05/06/2025
🌺কুরবানির শিক্ষা🌺
পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহের আলোকে কুরবানির তিনটি পরিভাষা পাওয়া যায়:-
১. কুরবানি
২. নুসুক
৩. যবেহ্
⚫ কুরবানি
আরবি "قُرْبَان" শব্দটি “قُرْبٌ” শব্দ থেকে এসেছে।
অর্থ: আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার জন্য উৎসর্গ করা কোনো জিনিস।
🟧 কুরবানি হল নির্দিষ্ট দিনে (১০-১২ জিলহজ) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট পশু জবাই করা।
শরিয়তের পরিভাষায় : "উযহিয়া" (أضحية) বলা হয়।
💠 কুরবানির হুকুম -
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
অর্থ : তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায আদায় করো এবং কুরবানি করো। (সূরা কাওসার-১০৮: ২)
⚫ নুসুক
“নুসুক” শব্দটি হজ্ব, উমরা, আকিকা ও আল্লাহর রাস্তায় পশু জবাই করাকে বোঝায়।
💠 নুসুকের হুকুম -
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
অর্থ : নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানি আমার জীবন ও মৃত্যু শুধু মাত্র আল্লাহর জন্য।
(সূরা আন’আম-৬: ১৬২)
⚫ যবেহ্
“যবেহ” বলতে কোনো প্রানির গলায় ছুরি চালিয়ে হত্যার প্রক্রিয়াকে বুঝায়।
💠 যবেহের হুকুম
إِنِّي أَرَىٰ فِي ٱلْمَنَامِ أَنِّيٓ أَذْبَحُكَ
অর্থ : আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ্ করছি। (সূরা সাফ্ফাত-৩৭: ১০২)
🟧 যবেহ্ হলো কুবানির বাহ্যিক দিক।
✅ সংক্ষেপে :
১. "কুরবানি" হলো নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহর জন্য পশু যবাই করা।
২. "নুসুক" হলো হজ্ব,ওমরা,আকিকা, ইত্যাদি ইবাদাত।
৩. "যবেহ" হলো যেকোনো সময় হালাল পদ্ধতিতে প্রানির গলা কা~টা।
⬛ কুরবানির শিক্ষা
১. তাকওয়া ভিত্তিক জীবন :
আল্লাহ তায়ালা বলেন -
اتۡلُ عَلَیۡهِمۡ نَبَاَ ابۡنَیۡ اٰدَمَ بِالۡحَقِّ ۘ اِذۡ قَرَّبَا قُرۡبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنۡ اَحَدِهِمَا وَ لَمۡ یُتَقَبَّلۡ مِنَ الۡاٰخَرِ ؕ قَالَ لَاَقۡتُلَنَّكَ ؕ قَالَ اِنَّمَا یَتَقَبَّلُ اللّٰهُ مِنَ الۡمُتَّقِیۡنَ
অর্থ : যখন তারা উভয়ে কুরবানি করেছিল, তখন একজনের কুরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের কবুল হলো না। সে বলল, আমি তোমাকে হত্যা
করবই। অপরজন বলল, অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকিদের কুরবানি কবুল করেন। (সুরা মায়িদা-৫: ২৭)
🟧 উদাহরণ : হাবিল,কাবিলের ঘটনা।
২. খালিস নিয়ত :
আল্লাহ তায়ালা বলেন -
لَنْ يَنَالَ ٱللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ ٱلتَّقْوَىٰ مِنكُمْ
ইরশাদ হচ্ছে:-
আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছে না, বরং আল্লাহর কাছে তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে।
(সূরা হজ-২২: ৩৭)
আল্লাহ তায়ালা বলেন -
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَ انۡحَرۡ
ইরশাদ হচ্ছে :-
অতঃপর তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করো এবং কুরবানি করো।(সুরা কাউসার১০৮: ২)
আল্লাহর রাসুল (স.) বলেন -
عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ : إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّةِ، وَإِنَّمَا لِامْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ فَهِجْرَتُهُ إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ، وَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ لِدُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ امْرَأَةٍ يَتَزَوَّجُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ
অর্থ : উমার (রা.)বলেন:-
আমি রাসূল (স.) কে বলতে শুনেছি যে, সকল কাজ নিয়ত উপর নির্ভরশীল। আর মানুষের জন্য তাই প্রাপ্য হবে, যার সে নিয়ত করবে। অতএব যে ব্যক্তির হিজরত আল্লাহর সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যে ও তাঁর রসূলের জন্য হবে; তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্যই হবে। আর যে ব্যক্তির হিজরত পার্থিব সম্পদ অর্জন কিংবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত সেই উদ্দেশ্যেই হবে।
[বুখারি হাদীস নং ১, ৫৪, ২৫২৯, ৩৮৯৮, ৫০৭০, ৬৬৮৯, ৬৯৫৩, মুসলিম ১৯০৭, তিরমিযি ১৬৪৭, নাসায়ি ৭৫, ৩৪৩৭, ৩৭৯৪, আবু দাউদ ২২০১, ইবন মাজাহ ৪২২৭, আহমদ ১৬৯, ৩০২]
৩. আনুগত্য, ও আত্মত্যাগ :
আল্লাহ তায়ালা বলেন -
رَبِّ هَبۡ لِیۡ مِنَ الصّٰلِحِیۡنَ
অর্থ : হে আমার রব, আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন।
(সুরা সফ্ফাত-৩৭: ১০০)
আল্লাহ তায়ালা বলেন -
فَبَشَّرۡنٰهُ بِغُلٰمٍ حَلِیۡمٍ
অর্থ : অতঃপর তাকে আমি পরম ধৈর্যশীল একজন পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম।
(সুরা সফ্ফাত-৩৭: ১০১)
আল্লাহ তায়ালা বলেন -
فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ ٱلسَّعۡيَ قَالَ يَٰبُنَيَّ إِنِّيٓ أَرَىٰ فِي ٱلۡمَنَامِ أَنِّيٓ فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعۡیَ قَالَ یٰبُنَیَّ اِنِّیۡۤ اَرٰی فِی الۡمَنَامِ اَنِّیۡۤ اَذۡبَحُكَ فَانۡظُرۡ مَاذَا تَرٰی ؕ قَالَ یٰۤاَبَتِ افۡعَلۡ مَا تُؤۡمَرُ ۫ سَتَجِدُنِیۡۤ اِنۡ شَآءَ اللّٰهُ مِنَ الصّٰبِرِیۡنَ
অর্থ : অতঃপর যখন সে তার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছালো, তখন সে বলল, ‘হে প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি, অতএব দেখ তোমার কী অভিমত’; সে বলল, ‘হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।(সুরা সফ্ফাত-৩৭: ১০২)
আল্লাহ তায়ালা বলেন -
فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ
অর্থ : অতঃপর যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল।(সুরা সফ্ফাত-৩৭: ১০৩)
আল্লাহ তায়ালা বলেন -
وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ
অর্থ : এবং ইব্রাহিম তাঁকে যবেহ করার জন্য শায়িত করল। (সুরা সফ্ফাত-৩৭: ১০৪)
আল্লাহ তায়ালা বলেন -
قَدۡ صَدَّقۡتَ الرُّءۡیَا ۚ اِنَّا كَذٰلِكَ نَجۡزِی الۡمُحۡسِنِیۡن
অর্থ : তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। নিশ্চয় আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি।(সুরা সফ্ফাত-৩৭: ১০৫)
🟧 এই আয়াত গুলোতে মহান আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন। কুরবানীর শিক্ষা এখানেই—আল্লাহর আদেশে নিজের সব কিছু উৎসর্গ করে দেওয়ার মানসিকতা। আর এটাই আত্মত্যাগ।
