11/08/2026
সৌম্য পাল লিখলেন - #পাঠ_প্রতিক্রিয়া
অসিশপ্ত
লেখক: সুমিত বর্ধন
প্রকাশক: কল্পবিশ্ব পাবলিকেশনস
মুদ্রিত মূল্য: ৩০০ টাকা
“একটি সফল ফ্যান্টাসি উপন্যাসের প্রকৃত শক্তি তার গল্পে নয়, বরং সেই জগতে—যেখানে পাঠক কিছু সময়ের জন্য নিজের বাস্তবতাকেই ভুলে যেতে বাধ্য হয়।” সুমিত বর্ধনের অসিশপ্ত সেই বিরল অভিজ্ঞতারই নাম।
বাংলা সাহিত্যে মৌলিক ফ্যান্টাসি রচনার সংখ্যা এখনও তুলনামূলকভাবে কম। সেই প্রেক্ষাপটে অসিশপ্ত নিঃসন্দেহে একটি সাহসী এবং উচ্চাভিলাষী প্রয়াস। লেখক এমন এক কল্পলোক নির্মাণ করেছেন, যা শুধু ঘটনাপ্রবাহের পটভূমি নয়, বরং নিজেই উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র।
উপন্যাসের ঘটনাস্থল অম্বলিকা—এক কল্পিত গ্রহ, যেখানে বহু প্রাচীনকালে বসবাস করত প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ভিন্নর জাতি। তাদের বিলুপ্তির বহু পরে সেই সভ্যতার ধ্বংসাবশেষকে কেন্দ্র করে নতুন মানবসমাজের উত্থান ঘটে। অতীতের হারিয়ে যাওয়া প্রযুক্তি, রহস্যময় স্থাপত্য এবং অদৃশ্য প্রভাব ধীরে ধীরে বর্তমানের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটই উপন্যাসটিকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে রজত—এক অনিশ্চিত, আত্মবিশ্বাসহীন যুবক, যে ভাগ্যের এক অপ্রত্যাশিত মোড়ে এমন এক শক্তির সংস্পর্শে আসে, যা তাকে ক্রমশ মানবিকতা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। তার এই রূপান্তর কেবল একজন মানুষের নয়; ক্ষমতা, হিংসা এবং আত্মপরিচয়ের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক যাত্রাও বটে। পাশাপাশি মিতা, রবি, রিমা, অতীন ও হিমুর মতো চরিত্রদের জীবনও অম্বলিকার বিস্তৃত ভূখণ্ডে এসে একসূত্রে জড়িয়ে পড়ে।
এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় সম্পদ নিঃসন্দেহে এর ওয়ার্ল্ড-বিল্ডিং। অম্বলিকার ভূগোল, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকে লেখক যে যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে নির্মাণ করেছেন, তা বাংলা ফ্যান্টাসি সাহিত্যে বিরল। দৃশ্য নির্মাণ এতটাই জীবন্ত যে পাঠকের মনে হয়, তিনি যেন বই পড়ছেন না—বরং সেই অচেনা গ্রহের পথঘাট, নগর এবং যুদ্ধক্ষেত্র নিজের চোখে দেখছেন।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক লেখকের ভাষা। শব্দচয়নে রয়েছে স্বাতন্ত্র্য, আবার কাহিনির প্রয়োজনে নির্মিত নতুন শব্দগুলিও কখনও অস্বস্তিকর মনে হয় না। বরং সেগুলিই অম্বলিকার জগতকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। ভাষার এই কারুকার্য উপন্যাসটির নান্দনিকতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
জাপানি অসিবিদ্যা এবং তরবারি যুদ্ধের বিভিন্ন কৌশলকে গল্পের সঙ্গে যেভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে, তা উপন্যাসে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। যুদ্ধের দৃশ্যগুলো শুধু রোমাঞ্চকর নয়, বরং গবেষণালব্ধ বলেই মনে হয়। বাংলা ফ্যান্টাসি সাহিত্যে এমন বিষয়বস্তুর ব্যবহার খুব একটা দেখা যায় না।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। অসিশপ্ত মূলত পরিবেশ, চরিত্র এবং জগত নির্মাণকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে যাঁরা শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সংঘাত বা দ্রুতগতির কাহিনি প্রত্যাশা করেন, তাঁদের কাছে কিছু অংশ অপেক্ষাকৃত ধীর মনে হতে পারে। উপন্যাসটি অনেক বেশি অভিজ্ঞতানির্ভর; একরৈখিক প্লটের তুলনায় এর জগত এবং আবহই পাঠককে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই বৈশিষ্ট্য যেমন বইটির শক্তি, তেমনি কিছু পাঠকের জন্য তা চ্যালেঞ্জও হতে পারে।
প্রকাশনার দিক থেকেও বইটি প্রশংসার দাবিদার। অলংকরণ, মানচিত্র, প্রচ্ছদ এবং সামগ্রিক প্রযোজনার মান বইটির পাঠ-অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষভাবে ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য, অদ্রীজা এবং সুমিত বর্ধনের শিল্পকর্ম এই কল্পলোককে দৃশ্যমান করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে অসিশপ্ত এমন একটি উপন্যাস, যা বাংলা ফ্যান্টাসি সাহিত্যের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে তুলে ধরে। এটি নিছক একটি গল্প নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জগতের আমন্ত্রণ। যারা বিশ্বনির্মাণে সমৃদ্ধ, মৌলিক এবং গবেষণানির্ভর ফ্যান্টাসি পড়তে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য এই বই নিঃসন্দেহে সংগ্রহে রাখার মতো।