06/06/2026
#তুমি_আমার_নিষিদ্ধ_অনুভূতি
#শামিমা_জাহান_শিউলী
#পর্ব_৪
দুপুরে সবাই ডাইনিং টেবিলে খাবার খেতে বসেছে।কিয়ানা তখনো নিচে আসেনি।নাহিয়ান বার বার তাকাছে সিরির দিকে।কিয়ানা কে নামতে দেখে নাহিয়ানের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো।দেখে মনে হচ্ছে কেবল শাওয়ার নিয়ে এলো।ভেজা চুল থেকে পানি পরছে।পরনে নীল রঙের থ্রীপিজে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।নাহিয়ান চোখ ফিরাতে পারছে না।কিয়ানা পুরো টেবিলে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো।দাদুর ডান পাশে দুইটা চেয়ার খালি আছে।কিয়ানা একটা খালি রেখে আরেকটায় বসে পরলো।তার পাশে ছিলো নাবিলা।নাবিলা কিয়ানা কে দেখে জরিয়ে ধরে বললে।
"কেমন আছো আপু"?
কিয়ানা বোন কে হালকা করে জরিয়ে ধরে মচকি হেসে বললো।
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো তুই কেমন আছিস.?আর ফুফা ফুপি কেমন আছে.?
নাবিলা হাসি মুখে জবাব দিলো।
" আমি ভালো আছি আপু।আর আব্বু আম্মু ভালো আছে।"
কিয়ানা আর কিছু বললো না।সামনে থেকে নাহিয়ান বলে উঠলো।
"আমি আছি ম্যাডাম আমাকে কি চোখে পরে না।"
কিয়ানা মাথা তুলে তাকালো তারপর কিছুটা ভেবে বললো।
"কে আপনি আপনাকে তো চিনতে পারলাম না.?"
নাহিয়ানের মুখটা একটু হয়ে গেলো।বাকিরা মিটমিট করে হাসছে।কিয়ানা খেতে শুরু করলো।তখনি ফাঁকা চেয়ারে এসে কেউ বসলো।কিয়ানার হাত থেকে গেলো।কোনো দিক তাকালো না আবার সাভাবিক ভাবে খেতে লাগলো।খাওয়া সময় আর কেউ কথা বললো না।সবাই চুপচাপ খেতে লাগলো।চামিজের টুংটাং শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।খাওয়া শেষ করে কিয়ানা উঠে চলে গেলো। তারপর তেজ ও উঠে গেলো।কিয়ানা যেতেই সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচলো মনে হলো। কারণ খাবার টেবিলে কথা বলা পছন্দ করে না কিয়ানা।তাই তো কেউ কথা বলার সাহস পেলো না।কিয়ানা জেতেই তেজ ও খাবার শেষ করে উঠে গেলো।নাহিয়ান শুধু তাকিয়ে রইলো কিয়ানার যাওয়ার দিকে।নাহিয়ান বুঝলো কিয়ানা কিছু নিয়ে আপসেট যার করনে ও এই কথা বললো।ছোট থেকে দেখছে কিয়ানাকে।তবুও নাহিয়ান মাঝে মাঝে কিয়ানাকে বুঝতে পারে না।দুপুরে খাওয়ার পরে সবাই একটা ঘুম দিয়েছিলো।ছুটির দিন গুলাতে এমনি করে সবাই।রাত আট টা ড্রইং রুমে বসে সবাই আড্ডা দিচ্ছে সবাই আড্ডা দিলেও কিয়ানা নেই।দুপুরে সেই যে রুমে ডুকেছে আর বের হয়নি।কেয়া নাহিয়ান কে বললো।
"ভাইয়া কিছু আনোনি আমাদের জন্য।"
নাহিয়ান জিভে কামর দিয়ে বললো।
"সরি বনু মনে ছিলো।কর্ণ যা তো রুম থেকে লাগেজ নিয়ে আয় তো।"
কর্ণ বসা থেকে উঠে যেতে যেতে বললো।
"যাচ্ছি ভাইয়া"
কিছুখন পর কর্ণ দুইটা লাগেজ নিয়ে ফিরে এলো।নাহিয়ান একে একে সবার জন্য আনা গিফ্ট গুলো দিতে লাগলো।সাথে চকলেট চিপস। সবাই খুশি হলো।এখানে তেজের কেমন একটা অসস্থি লাগছে।সবার মাঝে নিজেকে কেমন ছোট লাগছে।তাই তেজ উঠে নিজের রুমে চলে গেলো।কেউ সেটা খেয়াল না করলেও।একজন ঠিকি খেয়াল করেছে।সে হলো কিয়ানা। দ্বিতীয় তলার করিডোরে দাড়িয়ে সব দেখেছে।কিয়ানা কিছু বললো না।নিজের জন্য কফি বানাতে কিচেনে গেলো।কফি বানিয়ে কিয়ানা যখন আবার নিজের রুমের দিকে যাচ্ছিলো।তখনি পিছন থেকে নাহিয়ান কিয়ানাকে ডাক দেয়।
