16/02/2026
কলমে দীপিকা ✍️পালিত ( Dipti Mitra)
ছোটগল্প _ শান্তিজল।
__________
আগামী কাল মন্দাকিনীর জন্মদিন বলে সুশীলা কয়েকজন পরিচিত বান্ধবীকে নিমন্ত্রণ করতে বেরিয়েছিল জলখাবার খেয়ে। এসে বিছানায় একটু আয়েস করে লেখার খাতাটা নিয়ে বসেছেন ফোন এলো কর্তার আজকে ফিরতে একটু দেরী হবে একেবারে শ্যালকবাবুর বাড়ী হয়ে আসবো।
" দেখেছো কান্ড আজই দেরী হবে! ফোনে তো বৌদিকে বলে দিয়েছেন উনি " ভাবতে ভাবতেই একটা গলার আওয়াজ পেলেন জানলাদিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন। আবারো এলো আওয়াজটা।
"মা গো একটু খাইতে দেবে"? " কে রে ? কোত্থেকে
এসেছিস?" ওই তোমাগো বাড়ীর পিছনের বসতি
থেকে। "সুশীলা গেটের কাছে এসে দেখেন একটা ঝাঁকড়াচুলো ছোট ছেলে পেটটা টিপে ধরে বসে আছে। তিনি বাইরে বেরিয়ে এসে বলেন "ভিতরে আয়,বাগান পরিস্কার করতে পারিস "?
"সব পারি গো মা পেটে খেতে পাইলে "
" এটা কে আবার কোথা থেকে জোগাড়
করলে"! চমকে ফিরে দেখেন ভাইপো শ্যামল মিটি মিটি হাসছে, ভারি ফাজিল, বাড়ী থাকলেই পিসের সাথে বসে রাঙাপিসিকে রাগানো ওর একটা মহান কাজ।রাঙাপিসির লেখার খাতাখানা ঠিক খুজে বের করে তাঁর লেখার খুঁত ধরা ওর একটা প্রধান কাজ।"আ গেলো আমি জোগাড় করবো কি করে!"
"না তুমি তো মাঝে মাঝে জুটিয়ে আনো তাই বলছিলাম।" গুণধর ভাইপোটি কলেজ থেকে এলেন, শুধু বাকচাতুরী আর ফাজলামো শিখছে এখনকার ছেলেপুলে গুলো।" কুটো নেড়ে দুটো করবে না। সবসময় ফোন হাতে কি করে ফোনে কি জানি! উনি তো শুধু ফোন এলে ধরেন, ওনাকে মাঝে মাঝে বলে " এসো তোমাকে একটা ফেসবুক খুলে দিই দেখবে কতো বন্ধু হবে " এসব ছেলেপুলে ধরে তাদের পুত্তুরের মতো পালন করতে চাইলেই কি পারবে তোমার মন মতন গড়তে "? আগের ছেলেটা তো দুদিনেই অতিষ্ঠ হয়ে নিরুদ্দেশ হলো অতো শাসন এই শ্যাম সহ্য করবে বলে সবাই কি সহ্য করবে? একটা হেরিডিটি আছে তো না কি"?
" তা তুই বংশের মুখ রাখলি, তোর বাবা অতো বড়ো প্রফেসর, তুই H.S র রেজাল্ট টা ভালো করতে পারলিনা বলে তো তোকে কলকাতা ছেড়ে এই এঁদো শ্রীরামপুরের এসে থাকতে হচ্ছে এখানের কলেজে ভর্তি হতে হলো? " আরিব্বাস না এলে এতো ফ্রেস হাওয়া কোথায় পেতাম?" মনে মনে বলল মন্দাকিনীতে অবগাহন করতে না পারি বাতাস তো খাচ্ছি, যদিও সেটা কুলোর বাতাস। একটু হাতটা ধরলেই ছিটকে ওঠেন মহারানী, মুখে তখন বদমাশ হতচ্ছাড়া সব রাঙাপিসির কথাগুলো বুলেটের মতো বেরোতে থাকে। সন্ধ্যায় ফুচকা খেতে যাওয়ার সময় যা একটু হাসিমুখ, একা একা বেরোতে দেয়না তো পিসি। " চল শ্যাম তোকে খেতে দিই, ভাইপো নিয়ে এগোতে এগোতে ওই ছেলেটিকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন।ছেলেটা অনড় হয়ে বসে রইলো ওখানেই।
Deepika
তিনি ভিতর থেকে দুটো রুটি ঠাকুরের প্রসাদী সন্দেশ দিয়ে বললেন আগে খেয়ে জল খা।
তারপর মন্দিরের পাশের ঘাটে , চান করে পরিস্কার হয়ে আয়, একটা সাবান নিয়ে যা।
"তোর ঝোলায় কি আছে রে! "আজকে বসতি তুলে দিচ্ছে, সব উ*চ্ছে*-*দ করে তাড়িয়ে দিচ্ছে বলে যা ছেলো নিয়ে বেরোইচি গো মা"।"তোর কে কে আছে?" কেউ নেই গো, মাটা আমি জম্মাতেই কদিন বাদে চোখ বুঁজেছে। বাপটা একটা খান্ডারনী এনে সংসার পাতিছিলো আমার ঠাঁই হলো নি।ঘুরতে ঘুরতে একদল লোকের সাথে চলে এলুম বাঁকুড়া থেকে শিয়ালদহর ওই বস্তিতে।তারপর টেরেনে করে এখান সেখান করে এলাম এখেনে ছিরামপুরে। তোমার ওই মন্দিরের চাতালে বসেছিলাম" "সেবাইত বলল কিনা ভিতরে যা মাতা ঠাকরান খুব দয়ালু।"
*-----------***********-****----******
যতোবার বাচ্চা পেটে আসে তিনচার মাস হলেই নষ্ট হয়ে যায় সুশীলার, সেবার গড়ালো নয়মাস পর্যন্ত । কলকাতার বিখ্যাত এক নার্সিং হোমে ভর্তি করলেন তথাগত, বাচ্চাটা হলো কিন্তু সুশীলার যায় যায় অবস্থা, বাচ্চাটাও বাঁচলো না। ওর দাদা সৌরেনের এক বিপত্নীক বন্ধু তার একমাসের মেয়েটাকে নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন। অনেক পরামর্শের পর ওকে দত্তক নিলেন পিসে তথাগত।
সৌরেন ওর স্ত্রী ছাড়া কেউ একথা জানলো না। শ্যামল তখন বছর চারেক হলেও প্রায় সবটাই বুঝেও গুলিয়ে গেলো ভাবলো পিসি ডলপুতুলের মতো বাচ্চাটা তবে কিনলো? পেটের বাচ্চাটা মরে গেছে কাজের মাসী বলল ওকে।
আগের ছেলেদের জামাপ্যান্ট খুঁজে বের করে ছেলেটাকে গিয়ে পুকুরঘাটে দিয়ে এলেন।
চুলগুলো নাপিতকে ফোন করে ডেকে কাটালেন। এইবার দেখলেন বাঃহ সুন্দর লাগছে তো ছেলেটাকে। " অতো মুগ্ধ হওয়ার কি পেলে বাবা কি জানি? " এই এক আদুরে ছেলে হয়েছে, কারুর দিকে মন দেওয়ার উপায় নেই "বললেন সুশীলা। " চলো পেটে চুহা দৌড়চ্ছে যে "। "চল বাবা রাঁধুনী মায়ের রান্না হয়ে গেছে মনে হয় "। শ্যামলের মর্নিং কলেজে ডিউটি। মন্দাকিনীর ডে তে স্কুল ফিরতে সেই পাঁচটা।
খাওয়ার পর ছেলেটা নিজেই একটা খুরপি নিয়ে বাগানের গাছগুলো খুঁড়তে বসলো। পিসিও বসলো গিয়ে ওর পাশে, সব গাছের পরিচয় দিতে।ছেলেটা শুধু মুচকি মুচকি হাসছে শেষে বলে "অতোটাও মুখ্যু নই তুমি যতোটা ভেবেছো ",ফোর ক্লাস অব্দি পড়েছিলাম, তখন ছিলাম খুলনায়, তারপর ওহান থেকে চলে আসতে হলো গো মা। আমাদের একটু জমি জায়গা ছেলো, সে সব... " থাকরে বুঝেছি
তা তোর নাম টা কি রে কি বলে ডাকবো তোকে"?
"আমার নাম বাদল হক্কলে বাদলা বলে ডাকে ঘোর ঝড়বৃষ্টির মধ্যে আইলাম আমি, প্রত্থম পৃথিবী দেখলাম কিন্তু যে দেখালো তাকে বেশিদিন পেলুমনি গো মা ঠাকরন। আমরা আবার মনিষ্যি নাকি? বাবা বলে আমরা জলের মতো যখন যে জায়গায় থাকি সেই নাম ধারণ করি,কোথাও আনোয়ার, কোথাও রাম, কোথাও বংশী! পদবী নাই গো মোদের মা ঠাকরুন। তবে তুমি পদবী ভালোবাসলে নিজেই একটা দাও না গো মা "
" এতো দিব্য দর্শন হয়ে গেছে তোর, দাঁড়া কাল একটা পৈতে তোকে পরিয়ে দিয়ে আমি তোর পদবী দেবো " পিছনে কখন শ্যাম এসে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে।
সুশীলা বলে ওঠেন " কি রে দিবানিদ্রা ভাঙলো কুম্ভকর্ণ "? তবে একটু বাজারে যা না কিছু জিনিসপত্র আনতে হবে, তোর পিশে কলকাতা থেকে কেক আনবে বলে গেছে "। " বুঝলাম ওর মাপের নতুন জামা কাপড় তো " আচ্ছা মন্দার আসুক ও কে নিয়ে যাবো, নয়তো গাল ফুলোবে তোমার মেয়ে"। নিজেও তাকিয়ে আছে গেটের দিকে কখন রাঙাপিসির রাঙা কন্যা ফিরবে।
ছুটতে ছুটতে এসেই আহ্লাদী মেয়ে জড়িয়ে ধরলো মা কে। লোভীর মতো তাকিয়ে আছে শ্যাম দেখে পিসি বললো তুই আয় আমার কাছে, পিসির আড়ালে মন্দাকিনীকে কাতুকুতু দিয়ে অস্থির করবে ভাবছিলো কিছু না পেরে পা দিয়ে পায়ে ঘষতে লাগলো মন্দারের, মন্দার চোখ বড় বড় করে তাকালেও কে শুনবে ওর কথা।
পিসি বাড়ীতে নেই দেখে মন্দারের ঘরে ঢুকেই শ্যাম ওকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরতেই চটাস করে একটা কষিয়ে চড় দেয় ওর গালে। ততক্ষণে ওর কুর্তির তলায় হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে শ্যাম, এলিয়ে পড়েছে মন্দাকিনী। একে একে ওকে পোষাক মুক্ত করতে থাকে শ্যাম, মুখ ঘষতে থাকে ওর সুডৌল বুকে, ঠোঁট চেপে ধরে ওর ঠোঁটে, গন্ধপায় পারিজাতের। কতক্ষণ ছিলো ওরা এভাবে জানে না মনে হয় অনন্তকাল। হঠাৎ গেটের শব্দে চমকে উঠে মন্দাকিনী ওকে ঠেলে দেয়। শ্যাম বোঝে রাধা ওর বশ মেনেছে। একটু হেসে বেরিয়ে যায়। পিসি ফিরে মন্দারের মুখটা লাল দেখে একটু কিছু অনুমান করে। মোটে তো শ্যামের পঁচিশ মন্দারের একুশ, এর মধ্যেই কি দুহাত এক করে দিতে হবে ভাবতে থাকে সুশীলা।
বাদলা কে ডাকতেই চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়ে আসে বাদলা, বেশ বড়ো হয়ে গেছে এই দুইবছরে
