01/06/2025
সিফিলিনাম (Syphilinum):-
পূর্বে একস্থানে বলেছিলাম যে, আমার তুরুপের তাস, বিশেষ করে চিররোগের ক্ষেত্রে, সিফিলিনাম, ব্যাসিলিনাম, মেডোরিনাম-এই তিন মহারথী নোসোড ঔষধ নিয়ে আলোচনা করবো।
মেটিরিয়া মেডিকা লেখা আমার উদ্দেশ্য নয়, তারজন্য জগত্বরেণ্য মনীষীদের লেখা পুস্তক, লেকচার আপনাদের কাছে নিশ্চয় আছে। হ্যানিম্যান, ফ্যারিংটন, কেন্ট, বোরিক হাতের কাছে না থাকলে তো হোমিওপ্যাথি হয় না।
আপনারা নিয়মিত ঐসব পুস্তক পড়তে থাকুন এবং সূক্ষ্ম অথচ আশ্চর্য বিষয়গুলি নোটবুকে লিখে নিন। আমি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে, যেকোন পুরাতন রোগের চিকিৎসায় অগ্রে লক্ষণ বিচারে ব্যাসিলিনাম, সিফিলিনাম, মেডোরিনামের উচ্চ শক্তির দুটি মাত্রা দিয়ে চিকিৎসায় অগ্রসর হলে অধিক সুফল মেলে। গুরুমশাই মতিলাল মুখার্জীকে এইভাবে চিকিৎসা করতে দেখেছি।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে- কেন? এই ত্রয়ীকে অগ্রে ব্যবহারের হেতু কী?
মনে করুন- আপনি কষ্টিকামের রোগীর চিকিৎসা করবেন। রোগীর দক্ষিণাঙ্গে বাত বা পক্ষাঘাত। বংশগত কারণে কোন রোগী পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হলে এবং রোগটি চিররোগে রূপান্ত রিত হলে ঐ রোগের মুলোচ্ছেদ করতে আপনাকে বিচার করে দেখতে হবে যে, উক্ত রোগের মূলে সোরা-সিফিলিস-সাইকোসিস-কোন দোষটি বিদ্যমান।
আমরা জানি, সিফিলিনামের সঙ্গে বাত বা পক্ষাঘাতের নিকট সম্বন্ধ। যেমন মুখে পক্ষাঘাত, জিহ্বায় পক্ষাঘাত, চক্ষুপত্রে পক্ষাঘাত, হস্তপদে পক্ষাঘাত উদরযন্ত্রের পক্ষাঘাত ইত্যাদি। মুখে পক্ষাঘাত হলে মুখ বেঁকে যায়, জিহ্বায় পক্ষাঘাত হলে কথা জড়িয়ে যায়, চক্ষুতে পক্ষাঘাত হলে চক্ষুপত্র ঝুলে পড়ে, হস্তপদের পক্ষাঘাতে হাত বা পা পড়ে যায়, উদরযন্ত্রের পক্ষাঘাতে প্রবল কোষ্ঠকাঠিন্য প্রকাশ পায়। এই পক্ষাঘাতের কারণেই রোগী স্নায়বিক বেদনায় ভোগে, আক্ষেপ দেখা দেয়, মৃগীরোগ প্রকাশ পায়।
কিংবা স্বাভাবিক জ্ঞানবুদ্ধির বিকাশ না হওয়ায় বা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে রোগী অনেক সময় উন্মাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
পক্ষাঘাত দৈহিক মানসিক দুটিই হতে পারে। যদি এমন দেখা যায় যে, রোগীর দৈহিক কাঠামো সৌষ্ঠব বর্জিত, বিকৃত বা পুর্ণ নয় তাহলে তার মূলে সিফিলিটিক মায়াজম ক্রিয়াশীল থাকে।
