07/08/2026
এই লেখাটা স্কিপ করার আগে ৩০ সেকেন্ড সময় দেন ভাই।
হয়তো কাল সকালে এই লেখাটাই আপনার বাবার রিপোর্টটা বুঝতে সাহায্য করবে।
কারণ যে রোগটা নিয়ে লিখছি, এটা ১৫ বছর আপনার লিভারে ঘুমিয়ে থাকে, আপনি টেরও পাবেন না...
গল্প ১: রফিক ভাই
রফিক ভাই, বয়স ৩৮। আমাদের বাজারের হার্ডওয়্যারের দোকানদার। সারাদিন হাসিখুশি মানুষ।
গত ঈদের পর হঠাৎ দেখি শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে গেছে। পেটটা কেমন ফুলে আছে। ভাবলাম গ্যাস হইছে।
ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম, ডাক্তার Ultrasound দিয়ে মুখ কালো করে ফেললো। বললো, "লিভার সিরোসিস, একদম লাস্ট স্টেজ।"
রফিক ভাই অবাক! বলে, "আমি তো জীবনে মদ সিগারেট ছুঁই নাই ভাই, আমার কেন এমন হবে?"
আমরাও অবাক।
গল্প ২: স্কুলের আপা
আমার খালাতো বোন, বয়স ৩২। একটা প্রাইমারি স্কুলের টিচার।
বিয়ে হইছে ৬ বছর। বাচ্চা নিতে গিয়ে বারবার সমস্যা হচ্ছে, শরীর দুর্বল লাগে, একটু কাজ করলেই হাঁপিয়ে যায়।
সবাই বলতো, "মেয়ে মানুষের একটু আধটু দুর্বলতা থাকেই।"
গত মাসে একটা রুটিন চেকআপে ধরা পড়লো তার Hepatitis C পজিটিভ। লিভারের ৬০% ড্যামেজ হয়ে গেছে অলরেডি। সে তো কান্না থামাতেই পারছে না, বলছে "আমি কী পাপ করলাম?"
আচ্ছা বলেন তো...
দুইটা মানুষ, দুইটা বয়স, দুই রকম জীবন...
কিন্তু ভিলেন একজনই...
ভিলেনের নাম - হেপাটাইটিস বি / সি ভাইরাস।
আমরা একে চিনি না, কিন্তু সে আমাদের চেনে।
এই জিনিসটা আসলে কী? একদম সহজে বুঝাই।
আপনার লিভারটা হলো আপনার শরীরের ফ্যাক্টরি। এই ফ্যাক্টরি ৫০০ টার বেশি কাজ করে।
এই হেপাটাইটিস ভাইরাস হলো এমন এক চোর, যে ফ্যাক্টরির ভিতরে ঢুকে চুপচাপ বসে থাকে। চুরি করে না, ভাঙচুরও করে না। ৫ বছর, ১০ বছর, ১৫ বছর... আপনি বুঝতেই পারবেন না সে আছে।
আপনি দিব্যি খাচ্ছেন, ঘুমাচ্ছেন, সংসার করছেন।
আর ওদিকে সে আস্তে আস্তে ফ্যাক্টরির মেশিনগুলোতে জং ধরিয়ে দিচ্ছে। একটা সময় গিয়ে পুরো ফ্যাক্টরিটাই নষ্ট - এটাকেই ডাক্তাররা বলে লিভার সিরোসিস। আর সিরোসিসের পরের ধাপটাই হলো লিভার ক্যান্সার।
ভয়ংকর না?
এই চোরটা আমাদের শরীরে ঢোকে কিভাবে? ৪ টা রাস্তা মনে রাখেন, প্লিজ।
১. ব্লেড, সুঁই, সিরিঞ্জের মাধ্যমে:
একই ব্লেড দিয়ে ২ জন সেলুনে শেভ করলেন, নাক-কান ফোঁড়ানোর সময় একই সুঁই ব্যবহার হলো, দাঁতের ডাক্তারের যন্ত্রপাতি ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত না হলে, অথবা রাস্তাঘাটে আকুপাংচার বা হাতুড়ে ডাক্তারের একই সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহার - এই ভাবেই সবচেয়ে বেশি ঢোকে। রফিক ভাই ১২ বছর আগে একটা ছোট অপারেশন করিয়েছিল গ্রামের এক ক্লিনিকে, সেখান থেকেই...
২. রক্ত নেওয়ার সময়:
আগে যখন রক্ত পরীক্ষার এত ভালো ব্যবস্থা ছিল না, তখন অনেকেই ইনফেক্টেড রক্ত নিয়ে ফেলেছে। এখনো যেখানে সেখানে রক্ত নিলে রিস্ক থেকেই যায়।
৩. মা থেকে বাচ্চায়:
আমাদের দেশের অনেক মা জানেই না তার শরীরে Hepatitis B আছে। সেই মা যখন বাচ্চার জন্ম দেয়, তখন বাচ্চাটাও সেটা নিয়ে জন্মায়। বাচ্চাটা সারাজীবন এই ভাইরাস বয়ে বেড়ায়।
৪. অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক:
এটা নিয়েও আমাদের দেশে কেউ কথা বলে না, লজ্জা পায়। কিন্তু এটাও একটা বড় কারণ।
এটা কিন্তু হাঁচি-কাশি, একসাথে খাওয়া, কোলাকুলি বা মশার কামড়ে ছড়ায় না। তাই রোগীকে ঘৃণা করবেন না, ভাই।
আমরা যে লক্ষণগুলোকে পাত্তাই দেই না...
