12/01/2026
ভালোবাসাহীন জীবন
গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি ভাঙা মাটির ঘর ছিল। সেই ঘরেই জন্ম নিয়েছিল ছেলেটা বাবার ভালোবাসা সে কোনোদিন পায়নি। বাবা ছিল রুক্ষ, নির্লিপ্ত—যেন ছেলেটা তার জীবনের বোঝা মাত্র। আত্মীয়স্বজন তো আরও নির্মম; সুযোগ পেলেই অবজ্ঞা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর কটুকথা ছুড়ে দিত।
ছেলেটার শৈশব ছিল অভাবের সঙ্গে লড়াই করার এক নীরব ইতিহাস। এমন দিনও গেছে, যখন একমাস ধরে সে শুধু কুয়োর জল খেয়েই বেঁচে ছিল। ক্ষুধা তখন পেটে নয়, আত্মায় বাসা বেঁধেছিল। তবুও তার চোখে স্বপ্ন ছিল—একদিন সে ভালো থাকবে, কেউ তাকে আপন করে নেবে।
যৌবনে পা দিয়ে সে চেষ্টা করেছিল নিজের জীবন গড়তে। ছোট ছোট ইচ্ছা—একটু শান্তি, একটু সম্মান, একটু ভালোবাসা। সে পরিশ্রম করেছে, মাথা নত করে মেনে নিয়েছে অনেক অপমান। কিন্তু প্রতিবারই ভাগ্য যেন নির্মম হাসি হেসে তার সব চেষ্টা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সে ভাবত, “হয়তো ভগবান আমাকে দেখছেন, হয়তো দেরি হচ্ছে মাত্র।”
তারপর তার বিয়ে হলো।
সেদিন প্রথমবার সে মনে করেছিল—এইবার বুঝি অন্ধকারের শেষে আলো। ভাবল, জীবনসঙ্গিনী অন্তত তার মনের ভাষা বুঝবে। রাতে ঘরে ফিরলে কেউ একজন জিজ্ঞেস করবে, “আজ কেমন কাটল?” কেউ একজন তার কষ্টগুলো শুনবে, তার পুরোনো অভিশপ্ত দিনগুলো ভুলিয়ে দেবে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরও নিষ্ঠুর।
স্ত্রীর কাছে সে পেল না ভালোবাসা, পেল অবহেলা আর নির্যাতন। কথা দিয়ে নয়, নীরবতায়; হাতে নয়, চোখের দৃষ্টিতে—প্রতিদিন সে ভেঙে পড়ত একটু একটু করে। তবুও সে সহ্য করেছিল। কারণ সে বিশ্বাস করত, ভালোবাসা না হোক, অন্তত সংসারটা বাঁচুক।
কিন্তু একদিন সেই বিশ্বাসও চূর্ণ হলো।
বিশ্বাসঘাতকতার ছুরিটা এসেছিল ঠিক পেছন দিক থেকে। তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেল—সব দোষ তার ঘাড়ে চাপিয়ে। সেদিন ছেলেটা কাঁদেনি। শুধু অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, তার জীবনের সব দরজাই একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এখন সে আর কিছু চায় না। না স্বপ্ন, না আশা। শুধু প্রতিদিন ভগবানের কাছে একটাই প্রার্থনা করে—
“আর পারছি না। যদি দয়া থাকে, তাড়াতাড়ি আমাকে নিয়ে নাও।”
গ্রামের মানুষ তাকে দেখে বলে, “লোকটা খুব চুপচাপ।”
কেউ জানে না, সেই চুপচাপ মানুষের বুকের ভেতর কত আর্তনাদ জমে আছে।
তবুও প্রতিদিন ভোরে সে উঠে সূর্যের দিকে তাকায়। হয়তো গভীর কোথাও এখনো এক ফোঁটা আশা লুকিয়ে আছে—যদি না জীবনে, অন্তত পরজন্মে সে একটুকু ভালোবাসা পায়।