27/12/2025
চারদিকের ষড়যন্ত্রে কি বিলুপ্তির পথে এনসিপি?
না কি জামায়াত–সমঝোতায় নতুন রাজনৈতিক উত্থানের সুযোগ?
✍️ এএমসি রোমেল
ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক | প্যারিস, ফ্রান্স
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আজ এক কঠিন সময় পার করছে। একদিকে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন, অন্যদিকে রাজনৈতিক ময়দানে টিকে থাকার জন্য কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে এনসিপিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে “বিলুপ্তির পথে” যাওয়ার বয়ান। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বয়ান কি বাস্তব, নাকি এটি একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক চাপ?
এনসিপি জন্মলগ্ন থেকেই নিজেকে একটি নাগরিক, সংস্কারমুখী ও বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতা হলো, শুধু আদর্শ দিয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকা কঠিন। ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে থেকে রাজনীতি করতে গেলে নতুন দলগুলোকে প্রায়ই নানা দিক থেকে চাপে রাখা হয়। এনসিপিও এর ব্যতিক্রম নয়।
বিলুপ্তির কথাবার্তা কেন সামনে আসছে?
এনসিপির অভ্যন্তরীণ মতভেদ, কয়েকজন নেতার আপত্তি ও পদত্যাগ—এই ঘটনাগুলোকে সামনে এনে একটি ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যে দলটি ভেঙে পড়ছে। অথচ একই সঙ্গে এটাও সত্য, ২১৪ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে ১৮৪ জন নেতা জামায়াতে ইসলামীসহ জোট ও আসন সমঝোতার পক্ষে মত দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক কাঠামোয় এত বড় সমর্থনকে উপেক্ষা করা যায় না।
রাজনীতিতে অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তকেও বিতর্কিত করে তোলা হয়, যদি সেই সিদ্ধান্ত কারও স্বার্থের সঙ্গে না মেলে। এনসিপির ক্ষেত্রেও সেই চিত্রই স্পষ্ট।
জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা: সংকট না সুযোগ?
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের একটি পুরোনো, সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রাজনৈতিক দল। বাস্তবতা হলো, এককভাবে নির্বাচনী রাজনীতিতে সফল হওয়া এনসিপির জন্য সহজ নয়। এই অবস্থায় জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা এনসিপির আদর্শ বিসর্জন নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতায় টিকে থাকার একটি প্রচেষ্টা।
রাজনীতি কেবল নৈতিক অবস্থানের বিষয় নয়, এটি সম্ভাবনা ও সমঝোতারও বিষয়। ক্ষমতার বাইরে থেকে সংস্কারের কথা বলা আর ক্ষমতার ভেতরে থেকে সংস্কারের চেষ্টা করা—এই দুইয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। সমঝোতার মাধ্যমে এনসিপি যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় পৌঁছাতে পারে, তাহলে সেটিকে একেবারে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ কম।
দেশ গঠনে কী ভূমিকা রাখতে পারে এনসিপি?
এনসিপির বড় শক্তি হলো তাদের তরুণ, শিক্ষিত ও পেশাভিত্তিক নেতৃত্ব। এই নেতৃত্ব যদি জোটের ভেতরে থেকেও কার্যকর অবস্থান নিতে পারে, তাহলে—
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বাস্তব আলোচনা এগিয়ে নিতে পারে
দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালী করার পক্ষে ভূমিকা রাখতে পারে
নাগরিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে নীতিগত চাপ তৈরি করতে পারে
দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখের বাইরে নতুন নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে
এসবই দেশ গঠনের ক্ষেত্রে বাস্তব অবদান রাখার সম্ভাবনা।
নাহিদ ইসলাম ও নেতৃত্বের সমীকরণ
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে—জামায়াত যদি নাহিদ ইসলামকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন দিতে আগ্রহী হয়, তাহলে এনসিপির ১৮৪ জন নেতার সমর্থন অযৌক্তিক নয়। এটি একটি সমঝোতাভিত্তিক নেতৃত্বের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে এনসিপি প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন উদাহরণ নতুন নয়, যেখানে সমঝোতার মাধ্যমে নতুন মুখ সামনে এসেছে।
ষড়যন্ত্রের বৃত্ত থেকে বের হওয়ার পথ
এনসিপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা। কেন জোট, কী শর্তে জোট—এই প্রশ্নগুলোর পরিষ্কার ব্যাখ্যা জনগণের সামনে আনতে হবে। একই সঙ্গে ভেতরের মতভেদকে প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে না নিয়ে রাজনৈতিক পরিপক্বতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
রাজনীতিতে সাহসী সিদ্ধান্ত যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি সঠিক সময়ে নেওয়া সাহসী সিদ্ধান্তই দলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
এনসিপি আজ ধ্বংসের মুখে—এই কথা বলা যত সহজ, বাস্তবতা ততটা সরল নয়। দলটি বরং একটি কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা এনসিপির জন্য আত্মসমর্পণ নয়; এটি টিকে থাকার এবং প্রভাব রাখার একটি চেষ্টা।
এই পথ শেষ পর্যন্ত এনসিপিকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা সময়ই বলবে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—এই মুহূর্তে এনসিপিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করার চেয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার প্রয়োজন অনেক বেশি।
#রাজনৈতিক_বিশ্লেষণ #বাংলাদেশ_রাজনীতি