20/10/2025
শুভ কালীপূজা, শুভ দীপাবলী ২০২৫
আমার নাই আঁধারের ভয়
কালো মায়ের রূপে আলোর ঝরণা ধারা বয়।।
আজ মহাকালী পূজা, আজ আলোর উৎসব দীপাবলী।
আলোর আলো যখন আলোয় আলোকময় করে আসেন, তখন নয়ন থেকে সব আঁধার মিলিয়ে যায়। মহাকালীর জ্যোতির্ময়ী রূপে দিগন্তজুড়ে আলোর বন্যা বয়, তাই কালো মায়ের অমানিশায় আজ আলোর উৎসব!
শ্রীশ্রী চন্ডীতে আমরা পাই, শুম্ভ-নিশুম্ভের সঙ্গে সংগ্রামের সময় অম্বিকা দুর্বৃত্ত অসুরদের এগিয়ে আসতে দেখে ক্রোধে জ্বলে উঠলেন। তারা জগজ্জননীকে একজন সুন্দরী রমণীমাত্র ভেবে তাঁকে অপহরণ করতে চেয়েছিল। চিরাচরিত আসুরিক দুর্বৃত্তিকে শাস্তি দেওয়ার জন্য দেবীর মুখ প্রথমে কালো হল, মসীবর্ণ ধারণ করল তার অপরূপ বদনমন্ডল। তারপর, তাঁর ভ্রূকুঞ্চিত ললাট থেকে দ্রুত বেরিয়ে এলেন অসিপাশধারিণী করালবদনী কালী। সেই কালী প্রথম চন্ড মুন্ডকে হত্যা করেন। পরে যখন রক্তবীজকে কিছুতেই বিনাশ করা যাচ্ছে না, তখন তাঁর লোল জিহ্বা যুদ্ধক্ষেত্রে বিস্তারিত করে পান করেন রক্তবীজের প্রতিটি রক্তবিন্দু। রক্তবীজের নাশ হয়।
এটুকু হল শ্রীশ্রীচন্ডীর কাহিনী।
কালিকা পুরাণে আছে, অসুরবধের পরেও দেবী মত্তগতিতে ছুটে যাচ্ছিলেন। দেবতারা প্রমাদ গোণেন। দেবীর এই ভয়ানক সংহারিণী রূপ সংবৃত না হলে যে ত্রিলোক ধ্বংস হয়ে যাবে! তাঁরা মহাদেবের শরণাপন্ন হন। মহেশ্বর জানেন যে দেবী কখনো শিবকে নত হতে দেবেন না। কারণ তাঁর ধ্বংসলীলা যে অশিব বিনাশ করে শিব বা কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য। দেবীর গতিপথে ভূমিতে শুয়ে পড়লেন চন্দ্রচূড়। আর হঠাৎ পদতলে পরমেশ্বরকে দেখে ক্রোধে রক্তিম উন্মাদিনী মহাকালী লজ্জা পেলেন, লজ্জা পেয়ে যেন একটু হেসে জিভ কাটলেন। এই হল আমাদের চেনা কালীমূর্তি।
স পতিত্বা মহীপৃষ্ঠে তস্যাঃ পাদয়োর্ন্যপতত্।
তদানীং চ মহাকালী তং দৃষ্ট্বা প্রহসন্নিব।।
জঘান জিহ্বাং লজ্জায়াং তত্রৈব স্থিররূপিণী।
তবে রামপ্রসাদ লিখেছেন,
শিব নয় মায়ের পদতলে।/ওটা মিথ্যা লোকে বলে।। দৈত্য বেটা ভূমে পড়ে,/ মা দাঁড়ায় তার উপরে।/ মায়ের পাদস্পর্শে দানবদেহ/ শিবরূপ হয় রণস্থলে।।
মা অসুরদলন করে শবারূঢ়া। কিন্তু শক্তিযুক্ত হলে এই আসুরিক শবই শিব হয়ে যায়।
শক্তিবিনা শিব হলেন নিষ্ক্রিয় শবদেহ। অন্যদিকে শিব বা কল্যাণের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে অনিয়ন্ত্রিত শক্তি জগৎকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
মহাকাল সমস্ত প্রাণীকে গ্রাস করছেন। আর কালকেও গ্রাস করেন যিনি, তিনি মহাকালী। মহাকালেরও ঊর্ধে আদিকারণ হলেন মহাকালী।
