25/12/2025
বাংলা এডিশনের এনওসি বাতিলের সিদ্ধান্তটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রশ্ন নয়—এটি একটি গুরুতর আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন। রাষ্ট্র যদি কোনো গণমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত করতে চায়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের পেছনে স্পষ্ট কারণ, লিখিত ব্যাখ্যা এবং আইনের নির্দিষ্ট ধারা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। কারণ, গণমাধ্যম পরিচালনা করা বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী মৌলিক অধিকার—বিশেষ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
যদি “প্রতিষ্ঠাতা কে” বা “কার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত” হওয়াটাই অপরাধ হয়, তাহলে আইন সমানভাবে সবার জন্য প্রযোজ্য হওয়ার কথা। সেই যুক্তিতে সালমান রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ, টিপু মুনশির এভারকেয়ার, এস আলম গ্রুপ কিংবা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মালিকানাধীন অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান—সবগুলোর বি'রুদ্ধেই একই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। এখানেই প্রশ্ন ওঠে—এই সিদ্ধান্ত কি আইনের শাসনের (Rule of Law) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি এটি বৈষম্যমূলক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত?
আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—Selective application of law is abuse of power। অর্থাৎ, কাউকে লক্ষ্য করে আইন প্রয়োগ করা এবং অন্যদের ক্ষেত্রে চোখ বন্ধ রাখা স্পষ্টভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার। বাংলা এডিশনের ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই হয়েছে। একই অপরাধে এক পক্ষকে শাস্তি আর অন্য পক্ষকে ছাড় দেওয়া সংবিধানের Article 27 (আইনের দৃষ্টিতে সমতা)-এর সরাসরি লঙ্ঘন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এনওসি বাতিলের আগে কি বাংলা এডিশনকে শোকজ নোটিশ, শুনানির সুযোগ বা নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যার অধিকার দেওয়া হয়েছে? যদি না দিয়ে থাকে, তাহলে এটি প্রশাসনিক আইনের সবচেয়ে মৌলিক নীতি Natural Justice-এর লঙ্ঘন। “No one should be condemned unheard”—এই নীতির ব্যতিক্রম কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য নয়।
ইউনুস সরকারের পক্ষ থেকে যদি এই সিদ্ধান্তের পক্ষে শক্ত আইনি ব্যাখ্যা না থাকে, তাহলে আদালতে এই সিদ্ধান্ত টিকে থাকার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই। উচ্চ আদালতে গেলে এটি সহজেই arbitrary, malafide এবং unconstitutional হিসেবে চিহ্নিত হবে। অতীতের বহু রায়ে দেখা গেছে—যেখানে সরকারের সিদ্ধান্তে যুক্তির ঘাটতি ছিল, সেখানে আদালত সরাসরি সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে।
আরেকটি দিক উপেক্ষা করা যায় না। কিছু প্রভাবশালী মিডিয়া হাউস ও আন্তর্জাতিক লবির স্বার্থে যারা সব সময় সরব থাকে, তারা বাংলা এডিশনের প্রশ্নে সম্পূর্ণ নীরব। এই নীরবতা তথাকথিত এলিট শ্রেণির দ্বিচারিতা ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদেরই প্রমাণ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যদি সত্যিই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতো, তাহলে তারা নির্বাচিতভাবে নয়—সব ক্ষেত্রেই প্রতিবাদ করত।
সবশেষে একটি কথাই মনে করিয়ে দিতে হয়—জুলাই এখনো শেষ হয়ে যায়নি। হাদির জানাজা দেখিয়েছে, মানুষের ক্ষো'ভ এখনো জীবিত। এই ক্ষো'ভ দমিয়ে রাখা যায় না প্রশাসনিক কাগজে-কলমে নেওয়া অন্যায় সিদ্ধান্ত দিয়ে। রাষ্ট্র যখন বারবার যুক্তিহীন ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেটাই নতুন করে অস্থিরতার বীজ বপন করে। আপনারাই এমন পরিস্থিতি তৈরি করছেন, যেখানে আরেকটি জুলাই শুধু সম্ভাবনা নয়—ধীরে ধীরে বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে।