05/08/2026
আমিও চাকরি করবো আমি শুধু গৃহপালিত বউ হয়ে থাকতে পারবো না।
মানে? তাহলে আমি তোমার স্বামী হয়ে ঘরে চুড়ি পড়ে বসে থাকবো? আমার চাকরির বেতন দিয়ে কি তোমাকে খাওয়াতে পড়াতে পারছি না নাকি?
যে বিয়ের ৭ বছর পর দুই বাচ্চার মা হয়ে বলো চাকরি করবে। বাচ্চা সামলাবে কে? এগুলো যদি বাবা মায়ের কানে বা বাইরের কোনো লোকের কানে যায় তাহলে মানসম্মান থাকবে? বলবে যে বউ দিয়ে চাকরি করিয়ে খাচ্ছে।
আমি তখন আমার স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম.. কেন? বাচ্চা কি আমার একার যে আমি একা সামলাবো? আর মানসম্মানের কথা বলছো মানসম্মানের আগে আমার মা বাবা বোন আগে। আমার ছোট বোনটা যখন আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় তখন আমার কলিজা পু*ড়ে যায়। আমার বোন আমার কাছে কোনো কিছু চায়নি এখন পযন্ত তবে সেদিন তার ফরম ফিলাপের টাকার ১৮০০ টাকা কম ছিলো আমার কাছে টাকা চেয়েছিলো। আমি তাকে সাথে সাথে বলেছিলাম আচ্ছা তোর দুলাভাই সন্ধ্যা অফিস থেকে আসলে আমি তোর বিকাশে পাঠিয়ে দিবো।
"সেদিন আমি যখন তোমার কাছে দুই হাজার টাকা চাইলাম, তুমি কী বলেছিলে মনে আছে?"
সে কোনো উত্তর দিল না। আমি নিজেই বললাম, সেদিন তুমি বলেছিলে..
"'মাসের শেষে টাকার জন্য কানের কাছে এসে ভোঁ ভোঁ করো না তো মাছির মতো।'"
কথাটা বলতে গিয়ে আমি কান্না করে দিলাম।
এমন একটা কথা আমি কোনোদিন তোমার কাছ থেকে আশা করিনি।
টাকা না থাকলে বলতে পারতে, পরে দেব। কিন্তু আমাকে মাছির সঙ্গে তুলনা করলে কেন?
সেদিন সন্ধ্যায় যখন রূপা ফোন দিলো কিন্তু আমি ফোন রিসিভ করতে পারি নি। রিসিভ করে কি বলবো বলার মতো কোনো কিছু ছিলো না আমার কাছে।
কথা গুলো বলতে বলতে কান্না করে দিলাম।
চোখের কোণে জমা হয়ে থাকা নোনা জল চিবুক বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়লো। গলাটা দলা পাকিয়ে আসছিল, কিন্তু আজ আমি আর নিজেকে সামলালাম না। গত সাতটা বছর ধরে এই সংসার নামের সোনার খাঁচায় বন্দি হয়ে তিল তিল করে নিজের সব চাওয়া-পাওয়া বলি দিয়েছি। আজ আর চুপ থাকার কোনো উপায় নেই। বুক ফে''টে কান্না আসলেও দৃষ্টিতে ছিল এক অদম্য জেদ।
শাহেদ আমার এই চোখের জলের দিকে একপলক তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধপাস করে সোফায় বসে পড়ল। তার চেহারায় কোনো অনুশোচনা বা সহানুভূতির ছাপ ছিল না; বরং সেখানে ফুটে উঠেছিল চরম বিরক্তি আর পুরুষালী অহং*কারের বিষাক্ত ছায়া।
"তুমি একটা ছোট কথা নিয়ে অহেতুক জলঘোলা করছ," শাহেদ ঠান্ডা গলায় বলল, তবে তার কণ্ঠে ছিল অবহে*লার সুর। "মাসের শেষ দিনগুলোতে অফিসে কত চাপ থাকে তুমি জানো? আমার হিসাব মেলাতে নাভিশ্বাস ওঠে। সেই সময় হঠাৎ করে এসে টাকা চাইলে মাথা ঠিক থাকে? আর তোমার বোনকে না হয় চার পাচ দিন পর সামনের মাসে টাকাটা দেয়া যেত। এত নাটক করার কী ছিল?"