এই রোগের সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো এর তেমন কোনো লক্ষণই নেই। তারপরও শরীর কিছু সিগন্যাল দেয়, আমরা বলি "আরে এমনিই..."
কোনো কারণ ছাড়াই সবসময় দুর্বল লাগা, অল্পতেই হাঁপিয়ে যাওয়া
খাবারে অরুচি, একটু খেলেই পেট ভরে যাওয়া, বমি বমি ভাব
পেটের ডান পাশে উপরে হালকা ব্যথা বা ভারী লাগা
চোখ বা প্রস্রাব মাঝে মাঝে হলুদ হয়ে যাওয়া, আবার ঠিক হয়ে যাওয়া
কোনো কারণ ছাড়াই জয়েন্টে ব্যথা, মাংসে ব্যথা
এইগুলোকে আমরা গ্যাস্ট্রিক বলে গ্যাসের ওষুধ খেয়ে শেষ করে দেই।
ভয় পাইয়েন না ভাই... সুখবর হচ্ছে...
আল্লাহর রহমতে এখন এই রোগ নিয়ে ভয় পাওয়ার দিন শেষ।
Hepatitis B এর জন্য আমাদের হাতে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ একটা টিকা। এই টিকা নিলে আপনি সারাজীবনের জন্য অনেকটা নিরাপদ। আর যদি ভাইরাস থেকেও যায়, এখন এমন ওষুধ আছে যা ভাইরাসটাকে সারাজীবন ঘুম পাড়িয়ে রাখতে পারে।
আর Hepatitis C? এটা এখন ৯৫% ক্ষেত্রে পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়। হ্যাঁ, ঠিক শুনছেন। ৩ মাসের একটা কোর্সে (DAAs) এই ভাইরাস শরীর থেকে একদম চলে যায়। WHO, CDC সবাই বলছে এটা সম্ভব। শুধু দরকার সময়মতো ধরা পড়া।
তাহলে এখন কী করবেন? ৩ টা কাজ করেন ভাই, আজকেই।
১. টেস্টটা করে ফেলেন:
বয়স ২০ এর উপরে হলে জীবনে একবার HBsAg আর Anti-HCV - এই দুইটা রক্ত পরীক্ষা করিয়ে ফেলেন। খরচ ৮০০-১২০০ টাকার বেশি না। এটা আপনার জীবনের সবচেয়ে লাভজনক ইনভেস্টমেন্ট হবে।
২. টিকা আছে কিনা নিশ্চিত হন:
যদি Hepatitis B নেগেটিভ আসে, কালকেই ডাক্তারের সাথে কথা বলে টিকা নিয়ে নেন। বাচ্চা জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১ম ডোজটা দেওয়া বাধ্যতামূলক, মনে রাখবেন।
৩. ব্লেড আর সুঁই নিয়ে সচেতন হন:
সেলুনে গেলে নিজের ব্লেড নিয়ে যান বা দেখে নিন নতুন ব্লেড ভাঙছে কিনা। নাক-কান ফোঁড়ানো, ট্যাটু, দাঁতের কাজ বা যে কোনো ছোট অপারেশন - যেখানেই সুঁই বা ব্লেডের ব্যাপার আছে, সেখানেই ১০০% নিশ্চিত হন যে সবকিছু জীবাণুমুক্ত কিনা।
ভাই, রফিক ভাইয়ের মতো মানুষগুলো যদি ১০ বছর আগে একটা ৫০০ টাকার টেস্ট করতো, আজ তার দুইটা ছোট বাচ্চা নিয়ে তাকে হাসপাতালে দৌড়াতে হতো না।
এই পোস্টটা আমার কোনো বই থেকে লেখা না ভাই, আমার নিজের চোখে দেখা।
যদি মনে হয় এই লেখাটা কারো কাজে লাগতে পারে, একটা শেয়ার দিয়ে দিয়েন। আপনার একটা শেয়ারে যদি একটা মানুষও কাল গিয়ে টেস্টটা করায়, এর চেয়ে বড় সওয়াব আর কী হতে পারে?
বুকে হাত দিয়ে বলেন তো...
জীবনে কখনো Hepatitis B এর টিকা নিয়েছেন কিনা বা HBsAg টেস্টটা কখনো করিয়েছেন কিনা সত্যি করে বলেন তো? ভুলে গেছেন?
কমেন্টে লিখেন, লজ্জার কিছু নাই। আমি রিপ্লাইয়ে বুঝিয়ে বলবো আপনার কী করা উচিত।
লেখা: EM health tips