10/07/2026
অর্ধ-মৃত্যু
— সায়াদ ইবনে হাবীব
এশার নামাজ পড়ে ঘরে ফিরেছি। পরিবারের সবাইকে নিয়ে রাতের খাবার খাওয়া আর কিছুক্ষণ গল্প-আড্ডা যেন আমাদের নিত্যদিনের রুটিন। আজও তাই।
রাত প্রায় বারোটা। একে একে সবাই ঘুমাতে চলে গেছে। চারদিকে গভীর নীরবতা। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, মাঝে মাঝে শিয়ালের হুক্কাহুয়া।
আমার পাশে স্ত্রী ঘুমিয়ে আছে। তার মুখে প্রশান্তির ছাপ। মৃদু নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আর আমার বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে আমার আদরের একমাত্র সন্তান। ছোট্ট দুটি হাত দিয়ে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় এটাই।
আমি তাদের দু'জনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
ভাবছিলাম—
মানুষ আসলে কতটা সুখী হতে পারে!
তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, মনে নেই।
হঠাৎ অনুভব করলাম, ঘরের পরিবেশ বদলে গেছে।
চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা।
এমন নীরবতা, যা আগে কখনো অনুভব করিনি।
আমি চোখ খুলতেই দেখলাম, আমার সামনে এক ভয়ংকর অথচ মহিমান্বিত উপস্থিতি।
মনে হলো, মৃত্যুর ফেরেশতা এসে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি আমাকে ডাকছেন।
আমার রূহকে ডাকছেন।
প্রথমে পায়ের আঙুলগুলো অবশ হয়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে সেই নিস্তেজতা পা বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
আমি বুঝে গেলাম—
সময় শেষ।
দুনিয়ার সফর শেষ।
এটাই সেই মুহূর্ত, যার কথা অসংখ্যবার শুনেছি, কিন্তু কখনো কল্পনা করিনি এত কাছে এসে দাঁড়াবে।
পাশে তখনও স্ত্রীর নাক ডাকার শব্দ।
আমার সন্তান তখনও আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে।
আমি কষ্ট করে স্ত্রীকে ডাকলাম।
সে আধো ঘুমে চোখ খুলল।
আমি তার কপালে একটি চুমু খেলাম।
তারপর আমার সন্তানকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলাম।
তার নিষ্পাপ কপালেও একটি চুমু এঁকে দিলাম।
গলা ভারী হয়ে আসছিল।
আমি শুধু বললাম—
"আমার সন্তানটাকে দেখে রেখো।"
তারপর...
সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।
---
কিন্তু গল্প সেখানেই শেষ হলো না।
মৃত্যুর পর আমি নিজেকেই দেখতে পেলাম।
আমার নিথর দেহ বিছানায় পড়ে আছে।
আর যে স্ত্রী কিছুক্ষণ আগেও আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে ছিল, সে আতঙ্কে দূরে সরে গেছে।
আমি তাকে দোষ দিলাম না।
এটাই মানুষের স্বভাব।
জীবিত মানুষ মৃতকে ভয় পায়।
কিন্তু আমার ছোট্ট সন্তান কিছুই বোঝে না।
সে আমার বুকে উঠে বসেছে।
"বাবা... বাবা..."
বলে ডাকছে।
আমার মুখে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
কপালে চুমু খাচ্ছে।
আমাকে জাগানোর চেষ্টা করছে।
সেই দৃশ্য দেখে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছিল।
কিন্তু আমি কিছুই করতে পারছিলাম না।
---
খবর ছড়িয়ে পড়ল।
মা কাঁদছে।
বাবা কাঁদছে।
ভাই-বোন কাঁদছে।
চাচা-মামা কাঁদছে।
বন্ধু-বান্ধব কাঁদছে।
কেউ সত্যি সত্যি কাঁদছে।
কেউ সামাজিক দায়িত্ব পালন করছে।
কেউ লোক দেখানো কান্নাও করছে।
শ্বশুর-শাশুড়িও কাঁদছেন।
তাদের আত্মীয়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।
কিন্তু তাদের কথাগুলো শুনে আমি অবাক হলাম।
"মেয়েটার এখন কী হবে?"
"বাচ্চাটার ভবিষ্যৎ কী হবে?"
"এত অল্প বয়সে কী বিপদে পড়ল!"
আমি অপেক্ষা করছিলাম, কেউ হয়তো বলবে—
"আল্লাহ ওকে ক্ষমা করুন।"
"ওর কবরটা আলোকিত করুন।"
কিন্তু অধিকাংশ মানুষ মৃত মানুষটার চেয়ে, তার রেখে যাওয়া শূন্যতা নিয়েই বেশি চিন্তিত।
---
মসজিদের মাইকে ঘোষণা হলো—
"ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন..."
গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে গেল।
কেউ কবর খনন করছে।
কেউ বাঁশ কাটছে।
কেউ কাফন কিনতে গেছে।
কেউ ফোনে খবর পৌঁছে দিচ্ছে দূরের আত্মীয়দের কাছে।
আর আমার চারপাশে বসে অনেকে কুরআন তিলাওয়াত করছে।
আমি শুনতে পাচ্ছিলাম।
প্রতিটি আয়াত শুনতে পাচ্ছিলাম।
হঠাৎ আমার বুকের ভেতর থেকে এক আর্তনাদ বেরিয়ে এলো।
আমি বলতে চাইলাম—
"ভাই, আজ আমাকে নয়, নিজেকে শোনাও!"
