16/05/2026
মিথ্যা অপবাদ আর অধর্মীদের বিষাক্ত বাক্যবাণে আজ আমি পরিশ্রান্ত।
আমি হিন্দু ইতিহাসের বুক চিরে বেরিয়ে আসা অগ্নিসম তেজস্বী মহর্ষি ভরদ্বাজ নন্দন - গুরু দ্রোণ বলছি...
তোমরা যারা আমাকে ‘অহংকারী’ বলে আজ সাধু সেজে বসে আছো, তোমাদের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন - তোমরা কি আদৌও কখনো ধর্মগ্রন্থ উল্টে দেখেছো?
নাকি কেবল লোকমুখে শোনা অর্ধসত্যকে সম্বল করে এক ব্রাহ্মণের আজীবনের তপস্যাকে বিচার করতে এসেছো ?
তোমরা সেই যন্ত্রণার কী বুঝবে?
ইতিহাসের পাতায় তোমরা কেবল বীরত্বের কাহিনী পড়ো, কিন্তু এক হতভাগ্য পিতার বুকের দাবানলের খবর কি রাখো?
যখন দেখেছিলাম আমার অবোধ পুত্র অশ্বত্থামা ক্ষুধার জ্বালায় ছাতু গোলানো জলকে দুধ ভেবে পরম তৃপ্তির সাথে পান করছে, তখন অভাবের সেই নগ্ন রূপ আমার পিতৃত্বকে বিদ্ধ করেছিলো।
তোমরা কেবল অঙ্গরাজ কর্ণের দুঃখই দেখলে, যিনি আজীবন বন্ধুর রাজপ্রাসাদে রাজসুখে অতিবাহিত করলেন।
আর আমি? শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হয়েও নিজের সন্তানের জন্য একটি গাভীর অধিকারটুকু পাইনি।
নিঃস্ব, নিরুপায় হয়ে সেদিন আমি সমাজের দ্বারে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
সেদিন দ্রুপদের দর্পিত সিংহাসনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো আমার ক্ষুধার্ত পুত্র আর রিক্তহস্তা সহধর্মিণী কৃপি।
আমার কোনো ভিক্ষার অভিলাষ ছিলো না, আমি গিয়েছিলাম কেবল শৈশবের সেই পবিত্র বন্ধুত্বের অধিকারে - একটি গাভী চেয়েছিলাম মাত্র। কিন্তু ক্ষমতার মদমত্ততায় অন্ধ পাঞ্চালরাজ ভরা সভায় আমাকে চাবুকের মতো শব্দে বিদ্ধ করলেন - 'দরিদ্র আর ধনীর বন্ধুত্ব অসম্ভব।
সম্পর্কের সেই গরিমা সেদিন ধুলোয় মিশে গিয়েছিলো.... সৌজন্যের সেই সামান্যতম প্রকাশটুকুও তিনি দেখাননি।
তবুও আমার মনে কোনো অন্ধ প্রতিহিংসা ছিলো না।
যদি কেবল প্রতিশোধই কাম্য হতো, তবে আমার তপোবলে অর্জিত দিব্যাস্ত্রের এক ঝলকে সেদিনই পাঞ্চাল ভস্মীভূত হয়ে যেতো... ওই মাটিতেই বিলীন করে দিতাম আমার বন্ধুর অহঙ্কারী বংশকে। কিন্তু আমি ধৈর্য ধরেছিলাম।
মনে মনে সংকল্প করেছিলাম - আমার উপযুক্ত শিষ্যই একদিন আমার বিদ্যার এবং অপমানের যোগ্য সম্মান ফিরিয়ে আনবে।
দুঃখের সেই ঘন অন্ধকারেই আমি মানুষের ছদ্মবেশ আর প্রকৃত সম্পর্কের ব্যবধান চিনতে পেরেছিলাম।
আমার গুরুদক্ষিণা ছিলো দ্রুপদের দর্প চূর্ণ করা, তার প্রাণনাশ করা নয়।
ক্ষত্রিয় দম্ভকে পরাজিত করে আমি তাকে মুক্তি দিয়েছিলাম এবং অর্ধেক রাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। ক্ষমতার দম্ভের বিপরীতে এটাই ছিলো একজন ব্রাহ্মণের প্রকৃত উদারতা ও শ্রেষ্ঠত্ব।
শোনো হে মর্ত্যবাসী, যে শিষ্যের অটল একাগ্রতা আর সমুদ্রের মতো অসীম ধৈর্য ছিলো, সেই পার্থকেই আমি নিজ হাতে শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে বসিয়েছি।
ওরে মহামূর্খরা! অন্ধ আবেগে ভেসে না গিয়ে অন্তত মহাকাব্য ও ধর্মগ্রন্থগুলো খুলে দেখো - আমি কোনোদিন কোনো যোগ্য শিষ্যকেই জ্ঞানদান থেকে বঞ্চিত করিনি।