আমি শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখটা মুছে নিলাম। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শাহেদের মুখোমুখি হয়ে বললাম, "নাটক? কোনটা নাটক শাহেদ? একটা ১৭ বছরের মেয়ে, যে জীবনে প্রথমবার তার একমাত্র বোনের কাছে একটু ভরসা পেয়ে কিছু চেয়েছিল—তার সেই ভরসা ভে*ঙে দেওয়াটা নাটক? টেস্ট পরীক্ষার ফরম ফিলাপের ডেট কি তোমার মাসের শেষ আর শুরুর হিসাব মেনে চলবে?
পরদিন জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল! তুমি জানো রূপা সারা রাত ঘুমাতে পারেনি? আর আমি... আমি সারা রাত নিজের অযোগ্যতার আ*গুনে পুড়েছি।"
জানি না পরে আমার বাবা এক হাত প্যারালাইজড নিয়ে কিভাবে টাকা জোগাড় করেছিলো। তবে এটুকু জানি জোগাড় করেছিলো।
"অযোগ্যতা মানে?" শাহেদ সুর চড়িয়ে বলল। "তুমি এই বাড়িতে কিসের কষ্টে আছ, হ্যাঁ? এসি রুমে থাকছ, যা ইচ্ছা রান্না করে খাচ্ছ, যা পরতে চাইছ পাচ্ছ। তুমি তো রাজরাণীর মতো আছ! তোমার বাপের বাড়ির অভাব মেটাতে পারছি না বলে আমি খারাপ হয়ে গেলাম?"
শাহেদের মুখে ‘বাপের বাড়ির অভাব’ কথাটা শুনতেই আমার পুরো শরীরে যেন বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল। বিয়ের সময় বাবা সাধ্যের বাইরে গিয়ে যৌ*তুক না দিলেও জামাইকে আপ্যায়ন করতে কোনো কমতি রাখেননি। আজ সেই বাবাকে, সেই পরিবারকে এমন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য!
"খবরদার শাহেদ!" আমি শক্ত গলায় আঙুল তুলে তাকে সতর্ক করলাম। "আমার বাপের বাড়িকে এর মধ্যে টানবে না। রাজরাণীর মতো আছি, তাই না? এই রাজরাণী সকাল ছয়টা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্য পিঠ সোজা করে বসতে পারে না। তোমার মা-বাবার সেবা, তোমার দুই বাচ্চার সার্বক্ষণিক দেখাশোনা, ধোয়ামোছা, রান্না—এগুলো যদি কোনো কাজের লোককে দিয়ে করাতে, তবে মাসে অন্তত পনেরো-বিশ হাজার টাকা গুনতে হতো। আমি বিনামূল্যে ২৪ ঘণ্টা খেটে যাওয়া এক দা*সী ছাড়া আর কিছুই নই। আর বিনিময়ে আমার নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব নেই, একটা টাকা নিজের স্বাধীনতায় খরচ করার অধিকার নেই!"
শাহেদ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। "খুব তো হিসাব শিখেছ দেখছি! তা চাকরিটা করবে কোথায়? কে দেবে তোমাকে চাকরি? টেনে টুনে অনার্স শেষ করার পর সাত বছর ধরে হাড়িপাতিল ঠেলছ। এখন তো কোনো কোম্পানিতে কাস্টমার কেয়ারের চাকরিও পাবে না। বাস্তবতা বোঝো, আনিকা। আবেগে ভেসে লাফ দিও না। মুখ থুবড়ে পড়বে।"
শাহেদের প্রতিটি কথা আমার আত্মসম্মানে চাবুকের মতো আ**ঘাত করছিল। হ্যাঁ, বিয়ের পর পরই অনার্স শেষ বর্ষের পরীক্ষাটা কোনোমতে দিয়েছিলাম। রেজাল্টও ভালোই ছিল। কিন্তু তারপরই শাহেদ আর তার পরিবারের আবদার—"সংসার আর বাচ্চা আগে, চাকরি দিয়ে কী হবে?" তাদের মিষ্টি কথায় ভুলে নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে রান্নাঘরের ধোঁয়ায় উড়িয়ে দিয়েছিলাম। আর আজ সেই ত্যাগের মূল্য দিচ্ছে তারা এভাবে?