"এই কুরআন তো জীবিত মানুষের জন্য নাজিল হয়েছে।"
"যখন আমি বেঁচে ছিলাম, তখন আমাকে এই আয়াতগুলোর কথা মনে করিয়ে দিতে।"
"তখন হয়তো আরও বেশি তওবা করতাম।"
"তখন হয়তো আরও বেশি কুরআন পড়তাম।"
"তখন হয়তো আল্লাহর দিকে আরও বেশি ফিরে আসতাম।"
কিন্তু মৃত মানুষের কথা কে শোনে?
আমার চিৎকার আমার মধ্যেই বন্দী রয়ে গেল।
---
গোসল সম্পন্ন হলো।
কাফন পরানো হলো।
সাদা কাপড়ে জড়িয়ে গেল আমার সমস্ত পরিচয়।
পদবি নেই।
সম্পদ নেই।
ক্ষমতা নেই।
শুধু একজন মৃত মানুষ।
মানুষ লাইন ধরে এসে শেষবারের মতো আমার মুখ দেখছে।
কেউ বলছে,
"লোকটা খুব ভালো ছিল।"
কেউ বলছে,
"এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে ভাবিনি।"
আমি শুধু ভাবছিলাম—
এই কথাগুলো যদি জীবিত অবস্থায় শুনতাম!
---
জানাজার আগে ইমাম সাহেব মৃত্যু নিয়ে কথা বললেন।
জিজ্ঞেস করলেন, কোনো পাওনাদার আছে কি না।
আমার পক্ষ থেকে সবার কাছে ক্ষমা চাওয়া হলো।
তারপর জানাজা।
তারপর কবর।
তারপর মাটি।
এক মুঠো...
দুই মুঠো...
তিন মুঠো...
মাটির নিচে নেমে গেল আমার সমস্ত দুনিয়া।
মানুষ দোয়া করল।
তারপর একে একে চলে গেল।
যার যার কাজ আছে।
যার যার জীবন আছে।
দুনিয়া কারও জন্য থেমে থাকে না।
---
বাড়িতে ফিরে আত্মীয়-স্বজনরা বসল।
আলোচনা শুরু হলো।
আমার স্ত্রী কোথায় থাকবে।
আমার সন্তানের দায়িত্ব কে নেবে।
কে কীভাবে সাহায্য করবে।
সবাই কোনো না কোনো দায়িত্ব ভাগ করে নিল।
কিন্তু তখন আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত আফসোস জেগে উঠল।
আমার স্ত্রীকে কেউ দেখবে।
আমার সন্তানকে কেউ দেখবে।
আমার বাড়ি, জমি, সম্পদ—সব কিছুর দেখভাল হবে।
কিন্তু...
আমার দায়িত্ব কে নেবে?
আমার কবরের অন্ধকারে কে নামবে?
আমার হিসাব কে দেবে?
আমার নামাজের ঘাটতি কে পূরণ করবে?
আমার গুনাহের জবাব কে দেবে?
কেউ না।
একেবারে কেউ না।
সেদিন বুঝলাম, পৃথিবীতে মানুষ অনেক দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারে, কিন্তু নিজের আখিরাতের দায়িত্ব কাউকে দিয়ে যাওয়া যায় না।
---
ঠিক তখনই দূর থেকে একটি ধ্বনি ভেসে এলো।
প্রথমে ক্ষীণ।
তারপর স্পষ্ট।
তারপর আরও স্পষ্ট।
"আল্লাহু আকবার... আল্লাহু আকবার..."
আমি চমকে উঠলাম।
চোখ খুললাম।
ফজরের আজান।
আমার চোখ ভেজা।
গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
পাশে তাকিয়ে দেখি, স্ত্রী আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে।
আমার সন্তানটাও নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।
মনে হলো, যেন আমি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি।
আজানের শব্দে স্ত্রী জেগে উঠল।
আমাকে জেগে থাকতে দেখে অবাক হয়ে বলল,
"আজ এত ভোরে উঠে গেছেন?"
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
তারপর জিজ্ঞেস করলাম,
"এই যে আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছো, যদি দেখো আমি মারা গেছি, তখনও কি এভাবেই জড়িয়ে ধরে থাকবে, নাকি ভয়ে দূরে সরে যাবে?"
স্ত্রী মৃদু হেসে বলল,
"ভয় পাব কেন?"
তার উত্তর শুনে বুকটা ভরে গেল।
আমি বললাম,
"অদ্ভুত না? মানুষ জীবিত মানুষের চেয়ে মৃত মানুষকে বেশি ভয় পায়। অথচ মৃত মানুষ কারও কোনো ক্ষতি করতে পারে না। অনেক সময় জীবিত মানুষই জীবিত মানুষের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে।"
বাইরে তখন ফজরের আজান শেষের পথে।
আমি সন্তানটার মাথায় হাত রাখলাম।
স্ত্রীর দিকে তাকালাম।
তারপর মনে মনে বললাম—
হে আল্লাহ, আজকের এই স্বপ্ন যদি আপনার পক্ষ থেকে কোনো সতর্কবার্তা হয়ে থাকে, তবে আমাকে ক্ষমা করুন।
আমাকে এমন মৃত্যু দিন, যার আগে আমি আপনার কাছে ফিরে আসার সুযোগ পাই।
আর যখন সত্যিই সেই রাত আসবে, তখন যেন আমার জন্য মানুষের কান্নার চেয়ে বেশি হয় মানুষের দোয়া।
কারণ মৃত্যুর পর মানুষ নয় শুধু আমলই সঙ্গী হয়।