15/12/2025
ষষ্ঠ অধ্যায়
নারদের দ্বারা পূর্বজন্মে তাঁর শ্রীকৃষ্ণ সংকীর্তন ও সৌভাগ্যের বর্ণনা
সূত বললেন– হে সমগ্র সন্ন্যাসী বৃন্দ, ব্রহ্মপুত্র দেবর্ষির এই জন্ম এবং কর্ম সমূহের বৃত্তান্ত শুনে ভগবান ব্যাসদেব আরও কিছু প্রশ্ন করেছিলেন। মহাভাগ্যবান ব্যাসদেব জানতে চাইলেন সেই মুনিরা যখন বিদেশে গেলেন সেই বাল্যবয়সে তুমি কী করলে পরবর্তীকালে তোমার জীবন কীভাবে অতিবাহিত করলে।
একদিন রাতে গাভী দোহনের জন্য আমার মা পথে বেরিয়েছিলেন। তার পদপিষ্ট একটি সর্প কাল প্রেরিত হয়ে তাকে দংশন করে। মায়ের মৃত্যুকে ভগবানের অনুগ্রহ মনে করে আমি ওর দিকে গমন করলাম। সেখানে অনেক সমৃদ্ধ দেশের অবস্থান ছিল। নগর, গ্রাম, গোষ্ট বিভিন্ন রত্নের খনি ছিল। বন পর্বতে নানা ধাতুর দ্বারা শোভিত পর্বতশ্রেণী এবং তার গায়ের বৃক্ষসকল। যেতে যেতে আমি স্বচ্ছ জলপূর্ণ সরোবরের এবং নদীর সান্নিধ্যে এসেছিলাম। এই সরোবরের তীরে পক্ষীদের কলকাকলি ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ভ্রমররা গুঞ্জন করছে। আমি শেষপর্যন্ত একটা বিরাট অরণ্যের সামনে পৌঁছে গেলাম। সেই বনে নলবেণু গাছের ঝাড়, কুশ এবং বাঁশঝাড়ের অবস্থান। সেখানে বাঘের মতো হিংস্র জন্তুদের বসবাস। আমার ইন্দ্রিয় এবং দেহ অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়েছিল। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় আমি কাতর হয়েছিলাম। সেই নদীতে স্নান করলাম। সেই নদীর জল পান করে আমার ক্লান্তির অপনোদন ঘটে গেল।
নির্জন বনভূমিতে একটি অশ্বত্থ গাছের নীচে বসে পরমাত্মাকে চিন্তা করতে থাকলাম। আমার দুটি চোখ জলে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। হরি আমার হৃদয়ে আবির্ভূত হলেন। আমার সর্ব অঙ্গে জাগল আলৌকিক শিহরণ একটু বাদে গভীর আনন্দে লীন হলাম। নিজেকে এবং পরমাত্মাকে আর দেখতে পেলাম না। ভগবানের রূপ দেখতে না পেয়ে আমি উন্মত্তের মত হয়ে উঠলাম। আবার তাঁকে দর্শন করার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। এই ইচ্ছা ফলপ্রসূ হল না। অতৃপ্ত আত্মা আতুরের মতো ক্রন্দন করতে লাগল।
তখনই আকাশবাণী শুনতে পেলাম। –ওহে, এ জন্মে তুমি আমাকে আর দেখতে পাবে না। যাদের চিত্তের মালিন্য দূরীভূত হয়নি, এই কুযোগীরা আমাকে কখনও দেখতে পায় না। একবার সেই রূপ আমি তোমাকে দেখালাম কারণ আমার প্রতি তোমার অনুরাগের কোনো সীমা পরিসীমা নেই। আমার হৃদয়ের সমস্ত বাসনা পরিত্যাগ করে তুমি আমার পার্ষদত্ব লাভ করবে। আমাকে নিবদ্ধ তোমার এই শ্রদ্ধা কখনই বিনষ্ট হবে না। আমার অনুগ্রহে প্রাণীদের সৃষ্টি এবং প্রলয় হলেও তোমার স্মৃতি থাকবে।
এই কথা বলে পরমেশ্বরের কণ্ঠস্তব্ধ হয়ে গেল। তখনও তার মূর্তি আকাশে ছিল। অথচ অমূর্তি বলে আমি তাকে দেখতে পাই নি। আমি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করলাম।লজ্জা ত্যাগ করে আমি ভগবানের নাম কীর্তন করতে করতে পৃথিবী পর্যটন করতে থাকলাম। শুরু হল আমার সীমাহীন প্রতীক্ষা। হে ব্রাহ্মণ, এইরূপে আমি উন্মাদ প্রায় হয়ে কৃষ্ণভক্তে পরিণত হলাম। মালাভর্তি বিদ্যুতের মতো আমার মৃত্যুর সময় এসে উপস্থিত হল। ভগবান পার্ষদরূপ শুদ্ধ স্বত্ত্বময় দেহের জন্য আমার ভৌতিক দেহের পতন হল। প্রলয় কাল উপস্থিত হল। ভগবান সমস্ত জগতকে প্রলয় করলেন। ব্রহ্মার নিশ্বাসের সঙ্গে আমি তাঁর দেহের মধ্যে প্রবেশ করলাম। সহস্র যুগ চলে গেল। নিদ্রা থেকে জেগে উঠে ব্রহ্মা সৃষ্টি করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তার ইন্দ্রিয় সকল থেকে মরীচি প্রভৃতি ঋষিগণের আবির্ভাব ঘটল এবং আমি জন্মগ্রহণ করলাম।
মহাবিষ্ণুর অনুরোধে ত্রিলোকের অন্তর ও বাইরে কোথাও বাধা না পেয়ে ভ্রমণ করতে করতে আমি হরিকথা গান করে বিচরণ করে থাকি। আমি যখন ভগবানের লীলা গান করে থাকি, তখন ভগবান যেন আমার হৃদয়ে প্রবেশ করেন। যখন যেখানে তিনি গমন করেন, তাঁর পবিত্র চরণ স্পর্শে সেই স্থান তীর্থস্থানে পরিণত হয়ে যায়। বারবার বিষয় ভোগের বাসনায় আসক্ত সংসারীদের পক্ষে হোলিলীলা কীর্তন করা অবশ্য কর্তব্য। এটি আমার প্রত্যক্ষ অনুভব।
সূত বললেন– ভগবান নারদমুনি বেদব্যাসকে একথা বলে এবং তার অনুমতি নিয়ে বীণা বাজাতে বাজাতে অন্য কোথাও গমন করলেন।