12/11/2023
#ধোয়া
#শেষ পর্ব
লেখকঃ মো রাকিব
©️Copyright Prohibited 🚫
দাদির এই কথা শুনে আমি হতভম্ব, কি কও দাদি? আমার লাগবে না তোমার ওসব জিন, জিনের বাদশা তুমি তোমার সাথে নিয়া যাইও আমার বাবু ঘরে ও ভয় পাবে। দাদি একটু হেসে গম্ভীর গলায় বললো যদি পারতাম তবে আমার সাথেই নিয়ে যেতাম। তখন দাদির এই কথার অর্থ বুঝিনি।
আবার শুরু হলো আমার শশুরবাড়িতে আমার সাথে ঘটা সব অদ্ভুদ কার্যকলাম। দাদি ভীষণ অসুস্থ ওনার বাতের ব্যাথা ছিল। আমি রাতে বাবু কে ঘুম পাড়িয়ে বাবুর বাবার ঘরে ফেরার অপেক্ষা করছিলাম আর দাদির পা টিপছিলাম, পা টিপার একটা মুহূর্তে আমার নজর দাদির পানি খাওয়ার গ্লাসের দিকে গেল, গ্লাসটা নড়লো না?
এদিকে দাদি চোখ বন্ধ করে গুনগুন করে তেলাওয়াত করছিলেন, আমি দাদি কে বললাম দাদি পানির গ্লাসটা নড়ছে। দাদি কিছুই বলল না। তারই কিছুক্ষন পর কি দেখলাম, দাদির সাদা শাড়ির একটা আচঁল শূন্যে একটু একটু করে উঠছিল, আমি এক লাফে দাদিগো বলে ওনার মাথার সামনে গিয়ে বসে যাই। দাদি দাদি দেখো তোমার শাড়ি শূন্যে ভাসতেছে। দাদি শুধু মাথাটা ঘুরিয়ে একটু তাকালো আর বলল এই আচঁল ছাড়, আর মুহূর্তেই শাড়িটার আচঁল শূন্যে থেকে নিচে পড়ে গেল।
আমিতো ভয়ে চিলা-চিল্লি শুরু করে দিয়েছি। দাদি বলে এক বাচ্চার মা হইছস এহনো এত লাফাস ক্যান? আমি বললাম যাও দাদি এসব কি ? তুমি তো জানো আমি এগুলা কতটা ভয় পাই। দাদি আমার দিকে তাকিয়ে বলে আমি বাড়িতে গেলে আমার সাথে চলে যাবে চিন্তা করিস না। আমি ঠিক আছি তুই আমাকে বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা কর। কিন্তু আমার দাদি কখনোও থাকে না আমার কাছে। আর এখন তিনি বেশ অসুস্থ তাই আমি একটু ভয় পেলেও সেটাকে নিজের মত করে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তবে একটা ভাল ব্যাপার হচ্ছে দাদির পর আমিই একমাত্র যে ওদের কার্যকলাপ অনুভব করতে পারতাম।
আমি প্রতিদিন রাতে দাদিকে বিছানা ছেড়ে নিচে জায়নামাজ বিছিয়ে বসিয়ে দিতাম তিনি নামাজ পড়তো রাত জেগে।
এক রাতের কথা, তখন আমি দাদিকে নামাজে বসিয়ে বাবুকে ঘুম পাড়াতে যাই, বাবু ঘুমিয়ে পড়লে ওর শরীরের উপর কাথা দেওয়ার জন্য কোন কাথা খুজে না পেয়ে আমি ঘরের অন্য একটা কক্ষে যাওয়ার জন্য যখন রুম থেকে বের হবো ঠিক দরজার ছোট্ট স্থান দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পাই দাদি যে স্থানটায় নামাজ পড়ছে তার ঠিক পেছনের সাড়িতে দাদিকে অনুসরন করছে কতগুলো ছায়া, দাদির সাথে নামাজ পড়ছে, এ দেখে আমি এক লাফে বিছানায়।
