23/08/2026
শেষ ট্রেনের যাত্রী
আসামের এক ছোট্ট গ্রামের নাম ছিল চাঁদপুর। গ্রামের এক পাশে ছিল ঘন বাঁশঝাড়, অন্য পাশে একটি পুরোনো রেললাইন। সেই রেললাইন দিয়ে দিনে মাত্র কয়েকটি ট্রেন যেত। কিন্তু গ্রামের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পেত রাতের শেষ ট্রেনটিকে।
কারণ, বহু বছর ধরে একটা অদ্ভুত কথা প্রচলিত ছিল—
রাত ১২টা ১৭ মিনিটের ট্রেনে নাকি একজন অচেনা যাত্রী ওঠে।
কেউ তার মুখ ভালো করে দেখতে পায় না। সে সবসময় কালো চাদর গায়ে দেয় এবং ট্রেনের শেষ কামরায় একা বসে থাকে।
গ্রামের বয়স্ক লোকেরা বলত, “ওই ট্রেনে রাতের বেলা কখনো উঠবে না।”
কিন্তু এসব কথায় গ্রামের কলেজপড়ুয়া ছেলে অর্ণব বিশ্বাস করত না।
একদিন রাতে অর্ণবকে পাশের শহর থেকে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল। কাজ শেষ হতে অনেক দেরি হয়ে গেল। স্টেশনে পৌঁছে সে দেখল, প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা।
ঘড়িতে তখন ১২টা ১০ মিনিট।
কিছুক্ষণ পর দূর থেকে ট্রেনের আলো দেখা গেল।
অর্ণব মনে মনে বলল,
“এই তো! গ্রামের লোকেরা যে শেষ ট্রেনটার কথা বলে।”
ট্রেন থামতেই সে দ্রুত উঠে পড়ল।
অদ্ভুত ব্যাপার—প্রথম কয়েকটি কামরায় বেশ কিছু মানুষ ছিল, কিন্তু শেষ কামরাটি প্রায় সম্পূর্ণ ফাঁকা।
অর্ণব ভাবল, “ফাঁকা কামরাই ভালো।”
সে জানালার পাশে বসে পড়ল।
ট্রেন চলতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর সে লক্ষ্য করল, কামরার একেবারে শেষ প্রান্তে একজন লোক বসে আছে।
কালো চাদরে মুখ ঢাকা।
অর্ণব প্রথমে গুরুত্ব দিল না।
কিন্তু কয়েক মিনিট পর লোকটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল,
“তুমি কি চাঁদপুরে নামবে?”
অর্ণব একটু অবাক হয়ে বলল,
“হ্যাঁ।”
লোকটি আবার জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
“চাঁদপুরে আজ নামবে না।”
অর্ণব হাসল।
“কেন?”
লোকটি কোনো উত্তর দিল না।
ট্রেন তখন অন্ধকার মাঠের মধ্য দিয়ে ছুটে চলেছে।
হঠাৎ—
ঝটকা!
ট্রেনটি প্রচণ্ডভাবে দুলে উঠল।
অর্ণব জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল, দূরে একটা পুরোনো স্টেশন। কিন্তু সেই স্টেশনটি সে আগে কখনো দেখেনি।
স্টেশনের নামফলকে লেখা—
“চাঁদপুর”
অর্ণব অবাক হয়ে গেল।
“এটা কীভাবে সম্ভব? চাঁদপুর তো এখনও অনেক দূরে!”
সে উঠে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে সেই লোকটির গলা শোনা গেল—
“নামবে না।”
অর্ণব ঘুরে তাকাল।
লোকটি তখনও একই জায়গায় বসে আছে।
কিন্তু এবার তার মুখ দেখা যাচ্ছিল।
অর্ণবের বুক কেঁপে উঠল।
কারণ লোকটির মুখটি যেন বহুদিনের পুরোনো কোনো ছবির মতো ফ্যাকাশে।
অর্ণব কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।
স্টেশনটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
অর্ণব নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
সে সাহস করে লোকটির কাছে গিয়ে বলল,
“আপনি কে?”
লোকটি ধীরে ধীরে বলল,
“আমি? আমি তো এই ট্রেনের একজন পুরোনো যাত্রী।”
“আপনি কোথায় যাবেন?”
লোকটি এবার অদ্ভুতভাবে হাসল।
“যেখানে ট্রেন যায় না।”
অর্ণবের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
ঠিক তখনই ট্রেনের আলো একবার নিভে গেল।
পুরো কামরা অন্ধকার।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড পর আলো আবার জ্বলে উঠল।
কিন্তু—
লোকটি নেই।
অর্ণব চারদিকে তাকাল।
সিট খালি।
দরজা বন্ধ।
জানালা বন্ধ।
কোথাও যাওয়ার কোনো উপায় নেই।
তারপর সে সিটের নিচে একটা পুরোনো কাগজ দেখতে পেল।
কাগজটি তুলে নিয়ে দেখল, সেখানে একটি পুরোনো ট্রেনের টিকিট।
টিকিটের তারিখ দেখে অর্ণবের হাত কাঁপতে শুরু করল।
তারিখটি ছিল—
১৭ বছর আগের।
আর টিকিটের যাত্রীর নাম লেখা—
অর্ণব দাস।
অর্ণব কিছুতেই বুঝতে পারছিল না কীভাবে তার নিজের নাম সেই পুরোনো টিকিটে থাকতে পারে।
ভয়ে সে পরের স্টেশনেই নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
কিছুক্ষণ পর ট্রেন থামল।
সে দ্রুত নেমে পড়ল।
স্টেশনে একজন বৃদ্ধ চা বিক্রি করছিলেন।
অর্ণব হাঁপাতে হাঁপাতে তাকে জিজ্ঞেস করল,
“কাকু, এই ট্রেনটা কোথায় যাবে?”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
“তুমি এই ট্রেনে উঠেছিলে?”
অর্ণব মাথা নাড়ল।
বৃদ্ধের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“তাহলে তুমি ভাগ্যবান।”
“কেন?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন,
“১৭ বছর আগে এই লাইনে একটা ট্রেন দুর্ঘটনা হয়েছিল। শেষ কামরায় থাকা একজন যাত্রীকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।”
অর্ণবের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“তার নাম কী ছিল?”
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন,
“অর্ণব দাস।”
অর্ণবের হাত থেকে পুরোনো টিকিটটি মাটিতে পড়ে গেল।
বৃদ্ধ টিকিটটি তুলে নিয়ে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন,
“কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো... সেই যাত্রী দেখতে হুবহু তোমার মতো ছিল।”
অর্ণব কোনো কথা বলতে পারল না।
সেই রাতের পর থেকে সে আর কখনো রাতের শেষ ট্রেনে ওঠেনি।
কিন্তু গ্রামের মানুষ আজও বলে—
রাত ১২টা ১৭ মিনিটে যদি চাঁদপুর স্টেশনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যায়, দূর থেকে একটি ট্রেনের আলো দেখা যায়।
ট্রেনটি স্টেশনে থামে না।
শুধু শেষ কামরার জানালায় একজন মানুষ বসে থাকে।
আর মাঝে মাঝে সে জানালার কাঁচে হাত রেখে ফিসফিস করে বলে—
“চাঁদপুরে নামবে না...”
তবে সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো—
কেউ যদি সেই সময় নিজের নাম শুনতে পায়, তাহলে নাকি পরের রাতেই আবার সেই ট্রেনটি তাকে নিতে আসে।