “শেখ হাসিনা পালানোর আগ পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ একতরফা তাণ্ডব চালিয়েছিল।” ছাত্রদলের আরেক সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম শহীদ বলেন, “যখন আমরা মিছিল করতাম, তখন হামলা হতো। প্রশাসন আমাদের অভিযোগ কানেই তুলতো না।”
এই সমস্ত ঘটনায় একটাই চিত্র ফুটে ওঠে—একদলীয় আধিপত্য, যার কোনো জবাবদিহি ছিল না। খুন, মারধর, নির্যাতন—সবই যেন ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। যারা বেঁচে আছেন, তারা সেই অন্ধকার দিনের সাক্ষী। তাদের স্মৃতিতে এখনো তাজা হয়ে আছে স্বজন হারানোর বেদনা, বন্ধুকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখার ভয়াবহতা, এবং বিচারহীনতার এক নির্মম বাস্তবতা। চবির সবুজ পাহাড় হয়তো আজো সেইসব প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কেন তাদের এই রক্ত ঝরলো, আর কেনই বা সেই রক্তের কোনো হিসাব রাখা হলো না?