এখন একটু একটু করে সব কাজই করে, মন্দিরটা ঝাঁটপাট দেয় ধোয় তকতকে করে। সেবাইত খুব খুশী ওর গলার পৈতে দেখে, শুধু সুশীলার মনটা একটু খুঁতখুঁত করে যখন পুরুতমশাই বিকেলের শীতলটা ওকে দিতে বলেন। যতই লিবারেল হোন না কেন মনটা ঠিক সায় দেয়না প্রতিষ্ঠা করা শ্যামরায়।তবে বাদল খুব খুশী, একটা পোক্ত জায়গা হয়ে গেছে এই বাড়ীতে ওর।আরো পোক্ত করতে হবে জায়গাটা ভাবতে থাকে। তক্কে তক্কে থাকে পিসিকে শেতলের দুধটা খাওয়ানোর জন্য।
তথাগত একদিন বোঝালেন শোনো তোমার শ্যামরায় তো গোয়ালার ঘরে মানুষ হলেন তবে তো তার জাত আগেই গেছে শ্যামল ও বলে ও যতই ঘি ঢালো পিসে সবই ভস্মে যাবে। পিসি বিকেলের শেতলটা দেওয়ার জন্য পুরুতমশাইকেই বলেন রোজ।
ঠাকুর মশাই বলেন ও দিচ্ছে দিক গো, ওকে আমি
শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছি, তুমি ভেবোনা বৌমা। ছেলেটার খুব মেধা তাড়াতাড়ি সব আয়ত্ত করে নিয়েছে।
বাদল ভাবে দেখা যাক, রোজই শীতলের দুধের মধ্যে একটা শিশি থেকেএকটু মধু দিয়ে পিসিকে দেয় পিসি খায়না দুধে এলার্জি বলে।
একদিন একটু এলাচিগুঁড়া আর সংগ্রহের সদ্য চাকভাঙা মধু মিশিয়ে নিয়ে বারান্দায় বসে থাকা রামায়ণ পাঠরতা পিসিকে দেয়। পিসি অন্যমনস্ক হয়ে খেয়েও নেয় শান্তিজল বলে। পরম শান্তি সেইদিন রাতে নেমে এলো পিসির,শুয়েই ঘামতে লাগলেন একটু বমি করলেন বেসিনে, তারপর বুকটা একটু ধড়ফড় তারপর দুচোখে ঘুম জড়িয়ে এলো। ডাক্তার এলেন বেলা আটটায় পিসিকে কেউ জাগাতে পারছেনা বলে। ততক্ষণে নাড়ী ছেড়ে গেছে, ডেথ সার্টিফিকেট দিলেন ডাক্তার হার্ট ফেলিওর যদিও মুখটা একটু নীলচে, মনে করলেন চোখের ভুল।
শ্মশানের ডাক্তার একটু সন্দেহ করলেও কিছু করতে পারেন নি বাদলা অনেক বন্ধু জুটিয়ে এনেছিলো যাতে পিসিকে রোদে লাইনে না ফেলে রাখে। সবার প্রথমে লাশ দাহ হলো সুশীলা পিসির। সবাই বলতে লাগলো ভাগ্যবতী মেয়ে সিঁথের সিঁদুর নোয়া নিয়ে যেতে পারলো।কতো পুজো আচ্ছা করতো গরীবদের দান ধ্যান করতো।পুরুত মশাই সেদিনের কোষাকুশির শান্তিজলটা খোঁজ করেও দেখতে পাননি। কয়েকটা ইঁদুর ঠাকুরের পাশে *ম**পড়েছিলো কোন বাড়ী থেকে কি খেয়ে এসেছিলো? বাদলা ঘরদোর তকতকে করে ধুয়ে পরিস্কার করে রাখলো, ইঁদুরগুলো ফেলে দিয়ে।
নিশ্চিন্তমনে বাদলা একটা বিড়ি ধরিয়ে ভাবতে লাগলো ওর বাবা তো সাপুড়ে ওরা তো চিরকাল বনে বাঁদাড়ে ঘুরেছে,সাপও চেনে। এক ফোঁটায় এতবড় শরীলটা শ্যাষ! লোভে চকচক করতে লাগলো চোখ মুখ ওর।
আমরা কি চিরকাল লাঞ্ছনায় এ জায়গা ও জায়গা
করে বেড়াবো?
©