"দাড়া কিয়ানা"
কিয়ানার পা থেমে গেলো।কিন্তু সে পিছনে তাকালো না।নিহিয়ান আবার বললো।
"তোর জন্য গিফট এনেছি নিয়ে যা"
কিয়ানা শান্ত কন্ঠে বললো।
"লাগবে না,আমার এসবের প্রয়োজন নেই।"
কথাটা বলে আর দাড়ালো না।আর না কাউকে কিছু বলার সুযোগ দিলো।নাহিয়ান চুপ করে বসে রইলো।আরুনিকা চৌধুরী কিছু বলতে গিয়েও বললো না।নাহিয়ান মন খারাপ করে রুমে চলে গেলো।রাত ১২ টা কিয়াবা বারান্দায় দারিয়ে আছে।মন টা খারাপ কোনো কিছুতেই কিছু ভালো লাগছে না তার।মন টা কেমন বিষিয়ে আছে।একই সাথে আকাশ দিকে তাকিয়ে আছে তেজ।তৃশার কথা খুব মনে পরছে।তেজ বিরবির করে বললো।
"কোথায় হারিয়ে গেলি তৃশা,আমার যে নিজেকে বড্ড একা লাগছে।চারপাশ কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।প্লিজ ফিরে আয় না প্লিজ।"
একথা বলে তেজ চুপ হয়ে গেলো।বেশ কিছুখন দাড়িয়ে থেকে তেজ রুমে গিয়ে শুয়ে পরলো।নাহিয়ান কঁপালে হাত দিয়ে বেডের সাথে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে।মুখটা মলিন চোখ দুটো কেমন লাল হয়ে আছে।
" সবাইকে ভালোবাসা যায় না।আর যাকে ভালোবাসা যায় তাকে পাওয়া যায় না।ভালোবাসা এতো কেনো কঠিন।"
নাহিয়ান কিছুখন চুপ থেকে আবার বললো।
"আমি তোকে জয় করেই ছাড়বো। তোকে পাওয়ার জন্য যা করতে হয় করব।এতো সহজে আমি হাল ছেড়ে দিব না।আমি দেখতে চাই কতটা অবহেলা তুই করতে পারিশ আমাকে।একদিন নিজেই ক্লান্ত হয়ে পরবি।"
কথা বলে আলতো হাসলো।তারপর লাইট নিভিয়ে শুয়ে পরলো।রাত দুইটা তেজ পানি খেতে উঠেছে। রুমে পানি নেই তাই কিচেনে এসেছে।ড্রইং রুমে নীল রং এর ডিম লাইট জ্বলছে।তেজ পানি খেতে যখন রুমে যাচ্ছিলো।তখন উপর থেকে কিছু পরে যাওয়ার শব্দ হলো।তেজ চমকে গেলো।হাতের জগ টা ডাইনিং টেবিলের ওর রেখে পা টিপে টিপে উপরে উঠলো।বুঝার চেষ্টা করলো আসলে শব্দটা কোথায় হলো।কিছু দেখলোনা।সবার রুমের দরজা বন্ধ। তেজ ফিরে আসতে গিয়ে কিয়ানার দরজার দিকে তাকালো।কিছু একটা ভেবে দরজার কাছে এগিয়ে গেলো।তেজ বুঝলো দরজা চাপানো।তেজ কিছু না বলে চলে আসার জন্য পা বারাতেই।তখন তার কানে কারো গোঙানির শব্দ শুনতে পেলো।তেজ এবার কি করবে ভেবে পেলো না।কারণ আওয়াজ টা কিয়ানার রুম থেকে আসছে।তেজ মনের মধ্যে ভয় নিয়ে কাঁপা হাতে হালকা করে দরজা খুললো।ডিম লাইটের আলোতে পুরো রুমে দেখতে পেলো।কিয়ানা হাত দিয়ে পানির জগ ধরার চেষ্টা করছে।গ্লাস টা নিচে ভেঙে পরে আছে।কিয়ানা বেডে থেকে পরে যেতে নিলে তেজ তাড়াতারি করে গিয়ে কিয়ানাকে ধরলো।তেজ চমকে গেলো। কারণ কিয়ানার শরীর জ্বরে পুরে যাচ্ছে।তেজ কি করতে বুঝতে পারছে না।কিয়ানা আস্তে করে বললো।
"পানি"
তেজ কিয়ানাকে এক হাত দিয়ে ধরে অন্যা হাত দিয়ে আরেকটা গ্লাসে পানি নিয়ে কিয়ানাকে খাইয়ে দিলো।তারপর তাকে বালিয়ে শুইয়ে দিলো।তেজ কি করবে বুঝতে পারলো না।কাউকে ডাকবে কিনা তাও বুঝতে পারলো না।যদি কাউকে ডাকে এবং তাকে প্রশ্ন করে তুমি এখানে কেনো।সে কি জবাব দিবে।তেজ দিধায় ভুগছে। কি করবে বুঝতে পারলো না।তারপর কিছুখন ভাবলে।তারপর মনে হলো এতো রাতে কাউকে না জাগানোই ভালো।এসব ভেবে তেজ কিয়ানাকে বেডে শুইয়ে দিয়ে যখন উঠে আসতে নিতেই।কিয়ানা জ্বরের ঘোরে তেজের হাত ধরে বললো।
"যেওনা আমাকে ছেড়ে যেওনা"
তেজ কি করবে ভেবে পেলো না।তাই কিয়ানাকে আস্তে করে বললো।
"আমি আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না।আপনাকে জলপট্টি দিতে হবে।নয়তো জ্বর কমবে না।"
তবুও কিয়ানা তেজের হাত ছাড়লো না।তেজ অনেক কষ্ট কিয়ানার থেকে হাত ছাড়িয়ে নিলো।নিচে গিয়ে একটা বাটিতে পানি নিয়ে এলো।এখন কাপর পাবে কোথায়।তেজ চিন্তায় পরে গেলো।তেজ কিছু একটা ভেবে নিজের পকেটে হাত দিলো।কাক্ষিত জিনিস টা পেয়ে গেছে বলে মুখে হাসি ফুটে উঠলো।পকেট থেকে রুমাল বের করে।কিয়ানার মাথায় জলপটি দিতে লাগলো।রুমে লাইট জালিয়ে ঔষধ খুজতে লাগলো।তেজকে বেশি খুজতে হলো না।পড়ার টেবিলের উপরি বক্সটা পেয়ে গেলো।কিন্তু খালি পেটে কি করে খাওয়াবে ঔষধ।তেজ আবার নিচে নেমে এলো।আর খুব সাধারণে কিয়ানার জন্য ভেজিটেবল স্যুপ বানালো।তারপর কিচেন পরিস্কার করে।উপরে গিয়ে কিয়ানাকে জোর করে স্যুপ খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দিলো।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত ০৪:৪৫ আজান দেওয়ার সময় হয়ে গেছে।
মেঝেতে পরে থাকা কাচেক টুকো গুলো তাড়াতাড়ি করে উঠিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিলো।তারপর তেজ কিছু না ভেবে লাইট অফ করে কিয়ানার রুম থেকে বেরিয়ে এলো।দরজা ভিরিয়ে দিয়ে নিজের রুমে এসে শুয়ে পরলো।কিন্তু তেজ আর রাতে ঘুমাতে পারলো না কেমন জেনো টেনশন হতে লাগলো।আর ভয়ও করছে মনে।যদি কিয়ানা বুঝে যায়।তখন কি হবে।কিন্তু বোকা তেজ বুঝতে পারলো না।সে তাড়াতাড়ি করে আসতে গিয়ে কত বড় ভুল করে এসেছে।নিজের রুমাল পানির বাটি স্যুপের বাটি সব ফেলে এসেছে।নামাজ পরে তেজ আবার শুয়ে একটা ঘুম দিলো।সকাল সাতটা বাড়ির সকলেই উঠে গেছে।চৌধুরী বাড়ির ছোট বড় সবাই সকালে উঠে।কবির চৌধুরীর করা আদেশ সবাই কে নামাজ পরতে হবে এবং সকালে উঠতে হবে।সবাই এটা মেনে নিয়েছে।সকাল আট টা সবাই খাবার টেবিলে খেতে বসেছে।কিন্তু কিয়ানা এখনো নিচে নামেনি।দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। সবাই চিন্তায় আছে।এমন তো কখনো করে না কিয়ানা।তেজ ভিতরে ভিতরে টেনশন করছে।কিয়ানা নিয়ে তেজ বেশ চিন্তিত। কিন্তু কাউকে বলতে পারছে না।তেজ কোনো মতে খাবার শেষ করে উঠে পরলো।নাবিলা তেজের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।কাওসার চৌধুরী টুম্পার দিলে তাকিয়ে বললো।
"যা তো তোর বড় আপাকে ডেকে নিয়েআয়"
"যে চাচাজান যাচ্ছি"
বলেই টুম্পা চলে গেলো উপরে।টুম্পা কিয়ানার দরজার সামনে দাড়িয়ে ডাক দিলো।
"বড় আফা আপনারে চাচাজান ডাকছে"?
