09/02/2026
🗣️একদিন হজ্জাজ ইবনে ইউসুফ শিকারে বের হলেন। পথে তিনি দেখলেন—একটি অল্পবয়সী ছেলে, আনুমানিক দশ বছর বয়স, তার পাশে নয়টি কুকুর ও কিছু ভেড়া রয়েছে।
হজ্জাজ তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ
— হে বালক! এখানে তুমি কী করছ?
ছেলেটি মাথা তুলে তার দিকে তাকিয়ে বললঃ
— হে খবর বহনকারী! তুমি আমাকে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেছ, অহংকারের সুরে কথা বলেছ। তোমার কথা জবরদস্তের কথা, আর তোমার বুদ্ধি খচ্চরের বুদ্ধি!
হজ্জাজ বললেনঃ
— তুমি কি জানো আমি কে?
ছেলেটি বললৌ
— তোমার মুখের কালিমা দেখেই চিনেছি, কারণ তুমি সালাম দেওয়ার আগে কথা বলেছ।
হজ্জাজ বললেনঃ
— ধ্বংস হোক তোমার! আমি হজ্জাজ ইবনে ইউসুফ।
ছেলেটি বললঃ
— আল্লাহ যেন তোমার ঘর ও বাসস্থানকে কাছে না আনেন। তোমার কথা অনেক, কিন্তু সম্মান কম।
এই কথা শেষ হতেই চারদিক থেকে সৈন্যরা তাকে ঘিরে ফেলল। হজ্জাজ আদেশ দিলেন—ছেলেটিকে প্রাসাদে নিয়ে যাও। তিনি নিজে দরবারে বসলেন; চারপাশে লোকজন নীরব ও ভীত, আর তিনি যেন তাদের মাঝে এক সিংহ।
ছেলেটিকে হাজির করা হলে সে মাথা তুলে প্রাসাদের উঁচু ভবন, নকশা ও মোজাইক দেখে বললঃ
“তোমরা কি প্রতিটি উঁচু স্থানে স্মারক নির্মাণ করছ খেলাচ্ছলে?
আর কি তোমরা স্থায়ী প্রাসাদ বানাচ্ছ যেন চিরকাল থাকবে?
আর যখন আঘাত কর, তখন জুলুম করেই আঘাত কর।”
হজ্জাজ উঠে বসলেন এবং বললেনঃ
— তুমি কি কুরআন মুখস্থ করেছ?
ছেলেটি বললঃ
— কুরআন কি আমার কাছ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে যে আমি তাকে ধরব?
হজ্জাজ জিজ্ঞেস করলেনঃ
— তুমি কি পুরো কুরআন একত্র করেছ?
ছেলেটি বললঃ
— কুরআন কি ছড়িয়ে আছে যে আমি তাকে একত্র করব?
হজ্জাজ বললেনঃ
— তুমি কি আমার প্রশ্ন বোঝোনি?
ছেলেটি বললঃ
— আপনার বলা উচিত ছিল: তুমি কি কুরআন পড়েছ এবং তার অর্থ বুঝেছ?
হজ্জাজ বললেনঃ
— বলো তো—
কে বাতাস থেকে সৃষ্টি হয়েছে?
কে বাতাস দ্বারা রক্ষা পেয়েছে?
আর কে বাতাসে ধ্বংস হয়েছে?
ছেলেটি বললঃ
— বাতাস থেকে সৃষ্টি হয়েছেন আমাদের নবী ঈসা (আ.),
বাতাস দ্বারা রক্ষা পেয়েছেন সুলায়মান (আ.),
আর বাতাসে ধ্বংস হয়েছে হূদের জাতি।
হজ্জাজ আবার জিজ্ঞেস করলেন:
— কে কাঠ থেকে সৃষ্টি হয়েছে?
কে কাঠ দ্বারা রক্ষা পেয়েছে?
আর কে কাঠের কারণে ধ্বংস হয়েছে?
ছেলেটি বললঃ
— কাঠ থেকে সৃষ্টি হয়েছে সাপ—মূসা (আ.)-এর লাঠি থেকে,
কাঠ দ্বারা রক্ষা পেয়েছেন নূহ (আ.),
আর কাঠের কারণে শহীদ হয়েছেন যাকারিয়া (আ.)।
হজ্জাজ বললেনঃ
— কে পানি থেকে সৃষ্টি হয়েছে?
কে পানিতে রক্ষা পেয়েছে?
