15/06/2025
আব্বুকে ফোন দিলাম বাবা দিবসের শুভেচ্ছা জানাতে। আব্বু ফোন ধরেই বললো, "আমিতো তোমার ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম। আমিতো ভাবলাম ভুলে গেছো। আর কেউতো মনে রাখেনা..!"আব্বুর এই অপেক্ষা মুহূর্তেই আমার আজকের দিনের সেরা গিফট হয়ে গেলো...!
আমার বাকি ভাইবোনেরা যে মনে রাখেনা সেটা না, আসলে ওরা মুখ ফুটে বাবা মাকে ভালোবাসি বলতে পারেনা। আমি ছোট থেকেই চঞ্চল, যেমন ফট ফট করে ভালোবাসি বলতে পারি তেমনি আপনজনের জন্মদিন, শুভ দিন মনে রাখার চেষ্টা করি।
আমি তখন ৬ মাস বয়সের। মায়ের বুকের দুধ আমি পাইনাই। পটের দুধ ই আমার প্রধান খাদ্য ছিল। সেদিন আবার দুধ শেষ হয়ে গিয়েছিলো। লাইলী খালামণি( আমার দেখভাল করতেন) আব্বুকে বলেছিল মামণির দুধ নাই। তাড়াতাড়ি আইসেন।আব্বু তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করে দুধ নিয়ে ফিরতে গিয়ে মারাত্মক ভাবে বাইক এক্সিডেন্ট করে।তার হাত ও পা ভেংগে যায়। ৬ মাস বিছানায় ছিল। এক্সিডেন্টের পর প্রথম কথা ছিল, আমার বাচ্চাটা ক্ষুধায় কান্দবে,অপেক্ষা করছে আমার জন্য, কেউ কি বাসায় দুধ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করবেন?
সেদিন অবুঝ আমি অপেক্ষায় ছিলাম, সময়ের পরিক্রমায় আমি জানি এখন আব্বু আমার অপেক্ষা করে বাড়ি ফেরার।একটু বড় হবার পরেও আমি অপেক্ষা করতাম। শুক্রবার আসবে আব্বুকে বাসায় পাবো। আব্বু যখন বের হতো তখন ভোর বেলা আর যখন ফিরতো তখন অনেক রাত। কারণ আব্বুর পোস্টিং ছিল অন্য জেলায়। এরপরে আবার আমি ঢাকায় থাকাকালীন আব্বু আমার অপেক্ষা করতো। বাসায় ফিরলেই আমাকে আমার জন্য জমিয়ে রাখা তার আলমারি থেকে চানাচুর,বিস্কিট,গুড়া দুধ আমি যা যা পছন্দ করি বের করে দিতো। মানে বাসার জন্য তো বাজার সদাই প্রতিনিয়তই থাকেই, এগুলা আমার আলাদা। আব্বু আমিতো আবার দেশে আসবো তুমি ঠিক এমনি করেই কি সব জমিয়ে রাখছো?
আব্বুর সাথে আমার অনেক অনেক স্মৃতি। আমরা রাজনীতি, ভূগোল কিংবা খেলা যেকোন বিষয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ করেছি। যদিও আমাদের মতভেদ আছে তবে আমরা তা যুক্তি দিয়ে টোক্কর করার চেষ্টা করি। আব্বুর জীবনের অনেক স্মৃতি আমি শুনেছি খুব মন দিয়ে। আব্বু আমার জীবনে একমাত্র ব্যক্তি যে আমার রান্না মন দিয়ে তৃপ্তি নিয়ে খাবে এবং সে রান্না যেমন ই হোক প্রতি লোকমাতে সে আমার প্রশংসা করবে।আমি আব্বুকে কিছু দিয়েছি সে খায়নাই এমন হয়নাই, ইভেন নুডলস ও যা সে আদতে খেতে চায়না কখনোই।
আমার জন্মের পর থেকে বাসায় সেই বিস্কুট ই আনা হয় যা আমি পছন্দ করি, ট্রেনিং হোক কোথাও ডিনার হোক আমি যা পছন্দ করতাম নিয়ে আসতো। এটা নিয়ে আমার ছোট ভাইয়ের অবশ্য খুব আক্ষেপ। আমাকে নাকি আব্বু বেশি ভালোবাসে। বুঝ হবার পর থেকে আব্বু সেই ড্রেস টাই পরে যা আমি সিলেক্ট করে দেই। গত বছর পর্যন্ত সবসময় আব্বুর সব ড্রেস আমিই আয়রন করে দিতাম। আমার আসলে এই জীবনে আমার বাবার কাছ থেকে আমার আর কিছু পাওয়ার নেই। আব্বু থেকে আমি জীবনে একটাই জিনিস চেয়েছি, আব্বুর এত বছরের প্রতিদিনের লিখা ডায়েরী গুলো। আব্বুকে আমি কথা দিয়েছি আমি আমার জীবনের সব টুকু দিয়ে আগলে রাখবো।
আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। আমি আমার বাবাকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসি বলতে পারি। আমার বাবার বুকে যে কোন মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি। আমার বাবার কাছে মুখ ফুটে সব বলতে পারি। আব্বুর যখন ক্যান্সার ছিল, যখন কথা বলতে পারতোনা। তখনো আব্বু লিখে লিখে আমার সাথে কথা বলতো। আমি অবশ্য কান্নার জন্য বেশিদূর কথা চালায়া যেতে পারতাম না।তখন আমি বুঝেছিলাম দুনিয়াতে বাবা মা ছাড়া সব অর্থহীন। আমি এখন ভাবি, ওই সময় টা আমার জীবনে দরকার ছিল। দরকার ছিল বাবা মায়ের মূল্য বোঝার জন্য। আল্লাহর অশেষ রহমতে এখনো আব্বু মাথার উপরে আছে,বটবৃক্ষের ছায়া হয়ে।
অনেক সন্তানেরাই পারেনা মুখ ফুটে ভালোবাসি বলতে, কিংবা অনেকে সুযোগ পায়না। তারা যে ভালোবাসেনা তা নয়, হয়তো সময়টুকুও জুটেনা। আমি আমার দু একজন কাছের মানুষ কে দেখেছি এখন তারা প্রতিনিয়ত আফসোস করে আরেকটু সময় যদি বাবার কাছে থাকতে পারতাম,আরেকটু যদি গল্প করতে পারতাম।তাই সময় থাকতেই বাবাকে জড়িয়ে ধরো। মুখ ফুটে ভালোবাসি বলো। একটু তার গল্প শুনো।তার জীবনের স্মৃতি গুলো জানার চেষ্টা করো। বিশ্বাস করো বাবামে যখন কথা বলতে পাবেনা ছুঁতে পারবেনা এর চেয়ে ভারী দুনিয়াতে কিচ্ছু নেই.. সন্তান হিসেবে ভালোবাসো বাবাকে, তোমার বাবা এটুক নিয়ে শেষ বয়সে অন্তত তৃপ্ত হোক..