আমি অঙ্গরাজ কর্ণকেও বীরত্বের সমস্ত শিক্ষা দিয়েছিলাম।
তার শৌর্য আর নিষ্ঠায় কোনো কমতি ছিলো না, তবুও আমি তাকে কেবল ব্রহ্মাস্ত দিতে অস্বীকার করেছিলাম।
কারণ, আমার দিব্যদৃষ্টির সামনে তখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো এক চরম সত্য - আমার সেই প্রিয় শিষ্যকে রাজসিক দম্ভ আর অধর্মের মায়াজাল আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিলো।
যে যোদ্ধা সয়ং মহাগুরু পরশুরামের পবিত্র সান্নিধ্যেও মিথ্যার আশ্রয় নিতে দ্বিধা করেনি, এমনকি কঠোর অভিশাপ পাওয়ার পরেও যে ধর্মশাস্ত্রের গূঢ় ও পবিত্র অর্থ অনুধাবন করতে পারেনি..... তোমরাই বিচার করো, তেমন অস্থির চিত্তের যোদ্ধা কি ব্রহ্মাস্ক্রের মতো মহাপ্রলয়ঙ্কারী শক্তির ভার সইবার যোগ্য ছিলো?
যার জীবনের একমাত্র ব্রত কেবল অর্জুনকে বধ করা, যে কেবল ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ছে, সে কি কোনোদিন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কল্যাণ করতে পারতো?
কোন গ্রন্থে লেখা আছে যে আমি কর্ণকে ধিক্কার দিয়েছি? যার নিয়তিতে আমার মৃত্যু লেখা ছিলো, সেই ধৃষ্টদ্যুম্নকেও আমি শিষ্য হিসেবে স্বীকার করে অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছি।
মনে রেখো, অস্ত্র কেবল পেশিশক্তি নয়, তা ধারণ করার জন্য প্রয়োজন অন্তরের শুদ্ধতা আর ধর্মের প্রতি অবিচল আস্থা।
যখনই একলব্যের প্রসঙ্গ আসবে, ইতিহাসের দরবারে আমার ওপর হাজারো কলঙ্ক লেপন করা হবে। শিক্ষা দিয়ে পয়সা খেয়ে, নিম্নবর্গের রক্ত চুষে খাওয়া এক ‘অধর্মী’ ও ‘নিষ্ঠুর’ গুরু হিসেবে তোমরা আমাকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। কিন্তু আবেগ সরিয়ে রেখে একবার রাজধর্মের দর্পণে তাকিয়ে দেখো।
মনে রেখো, মগধ রাজের একান্ত অনুগত সেই ব্যাধপুত্রকে রণশিক্ষা দেওয়াটা আমার কাছে কেবল ব্যক্তিগত কোনো বিষয় ছিলো না - তা ছিলো সমগ্র আর্যাবর্তের নিরাপত্তার প্রতি এক চরম হুমকি।
একলব্য ছিলো জরাসন্ধের মিত্র। সেই জরাসন্ধ, যে মথুরাকে সতেরো বার আক্রমণ করে ধর্মের গ্লানি ঘটিয়েছিলো এবং বিনাশ করতে চেয়েছিলো যদুবংশকে।
হস্তিনাপুরের প্রধান সমর শিক্ষক হিসেবে আমি জানতাম, শত্রুর মিত্রকে অপরাজেয় করে তোলা মানে নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনা।
একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুলির প্রতি আমার কোনো ব্যক্তিগত মোহ ছিলো না, ছিলো হস্তিনাপুরের সিংহাসনের প্রতি আমার চরম দায়বদ্ধতা।
একজন সেনানায়ক হিসেবে আমার ধর্ম ছিলো কুরুরাজ্যের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা, কোনো সম্ভাব্য শত্রুকে ব্রহ্মাস্ত্রের কৌশলে দক্ষ করে তোলা নয়।
আজকের যুগে দাঁড়িয়ে তোমরা যারা নীতি-কথা বলো, তারা কি নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করেছো - তোমরা কি আজ কোনো পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী বা শত্রুপক্ষীয় জঙ্গিকে নিজের দেশের সামরিক অস্ত্রাগারের চাবিকাঠি কিংবা পারমাণবিক সংকেত সানন্দে তুলে দেবে?