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, অনেকের মস্তকটি উঁচুনীচু বা অসমান, অর্থাৎ সৌষ্ঠববর্জিত, ঠোট দুটি ফাটা ফাটা বা কাটা, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতযুক্ত, সারা দেহে তাম্রবর্ণের উদ্ভেদ, গলায় ক্ষত, দন্ত বিকৃত, অস্থি আক্রান্ত, কেশ পতন, দুরারোগ্য কোন ক্ষত, গ্রন্থিবিকৃতি, দৃষ্টিনাশ, জন্মের পর অনেক শিশুর বহুদিন যাবৎ নাড়ি দিয়ে রস-রক্ত পড়া, চর্ম উঠে যাওয়া বা শ্রীহীন হওয়া, সারাদেহ শুকিয়ে হাড় পাঁজরা বেরিয়ে আসা, হাড়বৃদ্ধি, অনেক রমণীর বারবার গর্ভস্রাব হওয়া, রিকেটিক শিশু বা পুঁয়ে পাওয়া শিশু—এই যে শারীরিক বিকৃতি তার মূলে ক্রিয়া করে সিফিলিস বা উপদংশ। রোগীর বাহ্যিক অবয়ব দেখে অর্থাৎ দৈহিকবিকৃতি দেখে একনজরে চিনে নেওয়া যায় যে, ইনি মিঃ সিফিলিনাম।
হোমিওপ্যাথিতে বংশগতদোষ বলে একটা কথা আছে। সোরা যা পীড়া নামক অন্তর্নিহিত ধ্বংসের মুল - এই সোরা যখন সিফিলিস বা সাইকোসিসের সঙ্গে মিলিত হয়ে ধাতুগত দোষে পরিণত হয় তখন তা বংশগতভাবে প্রকাশ পেয়ে থাকে।
ঠিক এইরূপ অবস্থায় সুনির্বাচিত ঔষধ ব্যর্থ হলে তার উপায় কী? এর জবাবটি হল- রোগের মূলে কুঠারাঘাত হেনে ঔষধের তুল্য প্রতিক্রিয়া সম্পাদনের জন্য এবং রোগটি আরোগ্যের জন্য নোসডস ঔষধ ছাড়া গত্যন্তর নেই।
সিফিলিনামকে জানতে হলে তার গোড়ার কথাটি অগ্রে জানা চাই। সাইকোসিস যেমন দূষিত সহবাসের অনিবার্য পরিণতি সিফিলিনামও তাই। দূষিত সহবাসের কারণে সিফিলিটিক মায়াজম।
প্রথম প্রকাশ পায় জননযন্ত্রে। প্রথমে একটি ক্ষুদ্র ক্ষতের সৃষ্টি করে। এই ক্ষত আজীবন স্বস্থানে থেকে যেতে পারে এবং কোনরকম ক্ষতির সম্ভাবনা থাকেনা যতদিন না তা সোরাবীজের সঙ্গে মিলিত হয়।
Vital force বা জীবনীশক্তি যতক্ষণ সক্রিয় থাকে, কার্যক্ষম থাকে ততক্ষণ সোরাবিষ সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং সুযোগসুবিধার অভাবে কোনরকম অশান্তির সৃষ্টি করতে পারেনা।
সুপ্তাবস্থায় থাকা জননযন্ত্রের এই ক্ষত কোনরকম কুচিকিৎসার সুযোগ পেলেই স্বমূর্তি ধারণ করে, বিউবোরূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং সোরার সঙ্গে মিলিত হয়ে দেহান্তরে জটিল ব্যাধির সৃষ্টি করে।
মায়াজম হল হোমিওপ্যাথির গোড়ার কথা এবং এই গোড়ার কথাটি গোড়া থেকে বুঝে না নিলে এবং তদ্রুপ ব্যবস্থাপত্র অজানা থাকলে চিকিৎসকের সকল শ্রম যে পন্ডশ্রমে পরিণত হবে তাতে সন্দেহ নেই।
গুরুমশাই মতিলাল মুখার্জীর সান্নিধ্যে থেকে এবং তারপর আমার চিকিৎসা জীবনের প্রথম প্রভাত থেকে সিফিলিনাম, মেডোরিনাম, ব্যাসিলিনাম-এই তিন বন্ধুর সঙ্গে বেশী করে সখ্যতা করার চেষ্টা করি। চিকিৎসা জীবনের সেই প্রথম প্রভাত থেকে এখনও, এই গোধুলিবেলায় যেখানে যত রোগীর চিকিৎসা করেছি এবং আজও করে চলেছি-তাতে আমি দেখেছি -রোগী চরিত্রের ডিফরমিটিজ বা কোনরকম বিকৃতি দেখলে আমি অগ্রে সিফিলিনাম প্রয়োগ করে তার পর প্রয়োজনীয় ঔষধটি দিয়ে সাফল্য পেয়েছি।
