02/05/2026
মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর বীরত্বগাঁথা
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর “অপারেশন সার্চলাইট”-এর মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালির উপর গণহত্যা শুরু হলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ছাত্র-যুবক, কৃষক-শ্রমিক, সাধারণ মানুষ অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। এই মহান যুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা পালন করে “মুজিব বাহিনী” বা “বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (BLF)”।
মুজিব বাহিনী ছিল স্বাধীনতার আদর্শে উজ্জীবিত এক সাহসী গেরিলা সংগঠন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব তৈরি করা। এই বাহিনী গঠনে নেতৃত্ব দেন তৎকালীন ছাত্রলীগের চার তরুণ নেতা— শেখ ফাজলুল হক মণি , তোফায়েল আহমেদ , আবদুর রজ্জাক এবং সিরাজুল আলম খান । তাদের নেতৃত্বে হাজারো তরুণ সংগঠিত হয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখেন।
মুজিব বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সেখানে গেরিলা যুদ্ধ, বিস্ফোরক ব্যবহার, গোয়েন্দা তৎপরতা ও ধ্বংসাত্মক অভিযানের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এই বাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস, সেতু উড়িয়ে দেওয়া, অস্ত্রাগারে হামলা এবং শত্রুপক্ষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বিশেষ করে ঢাকাসহ শহরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণে মুজিব বাহিনীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আকস্মিক হামলা চালাতেন এবং দ্রুত স্থান পরিবর্তন করতেন। এতে পাকিস্তানি বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাদের সাহসিকতা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়িয়ে দেয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও জোরদার করে। মুজিব বাহিনীর অসংখ্য অপারেশনের মধ্যে আমি একটি উল্লেখ করতে চাই.
ঢাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় আঘাত
মুজিব বাহিনীর বহু গোপন অভিযানের মধ্যে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে পাকিস্তানি সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসের অভিযান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে মুজিব বাহিনীর একটি বিশেষ গেরিলা দল ঢাকার আশেপাশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আঘাত হানার পরিকল্পনা করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল— পাকিস্তানি বাহিনীকে মানসিকভাবে দুর্বল করা এবং শহরের জনগণকে বোঝানো যে মুক্তিযোদ্ধারা রাজধানীতেও সক্রিয় রয়েছে।
এই অভিযানে গেরিলারা রাতের অন্ধকারে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে বিস্ফোরণ ঘটায় এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগাযোগ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। একইসঙ্গে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত করায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রসদ পরিবহন ব্যাহত হয়। এই ধরনের অভিযানের ফলে ঢাকায় পাকিস্তানি প্রশাসনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দলিল ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে উঠে এসেছে যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তখন শহরের ভেতরে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। তারা বুঝতে পারে— মুক্তিযোদ্ধারা শুধু সীমান্ত এলাকায় নয়, রাজধানীর অভ্যন্তরেও সংগঠিত হয়ে উঠেছে।
মুজিব বাহিনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আদর্শিক নেতৃত্ব। তারা শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধই করেনি, বরং জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রাহমান -এর অসাম্প্রদায়িক, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার চেতনাকে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে মুক্তিযুদ্ধ কেবল সামরিক সংগ্রাম নয়, একটি জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে পরিণত হয়।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। এই বিজয়ের পেছনে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের পাশাপাশি মুজিব বাহিনীর অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তাদের সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর ইতিহাস আমাদের শেখায়— স্বাধীনতা কখনও আপস করে অর্জিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন আত্মত্যাগ, আদর্শ এবং অদম্য সাহস। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে মুজিব বাহিনী এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, যা জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
লেখক:
শহীদুল হক চৌধুরী রাসেল
সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ
কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি