01/06/2026
সে ব্যাংকক থেকে ফিরেছিলো এই ভেবে যে, তার স্ত্রী তাকে বরাবরের মতোই ক্ষমা করে দেবে।
কিন্তু সে যখন তার পড়ার রুমে ঢুকলো, দেখল স্ত্রী ডিভোর্স পেপার আর একটি গোপন লক করা ফোল্ডার নিয়ে শান্ত মুখে বসে আছে। এ যেন এমন এক নারীর মুখ, যে তার মনের ভেতর জমে থাকা ভালোবাসাকে অনেক আগেই কবর দিয়ে ফেলেছে।
ভোর হওয়ার আগেই রায়হান চৌধুরী বুঝতে পারবে, যাকে সে কেবলই ঘরের 'শো-পিস' মনে করত, সে গত ছয় মাস ধরে তার পুরো বিজনেস সাম্রাজ্যের ভিত কীভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।
রাত তখন ১টা ১৭ মিনিট। গুলশানের বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স পেন্টহাউজের প্রাইভেট লিফটটা যখন খুলল, রায়হান চৌধুরীর চোখে প্রথম যে জিনিসটা ঠেকল, তা হলো এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
এটা ঠিক বড়লোকদের বাড়ির সেই চেনা আভিজাত্যের নীরবতা নয়, যেখানে দামি কার্পেট আর ট্রিপল-গ্লেজড কাঁচ বাইরের সব শব্দ শুষে নেয়, কিংবা যেখানে গৃহকর্মীদের নিঃশব্দে চলাফেরার প্রশিক্ষণ দেওয়া থাকে। এই নীরবতার মধ্যে অন্যরকম একটা ভার ছিল। মার্বেল পাথরের ড্রয়িংরুমে সেটা যেন একটা হুঁশিয়ারির মতো ঝুলে আছে। বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি। বসার ঘরের বিশাল কাঁচের দেয়ালে আছড়ে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা, বাইরের ঢাকার চেনা নিয়ন আলোগুলোকে ঝাপসা আর ভেজা দেখাচ্ছে। অনেক দূরে মেঘের ডাক শোনা গেল—খুব মৃদু কিন্তু গম্ভীর।
এক হাতে চামড়ার ট্রাভেল ব্যাগ আর অন্য হাতে মখমলের একটা দামি অলংকারের বাক্স নিয়ে লিফট থেকে বের হলো রায়হান। গলার টাইটা কিছুটা আলগা করা। গালে দুদিনের না-কামানো দাড়ি। তার গা থেকে তখনো হালকা প্লেনের জ্বালানি, দামি হুইস্কি আর সেই তীব্র গোলাপের সুগন্ধ আসছিল, যা তার পিএ সামিয়া রহমান নিজের গলায় মাখে।
ব্যাংককের ট্রিপটা দারুণ লাভজনক হয়েছে।
প্লেনে ফেরার সময় রায়হান নিজেকে এই সান্ত্বনাই দিচ্ছিল।
লাভজনক।
থাইল্যান্ডের সেই বড় কনসোর্টিয়ামটা শেষ পর্যন্ত গ্রিন-এনার্জি প্রজেক্টের চুক্তিপত্রে সই করেছে। এই নতুন প্রজেক্টের শেয়ার বাজারে আসার পর রায়হান চৌধুরী শুধু ধনীই থাকবে না, দেশের শীর্ষ ধনকুবেরদের একজন হয়ে উঠবে। আর সামিয়া—যে প্রচণ্ড বুদ্ধিদীপ্ত, লোভী আর বেপরোয়া—সে এই পুরো ট্রিপের কাজের ফাঁকে ফাঁকে রায়হানকে এমনভাবে প্রশংসায় ভাসিয়েছে, যা তার নিজের স্ত্রী বহু বছর আগেই বন্ধ করে দিয়েছে।
নীলা ছিল শান্ত।
নীলা ছিল মার্জিত।
নীলা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে, চুপচাপ সব শোনার একটা অভ্যাস ছিল তার। রায়হান সেটাকে নীলার দুর্বলতা ভেবেছিল এবং পরবর্তীতে সেটাকে নিজের যা-খুশি-তাই করার লাইসেন্স বানিয়ে নিয়েছিল। নীলা এখন পাঁচ মাসের অন্তসত্ত্বা। রায়হান মনে মনে ভাবত তার 'সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী' আসছে, যদিও সে আজ পর্যন্ত জানার চেষ্টাও করেনি পেটের সন্তানটি ছেলে নাকি মেয়ে। তার কাছে এই সন্তানসম্ভবা স্ত্রী হলো একটা পারিবারিক আভিজাত্যের অংশ। একটা স্ট্যাটাস। ভবিষ্যতের পত্রিকার হেডলাইন। চৌধুরী পরিবারের নিখুঁত ইমেজের আরেকটা উজ্জ্বল পালক মাত্র।