আপনি হয়ত দেখবেন, কোন রোগীর ঠোট কাটা, কারও হস্তপদের নখ ক্ষয়প্রাপ্ত বা ফাটাফাটা, কারওবা সারা দেহে তাম্রবর্ণের উদ্ভেদ, কোন রোগীর কোন একটি অঙ্গ অবস, অসাড়, বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত-এরূপ রোগীর জন্য আপনাকে প্রথমেই ভাবতে হবে মহামান্য সিফিলিনামের কথা। এ এক আশ্চর্য ঔষধ বটে।
সিফিলিনামের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আছে রাত্রে বৃদ্ধি। আপনারা হোমিওপ্যাথিক ঔষধের হ্রাস-বৃদ্ধি লক্ষণদ্বয়ের সঙ্গে নিশ্চয় পরিচিত আছেন। নিশীথে বৃদ্ধি কথাটি গভীর অর্থবোধক। অনেক সময় আমরা রোগী পর্যবেক্ষণে রোগের যথার্থ কারণটি বুঝে উঠতে পারিনা।
ধাতুগত দোষে পুরাতন রোগের ক্ষেত্রে সিফিলিনামের চরিত্রটি এতই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন থাকে যে, রোগ নির্ণয় ও ঔষধ নির্বাচনে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়তে হয়। ঠিক এরূপ অবস্থায় নিশীথে বৃদ্ধি আমাদের সিফিলিনামকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সিফিলিনামের কাছে রাত্রি যেন কালরাত্রি। সন্ধ্যা হতে না হতেই যাবতীয় রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকে এবং রাত যত বাড়তে থাকে পীড়ার উপদ্রুপ ততই দ্বিগুণতর হতে থাকে।
রাত্রি হবার সঙ্গে সঙ্গে রোগীচিত্তে আতঙ্কের ভাব তৈরি হয়। রোগীর মনে হয় এটাই বোধ হয় তার শেষ রাত্রি। শিরঃশুল, হৃদশুল, মলান্ত্রের ক্ষত, চক্ষুরোগ, বাত, পক্ষাঘাত, অস্থিক্ষত, পুতিনস্য, হাঁপানি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, মানসিক বিকৃতি, মৃগী, স্বরভঙ্গ, মুখক্ষত- সব রোগই রাত্রে বৃদ্ধি পায় এবং রোগীকে অস্থির করে তোলে।
সিফিলিনামের সকল বৃদ্ধি রাত্রে বলে এর রোগীর চক্ষে নিদ্রার লেশমাত্র থাকেনা। অনিদ্রায় সিফিলিনামকে সবার অগ্রে রাখুন। আর এই অনিদ্রাজনিত কারণে রোগী মনে করতে থাকে যে সে উন্মাদ হয়ে যাবে। মার্কসলের রোগীও রাত্রিকে ভয় করে কারণ তারও সব রোগ রাত্রে বৃদ্ধি পায়। আবার ল্যাকেসিসের কথা মনে করুন। নিদ্রায় বৃদ্ধি তার চমৎকার গুণ আর তাই ল্যাকেসিসও রাত্রিকে ভয় করে।
মনে রাখবেন ঔষধটি উপদংশ ক্ষতের বিষ থেকে তৈরি এবং উপদংশ বিষ দুষ্ট জীর্ণশীর্ণ ব্যক্তির ক্ষেত্রেই এটি অধিকতর প্রযোজ্য। ঔষধটিতে স্মৃতিশক্তির লোপ আছে। ভীষণ বোকাটে।
স্মৃতিশক্তিহীনতা অ্যানাকার্ডিনামেও প্রবলভাবে আছে। আবার মেডোরিনামেও আছে। সুতরাং ঔষধের তুলনামূলক পাঠ নেওয়া চাই।