"আমি চাকরি পাব কি পাব না, সেটা আমার যোগ্যতা দিয়ে আমি প্রমাণ করব," আমি নিজেকে বেশ শান্ত রেখে বললাম। "কিন্তু আমি আর এই পরজীবী হয়ে বেঁচে থাকার অপ*মান সহ্য করব না। আজ থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নিজের পায়ে দাঁড়াবই।"
"আমি চাকরি করতে চাই টাকার অহং*কার দেখানোর জন্য না। আমি চাই, কোনোদিন যদি আমার মা বাবা অসুস্থ হয়, আমি যেন কারও কাছে হাত না পাতি। আমার বোন যদি আবার সাহায্য চায়, আমি যেন বলতে পারি, 'চিন্তা করিস না, আমি আছি।' আমি চাই না, আমার সন্তানরা বড় হয়ে দেখুক তাদের মা নিজের পরিবারের জন্য সামান্য সাহায্যও করতে পারেনি।"
"আর আমার বাচ্চা দুটোর কী হবে?" শাহেদ গর্জে উঠল। "আয়ান আর আরিশাকে কে সামলাবে? ডে-কেয়ারে ফেলে রেখে আসবে? (পেইজ The Story Haven)
নাকি আমার বয়স্ক মা-বাবা ওদের পেছন পেছন দৌড়াবে?"
"সন্তান শুধু আমার নয়, শাহেদ," আমি বেশ দৃঢ়তার সাথে জবাব দিলাম। "ওরা তোমারও সন্তান। বাবা হিসেবে দায়িত্ব নিতে শেখো। আমি যদি সকালে ওদের আলাদা ভাবে নাস্তা বানিয়ে, পড়াশোনা বুঝিয়ে কাজ সামলাতে পারি, তুমি কেন পারবে না? যে বাবা নিজের সন্তানকে দুই ঘণ্টা সামলাতে পারে না, তার অন্যকে বড় বড় নীতি কথা বলার কোনো অধিকার নেই। আর তোমার মানসম্মানের কথা বলছ তো? বউ চাকরি করলে যদি মানসম্মান যায়, তবে সেই মানসম্মান কাঁচের মতো ভঙ্গুর! সমাজে মুখ দেখানোর ভয় থাকলে নিজের মানসিকতা বদলাও, আমাকে থামানোর চেষ্টা কোরো না।"
রুমের দরজায় তখন শাশুড়ি মা এসে দাঁড়িয়েছেন। শাহেদের আর আমার চড়া গলা শুনে হয়তো নিচে থেকে উঠে এসেছেন। তাঁর মুখে স্পষ্ট অসন্তোষ। তিনি দরজায় হেলান দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, "কী শুরু করেছ তোমরা সকাল সকাল? আনিকা, এসব কী শুনছি? ঘরের বউ বাইরে গিয়ে কাজ করবে? আমাদের বংশে কোনো দিন কোনো মেয়ে চাকরি করেনি। লোক হাসাবে নাকি তুমি?"
আমি শাশুড়ি মায়ের দিকে তাকালাম। এত বছর যাকে নিজের মায়ের মতো শ্রদ্ধা করে এসেছি, আজ তার চেহারায়ও কেবল বংশের তথাকথিত 'মানসম্মান' রক্ষার আকুতি, কিন্তু আমার বুকের ভেতরের যন্ত্রণাটা বোঝার মতো সামান্যতম সহানুভূতি নেই।
আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম। ভেতরের সমস্ত ভ''য়, দ্বিধা আর দুর্বলতাকে একপাশে সরিয়ে রেখে খুব শান্ত গলায় বললাম, "আম্মা, আপনাদের বংশের ইতিহাস বদলানোর সময় এসেছে। এতদিন আপনার ছেলের অবহেলা আর অধিকার খাটাই সহ্য করেছি, কিন্তু এবার আমার আ*ত্মসম্মানের প্রশ্ন। আমি আর পিছিয়ে আসব না।"
কথাটা বলেই আমি নিজের ঘরের আলমারির দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার জমানো পুরানো সার্টিফিকেট আর কাগজপত্রগুলো যেখানে ধুলো জমে পড়ে ছিল, সেগুলো আজ বের করার সময় হয়েছে। শাহেদ আর তার মা হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আজ এই ঘরে যে ঝড় উঠেছে, তা শুধু একটা ঝগ*ড়া নয়—এটাই আমার নতুন জীবনের সূচনা
চলবে..?
অবশেষে আমি
পর্ব ০১
লেখক The Story Haven (শাহেদ খান)
প্রথম পর্ব কেমন লাগলো? আজকেই দ্বিতীয় পর্ব পোস্ট করা হবে। ধন্যবাদ সবাইকে