04/01/2026
রক্তে ডুবে থাকা গা-জা এবং নীরব ঈশ্বর!
লেখক: শাইখ রমজান নাদভী
আধুনিক যুগে নাস্তিকতার প্রসারের কারণ নানাবিধ ও জটিল; তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গা-জা-এর মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি এই বৌদ্ধিক সংকটকে এক নতুন তীব্রতা দিয়েছে। সারা বিশ্বের অসংখ্য মন আজ এই প্রশ্নের মুখোমুখি—যদি সত্যিই আল্লাহ বিদ্যমান থাকেন, যদি তিনি সর্বশক্তিমান ও ন্যায়পরায়ণ হন, তবে এত ভয়াবহ জুলুমের পরও তিনি কেন তাঁর নির্যাতিত, প্রিয় ও মুমিন বান্দাদের সাহায্যে এগিয়ে আসছেন না?
এই প্রশ্ন কেবল আবেগী আর্তনাদ নয়; বরং এটি আধুনিক যুগের যুক্তিবাদী মানসিকতা থেকে জন্ম নেওয়া এক গভীর ও গুরুতর বৌদ্ধিক আপত্তি, যার সমাধান হালকা সান্ত্বনা বা কেবল পরকালীন প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সম্ভব নয়।
আসল সমস্যা হলো—আধুনিক মানুষের চিন্তা এমন এক খাঁটি বস্তুবাদী দর্শনের প্রভাবে গড়ে উঠেছে, যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার বাইরে থাকা প্রতিটি বাস্তবতাকে হয় সন্দেহের চোখে দেখে, নয়তো অপ্রয়োজনীয় মনে করে। এই মানসিকতার কাছে কেবল সেটাই গ্রহণযোগ্য, যা তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায়, মাপা যায় এবং পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করা যায়। ফলে যখন সে জুলুমের মোকাবিলায় আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো তাৎক্ষণিক সাহায্য দেখতে পায় না, তখন সে পুরো ঈশ্বর-ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে, দুনিয়ার প্রজ্ঞা ও মানব ইতিহাসের দর্শন ব্যাখ্যা না করে কেবল আখিরাতের কথা বলা—এই মানসিকতাকে তৃপ্ত করতে পারে না।
এই প্রশ্নকে বুঝতে ও এর উত্তর দিতে হলে আমাদের দুনিয়া সৃষ্টির প্রজ্ঞা, মানুষের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য এবং জাতিসমূহের ইতিহাসে কার্যকর আল্লাহর বিধান (সুন্নাতুল্লাহ) বুঝতে হবে। কুরআন মাজিদ আমাদের জানায়—এই দুনিয়া চূড়ান্ত প্রতিদান ও শাস্তির স্থান নয়; বরং এটি একটি পরীক্ষাগার। এখানে হক ও বাতিলের সংঘর্ষ চলতে থাকে, জাতিগুলো উত্থান ও পতনের ধাপ অতিক্রম করে, এবং অনেক সময় জুলুম সাময়িকভাবে প্রাধান্য পেয়ে যায়। কিন্তু এই সাময়িক অবকাশই আসলে আল্লাহর বিধানের অংশ—এটি ন্যায়বিচারের অস্বীকৃতি নয়।
কুরআন পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ঘটনাবলি কেবল গল্প হিসেবে বর্ণনা করে না; বরং সেগুলোকে একটি বৌদ্ধিক ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা এবং তক্বীনী (সৃষ্টিগত) ইলাহী বিধান হিসেবে উপস্থাপন করে। ফেরাউনের শাসন, নমরুদের শক্তি, ‘আদ ও সামূদের জাঁকজমক—সবই একসময় অজেয় বলে মনে হতো; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে জুলুম কখনো চিরস্থায়ী হয় না। তবু তাদের অনেক জুলুমের পূর্ণ হিসাব দুনিয়াতেই নেওয়া হয়নি। এখানেই সেই মূল বিষয়টি স্পষ্ট হয়, যা একটি বৃহত্তর ও চূড়ান্ত বিচারের জগতের অপরিহার্যতাকে প্রমাণ করে।
প্রকৃতপক্ষে, দুনিয়ায় পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হতে পারাই আখিরাতের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় যুক্তিবাদী প্রমাণ। মানুষের স্বভাবের মধ্যেই ন্যায়বোধ সন্নিবেশিত—মানুষ জুলুমকে মন্দ, ন্যায়কে উত্তম এবং মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানোকে অপরিহার্য মনে করে, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন। কিন্তু মানব ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো—এই দুনিয়া কখনোই সেই স্বাভাবিক ন্যায়বোধের পূর্ণ প্রতিফলন হতে পারেনি। না প্রতিটি জালিম শাস্তি পেয়েছে, না প্রতিটি মজলুম তার অধিকার ফিরে পেয়েছে।