ভিতর থেকে কোনো সারা এলো না।টুম্পা আরো কয়েকবার ডাক দিলো।কিয়ানা ছোট করে উওর দিলো।
" যা আসছি"
টুম্পা নিচে চলে গেলো।কিয়ানা মাথা চেপে ধরে বেডে উঠে বসলো।চারপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে গেলো তাড়াতাড়ি উঠতে গেলে পারলো না।পুরো শরীর ব্যাথা হয়ে আছে।আর দূর্বল অনুভব করলো।কিয়ানা আশেপাশে তাকালো।নজরে এলো পানি ভর্তি একটা বাটি তার পাশে একটা রুমাল।আর আরেকটা বাটিতে অল্প একটু স্যুপ পরে আছে।পাশে ঔষধ এর বক্স।কিয়ানা নিজের মথায় চাপ দিয়ে মনে করার চেষ্টা করলো। আর মনেও পরে গেলো। কাল বিকেল থেকই কিয়ানার হালকা জ্বর ছিলো।রাতে কেউ তার সেবা করেছে।এই টুকু মনে পরে গেলো।কিন্তু কে ছিলো সেটা মনে করতে পারছে না।কিয়ানা বেড থেকে নেমে বাটিতে থাকা রুমাল টা হাতে নিলো।পানি চিপরে নিজের চোখের সামনে মেলে ধরলো।রুমালের এক কোনে একটা নাম দেখতে পেলো।ইংরেজি অক্ষরে লেখা তেজওয়ান ওয়াসিফ তেজ।কেউ হয়তো যত্ন করে নিজের হাতে লিখেছে।কিয়ানা সিওর হলো রাতে তার সেবা তেজ করেছে।কিন্তু এটা বুঝলো না তেজ কি করে তার রুমে এলো।আর জানলো কি করে তার জ্বর এসেছে।কিয়ানা আর কিছু না ভেবে ওয়াশ রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো।সাথে রুমাল টা ধুয়ে পরিস্কার করে সুখাতে দিলো। টুম্পাকে ডেকে সব কিছু নিয়ে যেতে বললো।তারপর কিয়ানা নিচে এলো। কাওসার চৌধুরী কিয়ানাকে দেখে বললো।
"তোমার কি শরীর খারাপ।"?
কিয়ানা চেয়ার টেনে বসে পরলো।তারপর পুরো টেবিলে চোখ বুলালো কোথাও তেজ কে দেখলো না।তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে উওর দিলো।
"রাতে একটু জ্বর এসেছিলো।তাই উঠতে দেরি হয়ে গেলো।"
নাহিয়ান অস্থির হয়ে জিগাসা করলো।
"আমি তো পাশের রুমে ছিলাম ডাকিস নি কেনো।এখন ঠিক আছিস তুই.?
কিয়ানা চুপ করে রইলো।অরুনিকা চৌধুরী অস্থির হয়ে এগিয়ে এসে মেয়ের কপালে হাত রেখে বললো।
"দেখি শরীর বেশি খারাপ লাগছে"
কিয়ানা অরুনিকা চৌধুরী হাত যারা মেরে ফেলে দিয়ে বললো।
"খবরদার আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টাও করবে না।আমি মরি বাঁচি। তাতে আপনার দেখার ভিষয় না।আমি আমার জন্য যথেষ্ট।"
কথাটা বলে না খেয়ে উপরে চলে যেতে নিলে।কাওসার চৌধুরী মেয়ের হাত ধরে বললো।
"বসো এখানে আর একটা কথাও বলবে না।"
পাশ থেকে কবির চৌধুরী বললেন।
"দিদিভাই খাবার খেয়ে তারপর উঠবে।আর একটা কথাও বলবে না।"
কাওসার চৌধুরী রুটি ছিরে সবজি দিয়ে মেয়ের মুখের সামনে ধরলো।কিয়ানা বিনা বাক্য খেয়ে নিলো।কাওসার চৌধুরী কাজের ফাঁকে যতটা সময় পায় ততটা মেয়েকে দিতেন।কিরণ এগিয়ে এসে বোনের কপালে হাত রেখে বললো।
"আপু তুমি ঠিক আছো।"?