রায়হান ভেবেছিল নীলা হয়তো ড্রয়িংরুমের সোফায় তার জন্য অপেক্ষা করছে।
সাধারণত সে অপেক্ষাই করে।
রায়হানের আত্মবিশ্বাসের অন্যতম কারণ ছিল এটাই।
"নীলা?" রায়হান ডাকল।
তার গলার আওয়াজ দামি ইতালিয়ান মার্বেলের মেঝে আর ড্রয়িংরুমের প্রাচীন ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যগুলো পার হয়ে ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেল। কোনো কাজের লোক তার কোটটা এগিয়ে নিতে এলো না। সোফার পাশের ডিম লাইটটাও জ্বলছে না। করিডোরে কোনো চেনা পায়ের শব্দ পাওয়া গেল না।
কেবল বৃষ্টির শব্দ।
অবশেষে সে নীলাকে খুঁজে পেল তার নিজের পার্সোনাল স্টাডি রুমে।
তাদের যৌথ ঘর নয়। রায়হানের খাস কামরায়।
দামি সেগুন কাঠ, স্মোকড গ্লাস আর লেদার দিয়ে সাজানো এই ঘরটা ছিল রায়হানের আসল দুর্গ। এই ডেস্কে বসেই রায়হান চৌধুরী অন্য কোম্পানির শেয়ার হাতিয়ে নেওয়ার কাগজে সই করে, ছোটখাটো ব্যবসায়ীদের পথে বসানোর ফরমান লেখে। আর আজ সেই ডেস্কের পেছনে বসে আছে নীলা জামান চৌধুরী।
কিছুক্ষণের জন্য রায়হানের মনে উদ্বেগের চেয়ে বিরক্তিটাই বেশি ভর করল।
সে তার চেয়ারটায় বসে আছে!
নীলা কখনো এই চেয়ারে বসে না।
তার পরনে একটা অফ-হোয়াইট রঙের কাশ্মিরী সালোয়ার-কামিজ, যা তার পাঁচ মাসের সন্তানসম্ভবা পেটটাকে আলতো করে জড়িয়ে রেখেছে। তার সিল্কি চুলগুলো, যা সাধারণত কাঁধের ওপর খোলা থাকে, আজ শক্ত করে একটা খোঁপা করা। শরীরে কোনো গয়না নেই, কেবল আঙুলের বিয়ের আংটিটা ছাড়া। আজ রাতে সেই আংটিটাকেও কোনো অলংকার নয়, বরং একটা চূড়ান্ত প্রমাণ বলে মনে হচ্ছিল। ল্যাম্পের আলোয় তার মুখটা ফ্যাকাসে কিন্তু দীপ্ত দেখাচ্ছিল, আর তার চোখে কোনো কান্নার দাগ ছিল না।
এই ব্যাপারটা রায়হানকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
আহত বা কান্নারত নারীকে সামলানো সহজ, তাকে বশ করা যায়।
কিন্তু নীলাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে সব হিসাব চুকিয়ে ফেলেছে।
"তুমি ফিরলে তাহলে," নীলা বলল।
তার গলায় কোনো প্রশ্ন ছিল না।
রায়হান মুখে একটা ক্লান্ত হাসি ফুটিয়ে মখমলের বাক্সটা এগিয়ে দিল। "প্রচণ্ড খাটুনির ট্রিপ ছিল। থাই লোকগুলো সহজে রাজি হতে চায় না, তবে শেষ পর্যন্ত কাজটা হয়েছে। তোমার জন্য ব্যাংককের শপিং মল থেকে এটা এনেছি।"
সে ডেস্কের ওপর নীলার হাতের কাছে বাক্সটা রাখল।
একটা হীরার ব্রেসলেট। আকাশছোঁয়া দাম। এটা আসলে একটা সুক্ষ্ম ঘুষ—নিজের অপরাধবোধ ঢাকার, নীলার মন ঘোরানোর আর তাকে বেঁধে রাখার একটা সোনার শিকল।
নীলা ওটার দিকে তাকাল।
কিন্তু ছুঁয়েও দেখল না।
"খুশি হলাম যে ব্যাংকক ট্রিপটা তোমার ভালো কেটেছে," নীলা শান্ত গলায় বলল। "বছরের এই সময়ে 'দ্য সুখুমভিত' হোটেলটা বেশ মনোরম থাকে, তাই না?"