এই অপূর্ণতাই ঘোষণা করে যে দুনিয়া নিজ সত্তায় পূর্ণ নয়; বরং এটি এক বৃহত্তর উদ্দেশ্যের ভূমিকা মাত্র। যদি এমন কোনো জগত না থাকে, যেখানে প্রতিটি অশ্রুর হিসাব হবে, প্রতিটি জুলুমের ওজন মাপা হবে এবং প্রত্যেক হকদার তার পূর্ণ অধিকার পাবে—তবে মানুষের নৈতিক চেতনা অর্থহীন হয়ে যায় এবং এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডও উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়ে। আখিরাতের ধারণা আসলে দুনিয়ার অপূর্ণ ন্যায়বিচারকে পূর্ণ করার এক অনিবার্য দাবি।
প্রকৃতির ব্যবস্থা ও কসমিক (কায়নাতি) বিধান নিজ নীতিতে এতটাই অটল যে এতে সামান্য পরিবর্তনেরও সুযোগ নেই। কিন্তু নৈতিক ব্যবস্থা ইলাহী ও শরঈ—তক্বীনী নয়। এখানে স্রষ্টার পক্ষ থেকে জবরদস্তি নেই; বরং মানুষকে দেওয়া হয়েছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা। তক্বীনী ব্যবস্থায় শক্তিশালী ও ভারী দুর্বল ও হালকার উপর প্রাধান্য পায়, অথচ নৈতিক ব্যবস্থা চায় দুর্বলের সহায়তা ও অধিকারীর বিজয়। যিনি মানবদেহ সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তার মধ্যে বিবেক স্থাপন করেছেন এবং বুদ্ধি ও চিন্তার ক্ষমতা দান করেছেন। যখন মানুষ এই ক্ষমতাগুলো ব্যবহার করে জীবনকে স্রষ্টার মাপকাঠিতে পরিচালিত করেছে, তখন প্রকৃত ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; আর যখন এর বিরোধিতা করেছে, তখন ন্যায়বিচারকে শ্বাসরুদ্ধ করা হয়েছে। জাতিগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণত আল্লাহর বিধান কার্যকর হয়েছে; কিন্তু ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত জীবন ও অকাল মৃত্যু অনেক সময় এই ন্যায়ব্যবস্থাকে দুনিয়াতে পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। অথচ মানব প্রকৃতি ও সুস্থ বিবেকের অংশ এই ন্যায়ের দাবি—এই চলমান অবিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই পরিপূর্ণ মানববুদ্ধি ও ন্যায়সংগত জীবনদর্শন কেয়ামত দিবস ও পরকালীন প্রতিদান-শাস্তিকে মোটেও অযৌক্তিক মনে করতে পারে না; বরং এটিই প্রকৃতির কণ্ঠস্বর এবং জীবনদর্শনের সবচেয়ে সঠিক ধারণা বলে স্বীকৃত হবে।
গ়া-জা-এর নির্যাতিত শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা যদি দুনিয়াতে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে, তবে এই বঞ্চনাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে আরেকটি জগত অবশ্যই আছে—যেখানে কোনো শক্তিশালী দুর্বলের অধিকার চেপে রাখতে পারবে না, যেখানে মজলুমের নীরব দীর্ঘশ্বাসও রায়ে পরিণত হবে, এবং যেখানে ন্যায় কেবল স্লোগান নয়, বরং এক অটল বাস্তবতা হবে।
এভাবে গ়া- জা এর ট্র্যাজেডি ঈমানের জন্য শুধু একটি পরীক্ষা নয়; বরং নাস্তিকতার আপত্তির জবাবে এক গভীর বৌদ্ধিক যুক্তিও বটে। যা আমাদের বুঝিয়ে দেয়—যদি দুনিয়াতে ন্যায়বিচার পূর্ণ না হয়, তবে তার অর্থ এই নয় যে ঈশ্বর নেই; বরং এর অর্থ হলো—এখনো চূড়ান্ত রায় বাকি আছে, এবং এমন এক জগত অনিবার্য যেখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ব্যাখ্যা ছাড়া দুনিয়া খেলাচ্ছল ও জীবন অর্থহীন হয়ে যায়, যা এই বিশ্বসৃষ্টির মহা ব্যবস্থাপনা ও অস্তিত্বের প্রজ্ঞার সম্পূর্ণ বিপরীত।
“তোমরা কি মনে করেছিলে যে আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের আমার কাছে ফিরে আসতে হবে না? অতএব মহান ও উচ্চ আল্লাহ—সত্যিকার বাদশাহ। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি মহামহিমান্বিত আরশের অধিপতি।”
(সূরা আল-মু’মিনূন: ১১৫–১১৬)