আমার স্বামীকে উঠিয়ে বলি দেখো দাদির সাথে সাথে কে যেন নামাজ পড়তেছে। সে কোন গুরত্বই দিল না। একটু পর দাদি আমাকে মনি মনি করে পরপর দুইবার ডাক দেয়। আমি জি দাদি বলে একটু মনে ভয় নিয়ে তার সামনে যাই। এরপর দাদি বলে ওই রুমের আলোটা নিভিয়ে দে, আমি বললাম কেন দাদি? তখন তিনি বলে ওদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। আমি আর কথা বাড়ালাম না, গিয়ে আলোটা বন্ধ করে দিলেই দাদি বলে যা গিয়ে ঘুমিয়ে পড়।
জীবনে প্রথমবার নিজ চোখে এমন কিছু দেখেছি ভেবে পাচ্ছিলাম কি ভাষায় প্রকাশ করবো, আমার এসব ব্যাপার গুলো কারো সাথে যে ভাগ করবো সে অবস্থাও নেই যে যার মত করে ব্যস্ত, শাশুড়িতো নেই শশুর, জামাই থাকে নিজেদের কাজে ব্যস্থ, বাবু কে নিয়েই আমার বেশিরভাগ একা থাকা।
এভাবে সময় চলে গেল ১০-১২ দিন , একদিন দাদি আমাকে ডেকে বলে মনি শোন, আমি তার সামনে গেলে আমার হাত ধরে বলে, তোর মা মারা যাওয়ার পর থেকে তোকে একটা মুহূর্তের জন্যও আমি একা রাখিনি, তোর কষ্ট আমি বুঝি, আমি যদি না থাকি, আর এরা যদি তোকে বেশি জ্বালাতন করে তবে তুই নামাজে ওদের কে ডাকিস কথা বলিস, ওরা সব শুনতে পায়। আমি বলি ততক্ষনে আমি যে কতবার অজ্ঞান হবো ঠিক নাই।
ঠিক তারই কয়েকটা দিন পর দাদিও আমাকে ছেড়ে চলে যায়, কি আজব দুনিয়া, যার প্রয়োজন নেই তাকে অঠেল দিয়ে যায় আর যে একটু আদর, স্নেহ পাওয়ার জন্য কাতর হয়ে যায় তার শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেয়। দাদির শেষ কথা আমার মনে গেথে যায়, আমি নামাজ পড়তাম, রাত জেগে অনেক অনেক নামাজ পড়তাম, কান্নার জন্য সুরাও পড়তে কষ্ট হতো বাবুর বাবা মাঝে মাঝে আমার পাশে পানির মগ আর একটা গ্লাস রেখে যেত, অনেক কান্না করতাম নামাজে, তাহাজ্জুতের নামাজ পড়া হতো বেশি।
আমার আর স্নেহ করার মত কেউই রইলো না। বাবাতো তার ২য় পরিবার নিয়ে ব্যস্ত থাকে….. মানিয়ে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল…. দেখতে দেখতে দাদি যাওয়ার ১ সপ্তাহ…..
হঠাৎ মনে পড়লো, আচ্ছা ওরা কই? দাদি মারা যাওয়ার পর থেকে ওদের কোন কার্যকলাপ চোখে পড়ছে না। ওরা যে যে স্থানে বেশির ভাগ সময় থাকতো সে সে স্থানে আমি সালাম দিতাম, খুজতাম, অনেক ভয় লাগতো, শরীর কাপতো, শরীরের লোম দাড়িয়ে যেত, তাও আল্লাহর নাম নিয়ে সাহস করে খুজতাম। কিন্তু কোথাও তাদের থাকার আভাস পেলাম না এখনো।
আজ কেন জানি ওদের জন্যও খারাপ লাগছে, কিন্তু ওদের জন্য কেন খারাপ লাগছে? জামাই বলতেছে তুমি যেভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েছো, বাবুর খেয়াল কে রাখবে, আর কাল রাতে তুমি দাদির রুমে গেলে কেন? বেশ কিছুদিন ওইরুমে যাওয়া ঠিক হবে না?
