07/11/2025
#বহুজন_সমাজের দৃষ্টান্ত: যাদব মাঝির উত্থান – সংরক্ষণের আশীর্বাদ, JEE-এর ৱ্যাঙ্কিং এবং শিক্ষকের নিঃস্বার্থ ছত্রছায়া।
বহুজন সমাজের চোখে যাদব মাঝির জীবনকাহিনি কোনো ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি একটি সমষ্টিগত সংগ্রামের প্রতীক – যেখানে শোষিত, বঞ্চিত ও তপশিলি সম্প্রদায়ের সন্তানেরা দারিদ্র্যের জাল ছিঁড়ে উঠে আসে সমাজের শীর্ষে। কাঁথির জালপাই গ্রামের মৎস্যজীবী পরিবারে জন্ম নেওয়া যাদব, জাতে জেলে (তপশিলি ভুক্ত), তার জীবন শুরু হয়েছিল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো অস্থিরতায়। বাবা লঙ্কেশ্বর মাঝি জাল ফেলে মাছ ধরতেন, মা স্বর্ণময়ী সংসারের হাল ধরতেন, কিন্তু দারিদ্র্য এমন ছিল যে পেট ভরে ভাতও জোটে না অনেক দিন। এই পরিবেশে বহুজন সমাজের অসংখ্য সন্তানের মতো যাদবের ভবিষ্যৎও ছিল অন্ধকার – শ্রমের চক্রে আটকে থাকা, উচ্চশিক্ষার দরজা বন্ধ। কিন্তু এখানেই উঠে আসে বাবাসাহেব ড. ভীমরাও আম্বেডকরের সাংবিধানিক দান – তপশিলি সংরক্ষণের আশীর্বাদ – যা যাদবের মতো বঞ্চিতদের জন্য একটি আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়ায়।
বহুজন দৃষ্টিভঙ্গিতে যাদবের সাফল্যকে দেখতে হলে প্রথমে স্বীকার করতে হবে যে, ব্যক্তিগত পরিশ্রম যতই অদম্য হোক, সমাজের কাঠামোগত বৈষম্য ছাড়া তা অসম্পূর্ণ। যাদবের মাধ্যমিকে ৮৬.২৫% নম্বর, উচ্চমাধ্যমিকে ৮৪.৭৫% – এগুলো তার মেধার প্রমাণ, কিন্তু সংসারের টানে সে সমুদ্রে চলে যাচ্ছিল। এখানে এগিয়ে আসেন শ্রী বসন্ত কুমার ঘোড়াই, নিজেও তপশিলি ভুক্ত এক দরিদ্র শিক্ষক। তিনি যাদবকে খুঁজে বাড়ি যান, দাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন, নিজের বাড়িতে থাকা-খাওয়া-পড়ার ব্যবস্থা করেন। এটি কেবল একজন শিক্ষকের স্নেহ নয়, বহুজন সমাজের অভ্যন্তরীণ সংহতির উদাহরণ – এক তপশিলি যখন আরেক তপশিলিকে ঝড়-জল-রোদ থেকে রক্ষা করে ছাতা হয়ে দাঁড়ায়। বসন্ত স্যারের এই নিঃস্বার্থতা বহুজন সমাজের মূলমন্ত্র: "আমরা একে অপরের শক্তি"। কিন্তু এই সহায়তা একা যথেষ্ট ছিল না; এর সঙ্গে মিলিত হয় সাংবিধানিক সংরক্ষণের শক্তি।
বাবাসাহেবের সংবিধান তপশিলি সম্প্রদায়কে শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণ দিয়ে বৈষম্যের দেয়াল ভেঙেছে। যাদবের যাত্রা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। উচ্চমাধ্যমিকের পর সে প্রস্তুতি নেয় IIT-এর দরজা খোলার জন্য – JEE Advanced-এর মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়। এবং সাফল্য এলো SC (Scheduled Caste) ক্যাটাগরিতে। ২০১৩ সালের JEE Advanced-এ যাদব অর্জন করে SC ক্যাটাগরিতে **All India Rank (AIR) ১২৩** – একটি চমকপ্রদ ফলাফল যা প্রমাণ করে যে, তপশিলি সংরক্ষণ কেবল সুযোগ দেয় না, বরং মেধাবী সন্তানদের শীর্ষে পৌঁছাতে সাহায্য করে। এই র্যাঙ্কিং তাকে IIT Bombay-এর MSc Chemistry প্রোগ্রামে সরাসরি ভর্তির পথ খুলে দেয়, যেখানে সাধারণ ক্যাটাগরির হাজার হাজার প্রার্থীরও স্বপ্ন ভেঙে যায়। SC কোটায় এই র্যাঙ্কিং যাদবের মেধা ও অধ্যবসায়ের সাক্ষ্য – নৌকার কোণে বই পড়া ছেলেটি এখন IIT-এর গেট পার হয়েছে। এটি বহুজন সমাজের জন্য গর্বের: সংরক্ষণ কোনো 'দান' নয়, এটি ঐতিহাসিক অবিচারের ক্ষতিপূরণ, যা যাদবের মতো যুবকদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রাথমিক সাফল্য এনে দেয়।
