06/09/2025
চার্লস জাফিন (Charles Joughin) — টাইটানিকের প্রধান বেকার। যিনি মৃত্যুর মুখ থেকে লড়াই করে ফিরেছিলেন বুদ্ধি, সাহস আর তাঁর এক বদঅভ্যাসের জোরে।
১৯১২ সালের ১৪ এপ্রিল, টাইটানিকের বিপর্যয়ের রাত। চারদিকে কান্না আর মৃত্যুভয়। জাহাজের ডেক কাঁপছে দিশেহারা যাত্রীদের দৌড়ঝাঁপে। কিন্তু এত বিশৃঙ্খলার মাঝেও একজন মানুষ অবিচল। তিনি হলেন টাইটানিকের প্রধান বেকার চার্লস জাফিন। একটুও ভেঙে না পড়ে তিনি তাঁর বেকারির লোকদের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত রুটি বেক করতে শুরু করেন—কারণ তিনি বুঝেছিলেন, লাইফবোটে ওঠা মানুষদের খাবারের প্রয়োজন হবে। সেই রাতেই হাজার হাজার রুটি তৈরি করে লাইফবোটে পাঠানো হয়।
একদিকে খাবারের ব্যবস্থা করতে থাকলেন আর অন্যদিকে মহিলা ও শিশুদের লাইফবোটে তুলতে সাহায্য করতে থাকলেন। বিচক্ষণ এই মানুষটি বিলক্ষণ বুঝতে পারলেন যে লাইফবোটের সংখ্যা খুব কম, যা দিয়ে বেশি জনকে বাঁচানো অসম্ভব। অনেককেই জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়তে হবে। তাই তিনি কাল বিলম্ব না করে জাহাজের ডাইনিং রুম ও কেবিন থেকে টেবিল, আলমারি, কাঠের দরজা—যা কিছু ভাসতে পারে, সব সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলতে থাকেন। তাঁর যুক্তি ছিল, এগুলো হয়তো জলে ভাসলে তা আঁকড়ে ধরে অনেকেই বাঁচতে পারবে।
সময় গড়াচ্ছে। চার্লস বুঝে গেলেন বাঁচার চান্স খুবই কম তবুও তিনি বরফ শীতল জলের সাথে লড়াই করার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করতে বার কাউন্টার থেকে তুলে নিলেন এক ব্র্যান্ডির বোতল এবং বেশ কিছুটা ব্র্যান্ডি খেলেন। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে ওই ব্র্যান্ডিই তাঁকে বিপদের মধ্যেও শান্ত থাকতে সাহায্য করেছিল আর দেহে সামান্য উষ্ণতাও এনে দিয়েছিল।
যখন জাহাজ সম্পূর্ণ ডুবতে শুরু করল, চার্লস শেষ মুহূর্তে পর্যন্ত জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং লাফিয়ে না পড়ে ডুবন্ত জাহাজের সাথে আস্তে আস্তে নামলেন বরফশীতল জলে। যেখানে অনেকেই ১৫–২০ মিনিটের মধ্যেই মারা যাচ্ছিলেন সেখানে তিনি লক্ষ করলেন ব্র্যান্ডির প্রভাবে তাঁর শরীর অন্যদের মতো দ্রুত অবশ হয়ে যাচ্ছে না আর ঠান্ডাও কম বোধ হচ্ছে। ভাসমান এক কাঠের ওপর ভর করে ভাসতে ভাসতে তিনি নাম্বার ১০ লাইফবোটের কাছে পৌঁছে গেলে উদ্ধারকারীরা তাঁকে উদ্ধার করে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা জমাট জলে থাকার পরও তিনি অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যান। চার্লস জাফিন পরবর্তীতে বলেন, “ব্র্যান্ডির প্রভাবে আসলে আমি একেবারেই ঠান্ডা অনুভব করিনি।” এইভাবেই তাঁর বুদ্ধি, সাহস, এবং ব্র্যান্ডি খাওয়ার সিদ্ধান্ত সেই যাত্রায় বাঁচিয়ে দিয়েছিল তাঁকে।
টাইটানিক বিপর্যয়ে প্রায় দেড় হাজার মানুষ প্রাণ হারালেও চার্লস জাফিন প্রমাণ করেছিলেন— কঠিন থেকে কঠিনতর বিপদের মধ্যেও যদি মাথা ঠান্ডা রাখা যায় তাহলে অনেক বিপদ থেকে অস্বাভাবিক ভাবেও ফিরে আসা যায়।
লেখা: সৈকত বিশ্বাস