আমি বললাম আমি কাউকে খুজতে গিয়েছিলাম। সে আর কথা বাড়ালো না।
আমার একদম কাজে মন বসে না, খেতেও ইচ্ছে করে না। বাবু খেলাদুলা করে বেশ। ও নতুন নতুন কথা শিখেছে আমার সাথে খুব কথা বলতে চায় খেলতে চায় কিন্তু আমার মনের যে কি হলো শুধু দাদির ঘরের দিকে তাকিয়ে কান্না করি। বাবু এসে চোখ মুছে দেয়।
এভাবে চলে গেল এক মাসের মত, একটানা নামাজে থাকতাম, অনেক বেশি দোয়া করতাম, দুই একবার নামাজ পড়ে সাহস নিয়ে ওদেরও ডাকতাম, আর একটু পর পর পেছনে তাকাতাম এই আসলো বুঝি, আমার পিছনে দাড়িয়ে নামাজ পড়ছে মনে হলো। পিছনে তাকাতাম একটু পরপর, কিন্তু কেউ নেই। এই ভেবে আর বেশি কান্না পায় যে, গেলে তো সবাই একসাথে আমাকে রেখে চলে গেলে…
বাবুর হঠাৎ করে জ্বর আসছে, এ সব আমার দোষে, দাদির শোকে এতটা ভেঙ্গে পড়েছি যে আমার ছেলেটার প্রতি কোন যত্নই নেইনি। ওর বাবা অনেক কথা শুনাইছে, সব মিলিয়ে সবকিছু এলোমেলো লাগছিল। বাবুকে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাইয়ে ওকে নিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম, ওর বাবার জন্য অন্যান্যদিন অপেক্ষা করতাম, কিন্তু আজকে ক্লান্ত লাগছিল ভীষণ।
বিছানায় বাবুর পাশে একটু বিশ্রামের জন্য শোয়ার কিছুক্ষনের ভেতর চোখ বন্ধ হয়ে আসে। আমি দেখি চারিদিকে ধৌয়া উড়ছে, দাদি দাড়িয়ে ঠিক তার সাদা শাড়িটা পরে, মনি মনি বলে ডাকছে, সে ভাল আছে, বাবুর যত্ন নিতে বলেছে। তার জন্য চিন্তা করতে নিষেধ করেছে।
স্বপ্নের ভেতরেই কাঁদছিলাম, হঠাৎ চোখ খুললাম আমার বাবুর বাবার দরজা ভাঙ্গার শব্দ, দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। তিনি বেশ রাগান্বিত কন্ঠে বললেন ২০ মিঃ দাড়িয়ে কি করছোটা কি? ২০ মি?
শোয়ার সাথে সাথে চোখে ঘুম লেগেছিল। দাদিকে দেখেছি স্বপ্নে। কিছুটা খারাপ লাগছিল, ভালোও লাগছিল। নামাজে দাড়ালাম। মন থেকে অনেক দোয়া করলাম।
পরদিন সকালে বাবু কিছুটা ভালো অনুভব করছে, সেটা তার সারা ঘরে দৌড়াদৌড়িই বলে দিচ্ছিল। আমি সকল কাজ সেরে বাবুর শরীর মুছে দিয়ে ওর বাবার অপেক্ষা করছি। সে আসলে তাকে দুপুরের খাবার দিয়ে বাবু কে তার কাছে রেখে গোসলে যাবো।
বাবুর বাবা আসলো তাকে বললাম তুমি গোসল করে আসো আমি খাবার দিচ্ছি। সে বাবু কে নিয়ে গেল। আমি এদিকে থালা বাসন গুলো ধুয়ে নিয়ে ঘরে আসছিলাম।
রান্না ঘরে হাড়ি পড়ার বিকট শব্দ….. বিড়াল ভেবে দ্রুত ছুটে গেলাম, বিড়ালই ছিল।
খাবারের জন্য তাদের ডাকলাম। বাবুর বাবা এসে বলে তোমাকে রান্না ঘরে দেখলাম কত আগে আর ডাকতেছো মাত্র। আমি বললাম কই আমি তো মাত্র আসছি….
যাই হোক তারপর তারা সবাই খেয়ে নিল । আমিও খেয়ে ওনাকে বিদায় দিয়ে দরজার ছিটকানিটা দিয়ে একটু ঘুমাই,
কখন যে বাবু উঠে চলে গেল জানা নাই। তবে সে যে কত কথা বলছে, কার সাথে বলছে কে আছে তার সাথে? কার সাথে খেলছে এই সবই ভাবছিলাম অর্ধ্ব ঘুমের মাঝে আর ডাকছিলাম বাবুকে…
আম্নুর কাছে আসো, তুমি কি করো একা একা ? কার সাথে কথা বলো? কোন জবাব নাই তার। একটা সময় ঘুমিয়ে যাই। হঠাৎ চোখ খুলে বিছানায় তাকাই, উঠে বসি আর ডাক দেই বাবু বাবু বলে। ঘরের অন্য কক্ষে গিয়ে দেখি সে খেলতে খেলতে মেঝেতেই ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু এই ছেলেতো একা কখনোই খেলবে না…. আজকে কেমনে ???
রাতে নামাজ পড়ার প্রস্তুতি সাড়লাম, আজ কি মনে করে ইচ্ছে হলো আরেকটা জায়নামাজ বিছিয়ে দেই, দিলামও তবে দাদি যখন ছিল সেটা সম্পূর্ন বিছানো থাকতো। আমি জায়নামাজ টা না বিছিয়ে শুধু আমার পাশে রাখি। তারপর নামাজ পড়ছিলাম। শেষ করে পিছনে তাকানোর পর কলিজা কেপে উঠে। ভাজ করে রাখা জায়নামাজটা দেখি বিছানো…… আশপাশে কেউ নেই……তাহলে বিছালো কে? কেউ কি নামাজ পড়ছে এটাতে???
আরেকটা পর্ব আসবে…..