28/10/2025
একটি শহরের গল্প (যে শহর একদিন মরে গেল) -
একটা সময় ছিল, শহরটার নাম শুনলেই মানুষের চোখে আলো জ্বলে উঠত।
রাত নামলেই তার রাস্তায় ছিল গান, দোকানের কাঁচে প্রতিফলিত হত জীবনের রঙ।
এই শহর একদিন মানুষকে স্বপ্ন দিত, আশ্রয় দিত, ভবিষ্যৎ দিত।
ভোরবেলা শহরটার গলিতে একসময় পাখিরা ডাকত।
চায়ের দোকানে ধোঁয়া উঠত, হাসির শব্দে মিশত জীবনের গন্ধ।
মানুষ ঘর থেকে বেরোত স্বপ্ন নিয়ে — কেউ স্কুলে, কেউ অফিসে, কেউ শুধু একটু রোদ দেখতে।
শহরটা তখন জীবন্ত ছিল, যেন এক বিশাল হৃদয় — প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি জানালায় তার স্পন্দন বাজত।
কিন্তু একদিন সেই হৃদয়ের ওপর ভার পড়তে শুরু করল।
মানুষ আসতে লাগল, আরও মানুষ, আরও আরও।
শহর ভাবল — “সবাইকে জায়গা দেব, সবাই আমার সন্তান।”
কিন্তু সন্তান যখন অসংখ্য হয়ে যায়, মা-ও একসময় ক্লান্ত হয়।
পানি কমে গেল, নদী শুকিয়ে গেল।
আকাশ ঢেকে গেল ধোঁয়ায়, তারা দেখা গেল না।
রাস্তাগুলো জট পাকিয়ে গেল, যেন শ্বাসরুদ্ধ দেহের শিরা-উপশিরা।
কেউ আর হাসত না, শুধু তাড়াহুড়ো করত।
মানুষ একে অপরকে দেখত, কিন্তু চিনত না।
এক সকালে এক বৃদ্ধ ফুটপাতে বসে কাশছিল।
তার পাশে এক বালক স্কুলে যাচ্ছে, মুখে মুখোশ, চোখে ক্লান্তি।
বৃদ্ধটা হেসে বলল,
“তুই জানিস রে ছেলে, এই শহর একসময় গান গাইত?”
ছেলেটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “গান গাইত মানে?”
বৃদ্ধ বলল, “রাতে বাতাসে হালকা গন্ধ থাকত, রাস্তার বাতিগুলোও মনে হতো জীবন্ত।”
ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল, “আমার জন্মের পর থেকে শহর এমনই তো।”
বৃদ্ধ একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “না রে, তুই যা দেখছিস, এটা এক মৃত শহরের ছায়া। শহরটা অনেক আগেই মরে গেছে — এখন শুধু তার দেহটা হাঁটে।”
সেদিন সন্ধ্যায়, শহরের ওপর নামল ধূসর কুয়াশা।
বিলবোর্ডে নকল হাসি জ্বলল, রাস্তায় বেজে উঠল হর্ন,
আর দূরে কোথাও একটা নদী নিঃশব্দে নিজের শেষ জলটুকু হারিয়ে ফেলল।
তবু, অদ্ভুতভাবে শহরটা বেঁচে থাকল —
কারণ মানুষ মরতে ভয় পায়,
আর শহর মানুষেরই প্রতিচ্ছবি।
শহর কখনো মরে না, মরে যায় মানুষগুলোর মন।
-রিজওয়ানা