01/06/2026
ইতিহাস সমৃদ্ধ বদরপুর নিয়ে:
বরাকের ৪০ লক্ষ মানুষের দীর্ঘদিনের এক আবেগঘন দাবি—শিলচর রেল স্টেশনকে 'ভাষা শহিদ স্টেশন' নামে নামকরণ করা হোক। এই গণদাবিকে সম্মান জানিয়ে স্টেশনটির নামকরণ করাই ছিল প্রকৃত কাজের কাজ। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, এক রহস্যজনক নীরবতা পালন করে বরাকের এই গণদাবিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হচ্ছে। এই পাত্তা না দেওয়াটা কার্যত মাতৃভাষার জন্য আত্মবলিদানকারী এগারো জন শহিদকে চরম অপমানের শামিল।
অন্যদিকে, যেখানে নাম পরিবর্তনের কোনো দাবিই ছিল না, সেখানে এক প্রাচীন ইতিহাসকে মুছে ফেলার অদ্ভুত চেষ্টা চলছে। বদরপুরের ইতিহাস কয়েক শতাব্দী প্রাচীন এবং এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়:
১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে সুফি সাধক শাহজালালের অনুগামী শাহ সুফি বদরউদ্দিন সমাজ সংস্কারক হিসেবে এখানে এসে বসবাস শুরু করেন এবং তখন থেকেই এই স্থান 'বদরপুর' নামে পরিচিতি লাভ করে। বদরপুরঘাটের ফোর্টের কাছেই তাঁর কবর রয়েছে বলে লোকমুখে প্রচলিত।
১৬১২ খ্রিষ্টাব্দে মোঘল আমলে বদরপুরঘাটে বদরপুর ফোর্ট বরাক নদীর তীরে নির্মিত হয়।এই ঐতিহাসিক ফোর্টটি আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল এবং পর্যটকদের জন্য একটি অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান।
১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দ বার্মিজ আক্রমণ থেকে এই অঞ্চলকে রক্ষা করতে কাছাড়ি রাজা গোবিন্দ চন্দ্র হাসনু এবং ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেলের প্রতিনিধি ডেভিড স্কটের মধ্যে ঐতিহাসিক 'The Treaty of Badarpur' স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
১৮৯৮ খৃষ্টাব্দে' বদরপুর রেল স্টেশন' স্থাপিত হয় এবং এখান থেকে লামডিং পর্যন্ত রেললাইন প্রতিষ্ঠিত হয়ে এই অঞ্চলের সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
ইতিহাস সমৃদ্ধ বদরপুরের নাম পরিবর্তন করার পেছনে প্রাচীন ইতিহাসকে মুছে ফেলার চক্রান্ত ছাড়া আর কী হতে পারে?
ইতিহাসকে এভাবে মুছে ফেলা আগামী প্রজন্মের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। যে মানুষ তার নিজ জন্মস্থান তথা দেশের ইতিহাস ভুলে যায়, তার জন্য জ্ঞান ও সভ্যতা চিরকাল অধরাই থেকে যায়। ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে ধ্বংস করার নাম কি পরিবর্তন? নাম বদলের এই রাজনীতি এবার বন্ধ হওয়া উচিত; কারণ প্রকৃত উন্নয়নের সাথে নাম পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি একটি অভিসন্ধি ছাড়া আর কিছু নয় তো?
'বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য'-ই হলো ভারতের মূল মন্ত্র। এই মূল মন্ত্রের ওপর আঘাত হেনে ভারতের প্রকৃত ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার এই মানসিকতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
Hifzur Rahman
2.6.2026