18/06/2026
নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল: ব্যক্তি নয়, সমস্যার মূল হলো স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংকট
কোনো হাসপাতালের প্রকৃত চিত্র মূল্যায়ন করতে হলে শুধু একটি ভিডিও, একটি ছবি বা একটি অভিযোগ নয়—দেখতে হয় পুরো ব্যবস্থাটিকে। নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের বর্তমান বাস্তবতাও ঠিক তেমনই।
একটি ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ৬৫০–৮৫০ জন রোগী ভর্তি থাকলে, সেই হাসপাতালের ওপর কী পরিমাণ চাপ পড়ে তা সহজেই অনুমেয়। রোগীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ হলে শুধু চিকিৎসক বা তত্ত্বাবধায়ক নন—পুরো অবকাঠামোই ভেঙে পড়তে বাধ্য।
বাস্তবতা হলো—
• ২৫০ শয্যার জন্য বরাদ্দ খাবার দিয়ে ৬৫০–৮৫০ জন রোগীর চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়।
• সীমিত সংখ্যক ওয়ার্ডবয়, ক্লিনার ও নার্স দিয়ে অতিরিক্ত রোগীর সেবা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।
• একই টয়লেট শত শত রোগী ও স্বজন ব্যবহার করলে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা একজন ক্লিনারের একার দায়িত্ব হতে পারে না।
• আউটসোর্সিং কর্মচারীরা যদি মাসের পর মাস বেতন না পান, তাহলে তাদের কাছ থেকে শতভাগ কর্মদক্ষতা প্রত্যাশা করাও বাস্তবসম্মত নয়।
• নতুন ৫০০ শয্যার ভবন নির্মিত হলেও বিদ্যুৎ সংযোগ, লিফট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ও জনবল না থাকলে সেই ভবন চালু করা সম্ভব নয়।
এসব সমস্যা কোনো একক তত্ত্বাবধায়কের সৃষ্টি নয়; বরং এগুলো দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যখাতের পরিকল্পনা, অর্থায়ন, জনবল ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ।
যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম বা দায়িত্বে গাফিলতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকে, তাহলে অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু তদন্তের আগেই জনসম্মুখে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা বা "মিডিয়া ট্রায়াল" কোনো প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করে না।
বরং আমাদের জিজ্ঞাসা হওয়া উচিত—
✅ কেন ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন তিনগুণ রোগী ভর্তি হয়?
✅ কেন নতুন ভবন সময়মতো চালু করা যায় না?
✅ কেন প্রয়োজনীয় জনবল বছরের পর বছর শূন্য থাকে?
✅ কেন আউটসোর্সিং কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন নিশ্চিত করা যায় না?
✅ কেন স্থানীয় অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধানের কার্যকর ব্যবস্থা নেই?
সমাধানের পথও বাস্তবভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন—
১. হাসপাতালটিকে দ্রুত ৫০০–১০০০ শয্যায় উন্নীত করা।
২. রোগীর চাপ অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, ক্লিনার ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগ।
৩. নতুন ভবন দ্রুত চালুর জন্য বিদ্যুৎ, লিফট, আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ সম্পন্ন করা।
৪. আউটসোর্সিং কর্মীদের বেতন নিয়মিত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত করা।
৫. হাসপাতালের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশল কাজের জন্য স্থায়ী গণপূর্ত সেল গঠন।
৬. রোগীর প্রকৃত সংখ্যার ভিত্তিতে খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য বরাদ্দ পুনর্নির্ধারণ।
৭. হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন, অডিট ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
একজন কর্মকর্তা বদলি করলে হয়তো একটি মুখ বদলায়; কিন্তু একটি ভঙ্গুর ব্যবস্থা বদলায় না। ব্যক্তি নয়, সমস্যার মূল যদি ব্যবস্থার ভেতরে থাকে, তাহলে সমাধানও হতে হবে ব্যবস্থাগত।
নোয়াখালীর মানুষ কোনো ব্যক্তি বিশেষের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। তারা চায় একটি পরিচ্ছন্ন, আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক হাসপাতাল—যেখানে রোগী সম্মানের সঙ্গে চিকিৎসা পাবে এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদের সহায়তায় দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
ব্যক্তিকে নয়, সমস্যাকে চিহ্নিত করি। দোষারোপ নয়, টেকসই সমাধানের দাবিতে সোচ্চার হই।
নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল: ব্যক্তি নয়, সমস্যার মূল হলো স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংকট
copied
Dr. Ariful Haque