আর কে পানিতে ধ্বংস হয়েছে?
ছেলেটি বললঃ
— পানি থেকে সৃষ্টি হয়েছেন আমাদের পিতা আদম (আ.),
পানি থেকে রক্ষা পেয়েছেন মূসা (আ.),
আর পানিতে ধ্বংস হয়েছে ফেরাউন।
হজ্জাজ বললেনঃ
— কে আগুন থেকে সৃষ্টি হয়েছে?
আর কে আগুন থেকে রক্ষা পেয়েছে?
ছেলেটি বললঃ
— আগুন থেকে সৃষ্টি হয়েছে ইবলিস,
আর আগুন থেকে রক্ষা পেয়েছেন ইবরাহিম (আ.)।
হজ্জাজ বললেনঃ
— বলো তো—বুদ্ধি, ঈমান, লজ্জা, দানশীলতা, সাহস, উদারতা ও কামনা—এসব কেমন করে ভাগ করা হয়েছে?
ছেলেটি বললঃ
— আল্লাহ বুদ্ধিকে দশ ভাগ করেছেন—নয় ভাগ পুরুষে, এক ভাগ নারীতে।
ঈমান দশ ভাগ—নয় ভাগ ইয়েমেনে, এক ভাগ বাকি দুনিয়ায়।
লজ্জা দশ ভাগ—নয় ভাগ নারীতে, এক ভাগ পুরুষে।
দানশীলতা দশ ভাগ—নয় ভাগ পুরুষে, এক ভাগ নারীতে।
সাহস ও উদারতা দশ ভাগ—নয় ভাগ আরবদের মধ্যে, এক ভাগ বাকি বিশ্বে।
কামনা দশ ভাগ—নয় ভাগ নারীতে, এক ভাগ পুরুষে।
হজ্জাজ জিজ্ঞেস করলেন:
— তোমার কাছে সবচেয়ে নিকটতম জিনিস কী?
ছেলেটি বললঃ
— আখিরাত।
হজ্জাজ বললেনঃ
— সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ যাকে চান তাকে প্রজ্ঞা দান করেন। এমন জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান বালক আমি কখনো দেখিনি।
এরপর হজ্জাজ বললেনঃ
— নারীদের সম্পর্কে বলো।
ছেলেটি বললঃ
— আপনি আমাকে নারীদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছেন, অথচ আমি এখনো ছোট; তাদের স্বভাব ও চাহিদা সম্পর্কে জানি না। তবে প্রচলিত কথাগুলো বলি—
দশ বছরের মেয়ে—হুরের মতো,
বিশ বছরের—দৃষ্টির আনন্দ,
ত্রিশ বছরের—জান্নাত,
চল্লিশ বছরের—নরম ও ভারী,
পঞ্চাশ বছরের—সন্তান ও পরিবার,
ষাট বছরের—প্রশ্নকারীর জন্য কোনো উপকার নেই।
হজ্জাজ বললেনঃ
— বাহ, খুব সুন্দর! তুমি আমাদের জ্ঞানের সাগরে ডুবিয়ে দিলে। এখন তোমাকে সম্মান দেওয়া আমাদের কর্তব্য।
তিনি তাকে এক হাজার দিনার, সুন্দর পোশাক, এক দাসী, একটি তলোয়ার ও একটি ঘোড়া দিতে আদেশ দিলেন।
হজ্জাজ মনে মনে ভাবলেনঃ
“যদি সে ঘোড়া নেয়, বেঁচে যাবে; অন্য কিছু নিলে তাকে হত্যা করব।”
তারপর বললেনঃ
— যা ইচ্ছা নাও।
ছেলেটি বললৌ
— যদি আমাকে বেছে নিতে দেন, আমি ঘোড়াই নেব।
আর যদি আপনি সত্যিই শরিফ মানুষ হন, তবে সবই দিন।
হজ্জাজ বললেনঃ
— সব নিয়ে যাও, আল্লাহ যেন এতে বরকত না দেন!
ছেলেটি বললঃ
— আমি গ্রহণ করলাম। আল্লাহ যেন আপনাকে এর বদলে অন্য কিছু না দেন, আর যেন আমার সঙ্গে আর কখনো আপনার সাক্ষাৎ না হয়।
এইভাবে ছেলেটি হজ্জাজের দরবার থেকে বেরিয়ে গেল—নিরাপদ, বিজয়ী ও সম্পদসহ; তার বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের কল্যাণে।💙💙💙