ডেস্কের কোনায় রাখা রায়হানের হাতের আঙুলগুলো জমে বরফ হয়ে গেল।
সে নীলাকে বলেছিল যে সে তার পুরো টিম নিয়ে 'ফোর সিজনস' হোটেলে উঠেছে।
আর 'দ্য সুখুমভিত' ছিল একটা অত্যন্ত গোপনে বুক করা ব্যক্তিগত স্যুট। কোম্পানির কোনো কাগজপত্রে এর উল্লেখ নেই, অফিশিয়াল ট্যুর প্ল্যানেও ছিল না। রায়হান নিজের কর্পোরেট ক্ষমতার আড়ালে এই জায়গাটা ব্যবহার করত—যখন সে ঢাকা থেকে, ক্যামেরা থেকে আর সেই স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইত, যার নীরবতাকে সে চিরকাল অজ্ঞতা ভেবে ভুল করে এসেছে।
"নীলা," রায়হান গলাটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল, "তুমি কী বলছ আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।"
"থামো।"
শব্দটা খুব মৃদু ছিল।
কিন্তু রায়হানের বুকে এটা কোনো চিৎকারের চেয়েও জোরে গিয়ে আঘাত করল।
"তুমি মিথ্যে বলায় পারদর্শী নও, রায়হান," নীলা বলল। "আসলে তুমি এমন সব মানুষ দিয়ে পরিবেষ্টিত থাকতে অভ্যস্ত, যাদের তোমাকে কোনো প্রশ্ন না করার জন্য টাকা দেওয়া হয়।"
রায়হান একটা শুকনো, তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। "তুমি ক্লান্ত। মাঝরাতে এই অন্ধকারে বসে এসব আজেবাজে কথা বলা তোমার ঠিক হচ্ছে না। তুমি প্রেগন্যান্ট। যাও, ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো।"
"আমিও এতদিন সেই বেতনভুক্ত মানুষদের মতোই একজন ছিলাম," রায়হানকে পাত্তাই না দিয়ে নীলা নিজের সুরে বলে চলল। "আমাকে অবশ্য টাকা দেওয়া হতো না, দেওয়া হতো সামাজিক মর্যাদা। ক্ষমতা। একটা বনেদি পদবি। আর একটা সাজানো সংসারের অভিনয়।"
সে ডেস্কের নিচ থেকে একটা নীল রঙের লেদারের ফোল্ডার বের করল।
সেটা ভারী একটা শব্দ করে দামি কাঠের টেবিলের ওপর এসে পড়ল।
"আমি এই চুক্তির অবসান ঘটাচ্ছি।"
রায়হান ফোল্ডারটার দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
"এসবের মানে কী?"
"ডিভোর্স পেপার।"
হঠাৎ করেই যেন পুরো ঘরের বাতাস রায়হানের জন্য ভারী হয়ে উঠল।
চলবে,,,,,,
#শেষ_হিসাব
পর্ব:০১
সকলে গল্প পড়ে ক'মে'ন্ট করবেন । পরবর্তী পর্ব পোস্ট করা হলে কমেন্টে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হবে। গল্পটা ভালো লাগলে শে-য়া-র করুন । নতুন পাঠকেরা গল্পের কোনো পর্ব মিস না করতে চাইলে আমার প্রফাইলে যু''ক্ত হয়ে সাথেই থাকুন।
ধন্যবাদ❤️