যদি না দাও, তবে কেনো আমাকে অপরাধী করো? আমার সেই সিদ্ধান্ত কোনো বর্ণের লড়াই ছিলো না, তা ছিলো এক রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার কঠোর রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল।
হ্যাঁ, আমি স্বীকার করি - নুন খেয়েছি যাদের, সেই কৌরবদের পক্ষে লড়তে আমি বাধ্য হয়েছিলাম।
যে হস্তিনাপুরের রাজকীয় অন্ন আমার ও আমার পুত্রের ক্ষুধা নিবারণ করেছে, সেই সিংহাসনের প্রতি আনুগত্য ছিলো আমার কুলধর্ম।
আমি ছিলাম রাজধর্ম আর পরিস্থিতির কাছে নিরুপায়... একদিকে বিবেকের দংশন, অন্যদিকে প্রতিজ্ঞার শৃঙ্খল।
আমার পাপ শুধু এটুকুই ছিলো যে, আমি পুত্রস্নেহে অন্ধ ছিলাম।
দরিদ্রের পর্ণকুটিরে দুগ্ধের বদলে পিটুলি গোলা জল খেয়ে বড়ো হওয়া সেই অশ্বত্থামা যখন রুদ্রের অংশ হয়ে জন্মেছিলো, তখন তাকে আমি সাধারণ মানুষের মতো মায়ায় বাঁধতে চেয়েছিলাম।
এক অপরাজেয় দেবত্বকে আমি পিতৃত্বের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আটকে রাখার যে ভুল করেছি, তার দণ্ড আজও আমি বয়ে বেড়াচ্ছি।
আজও আমি অনুশোচনার আগুনে পুড়ছি, কারণ আমিই ছিলাম অভিমন্যুর সেই নির্মম চক্রব্যূহের কারিগর।
ষোলো বছরের সেই কিশোরের রক্তে আমার শ্বেতবস্ত্র রঞ্জিত হয়েছিলো।
কিন্তু ইতিহাসের পাতায় মহাকালের সাক্ষী হয়ে মনে রেখো - সেই অভেদ্য চক্রব্যূহ ভেদ করার ক্ষমতা কেবল আমার প্রিয় শিষ্য অর্জুন আর মহাবীর অভিমন্যুরই ছিলো।
এটি যেমন আমার পাণ্ডিত্য ও শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ, তেমনি এক গুরুর জন্য চরম বিয়োগান্তকও বটে।
আমি এমন এক স্রষ্টা, যার সৃষ্টিই শেষ পর্যন্ত তার বিনাশ আর বিলাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।
আমার তেজ তখনই স্তিমিত হয়েছিলো, যখন ধর্মের গ্লানি দেখে আমি অস্ত্র ত্যাগ করে যোগস্থ হয়েছিলাম।
ধৃষ্টদ্যুম্ন আমাকে বধ করেনি, আমি স্বেচ্ছায় দেহত্যাগ করেছিলাম।
আমার করুণার কথা তখনই প্রকাশ পেয়েছিলো, যখন স্বয়ং মাধব আমার হৃদয় হাতড়ে দেখেছিলেন। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন - "গুরু দ্রোণই শ্রেষ্ঠ গুরু, যিনি ধনুর্ধরদের জন্মদাতা।"
আমার জন্ম ছিলো দিব্য, কর্ম ছিলো দিব্য আর আমি রণক্ষেত্রে দিব্য শৌর্য প্রদর্শন করেছি।
ভরদ্বাজ মুনির দ্রোণ থেকে আমার জন্ম, তাই আমি দ্রোণাচার্য।
আমি ইতিহাসের সেই মর্মান্তিক নায়ক - যে সমাজ থেকে অপমান পেয়েছে কিন্তু সমাজকে দিয়ে গেছে সর্বশ্রেষ্ঠ বীরদের।
"হে কলিযুগের ছদ্মবেশী বিপ্রগণ, তোমাদের এই আস্ফালন কি তবে সত্যের সূর্যকে আড়াল করার এক বৃথা চেষ্টা?