সিফিলিনাম অধ্যায়ে পাঠ্য পুস্তকে লেখা হয়েছে Craving for wines - অর্থাৎ প্রবল মদ্যপানেচ্ছা। যদি কখনো কোন রোগীচরিত্রে প্রবল মদ্যপানের ইচ্ছা বা বংশানুক্রমিক মদ্যপানের ইচ্ছা লক্ষ্য করেন তাহলে সিফিলিনাম রোগীর কুঅভ্যাসটি নিশ্চয় দূর করবে।
উপদংশদোষ দুষ্ট কোন রোগীর মধ্যে মদ্যপান কবার অভ্যাসে আপনি সিফিলিনাম উচ্চ শক্তির দুটি মাত্রা দিয়ে দেখুন। আমরা মেটিরিয়া মেডিকায় পড়েছি সিফিলিনাম মানবের ইচ্ছাশক্তিকে বিকৃত করে। যে কাজটি ঘৃণার, যেটি অমর্যাদার, যাকিছু সম্মানহানীর-সেইসব কাজ সিফিলিনাম অবলীলায় করতে থাকে। তার ইচ্ছা শক্তি এমনই বিকৃত হয়ে পড়ে যে, যাকিছু ঘৃণাহ্ তাই-ই তার কাছে তৃপ্তিকর বলে মনে হয়। সিফিলিনামের ইচ্ছা শক্তি যেমন বিকৃত হয়ে পড়ে তেমনি তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিকৃতিভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কথাগুলি মহাদামী।
আমি এই প্রসঙ্গে একটি রোগী তত্ত্ব আপনাদের দেব। এক শিক্ষিত পরিবারের সুন্দরী শিক্ষিতা গৃহবধূ। তার ভাষায় ও পোষাকে শালীনতার ছাপ স্পষ্ট। ধীরে ধীরে কথা বলেন। আমাকে তিনি তার মদ্যপ স্বামীর প্রবল মদ্যপানের কাহিনী শোনালেন। অশ্রুভেজাকণ্ঠে মহিলাটি বললেন, ডাক্তারবাবু আমার স্বামীকে বাঁচান! তার কণ্ঠ খুঁজে এলো।
স্বামী ভদ্রলোক সরকারী চাকরিজীবী। প্রত্যেক রাতে তিনি মদ্যপান করে বাড়ী ফিরতেন এবং স্ত্রীর উপর দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। সম্মানহানীর ভয়ে মহিলাটি স্বামীর সকল অত্যাচার নীরবে সয়েছেন। কিন্তু কোনদিন কাউকে স্বামীর অত্যাচারের একটি কথাও বলেননি। আমাকে খুব বিশ্বাস করেন বলেই মনের কথাটি খুলে বলেছেন। হোমিওপ্যাথি কি পারবে মদ্যপানের ইচ্ছা দূর করে কোন মানুষকে সুস্থ সমাজ জীবনে ফিরিয়ে আনতে ?
মদ্যপ স্বামীর দৈহিক অবয়ব, তার অন্যান্য লক্ষণ জানার চেষ্টা করলাম। মাথায় টাক, শরীরে তাম্রবর্ণের উদ্ভেদ ও চুলকানি, দাঁতগুলি বিকৃত, অনিদ্রা এবং শীর্ণদেহ বিচার করে রোগীকে সিফিলিনাম সি এম শক্তির দুটি ডোজ দিলাম। আশ্চর্য সিফিলিনাম এবং আশ্চর্য তার ক্রিয়া। এই ঔষধ রোগীর মনস্তত্ত্বের কত গভীরে ক্রিয়া করে তা চাক্ষুষদর্শনে আশ্চর্য হই।
সপ্তাহ অন্তর ঔষধটির দুটি মাত্রা রোগীচিত্তে আশ্চর্য পরিবর্তন আনে। মদ যে খাদ্য বস্তু নয়, ধ্বংসাত্মক পানীয়, জীবনহানীকর-এসত্য তার মনে অতি ধীরে জাগতে থাকে। কোন সভ্য মানুষ, ভদ্রলোক কি মদ্যপান করতে পারে? এ প্রশ্ন প্রবলভাবে ভদ্রলোকের বিবেকে আঘাত হানে। রোগীর মনে হতে থাকে, আমি শিক্ষিত মানুষ, চাকুরিজীবী, আমার বংশের একটা মর্যাদা আছে-মদ্যপান করলে লোকে মাতাল বলবে, সমাজ ঘৃণার চোখে দেখবে। লোকে মাতাল বলবে, সমাজ ঘৃণার চোখে দেখবে-এই যে সুপ্ত চেতনাবোধ সিফিলিনামের আশ্চর্য ক্রিয়ায় তা প্রবলভাবে জেগে ওঠে। এতদিন যা ঘুমঘোরে আচ্ছন্ন ছিল এই মহাশক্তিশালী ঔষধের এক ধাক্কায় তার চেতনা ফিরে এলো।
অসুস্থ চেতনাকে সুস্থাবস্থায় ফিরিয়ে এনে রোগীর চিত্তমনে বিপ্লব আনতে পারে হোমিওপ্যাথির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বটিকা, অশান্ত গহজীবনে, শান্তি দিতে পারে সদৃশম্যাজিক-দণ্ড । উক্ত মাতাল লোকটির জন্য পরে স্টাফিসাগ্রিয়া দেওয়া হয়েছিল। মদ্যপায়ীদের জন্য অনেকে লিডাম দেন, অনেকে কফিয়া ব্যবহার করেন। ঔষধদুটি মহাদামী। ল্যাকেসিসও মদ্যপায়ীদের জন্য উত্তম ক্রিয়াশীল ঔষধ, তবে ক্ষেত্র থাকা চাই। মনে রাখা দরকার রোগীদেহে প্রতিক্রিয়া সম্পাদনের জন্য রোগীর মনস্তত্ত্ব কোন স্তরে কাজ করছে তা চিকিৎসককে নিখুঁতভাবে নির্ণয় করতে হবে।
একটি কলেরার রোগী, কোলাপ্স অবস্থায় উপনীত হয়েছেন। সারা দেহ এমনকি নিঃশ্বাস পর্যন্ত শীতল। ইঙ্গিতে রোগী পাখার বাতাস চাইছেন। জনৈক ডাক্তারবাবু রোগীকে কার্বোভেজ ৬ শক্তি ঘনঘন খাওয়াতে লাগলেন। ঔষধ যত খাওয়ান রোগীর অবস্থার তত অবনতি ঘটতে থাকে। গৃহকর্তা বিপদের গন্ধ পেয়ে আমাকে ডাকেন। গিয়ে দেখি রোগী মৃতপ্রায়, শ্বাসপ্রশ্বাসে কষ্ট, শীতল, সেই সঙ্গে বাতাসের জন্য ব্যাকুলতা। রোগীর পূর্ণচিত্র কার্বোভেজ জ্ঞাপক। রোগীকে ঠিক ঔষধই খাওয়ানো হয়েছে। কিন্তু ঔষধের কত শক্তি রোগীদেহে প্রতিক্রিয়া সম্পাদন করবে সেই হিসাবে গন্ডগোল হলে বিপদ। উক্ত রোগীকে ২০০ শক্তির কার্বোভেজ দিতেই রোগীদেহ সাড়া দিতে শুরু করে এবং রোগীও ভালো হয়।
চিকিৎসাশাস্ত্রে ভুলের কোন অবকাশ নেই। অন্যান্য ভুলের ক্ষমা থাকলেও চিকিৎসকের ভুলের কোন ক্ষমা নেই। কারণ প্রাণ নিয়ে খেলা চলেনা।
এবার অন্য একটি রোগীর কথা বলি। নাম ইসমাইল সর্দার, বাড়ী মুর্শিদাবাদ। রোগী তার স্পাইনাল প্রদেশে কেরিজ রোগে আক্রান্ত। উপদংশবিষদুষ্ট ধাতুর উক্ত রোগী সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণাকাতর হত এবং রাত্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার যন্ত্রণাও ভয়ানক বৃদ্ধি পেত। সিফিলিনাম সি এম সাতদিন ছাড়া দুটি মাত্রা দেওয়া হল। একমাস পরে আরো দুটি মাত্রা দিতে ৪০ দিনের মধ্যে রোগী সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
