30/05/2026
চার বছরে বাবার শেখা জীবন: আমার সন্তানের জন্মদিনে কিছু কথা
আজ আমার সন্তানের জন্মদিন। চার বছর পূর্ণ হলো ওর। এই চার বছরে ও যতটা বড় হয়েছে, তার চেয়েও বেশি বদলেছি হয়তো আমি।
একসময় আমি ছিলাম একেবারেই বাঁধনহারা স্বভাবের মানুষ। আত্মীয়-স্বজন অনেকেই বলতেন, “তোর দ্বারা সংসার হবে না। এত বাউন্ডুলে ছেলে সংসার সামলাবে কীভাবে?” কথাগুলো শুনে খারাপ লাগত না, কারণ আমিও মনে মনে তাই ভাবতাম। এক জায়গায় বেশিদিন স্থির থাকতে পারতাম না, নিজের মতো করে চলতেই ভালো লাগত।
তারপর প্রকৃতির নিয়মে বিয়ে হলো। সংসার শুরু হলো। কিছুদিন পর সন্তানও এলো জীবনে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বিয়ের পর থেকেই নিজের ভেতরে পরিবর্তন টের পেতে শুরু করলাম। যে মানুষটা একসময় নিজের কথাই বেশি ভাবত, সে ধীরে ধীরে দায়িত্বের কাছে হার মানতে শুরু করল। সংসারের প্রয়োজনগুলো নিজের প্রয়োজনের আগে জায়গা নিতে লাগল। স্ত্রীকে কখনো বলতে হয়নি, “এটা লাগবে, ওটা লাগবে।” যতটুকু সামর্থ্য ছিল, মনে হয়েছে যা করলে আমাদের জীবন একটু সহজ হবে, সাধ্যমতো তা করার চেষ্টা করেছি।
ফলাফল হলো, একসময় ঘর ভরে গেল নানান জিনিসে। এতটাই যে শেষ বদলির সময় ১৪ ফুটের ট্রাক ভর্তি করে সংসারের জিনিসপত্র নিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে। আজ ভাবি, আমাদের অবস্থান অনুযায়ী এত কিছু হয়তো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু মানুষ তো শুধু প্রয়োজনের জন্য বাঁচে না, কিছু স্বপ্নের জন্যও বাঁচে। কথায় আছে, “সখের তোলা আশি টাকা।”
সংসার করতে করতে একসময় বুঝলাম, সারাদিনের পরিশ্রম শেষে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় তার ঘর। দিনের শেষে শান্তির জায়গাটা আসলে এই ছোট্ট সংসারই। অথচ এই সংসারের শান্তি ধরে রাখার জন্য একজন পুরুষের ভেতরে কত ঝড় বয়ে যায়, সেটা হয়তো আরেকজন পুরুষই সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারে।
ভবিষ্যতের চিন্তা, বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান—সব মিলিয়ে দায়িত্বের একটা অদৃশ্য পাহাড় প্রতিদিন কাঁধে বহন করতে হয়।
তবে একটা জায়গায় আমি সত্যিই ভাগ্যবান। আমার বাবা-মা কখনো আমার ওপর ভরসা করে চলতে চাননি। একমাত্র ছেলে হয়েও কখনো বলেননি, “আমাদের জন্য এটা কর, ওটা কর।” বরং সবসময় বলেছেন, “তোরা ভালো থাকলেই আমরা ভালো আছি।”
এই কথাগুলো শুনলে ভালো লাগে, আবার বুকের ভেতর কোথাও একটা কষ্টও জন্ম নেয়। কারণ মনে হয়, এমন বাবা-মায়ের জন্য আমি কি সত্যিই আমার দায়িত্বটুকু ঠিকভাবে পালন করতে পেরেছি? সত্যিটা স্বীকার করতে ভয় নেই, আসলেই বলার মত কোন দায়িত্বই পালন করিনি আমি😭
বিয়ের পর স্ত্রীকে কখনো নিজের থেকে দূরে রাখিনি। পরে সন্তানকেও না। দূরে থাকতে হয়েছে শুধু বাবা-মাকেই। পরিস্থিতির কারণে। তারা কখনো অভিযোগ করেননি। আমার মা তো বিয়ের মাত্র ২২ দিনের মাথায় স্ত্রীকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন,
> “তোরা একসাথে থাক। একটা মেয়ে বিয়ের পর স্বামীর কাছে যতটা সুখে থাকে, শ্বশুর-শাশুড়ি ততটা সুখ দিতে পারবে না।”
সেদিন কথাটা শুনে খুব ভালো লেগেছিল। আজও লাগে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারছি, এর একটা অন্য দিকও ছিল।
একটা মেয়ে যখন নতুন সংসারে আসে, তখন তাকে নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ, নতুন সম্পর্ক—সবকিছুর সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হতে হয়। শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ-দেবর, পরিবারের রীতি—এসব বুঝে উঠতেও সময় লাগে। আমার স্ত্রীর সেই সময়টা খুব একটা পাওয়া হয়নি। ফলে একটা দূরত্ব, একটা না-বোঝাবুঝির জায়গা হয়তো শুরু থেকেই রয়ে গেছে।
এখন আর এসব নিয়ে খুব বেশি ভাবি না। জীবন যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলুক। শুধু মাঝে মাঝে বাবা-মায়ের কথা ভেবে মনটা একটু খারাপ হয়।
আমি সবসময় একটা জিনিস চেয়েছি—আমার মূল্যবোধটুকু যেন কাছের মানুষের কাছে টিকে থাকে। সবাইকে বলে বেড়াতে হবে না আমি কত কিছু করি। কিন্তু আচরণে যেন অন্তত এটা বোঝা যায় যে, “হ্যাঁ, তুমি আমাদের জন্য ভাবো। তুমি চেষ্টা করো। তোমার জন্যই আমরা কিছুটা ভালো আছি।”
এটুকু স্বীকৃতি পেতে চাওয়া কি খুব বেশি কিছু?
দিন শেষে একজন মানুষ নিজের কাছেও তো জানতে চায়, সে কতটা সফলভাবে তার প্রিয় মানুষদের ভালো রাখতে পেরেছে।
আজ আমার সন্তান চার বছরে পা দিল। একদিন সেও বড় হবে। সেও হয়তো সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নেবে। তখন মাঝে মাঝে ভয় হয়—আমি যেভাবে সবকিছু সামলানোর চেষ্টা করি, ও কি পারবে?
হয়তো পারবে। কারণ পৃথিবীর প্রায় সব দায়িত্ববান পুরুষই কোনো না কোনোভাবে এই লড়াইটা চালিয়ে যায়।
তবু স্বীকার করতেই হবে, কখনো কখনো খুব ক্লান্ত লাগে।
যখন অনেক চেষ্টা করার পরও প্রিয় মানুষের মুখে অপ্রাপ্তির ছাপ দেখি, যখন নিজের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন শুনতে হয়, যখন মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে এত কিছুর পরও আমি যথেষ্ট নই—তখন সত্যিই ভেতরটা ভেঙে পড়ে।
তখন মনে হয়, এটাই হয়তো একজন পুরুষের জীবন।
একসময় যে মানুষটা নিজের স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকত, সে ধীরে ধীরে অন্যদের জন্য বাঁচতে শেখে। আর নিজের জন্য বাঁচার সময়গুলো কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
আজ আমার সন্তানের জন্য কিছু কথা লিখে রেখে যেতে চাই।
বাবা,
যখন তুমি বড় হবে, হয়তো কোনো একদিন এই লেখাটা পড়বে।
তোমাকে শুধু একটা কথাই বলব—ভালোবাসবে মন দিয়ে, দায়িত্ব পালন করবে নিষ্ঠা দিয়ে, কিন্তু নিজেকে কখনো পুরোপুরি হারিয়ে ফেলো না।
কাউকে তোমার চিন্তা, স্বপ্ন আর আত্মপরিচয়ের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব দিও না।
কারণ মানুষ যখন নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে দেয়, তখন একসময় সে বুঝতে পারে—সে যতই করুক, তার প্রাপ্তি সবসময় সমান হয় না।
নিজেকে হারিয়ে ফেলে কাউকে সুখী করা যায় না।
আর একটা কথা—
তোমার মাকে কখনো ছেড়ে যেও না। তাকে কষ্ট দিও না। সম্পর্কের মূল্য যতদিন বোঝা যায়, ততদিনে অনেক সময় অনেক দেরি হয়ে যায়।
আমাকে নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। আমি চাই, তুমি শুধু একজন ভালো মানুষ হও। দায়িত্ববান হও। কিন্তু নিজের ভেতরের মানুষটাকে বাঁচিয়ে রেখো।
আজ তোমার চার বছরের জন্মদিনে, একজন বাবার সবচেয়ে বড় প্রার্থনা এটাই।
শুভ জন্মদিন, বাবা।
তুমি বড় হও, মানুষ হও, আর নিজের আলোয় পৃথিবীকে চিনতে শেখো। ❤️