কিয়ানা মুচকি হেসে বললো।
" আমি ঠিক আছি এতো চিন্তা করতে হবে না।"
কিরণ বোনকে জরিয়ে ধরে গালে চুমু গেলো।কিয়ানা তার ভাইকে আগলে নিলো।সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে হাসলো।অরুনিকা চৌধুরী চোখের পানি মুছে মনে মনে বললো।
"আমাকে কি কখনো ক্ষমা করতে পারবি না।আমি কি আর তোর মুখে মা ডাক শুনতে পাব না। আমি কত হতভাগা মা।যে নিজের মেয়ে তার সাথে কথা বলে না।"
চোখের পানি দেখার আগে অরুনিকা চৌধুরী রান্না ঘরে চলে গেলো।তার পিছনে কবিতা চৌধুরী গেলেন।অরুনিকা চৌধুরী কে বললেন।
"বড় ভাবি কষ্ট পায়েন না।আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"আর কিছু ঠিক হবে না ছোট।যে মেয়ে সারাদিন আম্মু আম্মু করে আমার পিছনে ছুটতো।সেই মেয়ে আজ আমার দিকে ফিরেও তাকায় না।আম্মু বলে ডাকা তো দূরে থাক।সব আমার দোষ, অনেক দেরি হয়ে গেছে রে ছোট এই একটা জিনিস বুঝতে।নিজের ভুলে আমি সব হারিয়েছি সব।"
কবিতা চৌধুরী কি বলে শান্তনা দিবে বুঝতে পারলো না।খাবার শেষ করে সবাই যার যার কাজে চলে গেলো।নাহিয়ান আজ হসপিটালে জয়েন করবে।তাই আর দেরি করেনি।কাওসার চৌধুরী আগেই চলে গেছেন।কামরুল চৌধুরী আজ একা অফিসে গেছেন।কবির চৌধুরী তেজ কে নিয়ে ভার্সিতিতে যাবে।হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠলো।ড্রইং রুমে তখন তেজ বসে ছিলো।কাউকে দেখতে না পেয়ে ও নিজেই দরজা খুলে দিলো।সামনে একজন ডেলিভারি বয় কে দেখে বললো।
"জী বলুন কাকে চাই"?
ছেলেটা তেজের দিকে তাকিয়ে বললো।
" জী এখানে তেজওয়ান ওয়াসিফ তেজ কে"? ওনাকে একটু ডেকে দিবেন ওনার নামে একটা পার্সেল এসেছে।"
তেজ অবাক হলো কে তাকে পারছেল পাঠাবে।তেজ অবাক হয়ে বললো।
"আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে আমার নামে কে পার্সেল পাঠাবে"?