পূর্বে বলেছি যে, যেকোন নামের পীড়ায় হোকনা কেন তা যদি রাত্রিতে বৃদ্ধি পায় তাহলে সিফিলিনামের কথা নিশ্চয় অগ্রে চিন্তা করতে হবে। মার্কারি অধ্যায় পাঠে আমরা এই রাত্রিকালীন বৃদ্ধির পরিচয় পাবো কিন্তু মার্কারি হল মার্কারি আর সিফিলিনাম হল সিফিলিনাম। প্রতিটি ঔষধই তার নিজস্ব গুণে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সিফিলিনামের রাত্রিকালীন বৃদ্ধির সঙ্গে আপনি তার ‘অক্ষুধা’ লক্ষনটি যোগ করুন। শারীরিক সুস্থতা ও দৈহিক বলাধানের জন্য নিয়মিত স্নানাহার জরুরি। ভোজনবিলাসীদের কথা স্বতন্ত্র সিফিলিনাম রোগী মোটেই আহার করতে চায়না। আসলে ক্ষুধা পেলে তো সে খাবে।
এর রোগী এমনই ক্ষুধাহীন যে আপনি তার সম্মুখে যত দামি খাবার পরিবেশন করুন না কেন সে খেতে চাইবেনা। দিনের পর দিন না খাওয়ার কারণে সে জীর্ণ কঙ্কালসার হয়ে পড়ে, শারীরিক বলক্ষয় হয়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকৃতি ঘটে, কেশ পতন হয়, কোষ্টকাঠিন্য প্রবলভাবে দেখা দেয়। মাতা তার শিশুকে খাওয়ানোর জন্য কত আদর করেন, কাক-বক দেখান তথাপি শিশু খেতে চায়না।
পিতা-মাতা চিন্তায় পড়েন যে তাদের বুকের মানিকটি আহারে বিমুখ কেন ? এই চিন্তায় তারা ডাক্তারের স্বরণ নেন, পীরের মানত করেন, হাতে কোমরে-কষ্ঠে কতরকমের তাবিজ কবচ বেধে দেন। তথাপি ফলশূন্য। আসলে পিতা-মাতার তো জানা নেই যে, তাদের শিশুটি সিফিলিনামের দুটি মাত্রা চাইছেন। চিকিৎসককে এ সম্পর্কে অজ্ঞ হলে চলবে কেন ? চিকিৎসক চক্ষু-কর্ণ খোলা রেখে শিশুর দৈহিক কাঠামো যেমন শারীরিক বিকৃতির কোন পরিচয় আছে কিনা যেমন দেখবেন তেমনি তার মানসিক খর্বতা বা বিকৃতির সন্ধানও নেবেন।
দৈহিক-মানসিক বিকৃতির সঙ্গে শিশু জীর্ণশীর্ণ হলে আমরা শিশুকে দুটি মাত্রা সিলিলিনাম দিয়ে অপেক্ষা করতে পারি। বড়দের ক্ষেত্রটিও তাই। অনেক রোগী এসে বলেন, ডাক্তারবাবু আমার ক্ষুধা বলে কিছু নেই। কিন্তু ক্ষুধা নেই কেন ? জীবনধারনের জন্য খাদ্য সে খেতে চায়না কেন ? এখানে রোগীর দরকার সিফিলিনাম এবং তদসদৃশ এ্যান্টিসিফিলিটিক ঔষধ।
এখানে রোগীর ইচ্ছাশক্তি বিকৃতির যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। সাইকোসিস যেমন বুদ্ধিবৃত্তিকে বিভ্রান্ত করে সিফিলিনাম তেমনি ইচ্ছাশক্তিকে বিকৃত করে। মানবের এই যে, ইচ্ছাশক্তির বিকৃতি তার পরিচয় কে দেবে? আমরা হোমিওপ্যাথির হাত ধরে রোগীর মনস্তত্ত্বের গভীরে পৌঁছাতে পারি এবং তার ইচ্ছাশক্তিহীনতার স্বরূপ উদঘাটন করে রোগীর অনিদ্রা, অক্ষুধা, অজীর্ণতা, দৈহিক বক্রতা, ক্ষত, কেরিজ, নিক্রোসিস, মৃগী, উন্মাদ, আক্ষেপ, স্নায়ুশুল, কোষ্ঠকাঠিন্য, চক্ষুরোগ, আলোকাত, সহজেই দূর করতে পারি।
শারীরিক ও মানসিক খর্বতা। কালা ও বোবা উপদংশকেই নির্দেশ করে। | তাই সিফিলিনাম যে তাদের উত্তম ঔষধ তাতে সন্দেহ কী?