JEE-এর এই সাফল্যের পর যাদবের যাত্রা ত্বরান্বিত হয়। GATE পরীক্ষায়ও সে SC ক্যাটাগরিতে চমৎকার র্যাঙ্ক অর্জন করে, যা তাকে IIT Bombay-এর MSc-এ নিশ্চিত করে। সেখানে অধ্যাপকরা বুঝলেন – এই ছেলেটির ভিতরে রয়েছে অসাধারণ মেধা। তাদের পরামর্শে পাড়ি জমাল কানাডার Queen's University Belfast-এ PhD-এর জন্য। বরফে ঢাকা শহরে ল্যাবরেটরির ভেতর রাতের পর রাত কাটাল রিঅ্যাকশনের সামনে। খাতায় জমল সাফল্যের গল্প। তারপর গবেষণার ডাক তাকে নিয়ে গেল আমেরিকার University of Pennsylvania-য় পোস্ট-ডক্টরেটের জন্য। প্রতিটি ধাপে সংরক্ষণের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না – JEE থেকে শুরু করে GATE, এবং পরবর্তী গবেষণায় ফেলোশিপ – সবকিছুতেই SC ক্যাটাগরির সুবিধা তার পথ সহজ করেছে। সংরক্ষণ কোটা যাদবকে সুযোগ দিয়েছে প্রবেশের, কিন্তু তার মেধা ও পরিশ্রম তাকে শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। এটি বহুজন সমাজের জন্য গর্বের: সংরক্ষণ কোনো 'দান' নয়, এটি ঐতিহাসিক অবিচারের ক্ষতিপূরণ। যাদবের মতো হাজারো তপশিলি যুবক এর ফলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক হচ্ছেন, যা ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙছে।
যাদবের ফেরা দেশে, IIT ধানবাদে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান – এটি বহুজনের বিজয়। গ্রামের ছেলে, জেলে পরিবারের সন্তান, এখন বিশ্বমানের গবেষক। মা স্বর্ণময়ীর চোখের জল, গ্রামের বিস্ময় – এগুলো বহুজন সমাজের সম্মিলিত আনন্দ। কিন্তু বাবা লঙ্কেশ্বর দেখে যেতে পারেননি, এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের সংগ্রাম এখনও চলছে। বসন্ত স্যারের প্রতিশ্রুতি – স্কুলের ১২০০ ছাত্রকে বিরিয়ানি খাওয়ানো – এটি উদযাপনের প্রতীক, যা বলে: একজনের উত্থান গোটা সম্প্রদায়ের।
বহুজন দৃষ্টিকোণ থেকে যাদব মাঝি প্রমাণ করেন যে, সংরক্ষণ + শিক্ষকের সংহতি + ব্যক্তিগত অধ্যবসায় = সমাজ পরিবর্তন। JEE Advanced-এ SC AIR ১২৩-এর মতো প্রাথমিক সাফল্য দেখিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তপশিলি সংরক্ষণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় কীভাবে বঞ্চিত যুবকদের পথ খুলে দেয়। এটি আমাদের শেখায়: সংরক্ষণকে রক্ষা করো, কারণ এটি বাবাসাহেবের অস্ত্র। শিক্ষকদের মতো বসন্ত স্যারকে সম্মান করো, কারণ তারা আমাদের ছত্রছায়া। আর যুবকদের বলো – পড়াশোনা ছাড়ো না, কারণ সমুদ্রের ঢেউ আটকাতে পারবে না তোমাকে। যাদবের গল্প বহুজন সমাজের মশাল – এটি জ্বালিয়ে রাখো, যাতে আরও হাজারো যাদব উঠে আসে।
#বহুজন_সংগ্রাম #তপশিলি_সংরক্ষণ #আম্বেডকর_আশীর্বাদ #যাদব_মাঝি #শিক্ষক_সংহতি