" ও তাহলে আপনি কি তেজ"
"জী আমি তেজ"
"তাহলে এই নিন আপনার পার্সেল। আর এখানে সাইন করুন"
তেজ কাঁপা হাতে সাইন করে দিলো।দরজা লাগিয়ে পার্সেল নিয়ে রুমে এলো।খুলবে কি খুলবে না করে পার্সেল টা খুলে ফেললো।পার্সেল টা বেশ বড় ছিলো।তেজ কাটুন খুলে অবাক হলো।এখানে তার জন্য ছয়টা শার্ট,একেক টা একেক কালারের লাইট গ্রিন,ব্লাক,বেজ কালার,অলিভ গ্রীন,সাদা,বেবি ব্লু।চার টা প্যান্ট,পাঁচটা গেঞ্জি,দুইটা পাঞ্জাবি,একটা ঘড়ি,দুই জোরা জুতা,ব্রাশ প্রয়োজনিও সব কিছুই আছে।সাথে একটা ফোন।তেজ সব কিছু দেখে হতভাগ।কম করে হলেও এখানে ৫০ হাজার টাকার জিনিস আছে।তেজের সারা শরীর কাঁপছে। হঠাৎ চোখ পরলো একটা কাগজের উপর।কাঁপা হাতে কাগজ টা হাতে নিলো।কাগজের ভাজ খুলে পরতে লাগলো।সেখানে লিখা।
"এতো গুলো জিনিস দেখে অবাক হয়েছো।অবাক হওয়ার কথা।ছোট মাথায় এতো চাপ দেওয়ার প্রয়োজন নাই "হার্টথ্রব" (Heartthrob)। এগুলো সব তোমার জন্য।কে দিছে, কেনো দিছে, এতো ভেবে লাভ নাই।মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো।নিজের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করো।তোমার একটাই লক্ষ নিজের একটা পরিচয় তৈরি করা। যাতে কেউ তোমার দিকে আঙুল তুলতে না পারে।জীবন তোমাকে বার বার সুযোগ দিবে না।সুযোগ যখন পেয়েছো সেটাকে কাজে লাগাও।বাস্তবতা অনেক কঠিন।সেটা তুমি ভালো করেই জানো।এই সমাজের মানুষ নরমের যম শক্তের ভক্ত।নিজেকে এমন ভাবে গরে তুলো।যাতে তুমি না চাইলে কেউ তোমাকে আঘাত দিতে না পারে।নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা রইল "হার্টথ্রব"।তবে হ্যা সাবধান মেয়েদের থেকে ১০০ হাত দূরে থাকবে।নয়তো আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।"
চিঠিটা পরে তেজ অবাকের চরম পর্যায় পৌঁছে গেলো।তেজ বেডে থ মেরে বসে রইলো।কি হচ্ছে তার সাথে কিছুই বুঝতে পারলো না।তেজ দির্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললো।
"আমি জানি না আপনি কে.?।কিন্তু এই টুকু বুঝেছি আপনি আমার ভালোচান।আমি আপনার কথা গুলো মনে রাখবো।এবং সেটা পালনও করবো।যে সুযোগ টা আমি পেয়েছি তা আমি কাজে লাগাবো।আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাকে এতো সুন্দর ভাবে অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য।"
তেজ নিজে নিজে কথা গুলো বলে মুচকি হাসলো।সব কিছু গুছিয়ে রাখলো।আর এখান থেকে একটা প্যান্ট আর ব্লাক শার্ট পরে নিয়ে রেডি হয়ে নিলো।হাতে ঘড়িটা পরে নিলো।ফোন খুলে সেখানে সিম ও পেলো।তেজ সিমটা ফোনে ডুকিয়ে নিলো।Redmi Note 15 Pro Max ফোন টা তেজের খুব পছন্দ হয়েছে।কবির চৌধুরী তেজ কে ডাক দিলো।
"তেজ দাদুভাই কই তুমি দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।"
তেজ জুতা পরতে পরতে বললো।
"আসছি দাদুভাই"
কিছুখন পরে তেজ বের হলো।তেজ কে দেখে নাবিলা হা করে রইলো।তেজ কে কি সুন্দর লাগছে।অরুনিকা চৌধুরী তেজের কাছে এসে কপালে চুমু খেয়ে বললেন।
"মাশাআল্লা অনেক সুন্দর লাগছে আব্বু।কারো নজর জেনো না লাগে।"
তেজ অরুনিকা চৌধুরী জরিয়ে ধরে বললো।
"মামনি তুমি দোয়া করে দিয়েছে। আর কারো নজর লাগবে না।"