সিফিলিনামের রোগী জন্মের পর থেকে নানারকম ক্ষত বা চর্মরোগে ভুগতে থাকে। শুধু কি তাই, এই ক্ষত শেষ পর্যন্ত অস্থি আক্রমণ করে। রোগীর দৈহিক খর্বতা প্রাপ্তি ঘটে। কণ্ঠ ও ঘাড়ের গ্রন্থিগুলি ফুলে ওঠে, শক্ত হয়। ক্ষত নালী ঘায়ে পরিণত হয়। একটির পর একটি ফোঁড়া হতে থাকে। তার মুখে ক্ষত, কর্ণে পুঁজ, নাসিকায় ঘা বা ক্ষত, চক্ষুপ্রদাহ, টনসিল বৃদ্ধি ও শক্ত-এসব চলতেই থাকে। |
সিফিলিনামের এই যে ক্ষত তা যেমন বন্ধুটির গুণগত বৈশিষ্ট্য তেমনি দুর্গন্ধও তার বিশেষ গুণ। ক্ষত ও দুর্গন্ধের সম্মিলন এখানে পাবেন। এর মল দুর্গন্ধ, মুত্র দুর্গন্ধ, ঘর্ম দুর্গন্ধ, শ্বাসপ্রশ্বাস দুর্গন্ধ, মুখে দুর্গন্ধ, নাকে দুর্গন্ধ। প্রত্যেক স্রাব বা ক্ষত দুর্গন্ধময়। ভাবুন। রোগী ও রোগচরিত্র বুঝতে হলে প্রতিটি ঔষধের বিশেষ বিশেষ গুণাবলীকে চিনে রাখতে হয়। সিফিলিনামের মুখে ক্ষত হলে মুখ দূর্গন্ধে ভরে ওঠে তখন তার সঙ্গে দুদণ্ড কথা বলতে ঘৃণার উদ্রেক করে, নাকে ক্ষত হলে নাক দূর্গন্ধে ভরে যায়, মলদ্বারের ক্ষতে-সেখানেও দুর্গন্ধ, অস্থিক্ষতে পচা দুর্গন্ধ বের হয়। অঙ্গপ্রত্যঙ্গের যেকোন স্থানের ক্ষতে ভীষণ দুর্গন্ধ। ক্ষত হওয়া ও দুর্গন্ধ সিফিলিনাম ছাড়া আর কে আছেন?
কেশ পতন। মস্তক বেদনা। * শোথ, ন্যাবা, রক্তস্রাব।
স্মৃতিনাশ।
সিফিলিনামের স্মৃতিনাশ কথাটি ভাবার মত। রোগী তার নিকটজনের নাম ঠিকানা পরিচয় সব ভুলে যায়। রোগী পরীক্ষায় যদি এরকম স্মৃতিনাশের পরিচয় মেলে তাহলে তার অনিদ্রা, অরুচি, খর্বতা, বিকৃতি, মাংসে অরুচি - এসবের পরিচয়ও মিলে যাবে।
ক্রোধ প্রবণতা। ষ্টাফিসাগ্রিয়া অধ্যায়ে আমরা রোগী চিত্তে ক্রোধ প্রবণতার যথেষ্ট পরিচয় পাই। এই ক্রোধ বা ক্রুদ্ধ স্বভাবটি সিফিলিনামেও আছে। তার আচার আচরণে প্রতিনিয়ত ক্রোধের বহিঃ প্রকাশ ঘটে।
অকারণে ক্রন্দন। অনেক সময় সিফিলিনামের রোগী শুধুশুধু অশ্রুবিসর্জন করে, কাঁদে। কিন্তু কেন রোগী ক্রন্দন করে তার কারণটি রোগী নিজে বোঝেনা। অথবা বিনা কারণেও সে অশ্রুপাত করে।ঘনঘন হাই তোলে।
হোমিওপ্যাথি কত সূক্ষ্ম এবং রোগচরিত্রের ছদ্মবেশ উন্মুক্ত করে চিকিৎসকের কাজটি কত সহজ করে দেয় তার পরিচয় মেলে রোগীর ক্রোধপ্রবণতায়, তার ক্রন্দনে, হাসিতে, ঘনঘন হাই তোলায়।
দৈহিক ও মানসিক খর্বতা বা বিকৃতির কারণে অনেক সময় রোগী উন্মাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে বা উন্মাদ হওয়ার ভয়ে ভীত হয়।
দৃষ্টিশক্তির বিকৃতি ঘটে। চক্ষুর স্নায়ু শুকিয়ে যায়। চক্ষুপ্রদাহে ঠান্ডা জল আরামদায়ক।
মুখে পক্ষাঘাত, মুখ বেঁকে যায়। রোগীর বাক্যলোপ ঘটে। স্পাইনাল কেরিজ বা মেরুদন্ডের ক্ষয়প্রাপ্তি। নিশাঘর্ম। প্রচুর সাদাস্রাব। প্রচুর ঋতুস্রাব। মাসে দুবার। পাকস্থলীতে জ্বালা, অম্লদোষ, বমি। মূত্রকোষে ব্যথা। উদরী, শোথ, ন্যাবা। মার্কসলের ন্যায় জিহবায় দন্তের ছাপ। নবজাতকের ক্রন্দন বা ক্রমাগত ক্রন্দন। হাঁপানি।
হাঁপানি রাত্রে, গ্রীষ্মে বা ঝড়জলে বৃদ্ধি পায়। মূত্রকোষে ব্যথা হলে সিফিলিনাম তার উৎকৃষ্ট ঔষধ। ঘুমঘোরে অসাড়ে প্রস্রাব।
সিফিলিনামের কোষ্টকাঠিন্য এতবেশি যে, মলদ্বার ফেটে যায়, রক্ত ঝরে, ক্ষতের সৃষ্টি হয়। হস্তপদের চর্ম উঠে যায়, চুলকানি।
ক্ষয়দোষ। আমরা এমন অনেক মহিলা রোগীর সন্ধান পাই যাদের প্রায়ই গর্ভ নষ্ট হয়ে থাকে। এর পশ্চাতে উপদংশদোষ বিশেষভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। এরূপক্ষেত্রে সিফিলিনামের স্বরণ নেওয়া ছাড়া গতি নেই।
পাকস্থলীর ক্ষতেও সিফিলিনাম তুল্য ফলদানে সক্ষম। ক্ষতজনিত বমি। এই বমি দিনের পর দিন চলতে থাকে।
রিকেটিক শিশু। সর্বাঙ্গ শুকিয়ে যায়। শোথ-রাতে বৃদ্ধি পায় দিনে কমে যায়।
রাগী, মৃগী। হজকিন ডিজিজে ঘাড়ের গ্রন্থিগুলি ফুলে গেলে সিফিলিনামের শরণ নেওয়া উচিৎ।
সিফিলিনামের মনটি বড় বিচিত্র। কোন বিষয়েই রোগী মনসংযোগ করতে পারেনা। ভীষণ চঞ্চল কিন্তু অনুতপ্ত। কোন একটি স্থানে বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা বসে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়-এমনই চঞ্চল।
কেন্ট মহাশয় তাঁর লেকচারে বলেন, “রোগী বিস্মৃতিপরায়ণ। দুর্বলচিত্ত, বিনা কারণে হাসে ও কাঁদে। সে লোকের মুখ, লোকের নাম, তারিখ, ঘটনা, পুস্তকের কথা, স্থানের কথা স্মরণ করিতে পারেনা। সে হিসাব করিতে পারেনা। আরোগ্য সম্বন্ধে হতাশ থাকে। বিষাদভাব। সে উন্মাদ হইয় যাইতেছে বলিয়া ভয় পায়। জড়ভাব।” তিনি আরো বলেন, “কেহ হয়ত ভালভাবেই জিজ্ঞাসা করিতে পারে-এ্যালোপ্যাথিক মতে সিফিলিসের চিকিৎসা এবং অসভ্য ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য কী? মাকুরিয়াস ও আইওডিন ঘটিত কড়া কড়া ঔষধ রোগীকে এতই দুর্বল করে যে, যাহারা ঐরূপ চিকিৎসার অধীন হয় তাহাদের সকলেই অকর্মণ্য ও দুর্বল হইয়া পড়ে।
কিন্তু তখনও তাহারা সিফিলিস হইতে আরোগ্য হয়না, যদি তাহারা আরোগ্য হইত তাহা হইলে আমরা তাহাদিগের দ্বারা অপসৃত লক্ষণগুলিকে ফিরাইয়া আনিতে পারিতাম না।
আমি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি উপদংশের চিকিৎসায় মার্কারি ও আইওডিন ঘটিত কড়া কড়া ঔষধে রোগীকে যখন অকর্মণ্য, দুর্বল ও শয্যাশায়ী করে দেয় এবং রোগী তাঁর আরোগ্য সম্বন্ধে হতাশ হয়ে পড়ে - ঠিক সেই অবস্থায় সিফিলিনাম উচ্চশক্তি রোগীদেহে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
রোগীও আরোগ্যলাভ করেছে। কেন্টের সূত্র ধরে আমি এও লক্ষ্য করেছি উপদংশজদোষদুষ্ট কোন টাইফয়েড রোগীদেহে উচচশক্তির সিফিলিনামের দুটি মাত্রা অতি দ্রুত বলসঞ্চার করেছে, তার শক্তি বৃদ্ধি করেছে এবং রোগী দ্রুত সুস্থতা লাভ করেছে।
--------------
ডা.হাসান মির্জা হোমিওপ্যাথ,ভারত
-----------------
ডা.মিজানুর রহমান বিজয়
মিজান অনলাইন হোমিও শপ
01937-500697