৪. সুখ ও দুঃখ ভাগাভাগি করা :
আল্লাহ তায়ালা বলেন -
فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا ٱلْبَائِسَ ٱلْفَقِيرَ
তোমরা কুরবানির গোশত খাও এবং অভাবগ্রস্ত দরিদ্রকে খাওয়াও।(সূরা হজ-২২: ২৮)
🟧 কুরবানি আমাদেরকে নিজে খাও অপরকে তাই খাওয়ানোর শিক্ষা দেয়। কেবল নিজে খাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজের দরিদ্র, অসহায় ও নিঃস্বদের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়। নিজের সুখ ও দুঃখকে সকলের মাঝে ভাগাভাগি করা, সকল হিংসা-বিদ্বেষ ছুড়ে ফেলে সকলকে বুকে টেন নেওয়ার শিক্ষা দেয় কুরবানি।
৫. প্রশ্ন ছাড়াই আল্লাহর বিধানকে মেনে নেয়া :
🟧 হযরত ইসমাঈল (আ.) যেমন কোনো প্রশ্ন ছারাই আল্লাহর বিধানকে মেনে নিয়েছিলো,তেমনি আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর সকল বিধান বিনাদিধায় মেনে নিতে হবে।
৬. সবচেয়ে প্রিয় বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় করা :
আল্লাহ তায়ালা বলেন -
لَنۡ تَنَالُوا الۡبِرَّ حَتّٰی تُنۡفِقُوۡا مِمَّا تُحِبُّوۡنَ ۬ؕ وَ مَا تُنۡفِقُوۡا مِنۡ شَیۡءٍ فَاِنَّ اللّٰهَ بِهٖ عَلِیۡمٌ
অর্থ : তোমরা কখনো সওয়াব অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না ব্যয় করবে তা থেকে, যা তোমরা ভালবাসো। আর যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।
(সূরা আলে ইমরান-৩: ৯২)
🟧 হযরত ইব্রাহিম (আ.) প্রিয় সন্তান উৎসর্গে প্রস্তুত ছিলেন।
৭. আদর্শ পরিবার গঠন :
🟧 হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.) এর পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, আনুগত্য, পিতা ও পুত্রের মুয়ামিলাত পরিবার গঠনের শিক্ষা।
৮. ত্যাগের মানসিকতা :
🟧 কেবল পশু নয়, আল্লাহর পথে নিজের স্বার্থও বিসর্জন দেওয়ার শিক্ষা কুরবানি দেয়। কুরবানির মাধ্যমে নিজ মনের পশুত্বকে ঝেরে ফেলে ত্যাগের মানসিকতা তৈরির শিক্ষা দেয়।
🟢 হাদীসের আলোকে কুরবানির ফজিলত
১. কুরবানি হলো মহান ইবাদত :
রাসূল (স.) বলেন -
مَا عَمِلَ آدَمِيٌّ مِنْ عَمَلٍ يَوْمَ النَّحْرِ أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ
অর্থ : কুরবানির দিনে মানুষের যত আমলই হোক না কেন, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় হলো রক্ত ঝরানো বা কুরবানি। (তিরমিযি: ১৪৯৩)
২. পশুর অঙ্গে সওয়াব :
রাসূল (স.) বলেন -
فَإِنَّهَا تَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِقُرُونِهَا وَأَشْعَارِهَا وَأَظْلَافِهَا، وَإِنَّ الدَّمَ لَيَقَعُ مِنَ اللَّهِ بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ عَلَى الْأَرْضِ
অর্থ : প্রত্যেক পশু কিয়ামতের দিন তার শিং, লোম ও খুরসহ উপস্থিত হবে, আর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়।(তিরমিযি: ১৪৯২)
✍️ লেখক
বাদশা ফাহাদ
খতিব,বাইতুন নুর জামে মসজিদ
সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা
Badsha Fahad #কুরবানির_আলোচনা #বাদশা_ফাহাদ #কুরবানির_শিক্ষা া #ইসলামী_জ্ঞান #হাদীস #তাফসীর #আত্নসমর্পণ #তাকওয়া #ত্যাগ_ও_ভাগাভাগি #কোরবানির_ফজিলত #সুন্দরগঞ্জ