18/07/2026
বাংলাদেশে চা শ্রমিকদের আসার ইতিহাস এক দীর্ঘ, বেদনাদায়ক এবং বঞ্চনার ইতিহাস। ব্রিটিশরা কীভাবে, কোথা থেকে এবং কেন এই মানুষদের এই অঞ্চলে নিয়ে এসেছিল, তার মূল তথ্যগুলো নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
১. কখন এবং কেন আনা হয়েছিল? (কত সালে ও কেন)
১৮৪০-এর দশকে ব্রিটিশরা বাংলাদেশে (বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে) চায়ের চাষ শুরু করে। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন গতি পায়।
চা বাগান করার জন্য দরকার ছিল বিশাল জঙ্গল পরিষ্কার করা এবং তীব্র পরিশ্রম করা। প্রথমে স্থানীয় মানুষ এবং চীন থেকে কিছু শ্রমিক এনে কাজ করানোর চেষ্টা করা হলেও ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর এবং প্রতিকূল পরিবেশের কারণে তারা টিকতে পারেনি। ফলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এমন এক বিশাল ও সস্তা শ্রমিক বাহিনীর প্রয়োজন ছিল, যারা কঠোর পরিশ্রম করতে পারবে এবং বাগান ছেড়ে পালাবে না। এই উদ্দেশ্যে ১৮৬০ থেকে ১৮৯০ সালের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দলে দলে মানুষ আনা শুরু হয়।
২. কোথা থেকে আনা হয়েছিল?
ব্রিটিশরা মূলত ভারতের অত্যন্ত দরিদ্র, খরা-প্রীড়িত এবং দুর্ভিক্ষগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করেছিল। প্রধান যে অঞ্চলগুলো থেকে শ্রমিক আনা হয়েছিল:
বিহার এবং উত্তর প্রদেশ
উড়িষ্যা (ওড়িশা)
পশ্চিমবঙ্গ (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ইত্যাদি অঞ্চল)
মধ্যপ্রদেশ এবং অন্ধ্রপ্রদেশ
আসাম এবং ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল পরগনা
এর ফলে সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওরাওঁ, রবিদাস, বাউরি, তেলুগু, কানুসহ প্রায় ১১৬টিরও বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও জাতের মানুষ এই অঞ্চলে আসেন।
৩. কীভাবে এবং কেমনে আনা হয়েছিল? (মিথ্যা প্রলোভন ও আড়কাঠি প্রথা)
চা শ্রমিকদের এই অঞ্চলে নিয়ে আসার পেছনে ছিল ব্রিটিশদের এক চরম প্রতারণার ইতিহাস। সরাসরি জোর করার চেয়ে তারা 'আড়কাঠি' (দালাল) নিয়োগ করেছিল। এই দালালরা ভারতের দরিদ্র গ্রামগুলোতে গিয়ে মানুষদের লোভ দেখাত।
তারা বলত, "আসাম-সিলেটের দিকে এমন দেশ আছে যেখানে গাছ নাড়া দিলেই টাকা পড়ে (গাছ হিলায়ে গা তো পাইসা মিলেগা)। সেখানে শুধু আরাম আর আরাম।"
এই মিথ্যা প্রলোভনে বিশ্বাস করে হাজার হাজার মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে পরিবারসহ রওনা দেয়। তাদের সাথে 'গিরমিট' (Agreement বা চুক্তি) করানো হতো, যা আসলে ছিল এক ধরনের আজীবন দাসত্বের চুক্তি।
কলকাতার ঘাট থেকে স্টিমারে বা রেলে করে, আর অনেক সময় শত শত মাইল পথ পায়ে হাঁটিয়ে এই শ্রমিকদের আসাম ও সিলেটের শ্বাপদসংকুল (হিংস্র পশুপাখিতে ভরা) গভীর জঙ্গলে নিয়ে আসা হতো। পথিমধ্যে অনাহার, কলেরা ও ম্যালেরিয়ায় ভুগে হাজার হাজার শ্রমিক মারা যান। যারা পৌঁছাতে পেরেছিলেন, তারা এসে দেখেন বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন—গাছ নাড়লে টাকা নয়, বরং চাবুকের বাড়ি আর বুটের লাথিই ছিল তাদের ভাগ্য।
ঐতিহাসিক "মুল্লুকে চলো" আন্দোলন (১৯২১)
ব্রিটিশদের এই চরম নির্যাতন ও দাসত্ব সহ্য করতে না পেরে ১৯২১ সালের ২০ মে পণ্ডিত গঙ্গা দয়াল দীক্ষিত এবং বাবা রামচন্দ্রের নেতৃত্বে প্রায় ৩০ হাজার চা শ্রমিক নিজেদের জন্মভূমি বা "মুল্লুকে" ফিরে যাওয়ার জন্য বাগান থেকে বেরিয়ে আসেন। তারা পায়ে হেঁটে চাঁদপুরের মেঘনা নদীর ঘাটে পৌঁছান। কিন্তু সেখানে ব্রিটিশ গোর্খা বাহিনী তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। হাজার হাজার শ্রমিককে হত্যা করে মেঘনা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। যারা বেঁচে যান, তাদের আবার জোর করে চা বাগানে ফেরত পাঠানো হয়। এই দিনটিকে আজও "চা-শ্রমিক হত্যা দিবস" বা "মুল্লুকে চলো দিবস" হিসেবে স্মরণ করা হয়।
বংশপরম্পরায় আজ প্রায় পৌনে দুইশত বছর ধরে এই শ্রমিকদের বংশধরেরাই বাংলাদেশের চা শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন, অথচ তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারা আজও মূল সমাজ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।