ভালো করে চেয়ে দেখো আমার দিকে - আমি দ্রোণ! আমিই সেই মহীরুহ, যেখানে শাস্ত্রের গাম্ভীর্য আর অস্ত্রের ক্ষিপ্রতা মিলেমিশে একাকার হয়েছে। তোমরা কি সত্যিই বিশ্বাস করো যে, তোমাদের এই ভণ্ডামি ভরা কপট পাণ্ডিত্য দিয়ে আমার ত্যাগের মহিমা আর জ্ঞানের হিমালয়কে পরিমাপ করা সম্ভব?
বিস্মৃত হয়ো না, আমি সেই গান্ধীবধারী অর্জুনের গুরু! যার একাগ্রতা আর শ্রেষ্ঠত্ব বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, সেই বীরশ্রেষ্ঠকে গড়ে তুলেছি আমিই।
আমার শিষ্য যদি বিশ্বজয়ী হতে পারে, তবে চিন্তা করো তার গুরুর স্থান কতো উচ্চে! মহাভারতের রণক্ষেত্রে আমি যে ধর্মের জয়ধ্বনি শুনেছি এবং যা স্বয়ং ঈশ্বর নির্দেশিত, তা তোমাদের মতো ক্ষুদ্রমনাদের অনুভবের অতীত।
আজ যদি আমার অর্জুন এখানে থাকতো, তবে তোমাদের এই স্পর্ধার উত্তর দেওয়ার আগেই তার গাণ্ডীবের অমোঘ টঙ্কারে মেদিনী থরথর করে কেঁপে উঠতো!
ব্রহ্মাণ্ড সাক্ষী, তার গুরুর এই অপমান সহ্য করার আগে সে বিশ্বদহন করতেও দ্বিধা করতো না। কুরুক্ষেত্রের রণক্ষেত্রে যার শরসন্ধানে ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারিত হয়েছে, সেই বীর আজ দিগ্বিজয় শেষে তার সমস্ত শৌর্য আমার এই ধুলিমলিন চরণে সঁপে দিতো।
তার ভক্তির সেই লেলিহান অগ্নিশিখায় তোমাদের মতো পাষণ্ডদের আস্ফালন মুহূর্তেই ভস্মীভূত হয়ে যেত।
ওরে অর্জুন! তোর অনুপস্থিতি আজ এই গুরুর হৃদয়কে বজ্রাঘাতের মতো বিদীর্ণ করছে।
তোর অভাব আজ আমাকে বড়ো বেশি নিঃস্ব করে দিচ্ছে।
আমার জীবন আর কর্মকে যারা বিচারের নিক্তিতে মাপতে আসো, তারা ধৃষ্টতা দেখিও না।
মনে রেখো, সূর্যের বিচার করার যোগ্যতা কোনো মশালধারীর নেই। মহত্ত্ব আর শ্রেষ্ঠত্বের যে সিংহাসনে আমি আসীন, সেখানে তোমাদের এই ক্ষুদ্র বুদ্ধির ডোর পৌঁছানো অসম্ভব। দ্রোণের বিশালত্বকে বাঁধার দুঃসাহস না করে, বরং নিজের অন্তরের অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করো ।"
আমি মহর্ষি ভরদ্বাজ নন্দন আচার্য দ্রোণ!
আপনারা যদি চান দ্রোণাচার্যের সম্পূর্ণ জীবনের ওপরে লেখা আসুক... 'তাহলে সেটা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন।
Writer - SB Bubai (Sangram)
নিচে Note আর Warning দেবার পরেও যারা লেখা কপি করে নিজেদের Profile বা Page এ পোস্ট করছেন কোনো রকম অনুমতি না নিয়ে.... এমনকি Credit পর্যন্ত দিচ্ছেন না তারা সাবধান হয়ে যান কারণ আমার কাছে নোটিফিকেশন আসছে আমি কিন্তু Copy Right মেরে দেবো। তখন কিন্তু Facebook আপনাদের পেইজ বা প্রোফাইল Down করে দিলে কিছু আর করার থাকবে না।
আপনারা Direct শেয়ার অপশন থেকে শেয়ার করুন এতে কোনো সমস্যা নেই।
(End)
Noted: This Text is protected under copyright law and copyrighted by Puran Kotha Samgra . Unauthorized copying, posting, may result in DMCA takedown, legal action, and Facebook account penalties. Content is tracked digitally—violators will be reported and penalized.