01/09/2025
বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায় বিভিন্ন অঞ্চলে পা ছুঁয়ে সালাম করার প্রচলন রয়েছে। বিশেষ করে বিয়ে বাড়ী কিংবা বিয়ের পার্টি হলে নববধুর সাথে যখন স্বামীর সাক্ষাৎ হয় তখন আশেপাশে বয়স্ক মুরব্বীদের পা ছুঁয়ে সালাম করার একটি প্রচলন দেখা যায়। এই সালাম করার মধ্য দিয়ে দুই পরিবারের মুরব্বীদের সাথে নবদম্পতির পরিচিতি পর্ব ঘটে। এছাড়া বিভিন্ন পারিবারিক উৎসব, ঈদ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে পা ছুঁয়ে বিশেষ সালামের প্রচলন রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বিভিন্ন পীরের দরবারে ভক্তরা পীরের পা ছুঁয়ে সালাম করছেন। পা ছুঁয়ে সালাম ইসলামে জায়েজ কিনা তা আমরা অনেকে জানিনা। বিষয়টি জানার পূর্বে একটি বিষয় চিন্তা করা যাক। আমরা জানি সালাম দেয়া সুন্নত, উত্তর দেয়া ওয়াজিব। সঠিকভাবে সালাম দেওয়ার নিয়ম হলো, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ (তিরমিজি ২৬৮৯)। সালামের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ জবাব হলো, ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ (সিলসিলা সহিহা ৮১৭)।
হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত রসুলুল্লাহ সা-এর কাছে একজন লোক এসে বললেন, আসসালামু আলাইকুম। নবী করিম সা. বললেন, ১০ (নেকি)। তারপর অন্য এক লোক এসে বললেন, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। নবী করিম সা. বললেন, ২০। অতঃপর আরেক লোক এসে বললেন, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। নবী করিম সা. বললেন, ৩০ (আবু দাউদ: ৫১৯৫; তিরমিজি: ২৬৮৯)। আমাদের মাঝে অনেকেই সালামের জবাব সঠিকভাবে দিতে পারি না। অথচ এটা একটা দোয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ”আর যখন তোমাদেরকে সালাম দেয়া হবে তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দেবে, অথবা জবাবে তাই দেবে। নিশ্চয় আল্লাহ সব বিষয়ে পূর্ণ হিসাবকারী” (সুরা নিসা, আয়াত-৮৬)। তাহলে ভেবে দেখুনতো যেখানে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন মুখে উচ্চারন করে সালাম ও তার জবাব দিতে হবে। তাহলে আমরা পু ছুঁয়ে কিভাবে সালাম দেই। যার পা ছুঁয়ে সালাম করলেন, সেই ব্যাক্তি কি আবার আপনার পা ছুঁয়ে সালামের জবাব দেয়? কারন সালামের জবাব দেওয়াতো ওয়াজিব।
সুতরাং পা ধরে সালাম দেওয়া ইসলামি পদ্ধতি নয়। ইসলাম পা ছুঁয়ে সালাম দেওয়ার মতো অদ্ভুত শিক্ষা আমাদের দেয়নি। এটা স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি কিংবা বাবা-মা কারো জন্যই জায়েজ নেই। সবাইকে মুখেই সালাম দেওয়ার নিয়ম ইসলাম জায়েয করেছে।
হাদিসে বড়জোর মুসাফাহা-মুআনাকার কথা এসেছে, কিন্তু পা ছুঁয়ে সালামের কথা আসেনি। সুতরাং উম্মত হিসেবে আমাদের উচিত- আসসালামু আলাইকুম....বারাকাতুহ বলে সালাম দেওয়া।
আনাস (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি যখন তার কোনো ভাই বা বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তখন সে কি মাথা ঝুঁকাবে বা তাকে জড়িয়ে ধরবে বা চুমু খাবে? তিনি বললেন, না। লোকটি বলল, তাহলে কি কেবল হাত ধরবে ও মুসাফাহা করবে? রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, হ্যাঁ।’ (তিরমিজি: ২৭২৮; ইবনে মাজাহ: ৩৭০২; আহমদ: ১৩০৪৪)
রাসুলুল্লাহ (স.) আল্লাহ ছাড়া কারো সামনে মাথা ঝুঁকাতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং বর্তমান সমাজে প্রচলিত পা ছুঁয়ে সালাম বা কদমবুচি করা মাকরুহ। বিশেষত সালামের সময় কারো সম্মানে মাথা ঝোঁকানো শরিয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। (আদ্দুররুল মুখতার : ২/২৪৫, রদ্দুল মুহতার : ৬/৩৮৩)
কোন কোন ব্যাক্তি বা সময়ে সালাম দেওয়া যাবেনা:
যে ব্যক্তি সালামের উত্তর দিতে অক্ষম তাকে সালাম দেয়া মাকরুহ। যেমন সালাত, আজান-ইকামত, জিকর , তিলাওয়াত, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, খানাপিনা ও প্রস্রাবরত ব্যক্তিকে সালাম দেয়া, গুনাহের কাজে লিপ্ত ব্যক্তিকে সালাম দেয়া, স্ত্রী সহবাস ইত্যাদি অবস্থায় সালাম দেয়া মাকরুহ। (রদ্দুল মুহতার : ১/৪১৪)।
হিন্দু ধর্মের অনুসারিদের সালাম দেওয়ার নিয়ম:
ইসলাম ধর্ম মতে হিন্দুদের ‘সালাম’ দেওয়া বৈধ নয়। কোনো প্রয়োজনে যদি দিতেই হয় তাহলে বলবে ‘আসসালামু আল মানিত্তাবাআল হুদা’। আর না জেনে কোন হিন্দু ব্যাক্তিকে সালাম দিয়ে ফেললে কোনো সমস্যা নেই। আর অমুসলিমরা আপনাকে সালাম দিলে তার উত্তরে শুধু ‘ওয়া আলাইকুম’ বলবেন।
এছাড়া কোন অমুসলিমকে ‘সালাম’ দেওয়া বৈধ নয়। কোনো প্রয়োজনে দিতে হলে ‘আসসালামু আল মানিত্তাবাআল হুদা’ বলবে। আর অমুসলিমরা সালাম দিলে তদুত্তরে শুধু ‘ওয়া আলাইকুম’ বলবে।
তবে অমুসলিমদের সঙ্গে যাবতীয় লেনদেন, সদাচরণ ও সাধারণ সম্পর্ক রাখা বৈধ। (সুরা মায়েদা, আয়াত ৫১, সুরা আল ইমরান, আয়াত : ১১৮, আল বাহরুর রায়েক : ৮/৩৭৪, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া : ১৯/৫৪৫, ফাতাওয়ায়ে ফকিহুল মিল্লাত : ১২/১০৩)
অনুলিখন :
মাহবুবুর রহমান চৌধুরী
বাংলাদেশী নাগরিক
তথ্য সুত্র: দৈনিক যুগান্তর,সময় নিউজ
ছবি: চ্যাটজিপিটি