অরুনিকা চৌধুরী মুচকি হাসলো।তেজ বিদায় নিয়ে চলে গেলো,কিরণ আর কবির চৌধুরী সাথে।নাবিলা শুধু তাকিয়ে রইলো।কেয়া,কুহু চলে গেছে স্কুলে।কুহুর এবার SSC Exm দিলো।একটা পেকটিকেল আছে।তাহলে কুহু কিছুদিনের জন্য পড়াশুনা থেকে বিরতি পাবে।তেজ নিজের সাথে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছিলো।তাই তেজের ভর্তি হতে সমস্যা হলো না।তেজ কে অনার্স চতুর্থ বর্ষে ভর্তি করিয়ে দিলো।কারণ তেজ তৃতীয় বর্ষে পরিক্ষা দিয়ে এসেছে।কিয়ানা বুম থেকে আর বের হয় নি।সারাদিন শুয়ে ছিলো।তেজ কিরন বিকেলে বাসায় এসেছে।এসে গোসল করে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলো দুইজন।তেজ খাবার খেয়ে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লো।নাহিয়ান পাঁচটার দিকে বাড়ি এসেছে।আজ প্রথম দিন হওয়ায় কাওসার চৌধুরী তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে।নাহিয়ান বাড়ি এসে গোসল করে রুমে বসে রেষ্ট নিয়ে।আযানের শব্দ শুনে নাহিয়ান নিচে নেমে এলো নাহিয়ান নিচে এসে দেখে।কিরণ,তেজ,কবির চৌধুরী,কামরুল চৌধুরী, নামাজ পরতে মসজিদে যাচ্ছে।নাহিয়ান তাদের সাথে গেলো।নামজ পরে এসে সবাই ড্রইং রুমের সোফায় বসলো।অরুনিকা চৌধুরী আর কবিতা চৌধুরী সবাই কে চা দিলেন।সাথে সিংগাড়া আর পুরি।তেজ চায়ের কাপ হাতে নিতে যাবে।তখন টুম্পা এসে তেজের উদ্দেশ্য বললো।
"ভাইজান আপনাকে বড় আপায় ডাকে।"
তেজ চমকে গেলো।বাকি সবাই অবাক হলো।টুম্পা আবার বললো।
"তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে।"
তেজ অসহায় চোখে কবির চৌধুরী দিকে তাকালো।কবির চৌধুরী তেজ কে বললো।
"যাও শুনে এসো।ভয় পেওনা যাও।"
নাহিয়ান কেমন করে যেনো তাকিয়ে আছে তেজের দিকে।ভিতরে ভিতরে রাগে ফুসছে।তেজ ভয়ে ভয়ে উপরের দিকে যেতে লাগলো।নাহিয়ান তেজের যাওয়ার দিকে হাত মুষ্টি বদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে রইলো।তেজ কিয়ানার রুমের সামনে এসে দাড়িয়ে রইলো। ভয়ে বুক কাঁপছে রাতের জন্য যে ডাকছে এটা তেজ সিওর।নয়তো তাকে ডাকার কারণ নাই।তেজের ভাবনা চিন্তার মাঝে ভিতর থেকে গম্ভীর সরে কিয়ানা বললো।
"ভিতরে এসো"
তেজ মনে মনে বললো।
"আল্লাহ এই বারের মতো বাঁচিয়ে নাও।আর জীবনেও এই রুমের দিকে চোখ তুলেও তাকাব না।আল্লাহ এই শেষ বার বাঁচিয়ে নাও।"
বুকে ফু দিয়ে ভিতরে ডুকলো তেজ।কিয়ানা তখন পায়ের উপর পা তুলে সোফায় বসে ছিলো।তেজ কে ভিতরে আসতে দেখে কিয়ানা তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকালো তেজের দিকে।ভয়ে তেজ মাথা নিচু করে নিলো।কিয়ানা তেজের দিকে তাকিয়ে বললো।
"কাল কেনো এসেছিলে আমার রুমে"?
তেজ আমতা আমতা করতে লাগলো।কিয়ানা গম্ভীর সরে আবার বললো।
"Look at me and talk to me eye to eye."
তেজ মাথা উচু করে কিয়ানার চোখে চোখ রাখলো।আজ তেজ কিয়ানা কে ভালো করে দেখলো।কিয়ানা দেখতে শ্যামলা,চোখ দুটো টানা টানা।গোলাপি ঠোঁট,চিকন ভ্রু প্রথমে দেখে যে কেউ বলবে।ভ্রু প্লাক করা,কিন্ত এটা নেচেরাল।ডান গালে ছোট একটা তিল।তেজ কিয়ানার চুল দেখতে পারলো না।কারণ আজো কিয়ানা হাত খোপা করেছে তার মধ্যে মাথায় ওড়না দেওয়া।সব মিলিয়ে তেজের কাছে কিয়ানাকে অসম্ভব ভালো লাগলো।কিয়ানার নজর কারা চোখ দুটো যে কাউকে ঘায়েল করতে সক্ষম। তেজ বেশিখন সেই চোখের দিলে তাকিয়ে থাকতে পারলো না।মাথা নিচু করে নিলো।কাঁপা গলায় বললো।
