09/06/2026
বাংলার মানুষ কি শুধু সরকার বদলাতে চেয়েছিল, নাকি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাটাই বদলাতে চেয়েছিল?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে শুধুমাত্র নির্বাচনের ফল দিয়ে বিচার করলে একটা বড় ভুল হবে। কারণ অনেক সময় ভোট মানুষ কোনো দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য দেয় না, বরং একটি ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য দেয়।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলার বহু মানুষের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে তৃণমূল কংগ্রেস শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ ক্ষমতার ইকোসিস্টেমে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ ছিল, দুর্নীতি, কাটমানি, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব এবং স্থানীয় স্তরে ক্ষমতার অপব্যবহার ধীরে ধীরে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
এই ক্ষোভ শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে ছিল না।
অনেক মানুষের অভিযোগ ছিল, পঞ্চায়েত থেকে ব্লক, ব্লক থেকে জেলা, জেলা থেকে বিধায়ক, সাংসদ—ক্ষমতার প্রতিটি স্তরে একই সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে।
২০১৯ সালে বিজেপির উত্থান সেই ক্ষোভেরই রাজনৈতিক প্রকাশ ছিল।
অনেক ভোটার বিজেপির প্রার্থীকে চিনতেন না। অনেকেই স্থানীয় নেতার নামও জানতেন না। কিন্তু তারা EVM-এ পদ্মফুলে চাপ দিয়েছিলেন একটি কারণেই—তারা তৃণমূলকে রাজনৈতিকভাবে শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু এরপর বিজেপি এমন একটি পথ বেছে নেয়, যা অনেক সমর্থকের মনেই প্রশ্ন তৈরি করে।
যাদের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর আন্দোলন হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলে সভা-মিছিল হয়েছে, তাদের অনেককেই বিজেপির মঞ্চে দেখা যেতে শুরু করে।
এখানেই প্রথম ফাটল তৈরি হয়।
কারণ সাধারণ ভোটার খুব সরলভাবে বিষয়টি দেখেন।
তিনি ভাবেন, “যদি এই মানুষগুলো এত খারাপ হয়, তাহলে তারা বিজেপিতে এলেই ভালো হয়ে গেল কীভাবে?”
আর যদি ভালোই হয়, তাহলে এতদিন তাদের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ তোলা হলো কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর আজও বাংলার রাজনীতিতে স্পষ্ট নয়।
আমার মতে, এখানেই বিজেপি বাংলার ভোটারের মনোভাব ভুল পড়েছিল।
মানুষ তৃণমূলের পতাকা বদল দেখতে চায়নি।
মানুষ তৃণমূলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান দেখতে চেয়েছিল।
তারা নতুন মুখ দেখতে চেয়েছিল।
তারা চেয়েছিল যারা বছরের পর বছর রাস্তায় লড়াই করেছে, তাদের উঠে আসতে।
তারা চেয়েছিল জবাবদিহি।
তারা চেয়েছিল পরিবর্তন।
যখন এই বার্তা উপেক্ষা করা হয়, তখন তার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়।
কিন্তু পরে বিজেপি আবার বুঝতে পারে যে বাংলার মানুষ শুধুমাত্র ক্ষমতার অঙ্ক দেখছে না, চরিত্রও দেখছে। তখন দলবদল রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে সরে এসে তারা নিজেদেরকে একটি বিকল্প রাজনৈতিক সংস্কৃতি হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করে। এমনকি দলের মধ্যেই “Trinamoolisation” নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।
এবং সেখানেই বাংলার মানুষ তাদের সবচেয়ে বড় বার্তা দেয়।
একটি অভূতপূর্ব জনসমর্থন।
একটি ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট।
একটি এমন রায়, যা শুধু সরকার গঠনের অনুমতি নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কার করার দায়িত্বও দেয়।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
যদি এত বড় জনসমর্থন পাওয়ার পরও আবার সেই পুরনো রাজনৈতিক মুখগুলোকে দলে আনা শুরু হয়, তাহলে সাধারণ ভোটার কী ভাববে?
তিনি কি ভাববেন না যে তিনি যাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন, তারা শেষ পর্যন্ত অন্য রঙের পতাকা নিয়েই আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে?
তাহলে পরিবর্তনটা কোথায়?
দলের নাম বদলেছে?
নাকি রাজনীতির চরিত্র বদলেছে?
বাংলার মানুষ সরকার পরিবর্তনের জন্য ভোট দেয়নি।
বাংলার মানুষ একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের জন্য ভোট দিয়েছিল।
আর যদি সেই প্রত্যাশা ভেঙে যায়, তাহলে কোনো বিরোধী দল নয়, কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়—সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে মানুষের বিশ্বাস হারানো।
কারণ গণতন্ত্রে ভোটার পরাজয় মেনে নেয়।
কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা খুব কমই ভুলে যায়।