12/01/2025
সপ্তাহ দু’য়েক আগের কথা। শীত আসি আসি করছে, কয়েক দিন আগে এক পশলা তুষারপাত হয়ে আবার সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
এদিকে গাড়ি খারাপ হয়ে আছে, মেরামত হতে কিছুদিন লাগবে। বাজার-সদাই করা মুশকিল গাড়ি না থাকলে। তাই কয়েক দিনের জন্য একটা গাড়ি ভাড়া করলাম। বাংলাদেশে তো ড্রাইভারসহ গাড়ি ভাড়া নিতে হয়, এখানে নিজেই ড্রাইভার—ভাড়ার গাড়িতেও একই ব্যাপার। ডানাভাঙা পাখির মত কিছুদিন আটকে থেকে ছটফট করছিলাম, হাতে গাড়ি পেয়ে আর কি বসে থাকা যায়?
টরন্টোয় তাপমাত্রা তখন মনে হয় ৩–৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস হবে। সাসকাচুয়ানে আড়াই বছর কাটানো আমার কাছে এ তো রীতিমত গরমই, হাহাহা। রবিবারে শুভ দিন দেখে বেরিয়ে পড়লাম Arrowhead Provincial Park, Huntsville-এর উদ্দেশ্যে। দূরত্ব বাসা থেকে কমবেশি ২৩০ কিলোমিটারের মতো হবে।
অন্টারিওর আবহাওয়ার সঙ্গে সাসকাচুয়ানের পার্থক্যের আরেকটা নতুন দিক দেখলাম সেদিন। বাসা থেকে ঝকঝকে রোদ নিয়ে বের হয়েছি, কিন্তু Barrie আসার আগেই হালকা তুষারপাত হচ্ছে দেখলাম। সাসকাচুয়ানে সাধারণত ২০০–৩০০ কিলোমিটার দূরত্বে আবহাওয়ার খুব একটা পার্থক্য হয় না। অথচ এখানে আমরা বাসা থেকে ১০০ কিলোমিটারও আসতে না আসতেই আমূল পরিবর্তন। যদি জানতাম আসার পথে কী অপেক্ষা করছে 🤣
Barrie থেকে যোগ দিল আমাদের বর্তমান পার্টনার-ইন-ক্রেজিনেস রিফাত ভাই। ভাল গল্পবাজ মানুষ, গাড়ি চালাতেও আড্ডা চলছে। একই গাড়িতে না কিন্তু আমরা—কথা হচ্ছে ওয়াকি-টকিতে। এভাবে ড্রাইভিং-এর মজাটাই আলাদা। মনে হয় যেন একই গাড়িতেই আড্ডা দিতে দিতে চলছি। এভাবেই টুকটুক করে চলে এলাম পার্কে।
এই পার্কটি অন্টারিওর অন্যতম সুন্দর এবং বড় পার্কগুলোর একটি। স্কিইং, স্কেটিংসহ নানা রকমের উইন্টার অ্যাকটিভিটিতে ভরা থাকায় শীতেও এর আকর্ষণ গরমকালের থেকে কম না। এক পশলা তুষারের আবরণ শীতের আমেজ নামিয়ে এনেছে যেন। শীতের কাপড়-চোপড় পড়ে কফি-টফি খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম সৌন্দর্যের সন্ধানে। রিভারব্যান্ড লুকআউট, মেটাল ব্রিজ—এগুলো ঘুরে দেখলাম। ব্রিজটা অসম্ভব সুন্দর; আমার ক্যামেরায় এর ছিটেফোঁটাও তুলে ধরতে পারিনি।
পুরো পার্ক দেখার সময় নেই আসলে এক দিনে। কাছাকাছি শহরে ঢুকে লাঞ্চ করতে হবে—যদিও বিকেল গড়িয়ে গেছে তখন। খেতে হবে, আবার কাছাকাছি লায়ন্স লুকআউট পয়েন্ট দেখতে হবে। এটা নাকি পাহাড়ের উঁচুতে একটা ড্রাইভেবল স্পট, যেখান থেকে পুরো হান্টসভিল শহর দেখা যায়। শীতের কানাডা, দিনের দৈর্ঘ্য খুবই কম। সন্ধ্যা নেমে গেলে আর কিছু দেখা যাবে না। কোনটা ছেড়ে কোনটা করি? শেষে খাওয়া বাদ দিয়ে চলে গেলাম সৌন্দর্যের সন্ধানে। গিয়ে দেখি শেষের কিছুটা পথ বন্ধ—উইন্টার মেইনটেন্যান্স নেই তাই। অনেকটা পথ হেঁটে উঠতে হবে 😞 এদিকে বউয়ের চমৎকার রান্নাবান্না খেয়ে ওজন-টজন বাড়িয়ে যচ্ছেতাই অবস্থা 🤣 উঠব কি উঠব না করতে করতে লেজিনেসের সাথে যুদ্ধ করে ক্রেজিনেসের বিজয় হলো। বাচ্চাকাচ্চা বগলদাবা করে হাপাতে হাপাতে উঠে গেলাম উপরে। কষ্ট করে উঠাটা স্বার্থক ছিল। চমৎকার কিছু দৃশ্য চোখের ক্যামেরায় আর তার কিছু ভগ্নাংশ মোবাইলের ক্যামেরায় বন্দী করে নিচে নেমে এলাম। খাওয়াদাওয়া সেরে বাড়ির পথ।
কিন্তু বিধিবাম 😞।
Barrie-এর কিছু দূর আগে থেকেই আবহাওয়া খারাপ হতে লাগল। এক পর্যায়ে রীতিমত তুষারঝর। দশ হাত দূরেও কিছু দেখা যাচ্ছিল না। এদিকে গাড়ি ভাড়ার হওয়ায় উইন্টার-উপযোগী টায়ারও নেই—মাঝারি মানের অল-সিজন টায়ার। ভয়ে ভয়ে কোনোমতে আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে পার হয়ে আসলাম ভয়ংকর জায়গাটা। সিদ্ধান্ত হলো রিফাত ভাইয়ের বাসায় একটু ব্রেক দেব, আবহাওয়া ভালো হবার অপেক্ষায়। ঘণ্টাদুয়েক পর বিদায় নিয়ে বের হয়ে এলাম। কিন্তু কিসের কি? রাস্তায় আবারো ঝড়—আবারো “দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুশিয়ার” অবস্থা। কোনোমতে ভাঙা তরী, ছেঁড়া পাল নিয়ে নিরাপদেই ঘরে ফিরলাম। সাথে এল কিছু অসাধারণ মূহুর্তের স্মৃতি।