30/04/2026
রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। মাসের শেষ দিন — এই কথাটা মাথায় ঘুরতে ঘুরতেই ভোর হয়ে গেছে। বালিশে মাথা রাখলেও চোখের সামনে ভাসছে বকেয়ার তালিকা, টার্গেটের সংখ্যা, সদস্যদের মুখ। ঘুম আর ঘুম নয় — এটা এক ধরনের যন্ত্রণার নাম।
ভোরের ফোন — দিনের শুরুটাই ফোনময়, সবাই সিরিয়াস কারন আজকে মাসের শেষ দিন।
- বসের কল।
"এই মাসে বকেয়া কমাতেই হবে। টাকা কোথা থেকে আনবেন, কীভাবে আনবেন — সেটা আপনার বিষয়।"
বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে ওঠে। মুখ খুলতে যান — বলতে চান যে সদস্যরা দিচ্ছেন না, সংসারে টানাটানি, বন্যায় ফসল নষ্ট হয়েছে, কত কারণ আছে। কিন্তু কথা মুখেই আটকে যায়। কারণ জানা আছে, বস কী বলবেন —
"ঋণ দিয়েছেন, এখন টাকা আনতে পারেন না? তাহলে চাকরি করেছেন কেন?"
ফোন রেখে দেন। একটা দীর্ঘশ্বাস বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে, যেটা কেউ দেখে না, কেউ শোনে না।
মাঠে নামা — বকেয়ার পেছনে ছোটা
রেগুলার কাজের ভার তো আছেই — কিস্তি আদায়, সঞ্চয় সংগ্রহ, ফর্ম পূরণ। কিন্তু আজকে সেই ভারের উপর চেপে বসেছে আরও একটা ভার — বকেয়া আদায়ের মানসিক চাপ। মাথার ভেতরে একটা ঘড়ি টিকটিক করছে, সময় যাচ্ছে, টার্গেট পূরণ হচ্ছে না।
প্রথম সদস্যের দরজায় কড়া নাড়েন।
"আজ নাই ভাই, কাল আসেন।"
দ্বিতীয় সদস্য —
"এই মাসে হবে না, সামনের মাসে দেব।"
তৃতীয় সদস্য দরজাই খোলেন না। হয়তো বুঝতে পেরেছেন কে এসেছে।
একটু একটু করে রাগ জমতে থাকে বুকে। শুধু রাগ নয় — হতাশা, অপমান, আর এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব। তর্ক হয়, কণ্ঠস্বর উঁচু হয়, কথা কাটাকাটি হয়। সদস্য বলেন তাঁর কষ্টের কথা, কর্মী বলেন তাঁর চাপের কথা — দুজনেই আসলে এক ব্যবস্থার শিকার, তবু মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করেন দুজন।
দুপুরে অফিসে ফেরা — চাপা উত্তেজনার এক ভিন্ন পরিবেশ
দুপুরে অফিসে ঢুকতেই বোঝা যায় — আজকের পরিবেশ অন্যদিনের মতো নয়। সবার চোখেমুখে একটা অদৃশ্য চাপ। কেউ মাথা নিচু করে কাগজে কলম চালাচ্ছেন, কেউ ফোনে কথা বলছেন চাপা গলায়, কেউ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দেয়ালের দিকে।
কাউকে জিজ্ঞেস করতে হয় না — বোঝা যায়। সবার গল্প একই। সবাই একই যন্ত্রণায় পুড়ছেন আজকে।
এবার শুরু হয় সঞ্চয় থেকে সমন্বয়ের হিসাব। যাদের সঞ্চয় জমা আছে, সেখান থেকে কিছুটা সমন্বয় করে বকেয়া কমানোর চেষ্টা। কাগজে কলম চলে, ক্যালকুলেটরে আঙুল চলে। তবু সংখ্যাটা যেখানে থাকার কথা, সেখানে যাচ্ছে না।
টার্গেট পূরণ হচ্ছে না।
বসের দ্বিতীয় ফোন — যে কথাটা সরাসরি বলা হয় না
বিকেলে আবার ফোন।
"বকেয়া কত এখন? টার্গেট ফিলাপ না করে ক্লোজ করবেন না। চাকরি করতে হলে বকেয়া আদায় করেই করতে হবে।"
কথাগুলো সরাসরি বলা হয়, কিন্তু আরেকটা কথা সরাসরি বলা হয় না — শুধু ইশারায় বোঝানো হয়।
পকেট কিস্তি দেন।
পকেট কিস্তি — এই দুটো শব্দের মানে যে জানে না, সে হয়তো বুঝবে না এর ভেতরে কতটা অপমান লুকিয়ে আছে। মানে হলো — সদস্যের বকেয়া টাকা নিজের পকেট থেকে দিয়ে টার্গেট পূরণ করো। নিজের বেতনের টাকা, সংসারের টাকা, হয়তো ধার করা টাকা — সেটা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের হিসাব মেলাও।
ফোন রেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকেন। মাথায় ঘুরতে থাকে — এই মাসে বাসায় কতটুকু টাকা দিতে পারবেন, বাচ্চার স্কুলের বেতন দেওয়া হয়নি, বাড়িভাড়া বাকি। আর এখন নিজের পকেট থেকে...
তবু উঠে পড়েন। ব্যাগ কাঁধে নেন। বেরিয়ে পড়েন।
বিকেলের ফিল্ড — রাত পর্যন্ত যুদ্ধ
বিকেলের মাঠে নামলে শুরু হয় আরেক অধ্যায়। সদস্যরাও জানেন আজ মাসের শেষ দিন, কর্মী আসবেনই। কেউ কেউ তৈরি হয়েই থাকেন তর্কের জন্য।
কণ্ঠ উঁচু হয়, কথা তীক্ষ্ণ হয়। কখনো সদস্যের বাড়ির সামনে পাড়ার লোক জমে যায়। একজন ক্লান্ত, বেতনভুক্ত কর্মী দাঁড়িয়ে থাকেন রাস্তায় — না পারেন ফিরে যেতে, না পারেন টাকা আদায় করতে।
রাত নামে। অন্ধকার ঘন হয়। কিন্তু বসের নির্দেশ — টার্গেট ফিলাপ করে তবেই ক্লোজ।
রাত আটটা, নয়টা, কখনো দশটা। পরিবার অপেক্ষা করছে বাড়িতে, ছোট্ট বাচ্চা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে বাবার মুখ না দেখেই। কিন্তু তিনি এখনো পথে।
যে কথাটা কেউ বলে না
এই গল্পটা শুধু একজনের নয়। সারাদেশে হাজারো এনজিও কর্মী প্রতি মাসের শেষ দিনটা এভাবেই পার করেন। ভোরের বিষাক্ত ফোন থেকে শুরু করে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত — পুরোটা সময় তাঁরা বহন করেন এক অদৃশ্য যন্ত্রণা।
না পারেন প্রতিবাদ করতে, না পারেন ছেড়ে দিতে। কারণ সংসার আছে, দায়িত্ব আছে, পেটের ক্ষুধা আছে।
একজন এনজিও কর্মীর মাস শেষের দিনটা শুধু একটি কর্মদিবস নয় — এটি একটি মানুষের সীমাহীন ধৈর্যের পরীক্ষা, একটি নীরব আত্মত্যাগের দলিল।
যাঁরা এই পথে আছেন, তাঁদের জন্য রইল গভীর শ্রদ্ধা।
আপনার মাস শেষের দিনে কেমন যায়? — কমেন্টে লিখুন। আপনার গল্পও কি কোথাও এই লেখার সাথে মিলে গিয়েছে।