আজ সারা বাংলায় অমাবস্যার আঁধারে আঁধারনাশিনী মহাকালীর পূজা হবে। তাঁর সাথে লক্ষ লক্ষ দীপমালা জ্বলবে শুভ দীপাবলীর কল্যাণী রাত্রিতে। এমন দিনে আজ অতি পরিচিত এক কালীপূজার গল্প আবার মনে করি। বেশীদিন আগের কথা নয়, ইতিহাসের ধরাছোঁয়ার মধ্যে ১৮৫৫ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতার উপকন্ঠে একটি গ্রাম দক্ষিণেশ্বরে সবেমাত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিরাট বিশাল কালীমন্দির। মা কালীর নাম ভবতারিণী। সেখানে এক আপন ভোলা ডাগরচোখের নবীন কিশোর এসেছিল দাদার সাথে। দাদা সেই মন্দিরের পূজারী। এক বছরের মধ্যে হঠাৎই দাদার শরীর চলে যায়। মন্দির-সম্পত্তির মালিক হলেন জমিদার রাণী রাসমনি। তাঁর সম্পত্তির দেখভাল করেন তাঁরই জামাই মথুরানাথ বিশ্বাস। পূজারীর ছোট ভাই গদাধরের গান তাঁরা খুব ভালোবাসেন, ভালোবাসেন সরল ছেলেটিকে। তাঁদের অনুরোধে পূজক পদে বৃত হলেন কামারপুকুর গ্রামের ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের ছোট ছেলে গদাধর চট্টোপাধ্যায়। ছোট ভটচাজ্ বলেই ডাকতো সকলে।
সেই ছেলেটি কিন্তু একটু অন্যধারা। পূজো করতে বসে তাঁর মনে হয়, যাঁর উদ্দেশ্যে এত মন্ত্রপাঠ, এত স্নান করানো, খাওয়ার দেওয়া – তিনি কোথায়? শুধু পাথর প্রতিমা হয়ে স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন যে কালীমূর্তি তাঁর সাথে তো কথা কওয়া যায় না। মার সাথে কথা না বললে কি হয়? তিনি যদি সকলের ‘মা’ হন তাহলে যে তাঁকে দেখতে হবে।
শুরু হল অদ্ভুত পূজকের অদ্ভুত প্রার্থনা। ‘মা, আমায় দেখা দে’ – এই আকুলিবিকুলি আর্তিতে গঙ্গার তীরে মুখ ঘষেন ছেলেটি, সবাই ভাবে, ‘আহা! ছেলেটার মা মারা গেছেন বোধহয় সদ্য সদ্য, নইলে এত কাঁদে কেন?’ রাতে চলে যান পঞ্চবটীর ঘন জঙ্গলে, গভীর ধ্যানে ডুবে যান। এভাবে কেটে যায় কতদিন। একসময় যেন দমবন্ধ হয়ে আসে, মনে হয় হৃদয়টাকে ধরে কেউ যেন গামছা নিঙড়ানোর মতন দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। ‘রামপ্রসাদ, কমলাকান্তেরা তো দেখা পেয়েছিলেন, আমি কেন পাবো না?’ মাকে দেখার ব্যকুলতায় শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে।
আর কষ্ট সহ্য করতে না পেরে ছেলেটি, মন্দিরের গর্ভগৃহে দেওয়ালে ঝুলছে খড়্গ, হাতে তুলে নেয় সেটা, আর তখনই আলো-আলো-আলো ,আলোর ঢেউ খলতে থাকে চারপাশে – উজ্জ্বল আলোর চেতন সমুদ্রে ডুবে যেতে যেতে ছেলেটি দেখে জগৎজননী -মহাকালীর মিষ্টি মুখখানি। সেই মুখ যা ভক্তকে বরাভয় দেয়।
এখনো যখন দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে যাই, মন্দিরে মাকে দেখি, ভাবি এই ঘরটাতেই ঠাকুর দেখেছিলেন এই দেবীবিগ্রহকে ঘুরে বেড়াতে, কথা বলতে? মন্দিরের দোতলায় চোখ পড়ে। এখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন মহাকালী – উগ্ররূপে নয়, একটি কল্যাণময়ী ছোট বালিকারূপে।
‘হেন তীর্থ আছে কোথা, যেথায় জগন্মাতা, সেদিন কহিলা কথা মানব ভাষায়’ – এই তো সেদিনের ঘটনা এগুলি।
আজ কালীপূজার পুণ্যলগ্নে আমরাও প্রাণ ভরে তাঁকে ডাকি। কালীমূর্তিতে তিনি অত্যন্ত জাগ্রত হয়ে প্রার্থনা শোনেন। আমাদের মনের সব অন্ধকার কোনগুলি জ্যোতির্ময়ীর আলোর ছটায় ভেসে যাক। দীপাবলীর আলো সবার হৃদয়ে আলো জ্বালিয়ে যাক।
তমসো মা জ্যোতির্গময়।
সংগৃহীত - প্রব্রাজিকা বেদরূপপ্রাণা মাতাজীর ফেসবুক এর পাতা থেকে