17/05/2025
১৯৭৫ থেকে ১৯৮১। বাংলাদেশের তিমিরাচ্ছন্ন এক সময়। অন্ধকারটা ব্যাপক অর্থেই—সমাজে, রাজনীতিতে নেমে এসেছে কালো রাতের আঁধার। অর্থনীতির চাকা উল্টো করে ঘোরানোর চেষ্টা চলছে সবেগে।
সংস্কৃতির অঙ্গনে বস্তাপচা কাসুন্দির দুর্গন্ধ। বাংলাদেশের ভিত্তিমূলের উপাদানগুলো ছুড়ে ফেলে পাকিস্তানি লেবাস চড়ানোর উদগ্র বাসনা দৃশ্যমান শাসকমহলে।
১৫ই আগস্ট ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় পালাবদলের চেষ্টা হয়নি, মুক্তিসংগ্রামের ভেতর দিয়ে বাঙালির অর্জিত বিজয় ও জাতিসত্তার সব কলঙ্ক মুছে ফেলার প্রয়াস চলে অবিরাম। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক নিহত।
মুক্তিযুদ্ধের গণ-আওয়াজ নির্বাসিত। বিতাড়িত পাকিস্তানি শাসকদের ফেরুপাল আর নব্য বিভীষণে দলের প্রভু বন্দনায় কান পাতা দায়।
১৫ই আগস্টের পর ঘাতকরা, তাদের প্রশ্রয়দাতা, নেপথ্য ষড়যন্ত্রকারী—অনেকেই উঁচু গলায় নিজেদের গণতন্ত্রের মুক্তিদাতা দাবি করত। নানা চক্রান্ত আর ক্রিয়াকর্মে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণকারী ব্যক্তিটি পরিষদদলের কণ্ঠে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক বলে বন্দিত হতে শুরু করে।
কিন্তু এটা তো না মেনে উপায় নেই যে তথাকথিত এই বহুদলীয় গণতন্ত্র ছিল সান্ধ্য আইনের গণতন্ত্র। এই সেনানায়কের শাসনামলে পুরো সময়টাতেই রাজধানী ঢাকা শহরে রাতে থাকত কারফিউ। এই সান্ধ্য আইনি গণতন্ত্রের যূপকাষ্ঠে একে একে বলি হয়েছে অর্থনীতির সত্যিকারের ভিত্তিস্তম্ভগুলো, অগ্রগামী সমাজ গঠনের অগ্রসর পদক্ষেপসমূহ। স্তাবকতার বিকল্প সাহসী কণ্ঠস্বরগুলো রাতের আঁধারে উধাও হয়ে গেছে সান্ধ্য আইনের কালো গহ্বরে।
‘মানি ইজ নো প্রবলেম’-এর দাপটে অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে ঋণখেলাপির নতুন অভিধা। মানুষ তিমির হননের জন্য একটি আলোকবর্তিকার সন্ধানে উদ্গ্রীব। কিন্তু বিভ্রান্তি আর পারস্পরিক অবিশ্বাসের বিষবাষ্পে আচ্ছন্ন অগ্রগামী সেনানীরা। আলোর মশাল কে তুলে ধরবে—জাতি খুঁজে ফিরছে এই প্রশ্নের জবাব। ক্ষতবিক্ষত দ্বিধাবিভক্ত আলোর মশালের সৈনিকরা নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বেছে নেন তাঁদের নেত্রীকে।
গণতন্ত্রের এই সংগ্রামে সামরিক শাসন ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনা নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন দূরদর্শী এক জননেত্রী হিসেবে। সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের মূলধারায় গণতন্ত্রমনা দলগুলোকে তিনি যে নিষ্ঠা ও দৃঢ়তায় ঐক্যবদ্ধ করলেন, তা-ও এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।
১৭ মে ১৯৮১। সান্ধ্য আইনি স্বৈরশাসকের ভ্রুকুটি এবং সব রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অগ্রসেনানীদের নেত্রী আর জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে। বিপরীত স্রোতে চলা তিমিরাচ্ছন্ন দেশটির জন্য দিনটি ছিল সত্যিকার অর্থেই মাইলফলক। সান্ধ্য আইনের বেড়াজালে আটক দেশে সেদিনই গণতন্ত্রের সত্যিকারের পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। বিমানবন্দর থেকে টঙ্গী, টঙ্গী থেকে তেজগাঁও—সর্বত্র লোকারণ্য। অঝোর ধারায় বর্ষণ আর দুর্যোগ উপেক্ষা করে মানুষ জানাল অশ্রুসিক্ত অভিনন্দন।
এমন অভাবনীয় ঘটনার জন্য শাসকরা একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। সান্ধ্য আইনি গণতন্ত্রের বিরোধীদের বজ্রমুষ্টি ক্রমান্বয়ে শিথিল হতে থাকল। সামরিকতন্ত্রের প্রেসক্রিপশনে এক অভিনব তন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে স্তম্ভগুলোতে একে একে ফাটল দেখা দিতে শুরু করল।
এটি এমন একটি সময়, যখন চেপে বসা স্বৈরশাসক আর তার পারিষদদলের কবল থেকে মুক্তির পথ খুঁজছে মানুষ। এ দেশের মানুষ বরাবরই গণতন্ত্রমনা। কিন্তু স্বৈর সামরিকতন্ত্রের জগদ্দল থেকে মুক্তিপ্রয়াস বারে বারেই যেন মরীচিকার মতো মিলিয়ে যাচ্ছিল। শেখ হাসিনার আগমনে এ দেশের গণতন্ত্রমনা মানুষ যেন নতুন পথের দিশা খুঁজে পেল। এই পথ সংগ্রামের। দিশা গণতন্ত্রের।
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল সংসদে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আন্দোলন। রাজশক্তির অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। নব্য স্বৈরাচার আর মৌলবাদের বিভীষিকার বিরুদ্ধে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর মানববন্ধন। এমনকি প্রহসনের নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে অর্জিত হলো গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক নতুন দিশা—তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর নির্বাচনে জয় লাভ করে।
সংগ্রাম আর সাফল্যের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় জীবন। কিন্তু সান্ধ্য আইনের তিমিরাচ্ছন্ন শাসন আর নয়। তাই "শেখ হাসিনা তিমির হননের নেত্রী।"
শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের শুভেচ্ছা। আরেকটি প্রত্যাবর্তন শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। জয় বাংলা। 🇧🇩