"আসলে রাতে আমি পানি খেতে উঠেছিলাম।কিন্তু জগে পানি ছিলো না।তাই কিচেনে এসে পানি খাই।পানি খেয়ে যখন জগ ভর্তি করে পানি নিয়ে রুমে ফিরে যাচ্ছিলা।তখন উপর থেকে কিছু পড়ার শব্দ পাই।প্রথমে ভেবেছিলাম চোর,কিন্তু সব রুমের দরজা বন্ধ ছিলো।তাই নিচে নেমে যাচ্ছিলাম।তখন চোখ পরে আপনার রুমের দরজার দিকে।কারণ আপনার রুমের দরজা চাপানো ছিলো।তাই দরজার সামনে এগিয়ে গেলাম।ভিতরে কোনো সারা না পেয়ে যখন ফিরে আসতে যাব তখন আপনার গোঙানি শব্দ শুনতে পাই।তারপর আপনার রুমে ডুকি দেখি আপনি হাত দিয়ে পানির জগ ধরার চেষ্টা করছেন।পরে যেতে নিলে। আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে ধরে ফেলি আপনাকে।আর তখন বুঝতে পারি আপনার গায়ে প্রচুর জ্বর।কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না।কাউকে যে ডাকব সেই সাহস ও হচ্ছিলো না।যদি প্রশ্ন করে আমি এখানে কেনো।তখন কি বলবো।আপনার মাথায় জ্বল পট্টি দেয় জ্বর কমার জন্য।তারপর ঔষধ কথা মনে পরে।আর আপনার টেবিলের উপর ঔষধের বক্স পেয়ে যাই।কিন্তু খালি পেটে তো আর ঔষধ খাওয়ানো যাবে না।তাই আবার কিচেনে গিয়ে স্যুপ বানিয়ে এনে আপনাকে খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে আমি রুম থেকে চলে যাই।বিশ্বাস করুন আমি ইচ্ছে করে আপনার রুমে আশিনি।আর আপনাকে এই অবস্থায় ফেলে রেখে যেতে পারিনি।প্রমিচ আর কোনোদিন আপনার রুমের সামনে তো দূর চোখ তুলে তাকাবও না।এবারের মতো মাফ করে দিন প্লিজ।এম ভুল আর হবে না।"
তেজ এক নাগার কথা গুলে বলে হাঁপিয়ে গেছে।কিয়ানা কিছুখন তেজের দিকে তাকিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বললো।
"পানিটা খাও"
এই মুহুর্তে পানিটা খুব দরকার ছিলো।কারণ ভয়ে গলা শুখিয়ে গেছে তেজের।এক ঢোকে পুরো পানি শেষ করলো তেজ।কিয়ানা বললো।
"গাড়ি চালাতে পারো"?
এই সময় এই কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো তেজ।তবুও নিজেকে সামলিয়ে মাথা নাড়ালো।কিয়ানা তেজের দিকে একটা চাবি ছুরে মারলো।তেজ সাথে সাথে ক্যাচ ধরে ফেললো।কিয়ানা গম্ভীর মুখে বকলো।
" আমার গাড়ির ড্রাইভার ১ মাসের জন্য ছুটিতে গেছে।তার অপারেশন হয়েছে।তাই এই এক মাস তুমি গাড়ি চালাবে।কাল সকাল আট টায় আমি আমার গাড়ি পরিস্কার দেখতে চাই।"
"ওকে"
"এখন তুমি আসতে পারো"
তেজ তাড়াতাড়ি করে রুম থেকে বের হয়ে, বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো।মনে মনে বললো।
"মনে হয় বাঘের খাঁচা থেকে জান টা হাতে নিয়ে বের হয়ে এলাম।থুক্কু বাঘীনি হবে।দূর সব তালগোল পাকিয়ে গেছে।"
তেজ কে নিচে আসতে দেখে। কবির চৌধুরী বললেন.?
"কিছু বলেছে"?
তেজ গাড়ির চাবি দেখিয়ে বললো।
" তার গাড়ির ড্রাইভার যতদিন না আসে।ততদিন আমাকে গাড়ি চালাতে বললো।আর কাল সকাল আট টার আগে গাড়ি পরিস্কার করে।রেডি করে রাখতে বললো।"
"কিন্তু তোমার তো কাল থেকে ভার্সিটিতে যাওয়ার কথা"?
" আরে দাদু চিন্তা করো না।আমি ম্যানেজ করে নিবো"
কবির চৌধুরী আর কিছু বললেন না। নাহিয়ান নিজেকে গালি দিতে দিতে বললো।
"ছি: নাহিয়ান তুই এই সামান্য বিষয় নিয়ে এই ছেলেটা প্রতি জেলাস ফিল করসিস।তুই আসলেই একটা গাঁদা"
নিজে মনে বিরবির করে মুচকি হাসলো নাহিয়ান।
চলবে.....
(কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন)